পশ্চিমবঙ্গের নয়া গুন্ডা দমন বিল: বিতর্কের বহু স্বর

শেয়ার করুন

সুমন কল্যাণ মৌলিক

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সদ্য পাশ হওয়া, বহু চর্চিত ‘গুন্ডা দমন আইন’ (West Bengal Public Safety and Control of anti-social Activities Act, 2026) নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। তথ্যের খাতিরে এ-কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এই আইনটির সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। একই সঙ্গে এই আইনের ওপর অবিলম্বে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারির আর্জিও জানানো হয়েছে। এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য হিসাবে রাজ্য সরকারের দাবি—সংঘবদ্ধ অপরাধ, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক হিংসা এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে এমন কার্যকলাপ রুখতেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু সরকারের কথাকে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ পাওয়া যাচ্ছে না। বিরোধী পক্ষ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষদের আশঙ্কা এই আইন পুলিশ প্রশাসনের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দিতে পারে এবং সেই ক্ষমতা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পূরণের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর একটি বয়ান যাতে তিনি বলেছেন সিপিএমের হার্মাদ ও তৃনমূলের গুন্ডাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এই আইনের দরকার ছিল—বিরোধী পক্ষের আশঙ্কার যথার্থতাকে প্রমাণ করছে। দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তরমন্তর আন্দোলনের সমর্থনে কলকাতা মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের একাংশের উপর এই আইনের প্রথম প্রয়োগের দাবি আইনটিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।

ইদানীং ভারতের শাসকদল ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত আইনের কথা বারবার ঘোষণা করলেও ইতিহাস সাক্ষী যে সমস্ত দানবীয় আইনগুলো ব্রিটিশ আমলের আইন ব্যবস্থারই সন্তান। গুন্ডা দমন আইনও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে (বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা) সর্বপ্রথম গুন্ডা আইন প্রয়োগ করে। ১৯৭০ সালে পশ্চিমবাংলায় কংগ্রেস সরকার ১৯২৩ সালের গুন্ডা দমন আইনের আদলে প্রথমবার একটি আইন প্রণয়ন করে যার পোশাকি নাম ছিল ‘The West Bengal (Prevention of Violent Activities) Act,1970’। আইনটির উদ্দেশ্য অংশে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, “নকশালদের অথবা অন্যান্য সমধর্মী গোষ্ঠী এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত সমাজবিরোধীদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ প্রতিরোধের জন্য বিনা বিচারে ব্যক্তিদের আটক করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সমস্ত প্রচলিত আইন তাদের কার্যকলাপ প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট নয়”। সেই সময় এই আইনের প্রয়োগের ভয়ংকর ইতিহাস আমাদের অজানা নয়। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার ভারতে উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে, গুজরাটে এই ধরনের আইন রয়েছে। বিগত সময় ঐ রাজ্যগুলোতে যে কোনো প্রতিবাদ ও বিক্ষোভকে দমন করতে গুন্ডা দমন আইনের আশ্রয় নিয়েছে সরকার।

পশ্চিমবঙ্গে গুন্ডা দমন আইন কার্যকর হলে সরকার যে কোনো ব্যক্তিকে আটকের নির্দেশ দিতে পারে। রাজ্য সরকার, পুলিশ কমিশনার, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকার নির্ধারিত ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল পদমর্যাদার পুলিশ অফিসার এই নির্দেশ দিতে পারেন। জনস্বার্থে বা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার তৎক্ষণাৎ আটকের নির্দেশ দিতে পারে। তবে এই ধরনের আটক করার নির্দেশ রাজ্য সরকারকে অবিলম্বে জানাতে হবে এবং ১৫ দিনের বেশি এই নির্দেশ কার্যকর থাকবে না। তার মধ্যে রাজ্য সরকারকে অনুমোদন দিতে হবে। উক্ত ব্যক্তিকে আটক করার পর তার কপি দিতে হবে, পরে আটকের কারণও জানাতে হবে। এক্ষেত্রে আশঙ্কা হল আগে গ্রেপ্তার করে পরে পুলিশ কারণ সাজাতে পারে। তবে জনশৃঙ্খলা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে সরকার এইসব তথ্য নাও দিতে পারে। নজরদারির জন্য রাজ্য সরকার এক বা একাধিক অ্যাডভাইজারি বোর্ড গঠন করবে। ওই বোর্ড সংশ্লিষ্ট অভিযোগের নথি দেখবে।প্রয়োজনে অতিরিক্ত তথ্য চাইতে পারে। তাদের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হল আটক ব্যক্তি আইনজীবীর মাধ্যমে বোর্ডে প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার পাবেন না। এই ধারা সংবিধানে নাগরিকদের যে আইনি অধিকার দেওয়া হয়েছে, তার বিরোধিতা করছে।অ্যাডভাইজারি বোর্ড শুনানি শেষে, আটক করার দিন থেকে নয় সপ্তাহের মধ্যে তাদের রিপোর্ট সরকারকে জমা দেবে।আইনে পরিষ্কার বলা নেই, বোর্ডের যথেষ্ট কারণ না থাকার কথা জানালেই আটক হওয়া ব্যক্তি নয় সপ্তাহের পর মুক্তি পাবে কি না! ধারা ১৩ তে বলা হয়েছে, এক বছরের আগে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি শেষমেশ সরকার বাহাদুরের মর্জির উপর নির্ভর করবে।তারপরও নিস্তার নেই স্বাধীন ভারতের নাগরিকের। এই আলোচ্য আইনে বলা আছে এক বছর অতিক্রান্ত হলেও নতুন আটক নির্দেশে সেই ব্যক্তিকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এই আইনের ১৫ নম্বর ধারা অনুসারে রাষ্ট্র কর্তৃক ‘গুন্ডা’ তকমাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সর্বাধিক এক বছর পর্যন্ত এলাকা ছাড়া (externment) হয়ে থাকতে হবে। কিন্তু বিতাড়িত ব্যক্তির বিতারণের আদেশের বিরুদ্ধে বোর্ডে যাওয়ার সুযোগ নেই। আইনের মর্মবস্তু থেকে এটা পরিষ্কার যে সরকার এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে।

সবচেয়ে বড়ো বিপদ হল এই ধরনের আইনগুলো ফৌজদারি ন্যায়বিচার কাঠামোর বিপরীত কাঠামো গড়ে তুলছে। সমাজবিজ্ঞান আমাদের শেখায় অপরাধ সমাজ থেকে উৎসারিত, অপরাধীরা সামাজিক-আর্থিক কারণেই অপরাধের রাস্তা বেছে নেয়। আর্থ-সামাজিক বৈষম্য, সীমাহীন দারিদ্র্যের সুষ্ঠু সমাধান না হলে গুন্ডার অস্তিত্ব থাকবেই। রাষ্ট্রনায়কদের সেটা জানা উচিত। পুলিশের দৃষ্টিতে দেখলে দমনের নামে সীমাহীন উৎপীড়ন হবেই। ইতিহাসের শিক্ষা তাই বলে। আর এলাকায় এলাকায় পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহায়তা ও মদতে গুন্ডারাজ তৈরি হয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

পশ্চিমবঙ্গে এই আইন ঠিক কবে থেকে লাগু হয়েছে তা নিয়েও এক রহস্যময় অবস্থা তৈরি হয়েছে। আমরা দেখলাম আইনটি ২৯ জুন পাশ হল এবং তা মাননীয় রাজ্যপাল মহোদয়ের সম্মতি পায় বলে সংবাদে প্রকাশিত হয়। সরকার পক্ষ থেকে জানানো হয় আইনটি ১৩ জুলাই থেকে কার্যকরী হচ্ছে। সেই মোতাবেক ২৪ জুলাইয়ের ছাত্র বিক্ষোভে আটক ব্যক্তিদের উপর এই আইন প্রথম লাগু হয়। কিন্তু এই আইনের সাংবিধানিকতাকে চ্যালেঞ্জ যে মানবাধিকার কর্মীরা করেছেন তাদের পক্ষের দুই আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জী ও বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য তাদের পিটিশনে আদালতকে জানিয়েছেন এই গুন্ডা আইনের কোনো সরকারি নির্দেশনামা তারা পাননি। এমনকি ছাত্র বিক্ষোভে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এই আইনে অভিযোগ হয়নি বরং তারা গ্রেপ্তারের পরের দিন জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

সামগ্রিক আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হওয়া আইন ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ২২ এর বিরোধী। এই আর্টিকেলে এটাও বলা আছে এই ধরনের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা একমাত্র দেশের পার্লামেন্টের আছে, বিধানসভার নয়। তাই এই আইনের বিষয়ে করা মামলাগুলোর ফয়সালা হওয়ার দাবিও যথাযথ। বিনা বিচারে এক বছর আটক থাকার আইন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ধারণার পরিপন্থী—এ কথা আজ সবাইকে জোরের সঙ্গে বলতেই হবে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *