ইতিহাসের প্রতিযোগিতা, নাকি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের পরীক্ষা? – কিংশুক বিশ্বাস

শেয়ার করুন

​পশ্চিমবঙ্গের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য লোক ভবন, পশ্চিমবঙ্গের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছে রাজ্যস্তরের প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বিষয়: “১৯৪৬ সালের কলকাতার গনহত্যাযজ্ঞ –কারণ ও ফলাফল”। আর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি রাখা হয়েছে স্পষ্ট একটি রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্তের আকারে—

“অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস—ভারতের চিরায়ত সভ্যতার ভিত্তির উপর এক মারাত্মক আক্রমণ।”

​মৌলিক প্রশ্নটি ঠিক এখানেই: এটি কি তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস খুঁজে বের করার স্বাধীনতা দিচ্ছে, গবেষণা ধর্মী মানসিকতা তৈরিতে সহায়তা করছে নাকি বিষয়ের শিরোনামেই রায় লিখে দিয়ে কেবল সেই রায়ের সপক্ষে সওয়াল করতে বলা হচ্ছে?

​একজন ছাত্র যদি নথিপত্র ঘেঁটে লেখে—১৯৪৬ সালের ২৯ জুলাই মুসলিম লীগ ‘Direct Action’-এর ডাক দিয়েছিল; সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায় তৎকালীন লীগ নেতৃত্বের; ১৬ আগস্টের উত্তপ্ত জমায়েত দ্রুত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রশাসনের ভূমিকা ছিল চূড়ান্ত ব্যর্থ ও পক্ষপাতদুষ্ট—তবে তা নিশ্চিতভাবেই ঐতিহাসিক আলোচনার স্বীকৃত অংশ।

​কিন্তু সেই ছাত্রই যদি প্রাথমিক নথি ও নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ সামনে এনে দেখায় যে, ১৬ আগস্টের পর থেকে হিংসা আর একতরফা থাকেনি—হিন্দু ও মুসলমান উভয় পক্ষের উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিই চরম নৃশংসতা, লুটপাট ও প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছিল—তাহলে কি তার লেখা সমান গ্রহণযোগ্য হবে?

​তৎকালীন সামরিক প্রশাসনের লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যার ফ্রান্সিস টাকার (Francis Tuker) তাঁর স্মৃতিকথা ‘While Memory Serves’-এ স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন যে প্রাথমিক হিংস্রতার পর উভয় পক্ষই সশস্ত্র প্রতিশোধে নেমেছিল এবং বস্তুত শহরটি এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছিল। সুরঞ্জন দাশের মতো আধুনিক গবেষকদের গবেষণাতেও উঠে এসেছে এই দাঙ্গার বহুমাত্রিক রূপ—যেখানে ব্রিটিশ পুলিশের ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা, গ্রামীন খাজনাভোগী জমিদার শ্রেণীর পরে কৃষক সমাজের ক্ষোভ, রেশনের কালোবাজারি নিয়ে তৈরি সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক ফায়দা তোলার উন্মাদনা একাকার হয়ে গিয়েছিল।

​তাহলে মূল্যায়নের মানদণ্ড কী হবে? যে ছাত্র প্রাথমিক নথি ঘেঁটে ইতিহাসের এই অস্বস্তিকর ও জটিল সত্যকে বিশ্লেষণ করবে, সে কি নম্বর পাবে? নাকি যে ৫,০০০ শব্দ ধরে কেবল প্রমাণ করবে যে ১৯৪৬-এর সমস্ত রক্তের দাগ একটিমাত্র ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গায়ে, তারই প্রবন্ধকে ‘শ্রেষ্ঠ’ ঘোষণা করা হবে? ​একটি মারাত্মক ঐতিহাসিক ভ্রান্তি হলো একটি রাজনৈতিক দলকে সমগ্র ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমার্থক বানিয়ে ফেলা। ১৯৪৬ সালের মুসলিম লীগ সমগ্র বাঙালি মুসলমানের একমাত্র প্রতিনিধি ছিল না। অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে তখন একে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা আন্দোলনের জনভিত্তি ছিল, জমিয়তে উলেমা ও মোমিন কনফারেন্সের মতো জাতীয়তাবাদী মুসলিম সংগঠনের জোরালো উপস্থিতি ছিল। এমনকি মুসলিম লীগের অভ্যন্তরেও আবুল হাশিমের মতো প্রগতিশীল নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কেন্দ্রের কট্টরপন্থী ধারার গভীর মতভেদ ছিল।

​অতএব, ‘মুসলিম লীগ’ এবং ‘বাঙালি মুসলমান’—এই দুই সত্তাকে এক বন্ধনীতে ফেলে দেওয়া ইতিহাসচর্চা নয়, রাজনৈতিক অতিসরলীকরণ। একইভাবে, ১৯৪৬-এর এক রাজনৈতিক চক্রান্তের দায় আজকের ভারতীয় কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো কোনোভাবেই অ্যাকাডেমিক সততার লক্ষণ হতে পারে না।

