/ / অপরাজিত অপু – নূর নাজমুল

অপরাজিত অপু – নূর নাজমুল

শেয়ার করুন

গ্রামের নাম গৌরীপুর। গৌরী কন্যার মতই তার রূপ। প্রকৃতি তার রূপের সমস্ত উপচার দিয়ে রূপসী করে তুলেছে গৌরীপুরকে। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ,ছুটে চলা নদী,সবুজের ছায়াবীথি তার রূপে যোগ করেছে অনন্য মাত্রা। জেলা শহরের অদূরের মেঠোপথ ধরে নদী পেরুলেই দু চার  গাঁ পরে গৌরীপুর। গৌরীপুরে একসময় হিন্দু মুসলমান সুখে শান্তিতে বাস করত। কিন্তু দেশ বিভাগের সময়এগাঁয়ের অনেকেই পাড়ি জমায় ওপার বাংলায়। হিন্দু পাড়ার প্রথম বাড়িটিই অখিল সাহার। অখিল সাহা হিন্দু পাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই। হাটুর ব্যথার কারণে চলতে কিছুটা সমস্যা হলেও নীতির প্রশ্নে অটল, আপোষহীন। তাইতো দেশবিভাগ দাঙ্গার মতো কঠিন সময়ও পিতৃপুরুষের ভিটা আঁকড়ে ধরে থেকে গেলেন গৌরীপুরে।নিম্নমধ্যবিত্ত হিন্দু বাড়ির সমস্ত সৌষ্ঠব ফুটে উঠেছে অখিলের ছোট্ট বাড়িটিতে। পূর্বপুরুষ প্রদত্ত দুখানা টিনের ঘর,তার সামনে এক ফালি উঠান,তার এককোণে তুলসিতলা,টিনের ঘরের বিপরীতে উঠানের ওপারে রান্নাঘর, একটি মাচা,তার পাশে গোয়ালঘর।
অখিলের ঘরে তার স্ত্রী সুহাসিনী,দুই ছেলে অপু আর মেয়ে সুধা। রান্নাঘর লাগোয়া জমিতে চাষবাস আর পাশের ডোবার মাছ আহোরণ করে কোনরকম কায়ক্লেশে সাহা বাড়ির অন্ন জোটে।
অখিলের ছেলে অপু। পঁচিশ বছরের টগবগে তরুণ। এ বছর এম এ ফাইনাল দেবে। কলেজে ভাল ছাত্র হিসেবে তার সুনাম অাছে,পড়াশুনার পাশাপাশি সামাজিক কার্যক্রমেও তার অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়।
সুধা অখিলের মেয়ে। দেখতে সুহাসিনীর মতই সুন্দরী,সামনের ফাল্গুনে ষোলতে পা দিবে।
দিনগুলো তাদের ভালই কাটছিল।কিন্তু হঠাত দেশে বেজে উঠলো যুদ্ধের ডামাডোল। সময়টা একাত্তরের মে র শেষের দিক।সারাদেশের মত গৌরীপুরেরে অদূরের জেলা শহরে পাকসেনারা ঘাটি গড়ে।ধীরে ধীরে তারা গ্রামের দিকে এগুতে থাকে। জোড়কদমে চলে নিরীহ বাঙালি হত্যার প্রস্তুতি।
অতর্কিত আক্রমণ চলে  শহর গ্রাম সর্বত্র। কামান গোলাবারুদে কিছুটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও গৌরীপুরবাসীর ধারণা খানসেনারা আধভাঙা কালভার্ট পেরিয়ে ডোবা খানাখন্দে ঘেরা গৌরীপুরে আসবে না,কারণ পাকসেনাদের পানি ভীতি যথেষ্ট। তবু তারা মুক্তিফৌজ গঠন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।অপু দেশপ্রেমের চেতনায় মুক্তিফৌজে যোগ দিয়েছে । নিজ গ্রামের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে তার বাহিনী ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। তাদের অস্ত্রের ভান্ডার সমৃদ্ধ না হলেও দৃঢ় মনোবল আর সাহসিকতা দিয়ে পাকসেনাকে পরাজিত করার স্বপ্ন দেখে।
সেদিন ছিল শনিবার। কে জানতো যে শনিবার শনির দশা নেমে আসবে গৌরীপুরের বুকে। পাশের গ্রামে পাকবাহিনী হানা দিয়োছে গতকাল।এই ভয়ে গৌরীপুরের সকলে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অপু মুক্তিফৌজের কাজে বাইরে গেছে দিন পাঁচেক হল। হাটুর ব্যথায় জর্জরিত অখিল বাড়িতেই থেকে যায়। সে কোথাও যায়নি তার পিতৃপুরুষের ভিটার মায়ায়।নিরুপায় সুহাসিনী আর সুধা মুখে কালি মেখে খাটের নিচে লুকিয় আত্নগোপন করে। ইতোমধ্যে কালভার্ট পেরিয়ে খানসেনারা ঢুকে পড়ে গৌরীপুরে।গোলাবারুদের গন্ধ আর কামান ট্যাঙ্কের শব্দে চারপাশের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। কয়েকঘর মুসলিম বাড়িতে হত্যাকান্ড চালানোর পর তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় অখিলের বাড়ি। সেনারা বাড়িতে ঢোকার পূর্বমুহূর্তে অখিল বাড়ির পিছনের ডোবার পাশে লুকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সেনাদের শকুনের দৃষ্টি তা এড়ায় না,তারা তাকে দেখে বলে ” পাকড়াও উচকো”আর গুলি ছোড়ে। তৎক্ষণাত অখিল অসার পা নিয়ে সশব্দে পড়ে যায় ডোবার জলে। গুলির শব্দে সিঁথির সিদুর মুছে যাওয়ার আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে সুহাসিনীর বুক। এরপর সেনারা  সারাবাড়ি তল্লাশি করে কাউকে কোথাও না পেয়ে সদর্পে সুহাসিনীর ঘরের দরজায় আঘাত করে। সেনারা ঘরে ঢুকে পড়ে। সুহাসিনী,সুধা ভয়ে কুঁকড়ে মরে। নাক মুখ চেপে নিঃশ্বাসের শব্দ আড়াল করার চেষ্টা করে।সেনারা ঘরের ভেতর হম্বিতম্বি করতে লাগলো, কাউকে না পেয়ে বিরবির করে বলে “কাহা গিয়া আওরাত লোক”।শেষে সেনাদের টর্চের অালোয় চিক চিক করে ওঠে অসহায় মা মেয়ের কালিমাখা মুখ।শিকারি খুজে পায় তার নিশানা অার হর্ষোল্লাসে বলতে থাকে “মিল গিয়া, মিল গিয়া”। টেনে হিঁচড়ে বের করল মা মেয়েকে।এক পিশাচ বলে” ই লারকি বহুত খুব সুরত ইসকো লেকে চল”। সুহাসিনী মেয়েকে বাঁচানোর অন্তিম চেষ্টায় তাদের পা ধরে মিনতি করে বলে “আমার সুধাকে ছেড়ে দাও, তোমরা আমাকে নিয়ে চল”। কিন্তু যালিমরা সেকথায় ভ্রুক্ষেপ না করে সদর্পে লাথি মারে সুহাসিনীকে।বুটের আঘাতে কৈ মাছের মত তড়পাতে তড়পাতে সে বোধশক্তি হারিয়ে চৌকাঠে পড়ে থাকে। হায়েনারা সুধাকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তোলে। সুধা কান্নামিশ্রত আর্তনাদে মা মা বলে চিৎকার করতে থাকে।আর সেনারা তার চিৎকারে উল্লাসে ফেটে পড়ে।
সকাল গড়িয়ে বিকাল হয়। ততক্ষণে তান্ডবলীলা শেষ। লুকিয়ে পালিয়ে থাকা অনেকে বাড়ি ফিরেছে কিন্তু সুহাসিনীর জ্ঞান ফেরেনি। তার গোঙানির শব্দে কোনমত পালিয়ে বাঁচা হারু ও তার বউ ছুটে আসে।তারা সুহাসিনীকে দুয়ারে শুইয়ে  দিয়ে তার চোখমুখে অনবরত জল ছিটাতে লাগলো, হাত পায়ে তেল মালিশ শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর সম্বিৎ ফিরে পায় সুহাসিনী। সে নিজেকে খুজে পায় দুয়ারে শোয়ানো অর্ধমৃত অবস্থায়। আড়ষ্টতা কাটামাত্র অাঙিনায় ছুটে যায় সুহাসিনী আর সুধা সুধা বলে চিৎকার করে স্তব্ধ হয়ে যায়,কারণ সে বুঝতে পারে সুধা আর নেই,কিন্তু সুধার বাবা কই? তার নিথর দেহ তো আঙিনায় পড়ে থাকার কথা। হারু, তার বউ সহ সকলে মিলে অখিলের লাশের সন্ধানে নেমে পড়লো, কিন্তু হদিস মেলে না। অবশেষে সুহাসিনীর চোখ পড়ে ডোবায়,সে দেখে ডোবার জল তার স্বামীর রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। সকলে মিলে তখন  ডোবা থেকে তুলে আনে গুলিবিদ্ধ অখিলকে। তারা ধরে নিয়েছিল যে সে মারা গিয়েছে,কিন্তু হারু নাকে হাত দিয়ে বলে “এখনো প্রাণ আছে”।তৎক্ষণাত পাড়ার সকলে মিলে তাকে পুলিন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। পুলিনবাবু দেখে বললেন ” অবস্থা বেগতিক এক্ষুণি শহরের হাসপাতালে নিতে হবে”। একথা শুনে সুহাসুনীর মুখে বিষাদের ছায়া পড়ে,সে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে, ডাক্তারবাবু যা করার এখানেই করেন দেশের এমতাবস্থায় তো তাকে শহরে নেয়া যায় না। পুলিন বাবু বললেন,”তবে তাই হোক,তবে তার পঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে”। সুহাসিনী বলে, তা পরে দেখা যাবে আগে গুলি বের করা হোক রক্তপাত কমুক, লোকটা বাঁচুক। রোগীকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। আধাঘন্টার প্রচেষ্টায় গুলি বের করা হল,রক্তপাতও বন্ধ হল। কিছুক্ষণ পর আবার সকলে মিলে অখিলকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে ডাক্তারের কথামতো পূর্ণ বিশ্রামে রাখা হল।
এভাবেই চললো কিছুদিন।পায়ের ক্ষত শুকানোর পর অখিল বলে আমার পায়ে বল নেই, আমি উঠে বসতে পারছি না কেন? একথা শুনে সুহাসিনী মনে মনে ভাবে ডাক্তারের কথা এবার সত্যি হতে চললো,তার স্বামী চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেল। অখিল বললো, “কি গো। তুমি কোন কথা বলছো না কেন?” সুহাসিনী তার স্বামীকে মিথ্যে সান্তনা দিয়ে বললো” ওগো তুমি যে বেঁচে আছ এটাই তো অনেক।তুমি চলতে না পারলেও সারাজীবন আমার পাশে থেকো,মৃত্যুর খাদে হারিয়ে যেও না” একথা শোনার পর অখিলের চোখ খুশিতে জ্বল জ্বল করে উঠলো।

কয়েকমাস পরের কথা।ততদিনে দেশ স্বাধীন হয়েছে।এ পাড়ার যারা মুক্তিফৌজে যোগ দিয়েছিল তারা অনেকে ফিরে এসেছে আবার অনেকে নিখোঁজ।যারা ফিরে এসেছে সুহাসিনী তাদের কাছে অপুর খোঁজ জানতে চায়,আর চোখের জল মুছে।

হঠাৎ একদিন ভোরে অপুর মা  ডাকে সুহাসিনীর ঘুম ভাঙে।অপু ফিরে আসে। সুহাসিনী তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাতৃত্বের বন্ধনে।অখিলের চোখে নেমে আসে আনন্দ অশ্রু।
ক্লান্ত বিধ্বস্ত অপু উঠানে বসে আছে নির্বিকারভাবে। আর ভাবছে, হয়তো তার মায়ের সিঁথির সিদুর মুছে না গেলেও স্বামীর পঙ্গুত্বে কিছুটা মলিন হয়েছে,সম্ভমহীনা সুধা কোনদিন ফিরে এসে তাকে দাদা বলে ডাকবে না,তার নিজেরও এম.এ. পরীক্ষা দেয়াটা অনিশ্চত।জীবনযুদ্ধে অপুর জয় পরাজয় অনিশ্চিত,কিন্তু দেশের জন্য যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়াতে সে নিজেকে অাবিষ্কার করে এক অনন্য অপরাজিত অপু হিসেবে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.