/ / পাখিদের গল্প – পারমিতা দে
|

পাখিদের গল্প – পারমিতা দে

শেয়ার করুন

লেখা ও ছবি: পারমিতা দে

(১)

বাবার যে আজ কেন আসতে এত দেরি হচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। মা রান্না ঘরে যাবার আগে বলল, “ফের ফোন করে দেখি একবার”। মিষ্টুর বুকের ভেতরটা কী রকম ঢিপঢিপ করছিল। বারান্দার এক কোনায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে ভাবছে কাল সকালে মামারবাড়ি যাওয়া হবে তো! ওখানে ঝিলিক দিদি, বিল্টু দা, মিমি, তাতান সবাই অপেক্ষা করবে। স্কুলে গরমের ছুটি পড়ে গেল আর মামার বাড়ি যাব না!

এমনই সময় বাড়ির বেলটা বেজে উঠল। অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল বলে, ওর রাস্তাটা খেয়াল করা হয়নি। বাকি দিনের মতো বাবার হাসি মুখটা আজ আর নেই। খুবই ক্লান্ত। এসেই মিষ্টুর গাল টিপে বলল, “তুই নিশ্চয়ই ভাবছিস যে কাল হয়তো আর বেরোনো হবে না!”

সকাল সকাল টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন পড়ল। তিনটে বারুইপুরের টিকিট নিয়ে বাবা ফিরে এল ঠিক ট্রেন ছাড়ার আগে। ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে দেখতে মিষ্টুর খুব ভালো লাগে। কত বড়ো বড়ো গাছ, ধানখেত, তারের উপরে বসে থাকা পাখি আরো কত কী! বাচ্চারা বিড়াল, কুকুর, রঙিন মাছ ভালোবাসে কিন্তু মিষ্টুর প্রিয় হল পাখি। ওদের গায়ের হরেক রকমের রং মনে আলো ছড়ায়।

মা হঠাৎ বলে উঠল “ছোটোবেলায় আমি আর বড়দা মানে তোর বড়োমামা বাঁশঝাড়ের জঙ্গলে আমবাগানে সকাল বিকেল কত না ঘুরে বেড়িয়েছি! বড়দার তখন খুব পাখি দেখার শখ ছিল। আমিও পেছন পেছন যেতাম। কী বলব মিষ্টু গরমের এক বিকেলে এক মনে দুটো বাঁশপাতি দেখতে ব্যস্ত হঠাৎ আমার পায়ের ওপর দিয়ে কি যেন একটা ঠান্ডা মতো চলে গেল। মুখ নাবিয়ে দেখি সাপ। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তারপর দাদা অনেকবার যেতে বলেছে। কিন্তু সাপের ভয়ে আমি বহুদিন পর্যন্ত যাইনি। তবে দাদার সঙ্গে থাকতে থাকতে অনেক পাখি চিনে গিয়েছিলাম। বড়দার ছেলে বিল্টু, ওর দেখি বাবার মতোই পাখি দোখার শখ।

বাঁশপাতি, বারুইপুর

মিষ্টু বলল, “জানো মা আমারও খুব পাখি ভালো লাগে। বিল্টু দার সঙ্গে আমিও অনেকবার পেছনের বাগানে গিয়েছি।”

সব শুনে বাবার মুখটাও ভয়ে বেঁকে গেল। মেয়েকে তো আর সব কিছুতে বারণ করা যায় না, খালি বলল, “যাস কিন্তু খুব সাবধানে।”

ঘরে ঢুকে দিদার কাছে আদর খেয়ে সবার সঙ্গে দেখা করে মিষ্টু সোজা বিল্টুদার ঘরে চলে গেল।

বিল্টু বলল, “আরে মিষ্টু কত বড়ো হয়ে গেছিস! কত বয়স যেন হল তোর?”

শ্যাম বর্ণা রোগা মেয়েটি উত্তর দিল, “এগারো। তোমার ছুটি কেমন কাটছে? নতুন কোনো পাখি দেখলে নাকি? মনে আছে, আগের বছর কত পাখি দেখেছিলাম এক সাথে!”

“হুঁ। আম বাগানে বিকেলবেলায় ঝাঁক ঝাঁক টিয়া আর চন্দনা বটফল খেতে আসে। নিশ্চয় তুই এইবারও যাবি আমার সঙ্গে বাগান ঘুরতে?”

টিয়া, বারুইপুর

মিষ্টুর মুখে কোনো আওয়াজ নেই, শুধু জানলার বাইরে দুচোখ ভরে এক জোড়া হলুদ পাখির দিকে চেয়ে আছে। কালো মাথা আর গাঢ় হলদে রং দেখে চোখ যেন ঝলসে যায়। ও বলে উঠল, “কী নাম গো ওই হলদে পাখিগুলোর?”

“বেনে বউ। আরে আমরা যাদের ‘বউ কথা কও’ বলি। এইবার মামার বাড়িতে ট্যুর কত দিনের?”

“মোটে এক সপ্তাহ গো। আচ্ছা তুমি কখনও বসন্তবৌরি দেখেছ? দিদা বলছিল নীলগলা বসন্তবৌরি দেখতে খুব সুন্দর হয় আর গাছের কোটোরে বাসা করে। আচ্ছা বলো তো, ওদের কি শুধু বসন্তকালেই দেখা যায়? তাই ওই নাম?”

“দূর বোকা, ওদের সারা বছরই দেখা যায়। তুই কখনও দেখিসনি? নীল রং টা দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। আরো ভালো লাগে যখন ওরা খুবলে খুবলে গাছের ঝুলন্ত ফল খায়। পেছনের ওই পেঁপে বাগানটায় বিকেলের দিকে প্রায়ই আসে।”

“তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ ব্যাগ নিয়ে?”

“টিউশন পড়তে।”

“বিকেলের পেঁপে বাগানে বসন্তবৌরি খুঁজতে যাবে তো?”

“হ্যাঁ যাব, এখন আসি।”

মিষ্টুর দিদা উঠোনে বসে রোদে আমসত্ত্ব শুকোতে দিচ্ছিল। দিদিমার আমসত্ত্বর সারা পাড়ায় খুব নাম! মেজাজ এখন তার কিন্তু ভারী গরম। তিনটে মাছি আমসত্ত্বে ভাগ বসাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে তাড়িয়েও যাচ্ছে না। মিষ্টুদের প্ল্যান শুনে বুড়ি তো রেগে বোম। চেঁচিয়ে বিল্টুকে বলল, “ছোটো বোনটার মাথা আর কত খাবি! নিজে সারাদিন বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াস। এখন আবার বাচ্চা মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়েছিস। এখন আলো পড়ে এসেছে। এই মরা বিকেলে না গিয়ে কাল সকালে যাস।”

বিল্টু অমায়িক গলায় বলল, “হ্যাঁ ঠাম্মা।”

মিষ্টু দিদাকে জড়িয়ে আদর করতে লাগল। “আমি তোমার আমসত্ত্ব পাহারা দিচ্ছি। তুমি ভেতরে যাও।”

দিদা ভেতরে গেলে দুই ভাই-বোন চম্পট দিল বাগানের দিকে।

আম, লিচু, পেয়ারা গাছ ঠেলে ওরা এগিয়ে গেল বাগানের রাস্তার দিকে। বড়ো গাছের গা জড়িয়ে অনেক লতা গাছ উঠেছে। সেইসব কলমিলতা গাছে কখনও সাদা আবার কখনও হলদে ফুল ফোটা। সমস্ত বাগান যেন খুটখাট কিচিরমিচির আওয়াজে ভরা।

বিল্টু বলল, “ভালো করে চোখ কান খোলা রাখবি। গাছের ডালের সঙ্গে রং মিলিয়ে অনেক পাখি মিশে থাকে আর থাকে সবুজ লাউডগা সাপ, চোখে পড়ে না। ওই দেখ, দেখতে পাচ্ছিস লালমাথা কাঠঠোকরাটা?”

কাঠঠোকরা, বারুইপুর

“দাদা, ওই শব্দটা কীসের গো? শুনে আমার দাঁত শিরশির করছে।”

“আরে ওটা তো হাঁড়িচাঁচাঁর ডাক। ভালো করে শুনে দেখ হাঁড়িতে খুন্তি দিয়ে চাঁচলে ঠিক এরকম আওয়াজ হয়। মায়েরা তো এদের ‘ল্যাজঝোলা’ বলে। বাদামি রঙের লম্বা ল্যাজ, ডানায় কিছুটা লম্বাটে সাদা দাগ। খেয়াল রাখিস। আমি একটা বইতে পড়েছিলাম যে জঙ্গলে এই হাঁড়িচাঁচাঁরা বাঘের আশেপাশে থাকে। মাংস খাওয়ার পর বাঘেদের দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংস এই পাখিগুলো সাবার করে দেয়।

হাঁড়িচাঁচা, বারুইপুর

“ব্যাপরে! কী করে?”

“পেট ভরে গেলে বাঘ হাঁ করে বোসে থাকে আর তখনই তাদের কাজ সারা হয়ে য়ায়। বুঝলি তোদের কলকাতার মতন নয়, যে শুধু কাকা আর শালিখ। গ্রামবাংলা হল পাখিদের ভাণ্ডার, কী জলে–কী ডাঙায়।”

“কে বলেছে, তুমি রবীন্দ্র সরোবর যাও না অনেক পাখি দেখতে পাবে। এখন বসন্তবৌরি কোথয়? দেখাও তো।”

“ওই দেখছিস পেঁপে গাছগুলো, ওখানেই ওরা বসে। এখানে চুপটি করে দাঁড়া।”

“কি গো অনেকক্ষণ তো হয়ে গেল কোথায় তোমার বসন্তবৌরি? মশার কামড়ে আমার পা ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল।”

মিষ্টুর আর তর সয় না।

“চুপ কর, ঐদিকে পেয়ারা বাগানের দিকে তাকা চারখানা ‘হরিয়াল’ এসে বসেছে। ভালো করে দেখ। সবুজ বড়ো বড়ো পায়রার মতো আর দেখ পাগুলো হলুদ। ওদের ঠিক পাশের ডালে উঁচু ঝুঁটি, লাল জুলফি দেওয়া দুটো পাখি দেখতে পাচ্ছিস? ওরা হল ‘সিপাহী বুলবুল’।”

সিপাহী বুলবুল, বারুইপুর

“বাহ্ কী সুন্দর! কিন্তু বসন্তবৌরি তো আসছে না।”

“নারে আজ আর এলো না বোধয়। এখন আর অপেক্ষা করা যাবে না। দেখছিস সন্ধ্যা হব হব। আজ বাড়ি ফিরে চ। সবাই চিন্তা করবে। আমি আরেকদিন নিয়ে আসব।”

“আর একটু থেকে গেলে হত না ?”

“না না অন্য আরেক দিন হবে।”

“চলো তাহলে।”

একটু খালি জায়গাতে আসতে আসতে, আকাশের দিকে চেয়ে দেখল খুব ছোটো ছোটো অনেক পাখি, লেজগুলো মাঝখানে একটু ছেঁড়া। খুব তাড়াতাড়ি উড়ে যাচ্ছে। কীসের যেন ওদের তাড়া, কী যেন খুঁজতে ব্যস্ত। মিষ্টু জিজ্ঞেস করতেই যাবে ওই পাখিগুলোর সম্বন্ধে, অমনি বিল্টু বলে উঠল, “জানিস কলকাতার চিড়িয়াখানায় আগের বছর শীতকালে গিয়েছিলাম। ওখানে বড়ো বড়ো গাছে সাদা সাদা বক দেখেছি। বাবা বলেছিল ওগুলো এদেশের নয়। প্রত্যেক শীতে ওরা ফিরে যায়। ওদের বলা হয় পরিযায়ী পাখি।”

মিষ্টুর আর মন নেই বিল্টুর কথায়। “আমার বড়ো পা কামড়াচ্ছে দাদা। এত হাঁটার অভ্যাস নেই তো।”

ওরা এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে ঘরে ফিরে গেল ।

ধূসর বক, চুপির চর

(২)

বাড়ি ফেরার দিন মিষ্টু ট্রেনের জানলায় মুখ চেপে কাটিয়ে দিল পুরো রাস্তাটা। মা-ও কী একটা ম্যাগাজিন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। মিষ্টুর গালে জানলার রেলিং-এর দাগ পড়ে গেছে। হঠাৎ খেয়াল পড়লে মা ফিরে দেখে বলল, “কী অবাক্ না!”

মিষ্টু ফিরে বলল, “কী?”

“আমাদের ট্রেনটা যত এগোচ্ছে সব বাড়ি, গাছ, মানুষ যেন পেছন দিকে চলে যাচ্ছে। কি মজার তাই না !”

“আচ্ছা মা, এই পরিযায়ী পাখির ব্যাপারটা কী গো? কোথা থেকে আসে এরা?”

“বাড়িতে গিয়ে তোকে একখানা বই দেবো। পড়ে দেখবি ভালো লাগবে।”

“কী বই?”

“সে বাড়ি গিয়ে দেখবি ক্ষণ।”

“বলোই না। কী বই?”

“‘বুড়ো আংলা’। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা।”

“আমি বুঝতে পারব তো পড়ে?”

“হ্যাঁ সহজ বাংলায় লেখা। ওখানে অনেক পাখির কথা আছে। মিষ্টু বইটার কথা ভাবতে থাকে আর এক একটা স্টেশন উলটো দিকে চলে যায়। সন্ধ্যায় মা তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে একটা পুরোনো হলুদ বই নিয়ে আসে।

“এই নে তোর ‘বুড়ো আংলা’।”

মিষ্টুর মনে খুব উত্তেজনা এল বইটাকে নিয়ে। “অবন ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’ তো আমি পড়েছি।”

মিষ্টু আস্তে আস্তে ‘বুড়ো আংলা’র জগতে ঢুকে পড়ে। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, শুধু বই নিয়ে পড়ে থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি পরিযায়ী পাখির নামও শিখে ফেলেছে সে, যেমন ‘চখা-চখি’, ‘বালি হাঁস’ এইসব।

মাকে ডেকে ও বলল, “জানো মা, ‘বুড়ো আংলা’-তে বলেছে চখা পাখির দল আকাশ পথে ‘বুড়ো আংলা’-কে নিয়ে বঙ্গদেশ থেকে স্বদেশের পথে, মানস সরোবরের দিকে যাচ্ছে। বইটা নিয়ে এসে মিষ্টু পড়তে লাগল—“মেঘনা নদীর মোহনা হয়ে আমতলী, হরিণঘাটা, গঙ্গাসাগর বাঁয়ে ফেলে, আসামের জঙ্গলে, গারো-পাহাড়, খাসিয়া-পাহাড় ডাইনে রেখে, ব্রহ্মপুত্র নদীর বাঁকে বাঁকে ঘুরতে-ঘুরতে হিমালয় পেরিয়ে তিব্বতের উপর দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা, ধবলগিরি উত্তর-গা ঘেঁষে সিধে পশ্চিম -মুখে মানস সরোবর।”

“কী দারুণ রাস্তার বর্ণনা! না মা?”

“যাক্, তোর তাহলে ভালোই লাগছে বল্। চালিয়ে যা। পুরোটা শেষ কর, তারপর কথা হবে।”

উড়ন্ত চখা-চখি, চুপির চর

“আমিও পাখিদের মতো আকাশে উড়তে চাই মা। আমার যদি পাখনা থাকত, খুব ভালো হত। এক্ষুনি উড়ে দিদা আর বিল্টুদার কাছে চলে যেতাম।”

মিষ্টুর বাবা এতক্ষণ সব শুনছিল হঠাৎ বলে উঠল, “আমাদের অফিসে মিস্টার মিত্রর খুব পাখি দেখার শখ। নানান জায়গায় যান পাখি দেখতে। উনি খুব ভালো ছবিও তোলেন। সেইদিন বর্ধমানের পূর্বস্থলীর ‘চুপির চর’-এর কথা বলছিলেন। ওখানে অনেক পরিযায়ী পাখি আসে।”

মিষ্টু হেসে উঠল, “চুপি! ভারি মজার নাম তো! চুপি চুপি যেতে হয় বুঝি ওখানে পাখি দেখতে?”

“ফি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত নানান পরিযায়ী পাখি দেখা যায় ওখানে। যাবি নাকি পরিযায়ী পাখি দেখতে?”

“ওরা আমাদের নতুন দেখে চিনতে না পেরে কামড়ে দেবে না তো বাবা?”

দুজনে হো হো করে হেসে উঠল।

ডিসেম্বরের এক ভোরবেলায় সবাই মিলে রওনা দিল ট্রেনে করে চুপির চর। চুপিতে আকাশে পাখি, জলে পাখি, চরে পাখি, যেদিকে চাইবে সেদিকেই নানা রং-এর পাখি শুধু পাখি। সে এক অদ্ভুত জায়গায় গিয়ে পড়ল ওরা। জলে নৌকা নিয়ে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা নৌকা বিহারে চুপির পরিযায়ী পাখি কাছ থেকে দেখানো হয়। মিষ্টু এখন খুব নিশ্চিন্ত দেখে যে সত্যিই ভিন্ দেশের পরিযায়ী পাখিরা অচেনা হওয়া সত্ত্বেও কামড়ে দেয় না। চুপির মাঝি ভাইরা অনেক পাখি চিনিয়ে দেয়। কত যে নাম বলে তা সব মনে রাখাও যায় না। বিল্টুদাকে বলবে বলে পাখিদের নাম মনে রাখার খুব চেষ্টা করছিল মিষ্টু কিন্তু শেষে গুলিয়ে যাওয়ায় হাল ছেড়ে দিল।

সবচেয়ে যেটা মনে দাগ কাটল সেটা ইউরোপ থেকে আসা লালমাথা হাঁসেদের ঝাঁক। গ্রামের লোকেরা ওদের ‘লালমুঁড়ি’ বলে। সঙ্গে দেখল বেগুনি, ধূসর, কালো, সাদা বড়ো বড়ো বক, প্রচুর ধরনের মাছরাঙা, আরো কত কী।

লালমুড়ি হাঁস, চুপির চর
লালমুড়ি হাঁসেদের দল, চুপির চর


নৌকায় ভাসতে ভাসতে বাবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টু জিজ্ঞেস করল, “তুমি বলেছিলে না পাখি নিয়ে দেশের বাড়ির একটা গল্প বলবে?”

বাবা বলল, “এখন থাক।”

“বলোই না। আমরাও শুনি।”, মা বলল।

“আমাদের দেশের বাড়ি জলপাইগুড়িতে অনেক পরিযায়ী পাখি আসে। ছোটোবেলায় দীঘির দিকে গেলে প্রচুর বালিহাঁস দেখতাম। ওদের দেখতে খুব সুন্দর হয়। সাদা ধবধবে ছোটো আকারের আর চোখগুলো ঠিক যেন এক একটা কালো চকচকে গোল বোতাম। দেখলেই মনে হবে নিজের কাছে রেখে দিই। সেই সময় লুকিয়ে বালিহাঁস মেরে খাওয়ার খুব চল ছিল। এক বন্ধুর জন্মদিনে গিয়ে খেতে বসে দেখি মাংসের স্বাদটা একটু অন্যরকম। ঠিক মুরগির মতন নয়। বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম কীসের মাংস? কেউ দেখি উত্তর দিতে চায় না। সবাই এর ওর দিকে তাকায়। অনেকবার জিজ্ঞেস করাতে বলল বালিহাঁসের। শুনে আমার মনটা রাগে আর কষ্টে ভরে গেল। সেই দিনই ঠিক করলাম গ্রামে অবৈধ ভাবে পরিযায়ী হাঁস মারা বন্ধ করতে হবে। এই হাঁসের দল প্রত্যেক বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের দেশে অতিথি হয়ে আসে। আবার শীত চলে গেলে ওরা নিজের দেশে ফিরে যায়। তারপর আমরা কিছু বন্ধুরা মিলে ক্লাবে কথা বলে, বালিহাঁস মারা বন্ধ করার উদ্যোগ নিলাম। গ্রামের লোকেদেরও বোঝানো হল। তারপর আমি চলে এলাম কলকাতায় পড়তে। এখন শুনেছি আগের থেকে অনেক কমেছে হাঁস মারা। তোকে একবার শীতের সময় দেশের বাড়ি উত্তরবঙ্গে নিয়ে যাব।”

“এই সুন্দর পাখিদের মেরে খাওয়া হয়! ইশ্ কী খরাপ লোকগুলো। আচ্ছা প্রত্যেক বছর ওরা কেন ঘুরতে আসে বাবা? ওরা বুঝি মানুষের মতো ঘুরতে ভালোবাসে নানান দেশ?”

মিষ্টুর মা হেসে বলল—“শীতকালে তুই কী করিস? লেপ থেকে তো বেরোতেই চাস না। পাখিরাও ওদের দেশে ওই ভয়ংকর শীতে থাকতে পারে না। হাজার হাজার মাইল দূরে পালিয়ে আসে ভালোভাবে খেয়ে-পড়ে থাকবে বলে।”

“ভাবাই যায় না মা! ওরা কোন্ কোন্ দেশ থেকে আসে গো? ”

“বিভিন্ন দেশ, যেমন ইউরোপ, রাশিয়া ,তিব্বত, মানস সরোবর। আরো অনেক জায়গা থেকে। আমিও সব জানি না।”

“চখা পাখিদের দলও মানস সরোবর থেকে এসেছিল। আমি ‘বুড়ো আংলা’-য় পড়েছি।”

নৌকা এখন ছরিগঙ্গা ছাড়িয়ে পড়ল আদি বড়ো গঙ্গায় যেখানে জলের স্রোত প্রায় দ্বিগুণ। মাঝি ভাই হঠাৎ বলে উঠল, “কোন্ পাখি বললে মামণি?”

“চখা-চখি।”

মাঝি বলল, “তুমি বইয়ে পড়েছ? আমি তোমায় চখা-চখি দেখাতে নিয়ে যাবো। দূরে চরটা দেখতে পাচ্ছ? ওখানে এক জোড়া চখা-চখি এসেছে। ওরা চর ছাড়া নাবে না।”

মিষ্টু শুনে খুব উত্তেজিত। ইন্টারনেটের যুগে সে চখা-চখির ছবি দেখেছে বটে কিন্তু সামনাসামনি দেখার আনন্দই আলাদা। মাঝি কাকু নৌকা নিয়ে গিয়ে দূর থেকে চখা দম্পতিদের দেখাল। রোদ পড়ে গায়ের বাদামি রং যেন আরও খুলে গেছে। হঠাৎ ওরা উড়তে শুরু করল। খোলা ডানার রং দেখলে ভারতের পতাকার কথা মনে পড়ে যায়। দূরবীনে তা স্পষ্ট ধরা পড়ল। মিষ্টুর মন এখন ‘বুড়ো আংলা’-র মতো উড়ে যাচ্ছে মানস সরোবরের দিকে। আর ও উপর থেকে দেখতে পাচ্ছে, সবুজ ছকগুলো ধানখেত–নতুন শিষে ভরে রয়েছে! হলদে ছকগুলো সরষেখেত–সোনার ফুলে ভরে গিয়েছে! মেটে ছকগুলো খালি জমি–এখনও সেখানে ফসল গজায়নি। রাঙা ছকগুলো শোন আর পাট। সবুজ পাড়-দেওয়া মেটে-মেটে ছকগুলো খালি জমির ধারে ধারে গাছের সার। মাঝ-মাঝে বড়ো বড়ো সবুজ দাগগুলো সব বন। কোথাও সোনালি, কোথাও লাল, কোথাও ফিকে নীলের ধারে ঘন সবুজ ছককাটা ডোড়া-টানা জায়গাগুলোতে। নদীর ধারে গ্রামগুলি–ঘর-ঘর–পাড়া-পাড়া ভাগ করা হয়েছে। কতগুলো ছকের মাঝে ঘন সবুজ, ধারে ধারে খয়েরি রং–সেগুলো হচ্ছে আম-কাঁঠালের বাগান–মাটির পাঁচিল ঘেরা। নদী, নালা, খালগুলো রিদয় দেখলে যেন রুপোলি ডোরার নকশা—আলোতে ঝিকমিক করছে! নতুন ফল, নতুন পাতা যেন সবুজ মখমলের উপরে এখানে-ওখানে কারচোপের কাজ! যতদূর চোখ চলে এমনি! আকাশ থেকে মাটি যেন শতরঞ্চি হয়ে গেছে দেখে রিদয় মজা পেয়েছে; সে হাততালি দিয়ে বলছে–‘বাঃ, কী তামাশা।’ অমনি হাঁসেরা যেন তাকে ধমকে বলে উঠল–‘সেরা দেশ–সোনার দেশ–সবুজ দেশ–ফলন্ত -ফুলন্ত বাঙলাদেশ’!”

চখা-চখি, চুপির চর

রাতে শুয়ে সারা দিনের কথা ভাবতে ভাবতে মিষ্টুর মনে পড়ল একটা ছোট্ট পাখির কথা যেটা নৌকা ভ্রমণের সময় মাথার ওপর খুব দ্রুত ঘন ঘন পাক খাচ্ছিল। ওরা মাঝে মাঝে জলের মধ্যে ডুবে থাকা গাছের সরু ডালে বা কোঞ্চির উপর বসছিল। দূর থেকে দেখলে কালো মনে হয়, লেজটাও ছেড়া অনেকটা। নামটা মনে করতে পারছিল না ও। শুধু মাঝিকাকু বলেছিল এরা এইভাবে উড়ে-উড়ে পোকা খায়। এইরকমই পাক খাওয়া একটা ছোটো পাখি মিষ্টু দেখেছিল মামার বাড়ির বাগানে, সেইদিন শেষ বিকেলে যখন আকাশ লাল হয়েছিল। নামটা মনে করতে করতে সেই রাতে মিষ্টু ঘুমিয়ে পড়ল।

(৩)

চুপির পাখি দেখে এসে সবার মন খুব ভালো। শীতকাল চলছে। ওদের বাড়ির বাগানে অনেক ফুল ফুটেছে। সামনের দিকটায় মস্ত মস্ত গাঁদা। এছাড়া চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, পিটুনিয়া তো আছেই। সেই ফুলে কত প্রজাপতি, ফড়িং ওড়ে। জানলার ধারে বসে দেখতে বেশ ভালো লাগে। উপরি পাওনা হিসেবে মৌটুসী বা দুর্গা টুনটুনিদেরও কখনও কখনও মধু খেতে দেখা যায়। এক অলস দুপুরে মা বলল, “তোকে বলা হয়নি, এইবছর স্কুলে গরমের ছুটি পড়লে আমরা পাহাড়ে বেড়াতে যাব। ট্রেনের টিকিট আজ কনফার্ম হল।”

“এইবার গরমে তাহলে মামার বাড়ি যাওয়া হবে না? আমায় আগে কেন বলোনি?”

“তাহলে তুই যাস না।”

“আমি তাহলে একা একা কী করব? মামার বাড়ি কে নিয়ে যাবে গরমের ছুটিতে?”

“সেই জন্য তো বল্লাম আমাদের সাথে চল। ওখানে বড়ো বড়ো পাহাড় আর খাদ দেখতে পাবি। খুব ভালো লাগবে। বারুইপুর না হয় পুজোর ছুটিতে যাব। তাহলে খুশি তো? আমি না তোর বেস্ট ফ্রেন্ড।”

উত্তরে মিষ্টু বেজার মুখ করে বলল-“হ্যাঁ, বেস্ট ফ্রেন্ড।”

পাহাড়ি গ্রামটির নাম ‘মহালদিরাম’। কার্শিয়াং-এর অন্তর্গত কুয়াশা ও চা বাগানে ঘেরা এক অপূর্ব জায়গা। মিষ্টু এরকম পাহাড়ি গ্রাম কখনও দেখেনি। দার্জিলিং কিংবা গ্যাংটক গিয়েছিল কিন্তু সেগুলো শহরের মতন। এ গ্রাম যেন ছবিতে আঁকা হয়। ছোটো ছোটো ঘর পাহাড়ের থাকে থাকে সাজানো। কত বাহারি রঙের অর্কিড। ফলত মিষ্টু এসে থেকে ভীষণ খুশি। বাচ্চাদের একটা মন্টেসরি স্কুল আছে যেখান থেকে কিচিরমিচির আওয়াজ ভেসে আসছে রাস্তা পর্যন্ত। পাহাড়ি লোকেরা গ্রামটাকে খুব সুন্দর সাজিয়ে রেখেছে। আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলো ঠিক যেন সাপের মতো। প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে মিষ্টুর বাবা বলল, “ভাব তো আমরা পাহাড়ের ঠান্ডায় কত উঁচুতে এসে গেছি?”

“কত উঁচুতে বাবা?”

“প্রায় ৬,৯০০ফিট।”

“ফিট মানে কি গো?”

“এতে উচ্চতা বোঝানো হয় রে। পরে বড়ো হলে সব পড়বি।”

সবাই কথা বলতে বলতে চারিদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার ধারে হঠাৎ একটা ছোট্ট চায়ের গুমটি দেখতে পেয়ে মিষ্টুর বাবা চা খেতে দাঁড়িয়ে গেল। ঠান্ডায় গরম চা সবারই খুব প্রিয়।

“আমিও খাবো বাবা।” আজকাল মিষ্টুও একটু-আধটু চা খেতে শিখেছে।

এক মধ্যবয়স্কা লেপচা মহিলা ওই দোকান চালায়। কানে তার বড়ো বড়ো রুপালি দুল আর নাকে তামাটে নাকছাবি। সঙ্গে তার দুটো চ্যাপ্টা চোখের বাচ্চা ছেলে। মহিলা ওদের বসতে বলল। দোকানে ঢুকতে যাবে এমন সময় মিষ্টুর মার কানেই প্রথম এক চেনা পাখির ডাক গেল। দোকানের পেছনের দিকে এক তারের উপর বসে অনবরত ডেকে যাচ্ছে। উত্তেজিত হয়ে মিষ্টু বলল, “দেখো মা, সেই পাখিটা যেটা আমরা চুপিতে জলের উপরে উড়তে দেখেছিলাম।”

বাবা বলল, “জানিস মিষ্টু তোকে বোধহয় চিনতে পেরেছে, তাই আনন্দে ডেকে চলেছে। এই পাহাড়ে আমাদের ওয়েলকাম জানাচ্ছে।”

মিষ্টুর চোখ আকাশে তখন চখার পিঠে ‘বুড়ো আংলা’-কে খুঁজতে লাগল। বইয়ে লেখা ছিল এইসব পাহাড়ি আকাশপথ দিয়ে ওরা উড়ে যায় মানসসরোবর। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু এই পাখিটার নাম কী মা? কোনোবারই জানা হয় না।”

আবাবিল, চুপির চর

চায়ের দোকানের মহিলা বলল উঠল, “আমরা এদের ‘আবাবিল’ বলি। এই পাখিগুলো শীতকালে এখানে থাকে না। এদেরকে দেখা মানে সারাদিন আমাদের ভালো কাটবে। এই নিন আপনাদের গরম গরম চা।”

মিষ্টুর মা জিজ্ঞেস করল, “এরা কি এইভাবে এত ঘনঘন ওড়ে?”

“আমরা তো এদের ছোটোবেলা থেকেই এই ভাবেই দেখছি। যখন দেখতাম খুব নীচ দিয়ে উড়ছে তখন বড়োরা বলতো, ‘দ্যাখ নিশ্চিই বৃষ্টি আসবে’।”

মিষ্টুর বাবা বলল, “বাহ! বেশ ইন্টারেস্টিং তো।”

মহিলা আরও বলল, “বেটি তুমি যাবে আমার সঙ্গে ওই দূরের বাড়িটায়?”

“ওই বাড়িতে কি আছে? ”

“গেলেই দেখতে পাবে। আপনারাও চলুন।”

আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এর ওর ঘরের দালানের সামনে দিয়ে ওরা হেঁটে যেতে লাগল। নীল রঙের বাড়ির সামনে এসে দেখল নেমপ্লেটে লেখা আছে ‘গুরু রাই’। বারান্দায় উঠে মহিলা সবাইকে ডাকল। কাদার ডেলা ও খড়ের সাথে কী যেন ঝুলছে।

“দেখুন এটা ‘আবাবিল’দের বাসা। এখন ওদের বাচ্চা হওয়ার সময়।”

মিষ্টু পাখিগুলোর ছবি তোলার খুব চেষ্টা করল কিন্তু এত দুরন্ত যে একটাও ভালো ছবি উঠল না। ও তখন পা উঁচু করে দেখতে পেল বাসায় ছোটো ছোটো উজ্জ্বল ডিম। বাবা-মাকে ডেকে দেখাতেই তারাও ভীষণ খুশি।

আবাবিল, চুপির চর

মন ভালো করা স্মৃতি নিয়ে সবাই কলকাতায় ফিরে এল।

সেই বছর পুজোর ছুটিতে যখন বারুইপুর গেল মিষ্টুর বয়স তখন সাড়ে বারো। বুঝতে শিখেছে আগের থেকে বেশি। ঘরে ঢুকে দেখল বিল্টুদা কী যেন মন দিয়ে পড়ছে।

মিষ্টু বলল, “পুজোর ছুটির মধ্যে কি এত মন দিয়ে পড়ছ? আমি এইবার কোনো বইখাতা আনিনি। ছুটিতে কেউ পড়ে নাকি!”

বিল্টু হাত তুলে দেখাল আর বলল “এটা স্কুলের বই নয় রে। আমি রাজুদার থেকে নিয়ে এসেছি বইটা। দেখবি?”

“কই দেখাও।”

হাতে নিয়ে বইটা দেখল, উপরে লেখা আছে ‘‘The Book of Indian Birds by Salim Ali’।

“তুই বলেছিলি না আমরা সব পাখি চিনে গেছি। এই বইটা হাতে আসার পর মনে হল, এখন সবে শুরু হল। আমাদের অনেক কিছু এখনও জানা বাকি আছে।”

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.