জেন -জি আন্দোলন বা একটি সাহসের কার্নিভাল – শান্তনু সেনগুপ্ত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিছক কৌতূহল মেটানোর তাগিদে প্রশ্ন করেছিলাম যে বিগত দশ বছরে কতগুলি নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে?
উত্তর পেলাম পরপর অন্তত দুটি প্রশ্ন ফাঁস প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়াও সে জানিয়ে দিল যে ভারতবর্ষ জুড়ে গত দশ বছরে দেড়শোর ওপর এই ধরণের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে।
এর পাশাপাশি আর কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরে AI জানিয়ে দিল যে এর সাথে পাল্লা দিয়ে ধর্মীয় মেরুকরণ, সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠরোধ সহ গণতন্ত্রের পরিপন্থী নানা ঘটনাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। স্পষ্টই বোঝা যায় যে শাসক তার ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে এই পরিস্থিতি তৈরী করছে।
জেন-জিদের থেকে বেশি বয়সী আমার ধারণা ছিল যে ধর্মীয় বিদ্বেষ, অতি-জাতীয়তাবাদী থালা বাজানোর অভ্যেস আর সহজলভ্য ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যবহার করে তৈরী করা চটুল রীলসের পরিমন্ডলে এই প্রজন্ম বোধহয় প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সম্বন্ধে বিস্মৃত হয়েছে।
কিন্তু আরশোলাদের উত্থান ও পরবর্তী দীর্ঘ আন্দোলন ও তার পরবর্তী পরিস্থিতি শুধু যে আমার সেই ভুল ভেঙে দিয়েছে তাই নয়, বরং এই বিশ্বাস তৈরী করেছে যে এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনের ধরণ, ভাষা ও মাধ্যম জেন -জি -রা যেভাবে তৈরী করেছে তা যথার্থ। এই সময় যোগ্য পথ প্রদর্শক তারাই।
আরশোলাদের উত্থানের প্রেক্ষিতটাই দেখা যাক। এর শুরু ইন্টারনেটের সমাজ মাধ্যমের একটি ব্যঙ্গাত্মক পেজ হিসেবে, যাদের মূল হাতিয়ার রীলস ও মিম । মিম সংস্কৃতিকে ইদানিং সময়ে অন্তত আমি মূলত চটুল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই দেখেছি। অথচ অতি দক্ষিণপন্থী দলগুলি হোয়াটস্যাপ ফরওয়ার্ডের পাশাপাশি রীলস ও মিমকেই তাদের বার্তা ঝট করে পৌছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। আমাদের অনেকেই যখন এগুলি দেখে নাক সিটকেছি, তখন কিন্তু তারা বেশ সফলভাবে এগুলো ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে। গুরুগম্ভীর তত্ব আলোচনা বা তথ্য চর্চা যতই প্রয়োজনীয় হোক না কেন, তা কখনোই বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছনোর উপযোগী ন্যারেটিভের ধরণ নয়। দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্র যন্ত্রের এই নিশ্চিন্ত জায়গাতেই আঘাত হানলো জেন-জি-রা। ইন্টারনেট জুড়ে পাল্টা মিম, রীলস আর ছোট ছোট বুদ্ধিদীপ্ত কন্টেন্ট লোকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে শুরু করলো রাষ্ট্রযন্ত্রের ফাঁক-ফোকর আর ফন্দি-ফিকিরগুলো।
এর পাশাপাশি দিল্লির যন্তর-মন্তর চত্বরে সোনাম ওয়াঙচুক ও ছাত্র ছাত্রীদের অবস্থান এবং অনশন আন্দোলন শুরু হলো। দীর্ঘ সময় জুড়ে দক্ষিণপন্থী বিষ – বপন সত্ত্বেও ভারতবর্ষ যে পারস্পরিক সহানুভূতি আর প্রয়োজনে বিদ্রোহের কথা ভোলেনি তার প্রমান পাওয়া গেল। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সমস্ত ধর্ম, গোষ্ঠী ও আর্থ – সামাজিক সামাজিক স্তরের মানুষ যোগ দিতে শুরু করলেন। মোহম্মদ জুনেদ এবং আসে-পাশের গুরুদ্বারাগুলি শ অনেকেই খাবার জোগাতে শুরু করলেন। তারপরে সারা দেশের মানুষ ডেলিভারি এ্যাপ ব্যবহার করে পাঠাতে শুরু করলো খাবার, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। যন্তর – মন্তরের এই অবস্থান হয়ে উঠলো ভারতের চিরাচরিত Unity in Diversity – র যথার্থ প্রতীক।
বিশে জুন সংসদ ভবণ অভিযানে অভুতপূর্ব পুলিশি আঘাতের সামনে চরম সাহস ও সহমর্মিতার ছবি আঁকলো জেন-জি-রা। লাঠি, জল কামান, পেলেট গান ও কাঁদানে গ্যাসের সামনে পাশের নাম না জানা সাথীকে যেমন আগলালেন, তেমনি সরিয়ে নিয়ে গেলেন ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া ছোট্ট কুকুরছানাকে। কেউ আবার গরমে অসুস্থ হয়ে পরা পুলিশকেই হাওয়া করলেন। তার পাশাপাশি চললো লাঠির সামনে দাঁড়িয়েই রীল বানিয়ে জানিয়ে দেওয়া যে একটুও ভয় পাইনি!
আবারো ব্যঙ্গ হয়ে উঠলো রাষ্ট্রের জারিজুড়ি কে কাঁচকলা দেখাবার প্রধান হাতিয়ার। যন্তর- মন্তরের ছবি ভিডিও, কথা জেনেছি নানান মাধ্যমে আর কলকাতায় জেন -জি দের মহা মিছিলে নিজেই সামিল হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। এই দুই মিলিয়ে মনে হল জেন-জি আন্দোলন আদতে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার এক বিশাল কার্নিভাল। গোটা নিট সংক্রান্ত বিক্ষোভের মধ্যেই কার্নিভালের ছাপ ছিল। এই কার্নিভাল ব্যাপারটাকে নিছক মজার ব্যাপার বা হুজুগ বলে ভাবলে ভুল হবে। এক্ষেত্রে আমার বাখতিনের Rabelais and His World এর কথা মনে পড়ছিল। রোমান উৎসবগুলির সময় এরকম ঠাট্টার ছলেই নিম্নবর্গ অস্বীকার করতো উচ্চবর্গের অবস্থান ও কতৃত্ব। Gen-Z-রাও গুরু-গম্ভীর তত্ব কথা না আউরে বুদ্ধিদীপ্ত ফাজলামোর চোটে শাসকের চোখে সর্ষে ফুল ফুটিয়ে দিয়েছে। তাই যাহা ফাজিল, যাহা মহাজনদের কাছে “অছাত্রসুলভ ” তাহাই বিদ্রোহের হাতিয়ার। অসাধারন সব স্লোগান, পোস্টার তুলে ধরে তারা জানান দিয়েছে যে শাসকের দৈবত্ব -এর দাবীকে কে তারা মোটেও পাত্তা দেয় না। শাসকের মুখোশে টান দেওয়ার এই ধরণ একেবারেই সিলেবাসের বাইরে ছিল!
মিছিলে গিয়ে আরও একবার বুঝেছি যে এই আন্দোলন ধর্ম, ভাষা, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদির যে প্রবল বিভাজন রেখা দেশকে গ্রাস করেছিল, তা অনেকটাই ভেঙে ফেলেছে। কার্নিভালে তাই হয়। তাই মিছিলের সর্বস্তরে একরকম ভাষা বা আচরণ দেখা যায়নি। এই বিভিন্নতা হয়তো অস্বস্তি তৈরী করতে পারে, কিন্তু এটাই হাতিয়ার।