​অন্ধকারের মাঝে সম্প্রীতির নথিভুক্ত ইতিহাস

​১৯৪৬-এর সেই বিভীষিকাময় চার দিনে কেবল রক্তের দাগ ছিল না; সেখানে জ্বলজ্বল করছিল এমন অসংখ্য বাস্তব ঘটনা, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজের জীবন বাজি রেখে অন্য ধর্মের প্রতিবেশীকে রক্ষা করেছিলেন। ইতিহাসের ছাত্র যদি সেই নথিবদ্ধ সত্য তুলে না ধরে, তবে তার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

  • ​মেডিকেল কলেজের মানবিক প্রতিরোধ: দাঙ্গা যখন রাজপথে তুঙ্গে, তখন কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও আর. জি. কর হাসপাতালের চিকিৎসক, ইন্টার্ন এবং নার্সরা ধর্ম-পরিচয় নির্বিশেষে আহতদের চিকিৎসা করেছেন। মেডিকেল কলেজের ছাত্র ও চিকিৎসকরা নিজেরাই হোস্টেলের সামনে পাহারা বসিয়ে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের আশ্রয়হীন মানুষকে নিরাপত্তা দিয়েছিলেন।
  • ​শ্রমিক ও বস্তির প্রতিরোধ: পার্ক সার্কাস, রাজাবাজার, বেলেঘাটা এবং খিদিরপুরের বিভিন্ন মিশ্র শ্রমিক বস্তিতে স্থানীয় হিন্দু ও মুসলমান বাসিন্দারা যৌথ শান্তি রক্ষা কমিটি গঠন করেছিলেন। অনেক জায়গায় গুন্ডারা আক্রমণ করতে এলে দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
  • ​পারস্পরিক প্রাণ বাঁচানোর সমকালীন রেকর্ড: বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশন, সামরিক নথি এবং পরবর্তীকালে গান্ধীজির শান্তিরক্ষার দলিলগুলোতে লিপিবদ্ধ রয়েছে কীভাবে হিন্দু পরিবারগুলো তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের নিজেদের ঠাকুরঘরে বা চিলেকোঠায় লুকিয়ে রেখেছিল, আবার মুসলিম পরিবারগুলো নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হিন্দু প্রতিবেশীদের দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদ অঞ্চলে পৌঁছে দিয়েছিল।
  • ​গান্ধীজির উপবাস ও নোয়াখালী-কলকাতা যাত্রা: এই সম্প্রীতির ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধী বেলেঘাটার হায়দরি মঞ্জিলে বসে হিন্দু-মুসলিম যৌথ শান্তি মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন, যার ফলে কলকাতা পরবর্তীতে বড় মাপের রক্তক্ষয় থেকে রক্ষা পায়।

​যে ছাত্র দাঙ্গার রক্তক্ষয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের এই অসাম্প্রদায়িক শুভবুদ্ধি ও পারস্পরিক সুরক্ষার নথিভুক্ত তথ্যগুলো তুলে ধরবে—তাকে কি “বিষয়ের বাইরে চলে গেছে” বলে নম্বর কেটে নেওয়া হবে?

​প্রতিযোগিতার আসল পরীক্ষা কোথায়?

​“ভারতের চিরায়ত সভ্যতার ভিত্তির উপর এক মারাত্মক আক্রমণ”—এই শিরোনাম কোনো নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক জিজ্ঞাসা নয়; এটি একটি পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক রায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত এই মূল্যায়নকে যুক্তি ও তথ্যের নিরিখে খতিয়ে দেখার। সে যুক্তি দিতেই পারে যে, এই আক্রমণ কোনো একক সভ্যতার ওপর ছিল না, বরং তা ছিল বাংলার বহু শতাব্দীর মিশ্র সংস্কৃতি, যৌথ অস্তিত্ব এবং আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচেতনার ওপর এক সর্বনাশা আঘাত—যার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী নেতৃত্ব ও ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতির প্রত্যক্ষ মদত ছিল।

​প্রতিযোগিতার মূল্যায়নে যদি প্রাধান্য পায়:

  • ​প্রাথমিক ঐতিহাসিক সূত্র ও নথির বস্তুনিষ্ঠ ব্যবহার,
  • ​বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণার তুলনামূলক বিচার,
  • ​হিংসার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ ও সম্প্রীতির তথ্যের নির্মোহ উপস্থাপন,
  • ​এবং লেখার যৌক্তিক ও সমালোচনামূলক ভারসাম্য—

​তবেই এই উদ্যোগ একটি উচ্চমানের বৌদ্ধিক চর্চা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।

​কিন্তু অঘোষিত শর্ত যদি হয় কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে শব্দ মিলিয়ে পুরস্কারের মঞ্চে পৌঁছানো, তবে তা ইতিহাসচর্চা নয়—তা হবে স্মৃতি ও মতাদর্শের নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা। লোক ভবনের এই উদ্যোগের প্রকৃত বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করছে এখানেই: বিচারকরা কি তথ্যের গভীরতা ও সততাকে পুরস্কৃত করবেন, নাকি পূর্বনির্ধারিত আনুগত্যকে?

কিংশুক বিশ্বাস

মানবাধিকার আন্দোলনের একজন সাধারণ কর্মী

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *