কুমায়ুন ভ্রমণ ও তার নানা কিস্‌সা – শিবু মণ্ডল (পর্ব ৭)

শেয়ার করুন

সপ্তম পর্ব

একটি পথ ও পথিক

সপরিবারে অথবা গ্রুপে ঘুরতে এলে কিছু সুবিধা আছে আবার কিছু অসুবিধাও আছে। বিশেষ করে হিমালয়ে ঘুরতে এসেও একলা হওয়া যায় না, নির্জনতাকে কাছে পেয়েও আসঙ্গলিপ্সা পূর্ণ হয় না মনের। সবাই একসাথে ঘোরা হল, খাওয়াদাওয়া হল, আড্ডা হল, আনন্দ হল। তবুও তো যেন কিছু অপূর্ণ রয়ে গেল। এমনিতেই অশান্ত মন কোনকিছুতেই সহজে তৃপ্ত হতে চায় না। এটা আমার স্বভাবজাত। সবসময়েই এক অভাববোধ এক বিষণ্ণতাবোধ লেগে থাকে মুখেচোখে। সব কিছু থেকেও যেন নেই এমন একটা শূন্যতার অনুভব- কেন হয় জানি না। সব কিছুর হয়তো উত্তর পাওয়া যায় না। তবে নৈসর্গিক সৌন্দর্য আমাকে এক অব্যক্ত আনন্দ দেয় এটা সত্যি। মনের কোথাও এক অশান্তি, এক অমোঘ অস্থিরতা যখন তাড়া করে বেড়ায় তখন হিমালয় যেন আমাকে ইশারায় ডাকে। তার ধ্যানমগ্নতা, তার গভীর রহস্য, তার নির্জনতা আমাকে প্রলুব্ধ করে। এই তাড়নার বশেই আজ খুব সকালে একলাই বেড়িয়ে গেছি। আজও মেঘবালিকারা উত্তরের শৃঙ্গরাজিকে লুকিয়ে রেখেছে।এক অজানা, অদেখা চিত্রশিল্পী বিনসার পাহাড়ে, জঙ্গলে, বাতাসে কুয়াশারঙ মাখিয়ে রেখেছে তাঁর অদৃশ্য তুলির আঁচড়ে। সেই কুয়াশারঙ শরীরে মেখে গতকাল যেই পথে যাওয়া হয়নি সেই পথ ধরে হেঁটে চলেছি। উদ্দেশ্যহীন পথ চলতে চলতে একসময় পথের নেশা ধরে যায়। কাহ্‌লিল জিব্রানের লিখে যাওয়া কথা যেন সত্য হয়ে উঠল এই মুহূর্তে- ‘you are the way and the wayfarers…’- ‘তুমিই পথ, তুমিই পথিক’। যে তুমি চলছ এখন সে তুমিই চলেছিলে দুদিন আগে রানিখেতের এক উঁচু-নিচু পথে। সেই তুমি উঠে এসেছে এখানে, সেই পথই উঠে এসেছে এখানে। সেখানেও পথে পড়ে থাকা মৃত সাপ কুহক রূপে এখানে চারপাশে, ওখানে যে বিষাক্ত বিছেটি মরে পড়েছিল সেটিও এখানে আছে নির্বিষ শুয়ে। ওই পথে যে প্রজাপতিটি মাকড়সার জালে আটকে ছিল সেও আছে এখানে তোমার আস্তিনের রং হয়ে ফুটে। সেখানেও যেই মায়াহরিণটি তোমাকে দেখে লাফিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল সেও যদি আসে তাকে বোলো- এখন নয়, খানিক বাদে এসো। এখন আমি পথ হয়ে আছি। তোমার বুকের উপর দিয়ে সে চলে গেলেও তাকে তার রূপে, বর্ণে, গন্ধে পাবে না। তুমি এখন পথ, তুমিই পথিক। গ্রন্থিবন্ধনহীন এক পথ, সময় বন্ধনহীন এক পথিক।

পাঠক বিশ্বাস করুন বনের গন্ধে যেমন নেশা ধরে তেমন কুয়াশারও এক অজানা নেশা আছে। এই দুই নেশা একই পথে এসে মিশলে এক উন্মাদ দশা ঘিরে ধরে। তবে বেশীক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। যে সুক্ষ্ম পথে এই চলাচল ঘটে সামান্য হোঁচট খেলেই ফুস্‌। এই পথ তো আমার মতো এলেবেলের পথ না। এই পথ এক কঠোর সাধকের। এই পথ বিলে থেকে বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা এক ঐতিহ্যের। সে তখন ভারতবর্ষের হৃদয় জয় করা এক বিশ্বপথিক। চিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনে বিশ্ববাসীকে চমকে দেওয়া সেই যুবক সন্যাসি দ্বিতীয়বার তাঁর হিমালয় ভ্রমণে এসেছেন। মাস’দুয়েক ধরে আলমোড়াতে খাজাঞ্চী বদ্রিনাথ শাহ্‌ এর বাগানবাড়িতে উঠেছেন। আসার দিন থেকে তাকে নিয়ে ভক্ত ও অনুরাগীদের উৎসব ও উন্মাদনা লেগেই আছে। দিনরাত অনুগামীদের সাথে ধর্ম ও আধ্যাত্মবাদ নিয়ে আলোচনা চলছে। চলছে গুরুভাইদের সাথে সঙ্ঘের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ততা। সব মিলিয়ে নানা চিত্তাকর্ষক বিষয় থাকা সত্ত্বেও স্বামীজীর মনের ভিতর কি একটা সংগ্রাম, একটা অস্থিরতা প্রবল হয়ে উঠেছিল? তাই কি সে তাঁর অনুগামীদের বলেছিলেন ‘নির্জনবাসের জন্য আমার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগিয়াছে, আমি একাকী বনাঞ্চলে যাইয়া শান্তিলাভ করিব।’ আর জীবনের সেই নানা যন্ত্রণা থেকে, নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতেই কি বিবেকানন্দও ১২৫ বছর আগে এমনই কোনও মেঘমন্ডিত বর্ষাকালে এই পথে হেঁটে এসেছিল ! আশ্রয় নিয়েছিল বিনসারের এই ঘন অরণ্যের নির্জনতায়! সামনে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে নিচের দিকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই সেই ডাক বাংলো যেখানে আমাদের যুগপুরুষ তিনটে দিন যাপন করেছিলেন। বর্তমানে সেটি ফরেস্ট রেস্টহাউস। না আমি আর সেই পথে এগিয়ে যাইনি। কেন যাইনি জানিনা। তার বদলে পিচ রাস্তা থেকে ডানদিকে যে পাথুরে ও শ্যাওলাপিচ্ছিল একটা সরু পথ উঠে গেছে সেদিকে ঘুরে গেলাম। ডানদিকের ঢালের ধারের মাটি কিছুটা ধ্বসে গেছে। হলুদ বর্ণের সেই ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। তার শরীর ঘেঁষে কিছু কাফল গাছ অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাঁ-শেকড় নিয়ে কিছুদিন আগেও ফুলে ফলে লাল হয়েছিল তারা, এখন তারা ফলহীন। সেই গাছের শরীরে ও মাটির পাড়ে কোনও জন্তুর তাজা স্পষ্ট আঁচড় লেগে আছে। খুব সম্ভবত ভালুকের হবে। এই কাফল ফল ভালুকদের ভীষণই প্রিয়। ফল না পেয়ে হতাশ হয়ে হয়তো তারা মাটি আঁচড়েছে, গাছের শরীর আঁচড়েছে। একটা পাখি কোথাও ডেকে যাচ্ছে অনবরত। এই ডাকটুকু না থাকলে আমি বিনসারের নির্জনতাকে আলাদা করে চিনতে পারতাম না। আমার নিঃশব্দ পদচারণার সতর্কতাটুকু শুষে নিচ্ছে পথের উপর জেগে থাকা পাথর আর পড়ে থাকা শুকনো পাতারা। দুপাশে ওক ও রডোডেনড্রন এর মাঝে মাঝে পাইন গাছও ভিড় জমিয়েছে। এও যেন জবরদখল- মাথা, বুক উঁচু করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার এক অহংকার, এক দাদাগিরি। তবে আজকের এই আলোহীন ঘন ছায়াতে সবাই সমান। সবার ডালপালা জুড়েই শ্যাওলার এক অতিরিক্ত ভার। কুয়াশা সবাইকে একইভাবে ভিজিয়ে দেবে। কুয়াশায় ভিজে আমিও হাঁটছি বনের ভেতরে। এই বনটি আবার এক পাহাড়ের উপরে। আমার পায়ের তলার মাটিতে ছোট ছোট পাথর জেগে আছে। এমন ছোটবড় পাথর দিয়েই এই পাহাড় গড়ে উঠেছে। পাহাড়ের শরীরে, পথের ধার ছেয়ে আছে সবুজ ঘাসে ও নানা প্রজাতির ফার্নে। এতো সবুজের মধ্যেও বাদামি বর্ণের শুকনো পাতারা গাছের ক্লান্তি নিয়ে মাটিতে পড়ে আছে। সূর্য ওঠেনি আজ। তবুও আলো আছে এইসবকিছুতেই। আলোহীন এক আলোতে পূর্ণ হয়ে আছি আমরা সবাই। এই এক দৃশ্য জগৎ ও অদৃশ্য জগৎ এর মধ্যে আমি আছি এতে কোনও দ্বিধা নেই, আমি হাঁটছি এতেও কোনও দ্বিধা নেই। হাঁটতে হাঁটতে গতকালকের সেই বাঁকটায় এসে বসলাম এতেও কোনও দ্বিধা নেই। আর কয়েকঘণ্টার মধ্যেই এই বনের সবুজ ছেড়ে, কুয়াশার মায়া ছেড়ে চলে যেতে হবে এটা নিয়েও কোনও দ্বিধা নেই। আছে শুধু বোধের মতো এক প্রবাহ!

অতিথি হয়ে এলে ফিরে যেতে হয়ই। এই গাছগাছালি, পাখপাখালির সাম্রাজ্য ছেড়ে, পাহাড়ের মৌনতা ছেড়ে, স্বর্গীয় শিখরের হাতছানি ছেড়ে আমরা যেপথে এসেছিলাম সেই পথেই ফিরে যাচ্ছি। ইংল্যান্ডে ফিরে যাবার সময় বিষণ্ণ রামজে সাহেব নাকি কেঁদেছিলেন খুব। আমাদের হয়তো কান্না পাচ্ছে না, তবে একটু মনখারাপ তো লাগছেই! আমরা চলে যাচ্ছি তো কি হয়েছে এই বিনসারে আবহমানকাল রয়ে যাবেন হেনরি রামজে, এই বিনসারে আবহমানকাল অধিষ্ঠিত থাকবেন দেবতা কলবিষ্ট…

বিনসার ডাকবাংলো

ফেরার পথে কাঁসারদেবী

জীবনের সুর-তাল গুলো, সম্পর্কগুলো যখন এলোমেলো হয়ে যায় সেগুলো ঠিকঠাক করতে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ি। আর বেড়ানোর কথা উঠলে পাহাড়ের কথাই কেবল মনে আসে। তখন পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে কোনও তুষার ধবল শৃঙ্গের মৌনতার কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর উপায় থাকে না। পাহাড়ের সুশৃঙ্খল সেজে ওঠা, তার সবুজের গভীরতা, তার অনেক না বলার মধ্যে একটু মাত্র ইশারার ভাষা- এইসব যদি আমাদের মনোজগতকে নতুন করে সেজে উঠতে সাহায্য করে! শান্তি নামক এক ঝরনাধারায় শরীর-মন সিঞ্চিত হয়ে নতুন নতুন ভাবনা-পথে ভেসে যাবার প্রাণশক্তি ফিরে পাই যদি! এইসব ভারহীন, নাদেখা সম্পদগুলো আমরা সাথে নিয়ে বিনসারে দু’দিন কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছি আজ যার যার শহরে। ফেরার পথ সেই আলমোড়া হয়েই। স্বামী বিবেকানন্দ আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে একাধিকবার এসেছেন যেই শহরে, যে শহরের রূপ ও রহস্য রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে কিছু কালজয়ী লেখা, যে শহর উদয়শঙ্করের নৃত্যকলার প্রয়োগশালা সেই শহরে এবার থাকা হচ্ছে না। তবে আলমোড়ার ছয় কিলোমিটার আগেই এক দৈব আকর্ষণে যেন আমাদের গাড়ির চাকা থেমে গেল। সেখানে মেইন সড়ক থেকে সরু একটি পথ উঠে গেছে একটি পাহাড়ের পিঠে। দৈবাবিষ্ট আমরা ক’জন প্রাণী বিগত তিনচারদিনের যাযাবর জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় যাকিছু পার্থিব সম্পদ বা বলা ভালো লোটাকম্বলের মায়া সাময়িক সময়ের জন্য ত্যাগ করে( বাস্তবে গাড়ির ড্রাইভারের জিম্মায় রেখে) হাঁটা লাগালাম একটি সিঁড়ির খোঁজে। সিঁড়িটি আগে থেকেই কেউ গড়ে গেছিল। আমরা শুধু তাঁর পথে পা বাড়ানোর অভিনয় করলাম। মাথার উপর থেকে ততক্ষণে মেঘ সরে গিয়ে সূর্যের আলো ঝিলিক দিচ্ছে পাইনের ফাঁকে ফাঁকে। দেবদারু ও ওকের শরীর ধোঁয়া সেই আলো আমাদের রক্তে মিশে যাচ্ছে নেশার মতো। বিনসার ছেড়ে আসার বিষাদ তখন উবে গেছে শরীর থেকে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছে যদি এখানে মন্দির না থাকতো তবুও হয়তো আমরা দাঁড়াতাম। যদি এখানে সিঁড়ি বাঁধানো না থাকতো তবুও আমরা হেঁটে উঠে আসতাম এই কোশী ও সুয়াল নদীর মাঝের এই কাশ্যপ(স্কন্ধপুরাণের মানসখণ্ডে যা কাষায় পর্বত নামে উল্লেখিত) পাহাড়ে। উঠে দেখতে পেতাম পাহাড়ের পূর্বপ্রান্তে একটি বিশাল পাথরের চাতালের নিচে ছোট একটি গুহার মধ্যে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছে এক গেরুয়াবসনধারী সন্ন্যাসী। তিনদিন হয়ে গেল তিনি এখানে একই অবস্থায় ধ্যানস্থ। চারিদিকে গভীর নৈঃশব্দ, ধ্যানভঙ্গ করবার মতো কেউ নেই। দিনরাত্রি একাকার এখানে, শীতল অথবা উষ্ণতা কোনও বোধ নেই, শুধু এক অব্যক্ত আনন্দের ঝরনাধারায় যেন নিমজ্জিত হয়ে আছেন। তাঁর মুখমণ্ডল দেখলে বোঝা যাবে না ইনিই কদিন আগে আপন বোনের আত্মহত্যার সংবাদ পেয়ে কেমন বিচলিত ছিলেন- সে তো সংসারের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করা এক সন্ন্যাসী, আত্মীয়ার মৃত্যুতে কেন সে শোকাহত হবে, কেন তাঁর হৃদয় মুচড়ে উঠবে। বুকের মধ্যে শুরু হয়েছিল এক প্রবল দড়ি টানাটানি, যেন নিজের সাথেই নিজের সংগ্রাম! – ‘ তুইই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে, চিঠি দিয়ে এত গোলমাল বাধাস।… আমাকে সবসময় তুই বিরক্ত করিস। আমি জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাই না, তুই কেবল সকলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবি।’- সতীর্থ সন্ন্যাসীকে এই কথাগুলি বলতে বলতে সেই তরুণ সন্ন্যাসীর দুটি চোখের জল টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছিল! আর এই মুহূর্তে তাঁর মুখমণ্ডল থেকে এক স্বর্ণাভ জ্যোতি যেন ঠিকরে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের চারিদিকে। এই জ্যোতির প্রকাশে এক সত্য উদ্ভাসিত হবে সেই তরুণের কাছে। একদিকে ধ্যান ও সমাধির পরম আনন্দের প্রতি আকর্ষণ ও অন্যদিকে গুরু রামকৃষ্ণের দেখানো মার্গ যাতে সংঘের মাধ্যমে মানুষের তথা জগতের নিঃস্বার্থ সেবা করা এই দ্বন্দ্বের মধ্যে আবৃত ছিলেন তিনি। কিন্তু আজ তাঁর কাছে সেই পরম সত্য প্রকাশিত- আধ্যাত্মিক পথে ব্যক্তিগত মুক্তি তাঁর কাম্য নয়- জীবরূপী ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও সেবাভাবই তাঁর একমাত্র ঈশ্বর সাধনার পথ। আধ্যাত্মিক উপলব্ধির চরম শিখর থেকে নেমে, ব্যক্তিমুক্তির চির আনন্দের চিদাকাশ থেকে বাইরে বেরিয়ে তিনি রামকৃষ্ণের দেখানো পথে আর্তজনের মুক্তির উদ্দেশ্যে কাজ করে যাবার জন্য এক প্রচণ্ড প্রেরণা বোধ করলেন। এই বোধ তাঁকে যেন সজোরে এই সাধনভূমি থেকে টেনে বের করে আনল। এই সত্যের আলোকে প্রকাশিত তাঁকে পুব আকাশে উদিত সকালের সূর্য বলে মনে হবে। তাঁর আলো ক্রমশ ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বসংসারে। এই নতুন উদিত সূর্যের রশ্মি আমাদের কাছে স্বামী বিবেকানন্দ নামে আজও পথ দেখাবে। 

পাকদণ্ডীর দুপাশে বসে থাকা পাইনের ছায়াদের সাথে সখ্য গড়তে গড়তে যখন কাঁসারদেবী মন্দিরের তোরণের সামনে এসে দাঁড়ালাম তখন মনে হল যেন কোনও মন্দির নয় সাক্ষাৎ স্বামীজীর সামনে এসে দাঁড়ালাম। মাথায় সেই একই রক্ত রঙের পাগড়ি ও অঙ্গে গেরুয়া বসন পরিহিত এক ধ্যানমগ্ন বিবেকানন্দ যেন! আমার মনের এই একরকম হওয়ার মধ্যেই অন্যান্য দর্শনার্থীদের ঘণ্টাধ্বনি যেন সেই মনকে অন্য আরেকরকম হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়- বলে এখানেই তো প্রকৃতি মাতৃরূপে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। দেবী কৌষিকী রূপ ধারণ করে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক অসুরদের বধ করেছিল। সেই থেকে দেবী এখানে কৌষিকী রূপে পূজিত হন। তোমাদের এই পৌরাণিক মান্যতা যতটা বাস্তব আমার মনে হওয়াটাও কি ততটাই বাস্তব নয়? বিবেকানন্দ নামক এক ভাবমূর্তির গর্ভগৃহে প্রবেশ করে আমি যদি দেখতে পাই মাতৃভক্ত রামকৃষ্ণের এক যোগ্য শিষ্য তাঁর হৃদয়গর্ভে মাকে অধিষ্ঠিত করে বসে আছেন ব্রহ্মলীন হয়ে, তবে কি তা বাস্তব নয়? এই যে আমরা যারা পর্যটক হয়ে এখানে আসি, এসে যখন জানতে পারি যে বর্তমান মন্দিরটি যেখানে গড়ে উঠেছে এটিই সেই গুহার কিয়দংশ যার নির্জনতায় বসে স্বামীজি ধ্যানযোগে আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। মন্দিরের পিছনে সেই গুহাটির কিছুটা অংশ আজও বিদ্যমান দেখে আমরা রোমাঞ্চিত হই। সেই গুহার ছাদরূপী বিশাল প্রস্তরখণ্ডের গায়ে হাত বুলিয়ে আমাদের আপন বিবেকের স্পর্শ পাই। সেই অবশিষ্ট গুহার আড়ালে বসে অথবা মন্দির চত্বরে ধ্যান করতে বসলে আমরাও কি একেকজন টুকরো টুকরো ভাবরূপী বিবেকানন্দ হয়ে যাই না? নিজ নিজ অক্ষমতার কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য সেই ভাব ধরে রাখতে না পারলেও সেই মুহূর্তটুকুর জন্য তো এক আশ্চর্য আবেশে বিবশ হয়ে থাকি। নয়তো কেন বারবার সেই স্থানটি টানবে আমাকেও। এর আগেও যেবার এসেছিলাম সেবারেও ছিল অন্য বন্ধু ও পরিজন। তবে প্রতিবারেই অনুভুতি সেই এক! এক আশ্চর্য অনুভূতি যা বলে অথবা লিখে ব্যক্ত করা যায় না!

অব্যক্ত অনুভূতির বাইরেও ব্যক্ত করার মতো কিছু থাকে বইকি। থাকার মধ্যে আরও একটি সিঁড়ি আছে যে সিঁড়ি বেয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম কাষায়শ্বর মহাদেবের মন্দিরে। এখানে একটি অগ্নিকুণ্ড অবিরত জ্বলতেই থাকে, নেভে না কখনো। এই অগ্নিকুণ্ডের ছাই কপালে মাখলে নাকি পাগলও শান্ত হয়ে যায় এমনই তাঁর অলৌকিক শক্তি! আমাদের মধ্যে কেউ পাগল ছিল না তাই সেটা আর পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। তবে কাঁসারদেবীর সেই উঁচু শিখর থেকে আলমোড়া শহরটির অপরূপ দৃশ্য দেখে আনন্দে পাগল হয়ে যাবার মতোই অবস্থা হয়েছিল। সেই পাহাড় থেকে জাহাজের ডেকের মতো ঝুলে থাকা একটি পাথরের চাতালে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষেরা টাইটানিকের জ্যাক ও রোজের মতো ভঙ্গিমায় ফটোস্যুট করতে পাগল। পাশেই এইসব পাগলদের দিকে তাকিয়ে আছে অন্য একটি শ্যাওলাধরা প্রাগৈতিহাসিক পাথরের দেওয়াল। তাতে আমাদের বোঝার অসাধ্য এক লিপিতে কিছু লেখা রয়েছে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এটি খ্রিষ্টীয় ষষ্ট শতাব্দীর একটি শিলালেখ। ব্রাহ্মী ভাষায় তাতে যে তথ্যটি উৎকীর্ণ আছে সেটি এরকম- ‘বেতিলার পুত্র রুদ্রক এখানে ভগবান রুদ্রেশ্বরকে স্থাপন করেছিলেন।’

শেয়ার করুন

Similar Posts

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *