স্বপ্নের কশেরুকা – অর্ণব সাহার গুচ্ছ কবিতা

শেয়ার করুন



ব্যথার প্রদীপে জ্বলা আলো
অন্ধ ভূত-চতুর্দশী। রাত
উড়ালপুলের নীচে থামে…
নিঃসঙ্গ। একাকী সম্রাট

ট্যাক্সির দরজা খুলে নামে
ঠোঁটে নীল চুম্বনের বিষ!

যদি সে কখনও ফিরে আসে
অপমান ফেলে রেখে যায়
তার দেখা মেলে না চৌকাঠে
তালাবন্ধ প্রত্যেক দরজায়!

সে আসে। রক্তের আলগা স্রোতে
বারবার আগুন জ্বালাতে…


ময়দানের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় প্রৌঢ় ও যুবতী।
যে প্রেম আগেও ছিল, আজও একই গন্তব্যহীন
ঠিকানা খুঁজে পাবার আগে তার উল্কা খসে যায়,
চোখের জলের রেখা মিশে আছে তারায় তারায়…

প্রিন্সেপ ঘাটের মাঝি বসে থাকে। মৃত চরাচর।

তেপান্তরে চাঁদ নামে কুকুরের জিভের লালায়…

ট্যাক্সি ছোটে। আরেকবার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে
মেয়েটি ভাবে, মুহূর্তকে যদি সত্যি ধরে রাখা যেত,
কালই তো সে ফসকে যাবে। যা কিছু অনির্বচনীয়
তা এই পৃথিবী থেকে মুছে গেছে সাত-তাড়াতাড়ি!

দরজা খোলে। ঘরে ঢোকে মাঝবয়সি লোক।

কাছে-দূরে, অন্য কোনও বলির বাজনা বেজে ওঠে…


ভয় এসে অনর্থক তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিদিন।
ত্রস্ত বেড়ালের মতো ছাদের কার্নিসে ছুটে যাই!
শরীরে বিচিত্র সাপ। কীটপতঙ্গের আনাগোনা
আমাকে ভিতর থেকে মূর্ছা যেতে বলে। আমি উঠি,
ঘুমন্ত লাটাই হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকি…
মধ্য-চল্লিশের দিকে হেঁটে যেতে যেতে বারবার
পথ ভুল হয়। অন্ধ গলিতে ধাক্কা মারে সর্বনাশী হাওয়া
এলোকেশী মেয়েদের শরীরের গন্ধে বিহ্বলতা!

বিষাদ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে খিলানের গায়ে।
ধোঁয়ার মূর্ছনা রেখে উড়ে যায় খেলনা জেটপ্লেন:

নির্জনতা বাঘ হয়ে ঘুমোচ্ছে দোলনায়। আকাশে।

সত্যিই তোমার সঙ্গে দেখা হবে ফেব্রুয়ারি মাসে?


কী বিরল গন্ধ ছিল তোর শরীরের কোশে কোশে…
হাওয়ায় গুটখা আর পানপরাগের ছোপ লেগে
আমাদের রোজকার জীবনও মলিন স্কাইওয়াক।
প্লাস্টিকের ঠোঙা ওড়ে অনর্গল চৈত্রের ফুটপাথে…

চৈত্র আসেনি। আজও কলকাতায় অধরা শীতের
চাদর বেচবে বলে আফগান যুবক ছুটে আসে…

মখমলবাফের ছবি ‘কান্দাহার’-এর দৃশ্য থেকে,
আমাদের রান্নাঘরে জমে-থাকা ঝুলকালি-মাখা
ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফিল্মে শব্দবিহীনতা…

তুই চুপ থাকলেও আমি তোর আত্মা টের পাই…


সে তার বুকের দরজা হাট করে দেয় মেসেঞ্জারে…
সে আসে ঝরা পাতায় শব্দ তুলে, বিষাদের মতো
আমি তার যতটুকু কুড়িয়ে পেয়েছি, জীবনের
শেষ মুহূর্তের আগে সবটুকুই আমার সঞ্চয়!

আমি জানি, সে আমার একশোভাগ নয়।
রুপোলি জলের ছিটে একজনের শরীরে লাগে না:

ভোরের শিশির-ধোয়া জল এসে দুজনকেই ছোঁয়।

একজনের রাজপথ রংবেরং ইমারতে ঠাসা।
অন্যজন ঢুকে পড়বে নামহীন গলিতে…

যেখানে শ্যাওলার গায়ে পাঁচ আঙুল দাগ রেখে গেছে


যে আমাকে ভালোবাসে, আমি তাকে প্রতিহত করি।
যে আমার স্পর্শ চায়, আমি তাকে ধরা দিই না। সে-ও
আহত পাখির ডানা মুড়ে রাখে। শীতের শহরে
রাত্রিচর মানুষেরা সাবধানে রাস্তা পার হয়…
কারও কিছু এসে যায় না। দুধারে আকাশছোঁয়া বাড়ি
নীল আকাঙ্ক্ষার মতো মেঘেদের প্যারাসুট ওড়ে।

আমাকে যে ভালোবাসে, আমি তাকে কষ্ট দিই রোজ।
লুকোনো চাবুকে তার আদরের উপবাস লেখা…
জ্যোৎস্না এসে পিছলে যায় তার শরীরের অন্ধকারে:
হারানো জীবনবিমা তার করতলগত। আমি
মৃত্যুকে গচ্ছিত রাখি সেই দুহাতের ভাঁজে। আর,
একটু একটু করে নিজেকেও ধ্বংস করি রোজ।

ট্রেনের হুইসল মেশে দেহাতি গানের সাত সুরে…
কলকাতায় সূর্য ওঠে। কলকাতায় রাত শেষ হয়।


একদিন হঠাৎ করে থমকে যাবে সবকিছু। পাখি মরে
যায়!
সংলগ্ন ট্যাক্সির গায়ে হেলানো সাইকেল
ছুটন্ত হাইওয়ে আর মুখ-থুবড়ে পড়ে-যাওয়া লোক
পৃথিবী দু-বাহু মেলে যাকে টেনে নিয়েছে গভীরে…

একদিন থাকব না আর। মেট্রোর সিঁড়িতে উঠছে
অফিসযাত্রীরা!
আমার পা টলে ওঠে। যদি এই টানেলের নীচে
কোথাও লুকোনো থাকে তেজি বিস্ফোরক,
মৃত্যুভয়
আচমকা পিছনে এসে ছায়ামূর্তি ইশারা ছড়ায়!

অ্যাসফল্টে শুকনো রক্তদাগ মুছে যাবে:
পড়ে থাকবে সাইডব্যাগ, শতচ্ছিন্ন একপাটি
জুতো…


প্রতিটা প্রেমের গায়ে রক্ত লেগে আছে।
প্রতিটা অবৈধ প্রেমে রক্ত লেগে আছে।
যাকে তুমি খাঁচা ভেঙে উড়ে যাওয়া বলো,
তা আসলে দীর্ঘশ্বাস, গুমখুন, অন্য কারও কান্না
দিয়ে ঢাকা!

নষ্ট ভ্রূণ, আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল শুধু তোমাকেই
তোমার দু’হাতে সেই অজাত শিশুর অশ্রু লেখা…

ঘর ভাঙা খুব সহজ। দায়বোধহীন
ডিঙিনৌকো দিগন্তের অন্য পারে বাঁধা।
এপারে বানভাসি গ্রামে যার চালাঘর ডুবে যায়,
সে কোথায় নীড় খুঁজবে? কে এসে দাঁড়াবে
তার পাশে?

তুমি তার ভাগ নাওনি। খেলেছ রক্তের
অনির্বচনীয় হোলি। তোমার ভালোবাসায় অন্য কারও
মৃত্যু-উদ্‌যাপন !


চৌকাঠ পেরোলে একটা লাল দরজা-নীল জানলা ঘর।
স্মৃতির উপত্যকা। ছুটে যাচ্ছে বুনো সারমেয়।
রেলব্রিজ থেকে দেখা ফাঁকা চক্ররেলের স্টেশন।
স্বপ্নের ভিতরে আঁকা সারসার খাঁজকাটা ব্লেড…
ধারালো আঁশবটির ফাঁক গলে বেরিয়ে এলাম!

২৭ এপ্রিল। আমি নিঃশব্দে পেরোচ্ছি তোর বাড়ি!

টিলার ওপারে মেঘ। মেঘের চূড়ায় মহাকাল
চার বছর আগে এই দিনটার কথা মনে পড়ে…

কর্নেলকে লেখে না কেউ। কর্নেলও জবাব দেয় না
কারও!

শেয়ার করুন

Similar Posts

  • জয়ীতা ব্যানার্জির পাঁচটি কবিতা

    সমস্ত সূর্যাস্ত গেল প্রার্থনাবিহীন ১ তুমি সে অভাববোধ। আত্মরতি অথবা সঙ্গমকালেচোখের অবাক দৃষ্টি–সজলতার বিবিধ কারণঅধিক সচেতনতা, ততোধিক নিরুদ্বেগে ফিরে যাওয়াপোশাকের কাছে। অনুশোচনার মতো দ্বিধাগ্রস্ত এইপ্রায়ান্ধ আলোর নীচে স্বচ্ছ পর্দা টানা আনন্দ মুকুরমেয়াদোত্তীর্ণ ফুলের কাছে আমরা তবু স্মৃতিচারণশিখি। অনাবিষ্কৃতের মোহে শিখি ব্যয়, ভ্রম ও ভণিতাতোমার করুণা আজও সমান অসহনীয় মনে হয়তবু যে কোনো ক্ষতেই আমাদের প্রথাসিদ্ধ…

  • ভয়ের অনুপ্রাস – কাজী জহিরুল ইসলাম

    টাইয়ের নটে সকাল বেঁধে রাখি এই শহরে সকাল এলে আঁতকে ওঠে পাখি কেউ জানে না কোথায় কি-যে ঘটে । আমার নাকি বন্ধ চোখও হাসে আতঙ্কিত পাখির ডানা ভয়ের অনুপ্রাসে কানাকানির শব্দ কিছু রটে। জীবন ফোনে বলল সেদিন রেগে ঘটবে কিছু আলোর সাথে আলোর ধাক্কা লেগে অবিশ্বাসের প্রকাণ্ড কান পাতি। কোথাও কিছু ফাটল নাকি রাতে? ছন্দহীন…

  • অন্য রকম বাঁচা – সুদীপ্তা

    আমি এক অতি সাধারন মেয়ে,, শরৎ বাবু, রবি বাবু অথবা হালের সুবোধ বাবু কেউই আমায় ধর্তব্য়ের মধ্যেই আনেন নাম। কি বললেন? কাব্য এ উপেক্ষিতা? ও উপাধি ও খাটে না আমার জন্য…. মেয়ে জন্মের যাবতীয় উপেক্ষা আর অবহেলা সত্বেও প্রাকৃতিক নিয়মেই যৌবন এসেছিল…. দেহে, মনে… বলে না যৌবনবতি কুক্কুরিও সুন্দরী? আমি তখন উদ্ভিন্ন যৌবনা আমি তখন…

  • অজিত ভড়ের পাঁচটি কবিতা

    বিধিনিষেধ ১৪৪ দৃশ্য শেষ। এইবার কান্না শুরু হবেকে কেমন করে কাঁদবে—তারই নির্দেশ দিচ্ছেন পরিচালক। আমপাতা এসে গেছে, জামপাতা এসে গেছে, এমনকি বটপাতা–অশ্বত্থপাতাও এসে গেছে, যার ওপর যেমন নির্দেশ সে সেই পাতায় মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকুক। জীবনের সব কান্নাই শিল্প। মনে রাখবেন, সিগারেট খাওয়া যেমন স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর আগুন জ্বালানোও তেমন দেশের পক্ষে ক্ষতিকর— অনুগ্রহ করে—কেউ আগুন জ্বালাবেন না। কপাল ১৬ ঘণ্টা…

  • সীতা হেমব্রমের পাঁচটি কবিতা

    আখা জ্বলছে, কয়লার বিরাম নেই লেখা আসার আগে, সন্তানজন্ম ফিরে আসে। স্বপ্ন তখন স্বরবর্ণে আসত, ফিরে যেত ভ্রূণ বিষাক্তকরে। মনে হত, মরা বাচ্চা বিয়োব আমি; নীল হয়ে যাওয়া, রক্তনাড়ী জড়ানো গলায় সে মাকেনা বলেই হয়ত ফিরে যাবে সম্পূর্ণ জীর্ণ । দলা পাকানো জরায়ু তছনছ করে গোটা বাড়িটাই ভেঙে পড়ল, সলতে পাকানোএক ফোঁটা জলও নিল না…

  • হারানো সুর – শুভদীপ চক্রবর্তী

    ভারাক্রান্ত হৃদয়ের ডাকে অস্পষ্ট চোখগুলো মাঝে মাঝেই ভাষা হারিয়ে মিশে যায় মেলানকলির অতলে। বিষন্ন মন ভেসে যেতে চায় অশ্রু ধারায়, সযত্নে লালিত স্বপ্নের ডিঙি বেয়ে ছন্দহীন কোনো সুর তালে।   যে নিরিবিলি ছায়ায় একদিন মনের সাথে মনের কাটাকুটি খেলত ওরা, আজ দেখো ওদের দৈন দশা। গ্রহণ কেটে বাস্তবতার তীব্র তাপে জ্বলছে ওদের দাহ্য ভালোবাসা।  …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *