/ / রঘু জাগুলীয়ার গুচ্ছ কবিতা

রঘু জাগুলীয়ার গুচ্ছ কবিতা

শেয়ার করুন

দিগন্ত প্রার্থনালয়

বাতাস এসেছে কাছে কাঁপা কাঁপা গলায়
কি অভিযোগ তার, বলে না কিছুই।
তবু হৃদয়ে তলিয়ে যাচ্ছে সূর্যাস্তে লেগে থাকা
নদীর তটভূমি, সংলগ্ন কোমল রোদ
মেঘে মেঘে বেগুনিরঙা আচ্ছাদন—

আমি তো ত্রিভুবনে প্রার্থনালয় চেয়েছি এমনি—

ফুলের মালা হয়ে জোনাকিরা
ছুঁয়ে যাবে দেবীর চরণতল;
আর রাত্রির কুঞ্জবন হতে পৃথিবীর দিকে
শিশুর মতো নিরালা মুখে হাতছানি দেবে চাঁদ,

অথচ যেদিকে করজোড়ে দাঁড়াই
বাতাসে-ধুলোয় দেখি শিকারির ধূর্ত ফাঁদগুলি।

দূরত্বে যারা ছিল তারা সব কৌতূহল—
এখনও যারা আছে অনতিদূরে,
লৌহ-পরম্পরায়, উঁচু-নীচু গাছের ছায়ায়
রাতের ভূমিকা থেকে জানা যায়
বৃষ্টিছাটের মতন
কাউকে এখুনি কিছু জানাব না
জানাবে পাতাঝরা বিকেলের ঘর—
যে ঘরে ক্রমে রক্তশূন্যতা ব্যাঙের স্বতঃস্ফূর্ত লাফ—
আর ছায়ানীলে ঘুমিয়ে প’ড়া
সেজদি’র ছেলের গণিতপ্রিয় আঙুলগুলি।

দরজা খুলতে পারিনি বলে
বসেছিলাম সেদিন পশ্চিমের মৌন-বারান্দায়—
এইদিকে বাদাবন ও সংযুক্ত মেঘরাশি,
পাড়া-প্রতিবেশিনীর খলখল হাসি, ক্ষীণ বৃষ্টি-আভাস,
মাছের ঘাইয়ে উদ্বেলিত জলতল,
হেমন্তের কাঁচাপাকা ধানখেতের উপর দিয়ে
ক্রমশ অনিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কুয়াশা—

সাড়া পেয়ে দেখি, জলকলস নামিয়ে
মা এল, খুলে দিল ঘর।

পৃথিবী ঘুরছে লাট্টুর মতো
তাই কি অপূর্ব বলি এইরূপ কেন্দ্রীয় সমাচার!
বাকিরা তার বেশি কে কতদূর মেঘজটাবিস্তৃত
জানতে পারি না বলে তাই
মায়াদরিয়ায়, স্বপ্নে, পুকুরে, জাল ফেলে ফেলে
রুই-ভেটকি নিয়ে আত্মবিড়ম্বনায় নেমে যাই—
শূূন্যে ছুটে চলি, অভিকর্ষের বিপরীতে
যেরকম লেত্তি দিয়ে
করতলে তুলে নেয় লাট্টু, পাক খেতে খেতে
মরে যায় আলো… অস্ফুট বেদনায়

বই সবথেকে প্রিয় বান্ধবী—
আর ছিল টুকটুকে লাল-সবুজ ঊর্মি,
বয়োসোচিত উন্মাদনা—
দীঘির স্মরণীয় কালো জল,
কচুপাতার মতো নিতম্ব, রোদের হস্তযুগল,
গ্রহ-তারকা, বালিকাবিদ্যালয়
তাহাদের সুবর্ণ পাপড়ি হতে
বিচ্ছুরিত আলো
যা কিছু প্রকৃত ফুল, আগুনের সংহত জ্ঞান—

বিকেলের সিঁথিলাল, জনশূন্যতায়,
ছিন্নবেতারে—পাতা ঝরে যায়…
কৃষ্ণাভ হরিণ দেখে ভালো লাগে—
নীলঅটবি–প্রান্তর, পরিচিতা–ঘনায়মান…

স্বপ্ন নিয়ে দোল খাই, সন্ধ্যাভ্রমণ পূর্বে
দু-দশ টাকা পকেটে রাখি
মনে মনে ধানপাতার ভিতর জলঢোড়া সাপ
সড়-সড় চলে যেতে দেখি
স্বপ্নের ভিতর বাস্তবিক এইটুকু আসা-যাওয়া।
কাকে কাকে এখনও ভালোবাসা জানাতে পারিনি
কে আছে কোথায়, কাছে-দূরে, বৈষম্যের শিকড়ে
বলতে পারিনি এ-হৃদয় মর্মর, সবুজাভা—
তুমি এসো আবার কাল বিকেলে

সন্ধের নীলাভ রং
তীর বিঁধে গেছে প্রিয়জনের পা’য়
দেখি অতঃপর ব্যাধের চোখে জল,
তমিস্রাবনের দিকে আলো, যেন চিকিৎসালয়

অন্তর্নিহিত হয়ে আছে যে গাছ
আজ যদি তাকে উপড়ে তুলি
বলো শুনবে তো মেঘে মেঘে বীণা
আর তার পাতাহীন ডালে ডালে পাখি—
নদীর কূলের দিকে যাবো,
বাতাসের আছে নাকি কিনারা?
রক্তাল্পতায় ঝিমিয়ে পড়ল বিকেল—
তবু ওই সীমা আর অসীম-এর ছোটোবোন
ধুলোয় এক ঠ্যাং তুলে মগ্ন খেলায়,
তার পা লেগে খোলা’র চাকতি সরে সরে যায়।

সবুজাভা ভেদ করে ছুটে চলে ট্রেন
যেন একটি আর্তনাদ
স্টেশনে পৌঁছে গম্ভীর হল।
হাত থেকে তরবারি ফেলে
সরাসরি দুধে-জলে মিশে কুশি’তে অমৃত হও।
কেন যে রোদের আয়তন থেকে,
শমিবৃক্ষ থেকে, যেতে দেরি হয়!

ওখানে দেখা করো তুমিও কোনোদিন…

অনন্ত নিদ্রায় শুয়ে আছেন আমাদের বুদ্ধ।

শেয়ার করুন

Similar Posts

3 Comments

  1. কী অপূর্ব সব ছবি ! কী চিত্রকল্প! ট্রেন যেন একটি আর্তনাদ যা স্টেশনে পৌঁছে গম্ভীর হয়, তরবারির বদলে দুধজলের অমৃতে ভরোভরো কুশি, রক্তাল্পতার জন্য কবি বেছে নেন বিকেলের মরা সময় আর মৌন বারান্দা থাকবে পশ্চিম দিকেই, কারণ পূবে আলোর উদ্ভাস। পূবের বিপরীতে যে অন্ধকার অরণ্য তা বাদাবনই হবে, কালো মেঘ থাকবে মাথায়। অনিবার্যতা শব্দচয়ন থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে।
    অভিনন্দন কবি!

    1. প্রণাম নিও দিদি। তোমার এমন প্রতিক্রিয়া আমার কাছে অনেখানি আশীর্বাদ। অন্তরের ভিতর তোলা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.