বাংলার রাজনীতিতে নতুন পর্ব – সৌম্যজিৎ রজক
ছোটো থেকে পাড়ার মাঠে প্রতিবার শূন্যে আউট হওয়া ছেলে হঠাৎ একদিন চোখ-কান বুজে ব্যাট ঘুরিয়ে ওভার বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ফেললে তার মাথা আউলে যায়। এক দেড় মাস রাতে ঘুম আসে না, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। একদিক থেকে দেখলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিরও সেই হাল-ই হয়েছে।
বাংলায় সরকার বানানোটা ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতনই ব্যাপার। জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা খোদ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নিজের রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও এখানে কোনো কালেই খুব একটা খাপ খুলতে পারেনি জনসংঘ, বিজেপি।
কেন? বাংলায় কি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অনুকূল মাটি, জল, হাওয়া ছিল না? যথেষ্ট সম্ভবনাময় উপাদান ছিল না হিন্দুত্ববাদের বাড়বাড়ন্তের? সবই ছিল, বেশ ছিল। কিন্তু বাংলা— সত্যপীর আর বনবিবির পুজো করা বাংলা, লালন আর আবাসউদ্দীনের বাংলা, তথাকথিত নবজাগরণের বাংলা, (কথাটা ক্লিশেড তবু বলি) রবি ঠাকুর আর নজরুলের বাংলা— ওদের বাড়তে দেয়নি। আর ছিল শ্রেণি আন্দোলনের, বাম রাজনীতির উর্বর ঐতিহ্য বাংলার।
এহেন বধ্যভূমিতে সরকার হাতে পেয়ে আউলে যাওয়ারই কথা। বঙ্গ বিজেপির তা-ই হয়েছে। নাহলে জেনেবুঝে সাপের লেজে পা দেয় কেউ? সরকারে এসেছিস, ক্যাবিনেট ট্যাবিনেট বানা! তা না, বুলডোজার ফুলডোজার নামিয়ে ফেলল; যুদ্ধ ঘোষণা করল গরিব মানুষের বিরুদ্ধে। ৪ঠা মে ফল ঘোষিত হয়েছে, ৫ তারিখই নিউমার্কেটে। তারপর একে একে দমদম, কোন্নগর, যাদবপুর, হাবড়া স্টেশন। তালিকা দীর্ঘ। হকার উচ্ছেদ, ঝুপড়ি বস্তি ভেঙে সাফ করে দেওয়া।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে সবে, ভেবেছিল, যা খুশি করা যাবে। বড়ো মসৃণ হবে রাস্তা। বিজেপির স্বপ্নের ঘোর কাটাতে যদিও সময় নেয়নি পশ্চিমবাংলা। হ্যাঁ, বামেদের সাময়িক পশ্চাদপসরণ ঘটেছে বটে, তবুও তো ঐতিহাসিকভাবেই এরাজ্য দেশের শ্রেণি আন্দোলন, গণ আন্দোলনের অগ্রবর্তী ঘাঁটি। স্টেশনে স্টেশনে বুলডোজার পৌঁছোনোর আগে প্রতিরোধের পাঁচিল গড়ে দাঁড়িয়ে গেছেন খেটেখাওয়া জনতা বাংলার। প্রত্যক্ষ শারীরিক প্রতিরোধের পর্ব শুরু হয়ে গেছে।
এ সংগ্রামেরই সহায়ক আইনি লড়াই। আদালতের ভেতরে। সেখানে বারংবার ধাক্কা খেয়ে বুলডোজারের ব্রেক কষতে হয়েছে অন্তত ৩৬টি স্টেশনে। রেল কর্তৃপক্ষকে যখন থমকাতে হল, গতি কমাতে হল উচ্ছেদের— তড়িঘড়ি নেমে পড়ল কলকাতা পৌরসংস্থা। সেখানে মেয়র সহ পুরো পৌর বোর্ড সারেন্ডার করেছে, ময়দান খালি করে ঘরে ঢুকে গেছে। কর্পোরেশন শুরু করে দিয়েছে উচ্ছেদের নোটিশ পাঠানো। সেখানেও প্রতিরোধ। আইনি, আইন বহির্ভূত দু’ পথেই। নামানো হয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষকেও এরপর।
গঙ্গার ঘাটগুলো দেওয়া হবে কর্পোরেটকে, সাফ করা শুরু হয়েছে তীরবর্তী মানুষের বসতি, দোকানপাট। রিভার সাইট মল নাকি হবে! আর গরিব মানুষ মলমূত্রের মতো ভেসে যাবে গঙ্গার জলে? বাংলার মাটিতে এমন খোয়াবও ঘুচবে শিগগিরি বিজেপি নেতাদের।
তিন মাসেই এই সরকার প্রমাণ করেছে নিজের চরিত্র। গরিব বিরোধী চরিত্র নিজের। তাঁদের রুটিরুজি ভিটেমাটি সব কেড়ে নিতে চায়। নিয়ে? তুলে দিতে চায় কর্পোরেটের পায়ে। যেভাবে আরাবল্লী পর্বত, হাঁসদেও অরণ্য, মালবার দ্বীপপুঞ্জের জমি তুলে দিচ্ছে মোদি-সরকার; শুভেন্দু-সরকারও যে একই পথে হাঁটবে তা আর অপ্রত্যাশিত কী? বাংলার রাজনীতিতে যে যুগের শুরু হল, সে যুগের বৈশিষ্ট্যই কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক শক্তির আঁতাতে গরিব মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া। যা করার তাই করছে তারা প্রত্যাশিতভাবেই।
খানিকটা হলেও অপ্রত্যাশিত যা, তা হল এত দ্রুত প্রত্যক্ষ শারীরিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠা। বাংলার গরিব মানুষ, মেহনতি, শ্রমজীবী মানুষ— জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে— অতিদ্রুত প্রতিরোধের রাস্তায় নেমে এসেছেন। আর সেই কারণেই বারেবারে, প্রায় প্রতিটা পদক্ষেপে হোঁচট খেতে হচ্ছে ডবল ইঞ্জিনকে। মুখ্যমন্ত্রী হকার উচ্ছেদ প্রশ্নে খানিক ঢোঁক গিলে ‘পুজোর আগে হবে না’ বলতে বাধ্য হলেন। প্রিপেইড মিটার বসানো স্থগিত করতে বাধ্য হলেন। মিড ডে মিলে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে ডিম।
সরকার তৈরির পরের প্রথম তিন মাসেই এতবার নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যেতে হওয়া— খুব কম কথা নয়। সকাল দেখে দিনটা কেমন যাবে, বোঝা যাচ্ছে সহজেই।
জনতার প্রতিরোধের নতুন এক পর্ব শুরু গেছে বাংলায়। যে শক্তির সামনে হাঁটু কাপছে, হাঁটু গেড়ে বসতে হচ্ছে শাসককে বারবার। ৪ঠা মে ২০২৬ থেকে পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে যে যুগের সূচনা হল, নতুন উচ্চতার প্রতিরোধের পর্ব হিসেবেই তা লেখা হবে আগামীর ইতিহাসে।

