​ট্রানজিস্টারের শেষ অক্ষাংশ – ​অয়ন মুখোপাধ্যায়

শেয়ার করুন

১

শহরের আকাশটা গত তিন দিন ধরে রঙের বদলে পচাগলা খয়েরি হয়ে আছে। হরিদা আজ সারাদিন ধরে চটি সেলাই করছে। তার সামনে এক জোড়া বাটা চটি, যেটা তলা খসে জিব বের করে রেখেছে। হরিদা দাঁত দিয়ে সুতো ছিঁড়তে ছিঁড়তে বিড়বিড় করে মনে মনে বলল, “খপ করে যদি একটা কামড় দিয়ে দিতে পারতাম খুব ভালো হতো, আর সেটা যদি চামড়ার বদলে এই শহরের ঘাড়টাকে পেতাম।” পাশের দেওয়ালে একটা পোস্টার— ‘উন্নয়নের জোয়ারে গা ভাসান’। পোস্টারটা দেখে হরিদার মনে হলো, ওটা একটা মৃত মানুষের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট।

২

অঘোর এল হাঁপাতে হাঁপাতে। তার ঝোলার ভেতর বাতিল খবরের কাগজের স্তূপ। অঘোর ফিসফিস করে বলল, “হরিদা, ওরা স্টেশনটা সিল করে দিয়েছে। ওরা ওখানেই কর্পোরেট টাওয়ার তুলছে। কাঁচের টাওয়ার।” হরিদা না তাকিয়েই বলল, “হোক। মানুষ এখন ড্রোন দিয়ে যাতায়াত করবে, নয়তো ইঁদুরের গর্ত দিয়ে।” অঘোর তার ঝোলা থেকে একটা টিকিট বের করল। টিকিটের গায়ে কোনো স্টেশনের নাম নেই, আছে শুধু একটা তারিখ—‘আগামীকাল’। আর একটা লাল সিলমোহর, যাতে লেখা ‘ওয়ান ওয়ে—টু নোহোয়ার’।

৩

“হরিদা, এই টিকিটটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছি শহরের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির ধ্বংসস্তূপ থেকে। কাল রাত তিনটের সময় একটা ট্রেন আসবে। কিন্তু ট্রেনটা কাউকে গন্তব্যে নেবে না, ওটা পুরো শহরটাকে পেটের ভেতর ঢুকিয়ে নেবে।” হরিদা এবার থমকে গেল। সে তার সুঁইটা মাটিতে পুঁতে দিয়ে অঘোরের চোখের দিকে তাকাল। অঘোরের চোখে কোনো ভয় নেই, আছে এক তীব্র উন্মাদনা।

৪

রাত তিনটে। শহরের ঘড়িগুলো সব একই সাথে বিকল হয়ে গেল। অঘোর আর হরিদা এগিয়ে চলল পরিত্যক্ত প্ল্যাটফর্মের দিকে। যেখানে রেললাইন থাকার কথা ছিল না, সেখানে এখন ঝকঝক করছে লাল রঙের ইস্পাতের পাত। বাতাসে বারুদের গন্ধ নয়, পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধ। দূরে দেখা গেল, প্ল্যাটফর্মে কোনো সাধারণ যাত্রী নেই। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে সেই পোস্টারের নেতাগুলো, কর্পোরেট সাহেবরা—যাদের মুখে সেই চিরচেনা উন্নয়নের হাসি। ওরা ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

৫

ট্রেনটা এল। কোনো ইঞ্জিনের শব্দ নেই, আছে হাজার হাজার মানুষের কান্নার একটা সম্মিলিত সুর। দরজা খুলল। নেতাগুলো সব একে একে ট্রেনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। হরিদা পকেট থেকে একটা দেশলাই বের করল। “ওরা তো যাচ্ছে, কিন্তু ওরা জানে না যে ট্রেনটার চাকা নেই, মেঝে নেই—শুধু একটা গর্ত আছে। ওরা যেখানে যাচ্ছে, সেখানে গিয়েই দেখবে—ওরা নিজেরাই নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।” হরিদা রেললাইনের দিকে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠিটা ছুঁড়ে দিল। লাইনটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। অঘোর দেখল পুরো প্ল্যাটফর্মটা এখন একটা আগুনের কুণ্ড।

৬

ঠিক সেই মুহূর্তে হরিদার হাতে থাকা সেই ভাঙা ট্রানজিস্টারটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। মরচে ধরা স্পিকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল সেই নিষিদ্ধ সুর—ইন্টারন্যাশনাল সংগীত:
“জাগো জাগো সর্বহারা,
অনশন বন্দী ক্রীতদাস
শ্রমিক দিয়াছে আজি সাড়া
উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস।।”

৭

ট্রেনের ভেতর যারা ঢুকেছিল, তারা কাঠের পুতুল হয়ে গেল। অঘোর আরো দেখল, ট্রেনের জানলা দিয়ে কোনো মানুষ নয়, বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার কালো পিঁপড়ে। তারা শহরটাকে গ্রাস করছে। ঠিক তখনই আকাশ থেকে বৃষ্টি নামল, কিন্তু সেটা জল নয়, তাজা রক্ত আর কালির মিশ্রণ।

৮

হরিদা ফুটপাতে বসে আবার তার চটিটা হাতে নিল। অঘোরের দিকে না তাকিয়েই শান্ত গলায় বলল, “কাল সকালে এই শহরে আর কেউ জাগবে না রে অঘোর। জাগবে শুধু এই সময়ের কঙ্কাল। আর কঙ্কালের তো আর ট্রেনের দরকার পড়ে না, গন্তব্য তো তাদের চরণে চরণে।” অঘোরের চোখের সামনে চেনা শহরটা হঠাৎ দপ করে নিভে গেল, যেন কোনো প্রকাণ্ড থিয়েটারের আলো অফ করে দেওয়া হলো। পড়ে রইল শুধু হরিদার সেই ভাঙা ট্রানজিস্টারটা। তাতে আর কোনো নেতার ভাষণ নেই, নেই কোনো মিথ্যে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। আছে শুধু সেই অবিরাম বিপ্লবের সুর—যা অমানবিক শ্মশানের নিস্তব্ধতা কে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে মহাকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। সুরটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে:
​”জাগো জাগো সর্বহারা, অনশনবন্দী ক্রীতদাস,
শ্রমিক দিয়েছে আজি সাড়া, উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস!
শেষ যুদ্ধ শুরু আজ, কমরেড, মোরা মিলি একসাথ,
গাও ইন্টারন্যাশনাল, মিলাবে এ মানবজাত।”

শেয়ার করুন

Similar Posts

  • আত্মহত্যা – বনমালী মাল

    বছর দুয়েক আগেই। শুকনো বাঁশপাতায় ভর্তি জায়গাটা মাড়িয়ে যেতে যেতে কমল দেখল, তার বাঁ পাশের হাত খানেক দূর দিয়ে কী একটা সোঁ করে চলে গেল।‘গেল ত গেল…’‘কী দরকার ছিল, আগ বাড়িয়ে তার পথ আটকানার?’কমল শুধু পথে বেড়ি দিয়েই ক্ষান্ত হল না, যখন জানতে পারল, তার সম্মুখে সাক্ষাৎ মৃত্যু বুক বেয়ে শীতল রাগ দেখাচ্ছে, তার দিকে…

  • |

    ইঁদুর – সোমেন চন্দ

    আমাদের বাসায় ইঁদুর এত বেড়ে গেছে যে আর কিছুতেই টেকা যাচ্ছে না। তাদের সাহস দেখে অবাক হতে হয়। চোখের সামনেই, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদলের সুচতুর পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়ার মতো ওরা ঘুরে বেড়ায়, দেয়াল আর মেঝের কোণ বেয়ে-বেয়ে তরতর করে ছুটোছুটি করে। যখন সেই নির্দিষ্ট পথে আকস্মিক কোনো বিপদ এসে হাজির হয়, অর্থাৎ কোনো বাক্স বা কোনো ভারী…

  • এয়ারগান – অর্ণব সাহা

    দোতলার উত্তরের বড়ো ঘরের দরজায় আলতো চাপ দিতেই খুলে গেল। দেখলাম সোফায় বাবা বসে আছে বরাবরের মতো। আর একটু ভেঙেছে শরীরটা। মাথার সাদা চুল প্রায় হালকা হয়ে এসেছে। চোখ দুটো গর্তে বসে গেছে। ইংরেজি খবরের কাগজের পাতা উলটে চলেছে একমনে। কিছুক্ষণ ঘোলাটে চোখে আমায় দেখল বাবা। তারপর ধীর গলায় বলল— “আয়, বোস”। মৃত্যুর পর এই…

  • নদী, শ্রাবণী ও মফস্বল বৃত্তান্ত – পাপড়ি রহমান

    ফুটে-ওঠা-ভোর দেখতে দেখতে আমি রুনিদের বাড়িতে পৌঁছে যাই। অনেকদিন বাদে কোনো মফস্বলি-সকাল আমাকে রীতিমতো ঘোরগ্রস্ত করে ফেলেছিল। শান্ত-নীরব-সমাহিত ওই সকালের ভিতর দিয়ে আমাদের অটোরিক্সা ধীরে-সুস্থে, প্রায় নিঃশব্দে চলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেটা ছিল একেবারেই অসম্ভব। থ্রি-হুইলের ওই যান থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাকের মতো একটানা শব্দ সরিয়ে ফেলা যায়নি। আমি সে চেষ্টাও করিনি। বরং ধোঁয়াটে-আলোর ভিতর…

  • অ্যালজাইমার – সুব্রত নাগ

    ‘‘এক এ চন্দ্র, দুই এ পক্ষ, তিনে?” ‘‘বে… বেদ…” ‘‘সে তো চারে। তিনে নেত্র মনে থাকে না কেন? পাঁচে পঞ্চবাণ, ছ’য়ে…?” ‘‘ঋ–… ঋতু–” ‘‘বাঃ, সাতে?” ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে অসহায় চোখ দুটো। স্মৃতির অতলে ডুব দিয়ে প্রাণপণে উত্তর ছেঁচে আনতে চেষ্টা করে। পারে না। জিজ্ঞেস করি, ‘‘ক’টা ভাওয়েল আছে?” এক সময়ের ইংরেজির দুঁদে মাস্টার জবাব…

  • গর্বিত বাঙালি – অলোকা

    বাড়িতে ফিরেই একটা দ্বন্দ্ব যুদ্ধ বেঁধে গেল। পরমা এমনিতে খুব একটা কথা বলে না। শান্তিতে থাকতেই ভালোবাসে। কিন্তু, অহেতুক অশান্তি একদম ভালো লাগে না। রান্নার লোককে ঝাল ছাড়া তরকারীটা করতে বলা হয়েছিল। ছেলেটা খেতেই পারছে না। আর শাশুড়ি মা, যত বয়স হচ্ছে কথাবার্তা খারাপ থেকে খারাপতর হয়ে যাচ্ছে। সারাজীবন ঝাল ঝোল খেয়ে এখন উনি নিজে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *