​ট্রানজিস্টারের শেষ অক্ষাংশ – ​অয়ন মুখোপাধ্যায়

শেয়ার করুন

শহরের আকাশটা গত তিন দিন ধরে রঙের বদলে পচাগলা খয়েরি হয়ে আছে। হরিদা আজ সারাদিন ধরে চটি সেলাই করছে। তার সামনে এক জোড়া বাটা চটি, যেটা তলা খসে জিব বের করে রেখেছে। হরিদা দাঁত দিয়ে সুতো ছিঁড়তে ছিঁড়তে বিড়বিড় করে মনে মনে বলল, “খপ করে যদি একটা কামড় দিয়ে দিতে পারতাম খুব ভালো হতো, আর সেটা যদি চামড়ার বদলে এই শহরের ঘাড়টাকে পেতাম।” পাশের দেওয়ালে একটা পোস্টার— ‘উন্নয়নের জোয়ারে গা ভাসান’। পোস্টারটা দেখে হরিদার মনে হলো, ওটা একটা মৃত মানুষের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট।

অঘোর এল হাঁপাতে হাঁপাতে। তার ঝোলার ভেতর বাতিল খবরের কাগজের স্তূপ। অঘোর ফিসফিস করে বলল, “হরিদা, ওরা স্টেশনটা সিল করে দিয়েছে। ওরা ওখানেই কর্পোরেট টাওয়ার তুলছে। কাঁচের টাওয়ার।” হরিদা না তাকিয়েই বলল, “হোক। মানুষ এখন ড্রোন দিয়ে যাতায়াত করবে, নয়তো ইঁদুরের গর্ত দিয়ে।” অঘোর তার ঝোলা থেকে একটা টিকিট বের করল। টিকিটের গায়ে কোনো স্টেশনের নাম নেই, আছে শুধু একটা তারিখ—‘আগামীকাল’। আর একটা লাল সিলমোহর, যাতে লেখা ‘ওয়ান ওয়ে—টু নোহোয়ার’।

“হরিদা, এই টিকিটটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছি শহরের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির ধ্বংসস্তূপ থেকে। কাল রাত তিনটের সময় একটা ট্রেন আসবে। কিন্তু ট্রেনটা কাউকে গন্তব্যে নেবে না, ওটা পুরো শহরটাকে পেটের ভেতর ঢুকিয়ে নেবে।” হরিদা এবার থমকে গেল। সে তার সুঁইটা মাটিতে পুঁতে দিয়ে অঘোরের চোখের দিকে তাকাল। অঘোরের চোখে কোনো ভয় নেই, আছে এক তীব্র উন্মাদনা।

রাত তিনটে। শহরের ঘড়িগুলো সব একই সাথে বিকল হয়ে গেল। অঘোর আর হরিদা এগিয়ে চলল পরিত্যক্ত প্ল্যাটফর্মের দিকে। যেখানে রেললাইন থাকার কথা ছিল না, সেখানে এখন ঝকঝক করছে লাল রঙের ইস্পাতের পাত। বাতাসে বারুদের গন্ধ নয়, পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধ। দূরে দেখা গেল, প্ল্যাটফর্মে কোনো সাধারণ যাত্রী নেই। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে সেই পোস্টারের নেতাগুলো, কর্পোরেট সাহেবরা—যাদের মুখে সেই চিরচেনা উন্নয়নের হাসি। ওরা ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

ট্রেনটা এল। কোনো ইঞ্জিনের শব্দ নেই, আছে হাজার হাজার মানুষের কান্নার একটা সম্মিলিত সুর। দরজা খুলল। নেতাগুলো সব একে একে ট্রেনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। হরিদা পকেট থেকে একটা দেশলাই বের করল। “ওরা তো যাচ্ছে, কিন্তু ওরা জানে না যে ট্রেনটার চাকা নেই, মেঝে নেই—শুধু একটা গর্ত আছে। ওরা যেখানে যাচ্ছে, সেখানে গিয়েই দেখবে—ওরা নিজেরাই নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।” হরিদা রেললাইনের দিকে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠিটা ছুঁড়ে দিল। লাইনটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। অঘোর দেখল পুরো প্ল্যাটফর্মটা এখন একটা আগুনের কুণ্ড।

ঠিক সেই মুহূর্তে হরিদার হাতে থাকা সেই ভাঙা ট্রানজিস্টারটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। মরচে ধরা স্পিকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল সেই নিষিদ্ধ সুর—ইন্টারন্যাশনাল সংগীত:
“জাগো জাগো সর্বহারা,
অনশন বন্দী ক্রীতদাস
শ্রমিক দিয়াছে আজি সাড়া
উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস।।”

ট্রেনের ভেতর যারা ঢুকেছিল, তারা কাঠের পুতুল হয়ে গেল। অঘোর আরো দেখল, ট্রেনের জানলা দিয়ে কোনো মানুষ নয়, বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার কালো পিঁপড়ে। তারা শহরটাকে গ্রাস করছে। ঠিক তখনই আকাশ থেকে বৃষ্টি নামল, কিন্তু সেটা জল নয়, তাজা রক্ত আর কালির মিশ্রণ।

হরিদা ফুটপাতে বসে আবার তার চটিটা হাতে নিল। অঘোরের দিকে না তাকিয়েই শান্ত গলায় বলল, “কাল সকালে এই শহরে আর কেউ জাগবে না রে অঘোর। জাগবে শুধু এই সময়ের কঙ্কাল। আর কঙ্কালের তো আর ট্রেনের দরকার পড়ে না, গন্তব্য তো তাদের চরণে চরণে।” অঘোরের চোখের সামনে চেনা শহরটা হঠাৎ দপ করে নিভে গেল, যেন কোনো প্রকাণ্ড থিয়েটারের আলো অফ করে দেওয়া হলো। পড়ে রইল শুধু হরিদার সেই ভাঙা ট্রানজিস্টারটা। তাতে আর কোনো নেতার ভাষণ নেই, নেই কোনো মিথ্যে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। আছে শুধু সেই অবিরাম বিপ্লবের সুর—যা অমানবিক শ্মশানের নিস্তব্ধতা কে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে মহাকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। সুরটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে:
​”জাগো জাগো সর্বহারা, অনশনবন্দী ক্রীতদাস,
শ্রমিক দিয়েছে আজি সাড়া, উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস!
শেষ যুদ্ধ শুরু আজ, কমরেড, মোরা মিলি একসাথ,
গাও ইন্টারন্যাশনাল, মিলাবে এ মানবজাত।”

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *