জেন জ়ি তন্ত্র জিন্দাবাদ – দেবযানী দাশগুপ্ত

শেয়ার করুন

সম্প্রতি ভারতের ছাত্র আন্দোলনের পর একজন মিলেনিয়াল হিসেবে জেন জ়িকে উন্নততর প্রজন্ম বলে মেনে নিতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। জেন জ়ি কে আমি যুগপৎ শ্রদ্ধা এবং ঈর্ষা করি।
আমরা মিলেনিয়ালরা যখন বড়ো হচ্ছি, উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্বায়নের ত্রয়ী তখন ভারতীয় সমাজ-অর্থনীতির চরিত্র নতুন করে লিখছে। ভারত ক্রমশ বাজারনির্ভর পুঁজিবাদী বিন্যাসের দিকে সরে আসছে। আইটি সেক্টরের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই জন্ম হচ্ছে নতুন কর্পোরেট মধ্যবিত্তের। যার কাছে ব্যক্তিগত সাফল্যই ভালো জীবনের একমাত্র চাবিকাঠি। ভালো করে পড়ো, ভালো মাইনের চাকরি করো, নিজের জীবন গুছিয়ে নাও- এই ছিল আমাদের প্রধান দর্শন। আমাদের প্রজন্মেরও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা, ব্যর্থতা এবং হতাশা ছিল, যথেষ্ট ছিল। আমাদের প্রতিবাদও ছিল, কিন্তু তা ছিল আমাদের কল্পনায়- “যাই হয়ে যাক, দিনের শেষে দারুণ সফল একটা কেরিয়ার তৈরী হয়ে গেলেই জীবনটা উতরে যাবে”, ” আর কোনো অপ্রাপ্তির যন্ত্রনা আমাদের স্পর্শ করবে না”, ” আমরাও তখন পাত্তা পাবো”, সমস্ত রকমের রাজনৈতিক ক্ষোভকে আমরা ব্যক্তিগত সাফল্য দিয়ে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছি। বড়ো বেশি প্রতিষ্ঠান মুখী ছিলাম আমরা।

অন্যদিকে জেন জ়ি যখন বড় হয়েছে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের ফাটলগুলো অতি স্পষ্ট। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, ডিগ্রি থাকলেও চাকরি হচ্ছে না, প্রতিযোগিতা বহুগুণ বেড়েছে, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, গিগ ইকোনমি, সমস্ত স্তরে বাড়তে থাকা বৈষম্য তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে ওদের। এসবই ওদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। আমাদের সময়টাও খানিকটা এইরকমই ছিল। আমরা ভাবতাম দোষ আমাদের, আমরাই যথেষ্ট পরিশ্রম করছি না, চেষ্টা করলেই হবে! জেন জ়ি এই সমস্যা গুলোকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখে না, সিস্টেমের গলত হিসেবেই দেখে।

মালিকের পায়ে জীবন যৌবন বন্ধক রেখে দিনে ১২ ঘন্টা মজদুরী করে বাড়ি ফিরে আমরা যখন ডুমস্ক্রোল করছি, জেন জ়ি সোশ্যাল মিডিয়াকেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কনভার্ট করে নিয়েছে।
আমাদের সময়ে আন্দোলনের জন্য একটা সংগঠন দরকার হতো, সংগঠন নির্দেশ দিতো, প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিতো, সংবাদমাধ্যম সেটি ছাপলে জনমত তৈরি হতো। এখন জেন জ়ি এবং তার চেতনা, একটা ভিডিও, একটি লাইভ, একটা রীল, মিম অথবা একটা হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। জনমত তৈরির ওপর প্রতিষ্ঠানের যে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, জেন জ়ি সেটা ভেঙে দিয়েছে। এই জেন জ়ি রাষ্ট্রের ন্যারেটিভের সাথে হাসতে হাসতে প্রতিযোগিতা করতে পারে। রাষ্ট্র যতক্ষণে প্রেস কনফারেন্স করবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে, ততক্ষণে জেন জ়ি শত শত ভিডিও, লাগসই মিম স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে ফেলছে, ফ্যাক্ট চেক করছে এবং পাল্টা বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনীতির যোগাযোগের পরিচিত গতি আমূল পাল্টে গিয়েছে।

আমরা মিলেনিয়ালরা নেতৃত্বের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতাম। জেন জি থাকেনা। ওরা নেতা-নির্ভর নয়, ওরা যেমন সক্রিয় তেমনি স্বতঃস্ফূর্ত। ওরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো নেটওয়ার্কিং জানে। কেউ বলে দেয়নি কি করতে হবে, তাও কি চমৎকার সমন্বয়ে এতো বড়ো একটা আন্দোলন করে দেখালো!

আমরা ভাবতাম রাষ্ট্র আমাদের বুঝবে। জেন জি রাষ্ট্রকে দেখে ক্ষমতার কাঠামো হিসেবে, যাকে প্রশ্ন করতে হয়, প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে হয়, এমনকি দরকারে ব্যঙ্গও করতে হয়। রাষ্ট্রের ভ্রুকুটি কে জিভ ভেঙচে চড়ে বসেছে রাষ্ট্র কাঠামোর মাথার উপর। ওরা আমাদের মতো হিসেবী নয়, কিন্তু আমাদের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী, তাই ওরা জানে নেতামন্ত্রী দেবতা নয়, তাদের ভাবমূর্তি ভঙ্গুর। ক্ষমতাশালীর মাথার পিছনে যে সিন্থেটিক জ্যোতির্বলয়, সেটাকে “ক্যান্সেল” করে একেবারে এলেবেলে করে দিতে হয়, তবে প্রতিপক্ষ সমে ফেরে। এই প্রজন্ম ভারতকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো রাষ্ট্রের দ্বিচারিতা। বছরের পর বছর ধরে রাজনীতিতে ব্যক্তি আক্রমণ, আর বিদ্বেষের যে স্বাভাবিকীকরণ হয়েছে, জেন জ়ি সেই অসুস্থ সমীকরণ ঘেঁটে দিলো। ভাষা নিয়ে যাবতীয় নীতিপুলিশীকে অগ্রাহ্য করে শিখিয়ে দিলো সন্মান পেতে গেলে সন্মান দিতে হয়। নয়তো মিমের ঘায়ে মূর্ছা যেতে হবে।

ভারতের ছাত্র আন্দোলন ঘোষণা করেছে, গণতন্ত্র নামের ব্যবস্থাটাকে এই নতুন ছেলে মেয়েরা কেবল ভোটপর্বে বেঁধে রাখতে রাজী নয়, গণতন্ত্রকে ওরা প্রতিদিনের অভ্যেসে রাখতে চায়। একটা প্রজন্ম নিজের কণ্ঠস্বরকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবিষ্কার করেছে। সেই কণ্ঠস্বর ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে, কোন সংগঠন বা মতাদর্শ তাকে ধারণ করবে, তা সময় বলবে। আপাতত বোঝা গেল ওরা সহজে ছেড়ে দেবে না, লড়বে। রাষ্ট্র ওদের উপর লাঠি চালালে ওরা লাঠি কেড়ে নিতে জানে, প্রচন্ড মার খেয়েও খোঁড়াতে খোঁড়াতে পরের দিন আবার পথে নামতে জানে, ওদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে জলকামান চালালে ওরা রাষ্ট্রের বুকের উপর দাঁড়িয়ে পানিওয়ালা ডান্সে মেতে যায়। নাচতে নাচতে, হাসতে হাসতে, গণতন্ত্রের যে স্তম্ভ গুলো ভেঙ্গে পড়ছে, সেগুলোর পুনর্গঠনের দাবি তুলেছে জেন জ়ি। জেন জ়ি তন্ত্র জিন্দাবাদ!

দেবযানী দাশগুপ্ত

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *