/ / গৌতম বসুর সাক্ষাৎকার – তপন রায়

গৌতম বসুর সাক্ষাৎকার – তপন রায়

শেয়ার করুন



‘… সব দর্শক যখন অতীত / তখনও অনেক ভূমিকা থেকে যাবে / এই জল প্রকৃত শ্মশান বন্ধু, এই জল রামপ্রসাদ সেন ‘ বা ‘… সবই আছে , কিন্তু এমনভাবে, / ভাতের হাঁড়ির নীচে আগুন নেই, নদীতে জল নেই, আগুন; উদ্বেগ এইজন্য ।’ – এই চিরন্তন পঙ্তিগুলোর রচয়িতা যিনি, তাকে একবার চাক্ষুষ দেখার জন্য ১৯৯২-র এক দুপুরে প্রবল ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম তার বাড়িতে । শুধু একবার তাকে দেখব, তাঁর কথা শুনব প্রাণ ভরে, এই ছিল আমাদের সেদিনের স্বপ্ন । তিনি, কবি গৌতম বসু । যাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘নয়নপথগামী’র আলোচনা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কবি কালীকৃষ্ণ গুহ কিছুদিন আগে ‘রিভিউপ্রিভিউ’ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ সংখ্যায় লিখেছিলেন গৌতমের প্রথম কাব্যপুস্তিকা ‘অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’ (১৩৮৮) বেরনোর পর কী ঘটেছিল তা অনেকেই জানেন । ‘এই জল প্রকৃত শ্মশান বন্ধু, এই জল রামপ্রসাদ সেন’ পঙক্তিটি একটা কবিতা যুগে গায়ত্রীমন্ত্রের রূপ পেয়ে গেল । বাংলা কবিতা থেকে কৃত্তিবাসী প্রস্বরটি তার ভৌতিক বিস্তার সহ যেন চুরমার হয়ে গেল । …অনেকেরই কবিতা লেখা থমকে দাঁড়াল, শুরু হল পথ বদল । অনেকের মূল্যবোধ পাল্টে গেল – সেই সঙ্গে ভাষাবোধ, বুলি, জীবনাচরণ । অথচ আশ্চর্য এই বইটি ঘনিষ্ট মহলের বাইরে পাঠক সমাজের মধ্যে তেমন প্রচারিতই হল না । ১৬ পৃষ্ঠার এই পুস্তিকাটি কী ইতিহাস তৈরি করল তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে হয়তো । এ-বিষয়ে এই সময়ের একজন অগ্রণী কবি ও ভাবুক অনির্বাণ ধরিত্রীপুত্র যা বলেছেন তা মনে করা যেতে পারে ।
‘…সেদিন যদি সত্য সত্যই আসে কোনোদিন, তবে সেই যুগান্তপারের হে পাঠক, হে পাঠিকা, হে পাঠিকা, আমরা নিশ্চিত জানি, যে, শ্রী গৌতম বসুর পদপ্রান্তে, তোমাদের সেদিন, কৃতজ্ঞচিত্তে , প্রণত হইতেই হইবে। ‘

আজকের এই সাক্ষাৎকার কিন্তু সেই দুপুরের কথাবার্তার ফসল নয় । বস্তুত সেদিন দেখাই হয়েছিল । কথাবার্তা বিশেষ হয় নি । তাঁর প্রসন্ন-সান্নিধ্যই আমাকে মুগধ করে রেখেছিল সেদিন । মুগধতার সেই রেশ আজও বহন করছি আমি । এবং বার্তালাপ, সে তো এক প্রকার হয়েই গিয়েছিল মনে-মনে । তাঁর একেকটি বই, পড়ে পাওয়া গদ্যগুলো, দু একটি সংক্ষিপ্ত, প্রাণময় পোস্টকার্ড আমাকে জাগিয়ে রেখেছে এই ক’বছর । অপেক্ষা করেছি দীর্ঘ আড্ডার, জেনে-নেবার, বুঝে নেবার সেই মুহূর্তগুলো কবে আসবে ।

বছরে দুয়েক আগে হঠাৎ খবর পেলাম । আদম পত্রিকা’র সম্পাদক সেদিন কথায় কথায় ফোনে বললেন, ‘ গৌতমদা তো এখন আপনাদের শিলিগুড়িতেই আছেন । বদলি হয়ে এসেছেন।’ আমি উত্তেজনায় ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম ।আমাকে দীর্ঘদিন বিষণ্ণ দেখে হয়তো গৌতমদাকে পাঠিয়ে দিলেন । রবিবারের সন্ধ্যাগুলোর জন্য আমি এখন উন্মুখ হয়ে থাকি । কিন্তু সব রবিবারই তো আর সত্যি সত্যি রবিবার নয় । গৌতম বসু শিলিগুড়িতে আছেন, যেন কিছুটা অজ্ঞাতবাসেই । সুতরাং অপেক্ষা আর আকাঙ্খা, শেষ পর্যন্ত থেকেই যাচ্ছে ।

এই সাক্ষাৎকার অতঃপর, ২০০৮-এর দ্বিতীয়ার্ধের গুটিকয় সান্ধ্য আড্ডারই ফলশ্রুতি | কিন্তু একে কি সেই অর্থে সাক্ষাৎকার বলা যাবে ? কেন না সাক্ষাৎকার নেবো বলে সেজেগুজে টেপরেকর্ডার হাতে কবির ড্রয়িং রুমে হাজির হওয়ার মতো জমকালো ঘটনা এখানে নেই | বরং এখানে আছে লাহিড়ীদার চায়ের দোকান অথবা জনবহুল বিধান রোড কি সেবক রোড-এর ফুটপাথ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটা | থেমে কোথাও আবার চা খাওয়া | হয়তো আমি কিছু একটা প্রশ্ন করলাম; হয়তো বোকা – বোকাই শোনালো প্রশ্নটা | গৌতমদা মুচকি হেসে আন্তরিকভাবেই জবাবটা দিলেন | পরে আমার মনে হয়েছে, অনেকদিন পর এই কথাগুলো যদি আবার ভুলে যাই | গৌতমদাকে বললাম | টেপরেকর্ড চালিয়ে কথা বলা খুব বিচ্ছিরি ব্যাপার | তার চেয়ে, যদি কাগজে প্রশ্নগুলো পরপর সাজিয়ে দিই তাহলে কি আপনি আমার কথা ভেবে জবাবগুলো লিখে জানাবেন ? তাছাড়া আমার কাছে তো ভালো টেপ রেকর্ডার নেই | আপনি যখন কলকাতা ফিরে জাবেন, আমি মাঝে মাঝে পাতাগুলো উলটে দেখব | পড়ব | ভাবব | আমার ভালো লাগবে | কিছুক্ষণ চুপ থেকে গৌতমদা হেসে ফেললেন | স্নেহের হাসি | বললেন, ‘ঠিক আছে’| সেই শুরু | এই সাক্ষাৎকারকে বরং কাগজে কলমে আড্ডা-ই বলা যায়| এবং একান্ত বাক্তিগত আনন্দের জন্য এই সন্দেশ আমি কৌটোবন্দী করে ফেললাম |

কিন্তু সন্দেশের কৌটোর কথা পিঁপড়েরা কীভাবে যে টের পেয়ে যায় | এই পিঁপড়ে তো আবার মহাবাহু অভিজিৎ | সুতরাং সব প্রতিরোধ, আড়াল-আবডাল বন্যার জলের মুখে ভেসে গেল | শুধু বলতে পেরেছি ‘জানি না, গৌতমদাকে রাজি করানোর দায়িত্ব তোমার |’

‘অতএব বাক্তিগত আনন্দের জন্য সংরক্ষিত গপন এই কৌটো এখন আপনাদের সঙ্গে আমরা শেয়ার করছি, পাঠক |

প্র ‘অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’ লেখার সময় আপনি কি এই বইটির প্রভাব ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন ? আপনি কি বুঝতে পারছিলেন সমকালীন ও পরবর্তী প্রজন্মের কবি / পাঠকদের এই বইটির কাছে ফিরে ফিরে আসতে হবে ?

  • না |
    প্র নিয়তি কিম্বা প্রেরণায় আপনি বিশ্বাস করেন ?
  • করি | এরই সঙ্গে আমি পরিশ্রমের উল্লেখ করতে চাই | আমাদের সামনে পরিশ্রমের উপযোগিতার দৃষ্টান্ত রয়েছে, রবীন্দ্রনাথ | আমার ধারণা, রবীন্দ্রনাথের প্রতিতুলনায় দ্বিজেন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, উভয়েরই ক্ষমতা বেশি ছিল | কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যতটা ভেবেছিলেন, যতটা অনুশীলন করেছিলেন, কান পেতে যতদূর শোনার চেষ্টা করেছিলেন, তার প্রতিভাবান দুই দাদারা তার কণামাত্র করেননি | ফলে, আমরা কী দেখলুম ? রবীন্দ্রনাথের সিদ্ধিলাভ দেখে, রাগে, দুঃখে, আমি বলব ভয়ে এবং ঈর্ষায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রাঁচিতে পালিয়ে গেলেন | দ্বিজেন্দ্রনাথ আশ্রয় নিলেন ছোট ভাইয়ের শান্তিনিকেতনে | কোথায় যেন পড়েছিলুম, শান্তিনিকেতনে দ্বিজেন্দ্রনাথের প্রাত্যহিক আহার ছিল পেটে পোলাও ভরা একটি ছোট মুরগি | শৌখিনতার বাইরে এসে দাঁড়াতে পারলেন না দ্বিজেন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ | শিল্পসাধনায়, বিজ্ঞানচর্চায়, দর্শনচর্চায়, খেলাধুলায় যারা সিদ্ধিলাভ করেছেন তাদের প্রত্যেকের জীবনে প্রেরণা, নিয়তি এবং পরিশ্রমের একটা সংযোগ ঘটেছে বলে আমার মনে হয় | পথিকৃৎদের মুস্কিল অন্য জায়গায় – নিজেদের কাজ সম্পর্কে তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণা থাকে না, তাঁরা অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে চলেন । রবীন্দ্রনাথ যাকে আমরা সর্বজ্ঞ মনে করি, তিনিও লিখেছেন ‘পথ আমারে সেই দেখাবে যে আমারে চায় -‘ এবং ‘একলা রাতে অন্ধকারে আমি চাই পথের আলো’। Degas যখন তাঁর ছবিগুলো আঁকছিলেন তখন তৈল চিত্রাঙ্কনের যে পদ্ধতিটি ওঁরা ব্যবহার করছিলেন সেটি ছিল নতুন | Degas লিখছেন : একটা অদ্ভুত সময় আমরা পার হচ্ছি ; এই যে Oil painting এর চর্চা করছি, তার বিন্দুবিসর্গ আমরা জানি না । আমার বন্ধু অনির্বাণ ধরিত্রীপুত্র একবার লিখেছিলেন, যিনি পথপ্রদর্শক তিনি একটা মশাল নিয়ে হাঁটছেন, তাঁর অনুগামীরা এগিয়ে চলার জন্য যেটুকু আলোর প্রয়োজন, তা পেয়ে যাচ্ছেন । কিন্তু পথপ্রদর্শকের অবস্থা কী ? তার সামনে গাঢ় অন্ধকার, তিনি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না ! তুমি যে প্রশ্ন উত্থাপন করছ -প্রেরণা, নিয়তি – এদের একটা ভূমিকা আছে অনির্বাণের সেই কথায় । বড় মাপের মানুষদের মধ্যে পরিশ্রম, প্রেরণা এবং নিয়তি মিলে মিশে একপ্রকার শক্তির জন্ম দেয় – সজ্ঞা, intuition – এরা অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে হয়ত পান না, কিন্তু একটা আভাস দেন ।
    প্র কবিতা ব্যাপারটা আপনার কাছে ঠিক কিরকম ?
  • এই প্রশ্নের ফাঁদে আমি পা দিচ্ছি না । কিন্তু প্রসঙ্গ আছে যার আশে পাশে ঘোরা যায় কিন্তু ছুঁতে নেই । ছুঁলেই তাদের শুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যায় ।
    প্ৰ সাহিত্য ছাড়া অন্য কোনো শিল্পমাধ্যম যেমন চলচ্চিত্র, চিত্রকর্ম, সঙ্গীত ইত্যাদি কি আপনার কবিতা কিম্বা চিন্তাভাবনাকে কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে ?
    -সমস্তই তো প্রভাব, সমস্তই ঋণ । সিনেমা বিদ্যাটি তত কাছের জিনিস বলে মনে হয় না । গান, আমার ব্যক্তিগত ধারণা, শিল্পের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম । প্রাকৃতিক ধ্বনিকে নিজের মতো সাজিয়ে নিয়ে তাকে মানুষ যে স্তরে উন্নীত করেছে, সেটা আমার কাছে ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে । ধ্বনিকে যান্ত্রিক উপায়ে ধরে রাখার প্রযুক্তি নতুন । তবু, গান কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হল, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ল – এটা চরম বিস্ময় উদ্রেক করে । ছবি ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যের কথাও আসছে এই সঙ্গে – অন্য একদিন এ-বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। তারকোভস্কির একটি কালজয়ী চলচ্চিত্রে একটা কথা পেয়েছিলুম, যা এত স্পষ্টভাবে অন্য কোথাও পাই নি – the unselfishness of art .
    প্ৰ ভিড়ের মধ্যে আপনি কবিতা লিখতে পারেন?
  • না ।
    প্ৰ মানুষ, না নিসর্গ – আপনার ব্যাক্তি এবং কবিজীবন কোথায় সবচেয়ে comfort বলে আপনি মনে করেন ?
  • প্রকৃতি এবং মানুষ – উভয়ের সান্নিধ্য ছাড়া জীবন আরো অপূর্ণ থেকে যেত । কিন্তু মানুষকে আলাদা করছি কেন, প্রকৃতি থেকে?

প্ৰ ব্যাক্তিজীবন থেকে আপনার কবিজীবন ঠিক কতটা এবং কীভাবে আলাদা করবেন আপনি ?

  • এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই । দূরকমই দেখি । কবিতায় আমি একটা কথা বললুম, আমার ব্যক্তিজীবন অন্য পথে হাঁটছে – আমরা তো বলি, এ মিথ্যা, সময়ের প্রহারে মিথ্যা কবিতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে | কথাটা তো ঠিক | কিন্তু এর ব্যাতিক্রমও কি নেই ? আমার কাছে ব্যাতিক্রমের একটি নিদর্শন : পণ্ডিত রবিশঙ্কর | নানা প্রকার ক্ষুদ্রতা দেখা গেছে ওঁর মধ্যে, যার উল্লেখ আমি করতে চাই না | যখন উনি সেতারে হাত রাখেন, তখন কিন্তু উনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ | Classicism-কে রবিশঙ্কর যে-স্তরে উন্নীত করেছেন তা অবিশ্বাস্য | কী করে সম্ভব হল এটা ? আমি জানি না |
    প্র কিছুদিন আগে আদম পত্রিকায় মহাকাব্যের ভাষা, তার ক্ষয় ইত্যাদি নিয়ে খুব ছোট কিন্তু সারবান এক প্রবন্ধ লিখেছিলেন আপনি | আমার তৃষ্ণা মেটে নি বরং বেড়ে গেছে | এই অবসরে আপনি এই বিষয়ে কিছু বলুন !
  • ভাষার ক্ষয় ও মৃত্যু আমার প্রিয়তম বিষয়, কিন্তু প্রসঙ্গটি এতই বিরাট ও গভীর যে তাকে ধরবার ক্ষমতা আমার অনায়ত্ত | লেখাটা বাড়াবার ইচ্ছে আছে | কয়েকটি সূত্র ঠিক মতো লিখে উঠতে পারি নি আগে, সেগুলো সংশোধন করতে হবে |
    প্র গৌতমদা, আপনি বেশ কিছুদিন হল শিলিগুড়িতে | বলতে গেলে প্রায় আত্মগোপন করেই আছেন | তা, শিলিগুড়ি বা বৃহৎবঙ্গের এই অংশে এসে কেমন কাটছে আপনার দিনগুলো ! শিলিগুড়ি কি আপনাকে কবিতা লেখার অবকাশ বা চিন্তা-ভাবনা করবার মেজাজে রাখতে পারছে ?
  • উত্তরবঙ্গে এসে জীবনের একটা দিক খুলে গেল | কত নতুন মানুষ, কত দৃশ্য ! এখানকার আর্থসামাজিক জটিলতা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না, এখন একটু-একটু বুঝতে চেষ্টা করছি | লেখার ওপর এসবের কোনো প্রভাব পড়ছে কি না তা বলার আমি কেউ নই |
    প্র একটা পরিবর্তিত ভূগোল, তার ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো বা ইকোলজি একজন প্রকৃত কবিকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করে বলে আপনার মনে হয় ?
  • শুধুমাত্র মাথা প্রয়োগ করে ভূগোল, ইতিহাস, ইকোলজি বুঝলে কবিতার ক্ষেত্রে কোনো উপকার হবার কথা নয় | আমার মনে হয়েছে, একজন কবির ক্ষেত্রে, পড়াশুনো করা আর পড়াশুনা না-করা – দুটোই সমান বিপদের ব্যাপার | দুদিকে দুরকম ব্যাথতা দেখি যে ! সাধারণ স্তরে কবিতা হৃদয়ের ব্যাপার, এই স্তরে খুব বেশি পড়াশুনো না করে, যেটুকু পড়া হয়েছে সেটুকু ঠিকঠাক বুঝে নিতে পারলে, কবিতাও কিছুদূর গড়াবেই | উচ্চতম স্তরে কিন্তু কবিতা প্রজ্ঞা, wisdom ; এখানে সমস্ত বিদ্যা এক হয়ে যায় | একজন কবি নিজেকে বাঁশির অবস্থায় যদি নিয়ে যান, সেখানে ভূগোল, ইতিহাস, ইকোলজি বায়ুর মতো তাঁর দেহে প্রবেশ করে গাইতে থাকবে | এটা সম্ভব, রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন |
    প্র পঞ্চাশের কবিতা নিয়ে খুব কথাবার্তা, হইচই সবসময় হচ্ছে | আপনার কথা যদি একটু জানা যেত ?
  • এতক্ষণে একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে আসা গেল | দশক বিভাগে অনেক গোলমাল আছে | মনীন্দ্র গুপ্ত কোন দশকের কবি ? নারায়ণ মুখোপাধ্যায় ? আমি অবশ্য বুঝতে পারছি তুমি কাদের কথা বলতে চাইছো | ওদের লেখা পড়ে বড় হইছি, প্রথমেই পড়ে নিতে হয়েছিল ভারবি-র ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থমালা | গ্রহণ বর্জনের প্রাথমিক কাজ এখানেই সারা হয়ে গেছিল | যাঁদের বেছে নিলুম এবার তাদের বইগুলি খুঁজে খুঁজে পড়া, সে এক যুগপৎ বিস্তর ঝামেলা ও প্রভূত আনন্দের ব্যাপার | ঝামেলা বাড়ল উৎপলকুমার বসু এবং প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের ক্ষেত্রে; কারণ ভারবি-র শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থমালায় এঁরা ছিলেন না | তখন তো কিছুই বুঝতুম না, এখন বুঝতে পারি পঞ্চাশের কবিদের লেখার সঙ্গে আমার সম্পর্কটি খুবই জটিল, আসলে | প্রথমে, কিছু খুঁজে পাই নি বলে আর না-পড়া এবং কিছু খুঁজে পেয়েছি বলে আরো পড়া | এর পরে, যাঁদের মধ্যে কিছু খুঁজে পেয়েছি তাদের লেখা বেশি না-পড়া কারণ তাঁরা ছাতা, চটি নিয়ে আমার কুটিরে ঢুকে পড়ে সেখানেই অবস্থান করছেন ! এখন, সেই বিপদ কেটে গেছে বলেই তো মনে হয়, এখন মুক্তমনে তাঁদের লেখা পড়ি | অন্য সময়ের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, এ-ক্ষেত্রেও তাই, এদের লেখায় একটা perennial আর temporal-এর একটা সহবস্থান দেখা যায় | আমার স্বভাবের আড়ষ্টতার কারণে এদের অনেকের সঙ্গে আমার বাক্তিগত যোগাযোগ ঘটেনি | আলোক সরকার, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু, যুগান্তর চক্রবর্তী – এই চারজন বাদে কবিতা সম্পর্কে কারোর সঙ্গে কথা হয় নি কখনো, অনেকের সঙ্গে মৌখিক পরিচয় নেই, অনেকেই আমার লেখাও পড়েন নি | আমার প্রিয়তম কবিরা হলেন : অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, আলোক সরকার, উৎপলকুমার বসু, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, বিনয় মজুমদার, শঙ্খ ঘোষ, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, যুগান্তর চক্রবর্তী এবং নারায়ণ মুখোপাধ্যায় | শব্দগুলি কীভাবে সাজাতে হয়, কেমন করে শুরু করতে হয়, কোথায়, কীভাবে থামতে হয়, কবিতা লেখার এই ঘরোয়া ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আলোকদা ও উৎপলদার সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে এক সময়ে, এই দুজনের সান্নিধ্য আমার সম্পদ |
    এরপরের লেখকদের সম্পর্কেও কিছু বলার আছে, কারণ আমি যখন লিখতে শুরু করেছি এঁরা অনেকেই তখন প্রতিষ্ঠিত তরুন কবি | বড় আকারে ভেবেছিলেন পবিত্র মুখোপাধ্যায়, কিন্তু আমার ধারণা সে-জায়গাটা তিনি ধরে রাখতে পারেন নি | নতুন যারা আসছেন তাদের মধ্যে আবার যদি কেউ বড় করে ভাবতে চান, তাহলে পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের লেখা তাকে পড়তেই হবে | আমার প্রিয় লেখক : কালীকৃষ্ণ গুহ, ভাস্কর চক্রবর্তী, অশোক দত্তচৌধুরী, মানিক চক্রবর্তী, শঙ্কর দে, সুনীত মজুমদার |
    প্র আপনার সমকাল এবং পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলা কবিতা কী ছিল আর কী হয়েছে সেই সম্পর্কে একটু আলোকপাত করুন ?
  • স্পর্শকাতর বিষয় যে শেষই হচ্ছে না গো ! আমার সময়ের অনেক কবিই আমার অনেক আগে থেকে লিখছেন – দেবদাস আচার্য, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, অমিতাভ গুপ্ত, শম্ভু রক্ষিত, সুব্রত রুদ্র, রঞ্জিত দাশ, সুভাষ ঘোষাল, বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়, অরুণ বসু, গৌতম চৌধুরী, একরাম আলি, অনন্য রায়, জহর সেনগুপ্ত | ‘দেবী’, ‘আলো’, ‘মৃৎশকট’ এবং ‘প্রিয়ধ্বনির জন্য কান্না’ – এই চারটি বইয়ের কথা ভাবলে বিপুল গর্ব, অনুভব করি, পাঠক হিসেবে নিজেকে ইতিহাসের অংশ বলে মনে হয় | তারপরের ঘটনাগুলো তো চোখের সামনেই ঘটে গেল | এই তো সেদিন ছেপে বেরুল ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’, ‘ক্রীসমাস ও শীতের সনেট গুচ্ছ’, ‘হননমেরু’, ‘মাতা ও মৃত্তিকা’, ‘অতিজীবিত’, ‘দেবদারু কলোনী’, ‘পুরোনো এ-জীবন আমাদের নয়’, ‘অষ্টবসুর বিভা’, ‘দক্ষিণ বাংলার জন্ম’, ‘শ্যামাপদ ও আকাশের দেবী’, ‘ছাইফুল স্তূপ’, ‘ঈশ্বরের বিভা’, ‘যখন আনন্দঋতু’| সেইসব দিন আর ফিরবে না | আমাদের সময়ে আরও কয়েকজন আছেন, যাঁদের মূল বই বেরিয়েছে পরে – দেবাশিস তরফদার, আমিতাভ মণ্ডল, বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী, ফল্গু বসু, অসিত সিংহ এবং প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় | এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে নিজেদের কাজ সম্পর্কে আমার বাক্তিগত মূল্যায়ন কিন্তু অনুকূল নয় | যতটা সম্ভাবনা ছিল ওই সময়ের লেখকদের মধ্যে তাঁর অনেকটাই কাজে প্রতিফলিত হয় নি | সময় যত এগোবে আমাদের অনেকের কাজ আরো আরো ঝাপসা হতে থাকবে| আমার নিজের কাছে কথাগুলি চরম বেদনাদায়ক, কিন্তু এমনই তো দেখতে পাচ্ছি | দুটো পথ আছে : এক, সারা জীবন কবিমনকে ধরে রাখা অথবা, দুই, যুগান্তর চক্রবর্তীর মতো একটিই কালজয়ী গ্রন্থ লিখে ফেলা | দুটি কাজই অসম্ভব কঠিন | সময়ের মার সাঙ্ঘাতিক মার |
    আমাদের পরেই যারা তাদের মধ্যে প্রথমেই সুতপা সেনগুপ্ত, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল পুরকায়স্থ্য এবং প্রদিপ সিংহের নাম মনে পড়ছে | ‘অন্ধকারের নৌকো’ কী একখানা বই ! রাহুল লিখলো ‘বর্ষাতি নেই তাই ভিজে গেছি বাংলা ভাষায়’! আমার বিনীত ধারণা এখানেও সমস্যা একই, সারাজীবন কবি মন ধরে রাখতে না-পারা | এর চিহ্ন সর্বত্র | ওই সময়ের লেখকদের মধ্যে আমিতাভ দেব চৌধুরীর লেখা আমি আবিষ্কার করেছি অনেক পরে, তাঁকে একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক মনে হয় আমার | আরও পরে যারা এসেছেন, তাদের বই ও অগ্রন্থিত কবিতা পড়ে সেই সম্ভাবনা দেখতে পাই, যা হয়তো আমাদের সময়ের লেখকদের মধ্যে একসময় দেখা যেত | সচেতনভাবেই আমি কোনো নাম উল্লেখ করছি না কারণ আমার পাঠের অভিজ্ঞতা সীমিত | যেহেতু সামগ্রিক চিত্রটি আমার সামনে নেই সেহেতু কোনো মন্তব্য করা, আমার মনে হয়, অনৈতিক| তরুণদের প্রতি আমার কিন্তু দুটি অভিযোগ আছে : ১ তাঁরা গদ্যরচনা সযত্নে পরিহার করে চলেন এবং ২ ‘অভিমান’-এর মতো কোনো কাগজ তারা গড়ে তুলতে পারেননি | বড় কবিদের উচ্চতা তাঁদের গদ্যরচনায় ধরা পড়ে | সেই রকম গদ্যরচনা কোথায় ? চুলে পাক ধরার আগেই তো সেরকম গদ্যরচনা লেখা শুরু করতে হবে ! না-হলে, এই বিরাট ঐতিহ্য কীভাবে বহন করবে তরুন কবিরা ?
    প্র জীবনানন্দর কবিতার ভাষা কি পরবর্তী বাংলা কবিতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে ?
  • ভাসাতত্ব বলছে ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগের অনেক অন্তরায় আছে | একটি শব্দ ব্যবহার করে তুমি আমাকে যা বোঝাতে চাইছ, সেই শব্দটির অর্থ আমার কাছে অন্য, ফলে আমি অন্য কিছু বুঝছি | তোমার প্রশ্নের উত্তরে আমি যদি বলি, হ্যাঁ, জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতার ক্ষতি করেছেন, তাহলে তুমি যা বুঝবে আমি তা বলতে চাইনি | এখানে ‘ক্ষতি’ শব্দের অর্থ তোমার কাছে লোকসান | আমার কাছে এই শব্দটির অর্থ বদল, বিবর্তন, এমনকি অগ্রগতি |
    আমার বিশ্বাস, প্রত্যেকটি জীবের সঙ্গে ক্ষয় ও মৃত্যুর যেমন একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, ভাষার ক্ষেত্রেও তাই | ভাষা একটি ‘Living organism’, তাঁর ক্ষয় ও মৃত্যু আছে | যিনি যত বড় লেখক, বিশেষত তাঁর মধ্যে ধ্রুপদী সত্তা যদি প্রবল হয়, তিনি তত ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারেন তাঁর ভাষাকে | জীবনানন্দের মধ্যে ধ্রুপদী সত্তা প্রবল, সেইজন্য তাঁর কারনে বাংলাভাষা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে | একটি দৃষ্টান্ত : জীবনানন্দের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে কাজ করবে সবসময়ে এইজন্য ‘মরণ রে তুহুঁ মম শ্যাম সমান’ এই লাইনটির অপার অর্থ আমি ধরতে পারছি না | আমি ভাবছি কি ন্যাকা ন্যাকা লাইন রে বাবা ! রবীন্দ্রনাথের অবস্থান কী ? তাঁর দ্বারাও বাংলাভাষা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কিন্তু তাঁর মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম | কারণ রবীন্দ্রনাথে Classical element কম, তিনি ভাষা গড়তে গড়তে এগিয়েছেন | তবু ক্ষতি তো হয়েছেই | ধরা যাক গোপাল উড়ের সেই কবিতা –
    ‘ওই দেখা যায় বাড়ি আমার চারদিকে মালঞ্চ বেড়া
    ভ্রমর গুঞ্জরে তাহে
    আবার কোকিলেতে দিচ্ছে সাড়া | |
    ময়ূর ময়ূরী সনে, আনন্দিত কুসুমবনে
    আমার এই ফুলবাগানে কভু নাই বসন্ত ছাড়া | | ‘
    এই পংক্তিগুলো তোমার কেমন লাগল আমি জানি না, আমাকে কিন্তু একশোটি শ্রেষ্ঠতম বাংলা কবিতা বাছতে বললে, এই লেখাটি রাখবই | দুঃখের কথা এই যে, রবীন্দ্রনাথের সুবিশাল কীর্তির কারণে এই বিশেষ ভাবমণ্ডলটি নষ্ট হয়ে গেছে | অতুলনীয় এই লাইনগুলো মরে গেছে, তপন | তুমি আমি আর এভাবে লিখতে পারব না | এছাড়াও ভাষার ক্ষয় ও ক্ষতির অন্যদিক আছে, সে সব দীর্ঘ আলোচনা, বিচার আর সংঘাতের ব্যাপার |
    প্র গৌতমদা আপনার একেবারে প্রথমদিকের কবিতা আর ‘অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’ -এর কবিতা রচনার দিনগুলো সম্পর্কে, কবিতাগুলো সম্পর্কে জানতে খুব ইচ্ছে হয় | যদি একটু বলেন ?
  • প্রথম বইয়ের লেখাগুলো যখন লেখা হচ্ছিল সেই সব দিনগুলো ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা | বলার মতো কিছু নেই | তার আগের একটা কথা বলি | আমি তখন এদিক ওদিক থেকে টুকে খুবই নিম্ন মানের লেখা প্রসব করে চলেছি মহানন্দে; আমার বন্ধু অভিরূপ সরকার আমায় একটা পরামর্শ দিল | আমি কিছু লেখা নিয়ে এক রোববার সকালে হাজির হলুম আলোক সরকারের রাসবিহারী অ্যাভেন্যু-এর বাড়ি | আলোকদা লেখাগুলি শুনে বললেন : এই লেখাগুলি থেকে আমি অন্তত একশোটা ভুল বার করতে পারি, কিন্তু আমি কিছুই করব না | ভুলগুলো তোমাকে নিজেকেই খুঁজে বার করতে হবে | কবিতা কতদূর লিখতে পেরেছি জানি না, কিন্তু সেই শিক্ষাপর্বের কী মুল্য আছে আমার জীবনে, তা একমাত্র আমিই জানি |
    প্র আপনার এক-একটা গ্রন্থ প্রকাশের ব্যবধান দেখা গেছে, প্রায় বারো বছর | এই যে এক যুগ পরপর এক একটা মহারচনা প্রকাশিত হয়ে চলেছে, এটা কি নিছক কাকতালীয় না এর পেছনে কোনো পরিকল্পনা, কোনো ইঙ্গিত পাঠকের জন্য অপেক্ষা করে আছে ?
  • বইগুলির মধ্যে সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান আছে এটা সত্য | বন্ধুরা এ-নিয়ে মজাও করেন | শেষতম বইটির খবর পেয়ে দেবাশিস তরফদার বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন রাখলেন – বই বেরুল কী করে ? দশ বছর তো কাটে নি ! এর নেপথ্যে কোনো রহস্য নেই, পরিকল্পনা তো নেই-ই | কবিতা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বছর ঘুরে যায়, লেখা আর হয় না | কবিতা লেখার বৃত্তি খুব সুখদায়ক অভিজ্ঞতা নয়, আমার কাছে |
    প্র ‘অন্নপূর্ণা ও শুভসকাল’-এর ছন্দ ব্যবহার সম্পর্কে কিছু শুনতে ইচ্ছে হয় | এই বিষয়, ভাষার এই রিদম, এই সুর আপনি কি স্বপ্নে পেয়েছিলেন ? না কি এর পেছনে রয়েছে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা আজকের পরিভাষায় যাকে বলা যায় Projectwork ?
  • প্রথম বইয়ের লেখাগুলোর ছন্দ সম্পর্কে বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত কয়েকটি কথা বলেছিলেন যা আমি সম্যক বুঝতে পারি নি | যদি বুঝতে পারতুম কাজে দিত | সে আর হল না | আমার ছন্দজ্ঞান দুর্বল, কানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে লিখে যাই, লেখাগুলোয় কী ছন্দ আছে আমি জানি না | কোনো নিয়মের মধ্যে বোধহয় পড়ে না পংক্তিগুলো, তোমায় গড়গড় করে পড়ে যেতে হবে, take it or leave it | কিন্তু ছন্দ বিষয়ে আমার কিছু উদ্ভট ভাবনা আছে | ১ অমুল্যধন is genius ২ এমন কোনো বড় কবির কথা আমার মনে পড়ে না, যিনি ছন্দকে ঢেলে সাজাননি | ভবিষ্যতের ছন্দশাস্ত্রে ছাপ রাখা একজন বড় কবি হওয়ার necessary condition | ৩ যারা বেছে দেওয়া গঠনের বাইরে এসে দাঁড়াতে পারেন নি, তাঁরা সব ডাহা ফেল | শৃঙ্খলা থেকে মুক্তির বাতাস টেনে বের করে আনতে হবে, সেই বাতাস বইবে পংক্তিগুলির ভিতরে, উৎকর্ষ এইখানে | পয়ার তো আগেও ছিল, বিনয় মজুমদার তাঁকে কোথায় নিয়ে এলেন, ভাবো | আমার বিনীত মত, সাম্প্রতিক কালে কালীকৃষ্ণ গুহ কাব্যছন্দের একটা নতুন দিক দেখিয়েছেন | ৪ বাংলা ভাষায় যে ধ্বনি মাধুর্য রয়েছে তার পুরোটা আমাদের ছন্দশাস্ত্রে এখনো ধরা পড়েনি বলে আমার মনে হয় | আমি এইভাবে বুঝি : ছন্দ লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য হচ্ছে সুর | ধ্বনি ও নীরবতার একটা রসায়নের ভিতর দিয়ে আমরা সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে চাইছি | যেখানে ধ্বনি ও নীরবতার ভারসাম্য ঠিকঠাক আনতে পারছি না সেখানে রিকশার হুডের মতো ছন্দ উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে | আমরা ভাবছি আরে লোকটা তো দারুন ছন্দ জানে ! আসলে ঠিক এর উল্টোটাই সত্যি | রিকশার হুডখানা নামিয়ে রাখতে হবে ভাই, সুরের দিকে আগিয়ে যেতে হবে | আমার খুব আক্ষেপ হয়, চিঠিপত্রের বাইরে মধুসুধনের কোনো গদ্য রচনা পাওয়া যায় না, যদি পাওয়া যেত ধ্বনিপ্রয়োগ ও যতিপাতের ভারসাম্য এবং সুর সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্পষ্টতর হত | রবীন্দ্রনাথ ও দিলীপ রায়ের মধ্যে ছন্দ সম্পর্কে যে আলোচনা হয়েছিল এক সময়ে, সেখানেও এই সুত্রগুলি আছে | নিজের লেখার ক্ষেত্রে, তিনজনের ছন্দজ্ঞান থেকে বিস্তর চুরি করার কথা স্বীকার না করলে পাপ হবে – Gerard Manley Hopkins, R.S. Thomas এবং বীরেন চট্টোপাধ্যায় |
    প্র ‘অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’ পড়তে গিয়ে আমার বরাবরই মনে হয়েছে কোনো এক উপন্যাসই বুঝি পাঠ করছি | আপনি কোনো মহা উপন্যাসই লিখতে চেয়েছিলেন আসলে ?
  • কাব্য ও গদ্যের মধ্যে প্রভেদটা যে ঠিক কোথায়, তা আমি এখনো ঠিক নির্ধারণ করতে পারি নি | Narrative – এর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই | প্রিয় ঔপন্যাসিকদের যে কোনো লেখার যে কোনো পাতা খুলে পড়তে-পড়তে আমি এই রহস্য ভেদ করবার চেষ্টা করেছি, পারিনি | প্রাথমিকভাবে কয়েকটা কথা মনে হয় | কবিতা বলছে, ‘Who if I cried, would hear me among the angelic / orders ?’ গদ্য কিন্তু তেমন করে বলছে না; গদ্য অনেক, অনেক শান্ত, ধৈর্যশীল বলছে : ‘It was the best of times, it was the worst of times.’ | কাব্য বিষণ্ণ, গদ্য নিঃস্পৃহ |
    প্র গৌতমদা আপনার সাম্প্রতিক বই ‘নয়নপথগামী’-র প্রচ্ছদ প্রথম দর্শনেই চমকে দিচ্ছে পাঠককে | আপনার অপরাপর বইগুলোর পাশে এই বই রাখলে বিশ্বাস হয় না এই বইয়ের প্রণেতা কবি শ্রী গৌতম বসু | আপনি কি সচেতন ভাবেই পাঠককে এই ধাক্কাটা দিতে চেয়েছেন ? এই প্রচ্ছদ ভাবনা সম্পর্কে কিছু বলুন ?
  • ‘নয়নপথগামী’-র প্রচ্ছদ অনেকেরই ভালো লাগে নি | অরুনাভ সরকার, নির্মল হালদার, অঞ্জনা কাঞ্জিলাল বিস্তর বকাঝকা করেছেন আমায় | ছবিটি ছাপার ব্যাপারে কারিগরি বাধা অতিক্রমের জন্য অরুণাভই কিন্তু উঠে পড়ে লেগেছিল, ভালবাসা এমনই বস্তু ! এই চটি বইয়ের একটা লেখাও কেউ যদি না পড়েন, আমার দুঃখ হবে না, আমি চাই মানুষ ছবিটি দেখুক, প্রত্যক্ষ করুক হতভাগ্য বিংশ শতাব্দীকে | আখমাতোভা কুড়ি বছর ধরে একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছিলেন | এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি আছে কী ? মান্দেলস্থাম, পাস্তেরনাক, আখমাতোভা – বই প্রকাশ তো দূরের কথা, এঁরা কবিতা প্রকাশ করতে পারতেন না, নগন্য লেখকদের দাপিয়ে বেড়ানো দেখেছেন, সহ্য করেছেন কত লাঞ্ছনা, তবু লিখে গেছেন | এদের কি তুলনা হয় ?

প্র আপনার ‘কবিতা সমগ্র’-র ভূমিকায় আপনি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে লিখেছেন । আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার সময় আমি বহুবার আপনাকে ওই নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করতে শুনেছি । সেই সম্পর্কে আপনি এখন কিছু বলুন আমাদের ?

  • বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে আমায় প্রথম নিয়ে যায় অভিরূপ । মাত্র কয়েকবারই ওঁর সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়েছে । একবার শংকর চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির একতলার একটা ছোট্ট ঘরে কবিতাপাঠের আয়োজন করা হয়েছিল । বীরেনবাবু সেখানে কবিতা পড়েছিলেন । ‘পুরোনো কিছু লেখা পড়বো ?’ – এই বলে ‘রাত্রি শিবরাত্রি’-র প্রায় পুরোটাই পড়ে ফেললেন । শুনতে শুনতে ভাবলুম, কান্নার, প্রার্থনার, ক্রোধের ঢেউ একের পর এক এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । একটাই তো মানুষ, তারই মধ্যে এত কিছু ? আমি কোনোভাবেই তার কাছের মানুষ ছিলাম না, কিন্তু আমার প্রথম বই বেরুবার পর যে চিঠিটি আমি সর্বপ্রথম পাই, সেটা তাঁর ।
    প্ৰ উত্তর আধুনিকতা ও পোস্টমডার্নিটি, পোস্ট কলোনিয়াল এবং সাবঅল্টার্ন লিটারেচার ইত্যাদি সম্পর্কে আপনার মতামত বা অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে একটু শেয়ার করবেন ?
  • সাহিত্য সংগঠন দু’রকম হয় । প্রথমে আছে রাষ্ট্র, নোবেল কমিটি, এই অকাদেমি ওই অকাদেমি, প্রকাশন সংস্থা, সংবাদ মাধ্যম ইত্যাদি । দ্বিতীয় প্রকার সংগঠন হচ্ছে ভাব সংগঠন অর্থাৎ বিভিন্ন কাব্য আন্দোলনগুলি । আমি এঁদের কারুর প্রভুত্ব মানি না । ব্যক্তি হিসেবে আমার যে কোনোরকম ক্ষমতা নেই এটা আমি ভালো মতো জানি কিন্তু এটাই আমার অবস্থান । কবিতা আমার কাছে মুক্তির জায়গা, এখানে কোনো আপস নেই ।
    প্ৰ গৌতমদা, একটু আগে একটা প্রশ্নে আমি ‘অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’ প্রসঙ্গে খুব সচেতনভাবেই Project শব্দটা ব্যবহার করেছিলাম । হয়তো ঠিক মতো বোঝাতে পারি নি । আসলে Project শব্দটাকে আমি গবেষণা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে চাইছিলাম । ভাবতে চাচ্ছিলাম এর পেছনে আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক অতিসূক্ষ এবং দীর্ঘ গবেষণা রয়ে গেছে । যেন কবিত্ব শক্তি আর কবিমনের মায়া এসে গবেষকের মন্ত্র গোপন সংকেতে, রূপান্তরিত করেছে । এই সুযোগে আমি কবি গৌতম বসুর কাছে গবেষক গৌতম বসুর ভূমিকা বা তার সম্ভাবনার কথা শুনতে চাচ্ছি ?
  • গবেষণা যেমন একটা সৃজনকর্ম হয়ে উঠতে পারে, একটি সৃজনকর্মেও গবেষণার উপাদান থাকতে পারে, থাকেও । তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের একটি প্রধান উপন্যাসের শুরু হচ্ছে এইভাবে :
    একজন কামার সিদ্ধান্ত নিল যে সে তার উৎপাদন বন্ধ করে দেবে, কারণ সে তার কাজের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না । অর্থবিজ্ঞানের যে কোনো ছাত্র জানেন এটি Terms of Trade- এর সমস্যা এবং এ-বিষয়টি ঘিরে প্রচুর কাজ হয়েছে । তারাশঙ্কর সেগুলো পড়েছিলেন বলে তো মনে হয় না । কী করে ধরলেন তবে ব্যাপারটা ? এর উত্তর সহজ : দেখা এবং শোনা, অন্তর্দৃষ্টি । আমরা দেখতে পাই না, তাই লিখতেও পারি না । যিনি দেখতে পাচ্ছেন, তিনি লিখতেও পারবেন । আমি মনে করি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক । এই ধারাটি মোর যায় নি এখনো, দেবেশ রায়ের লেখায় বেঁচে আছে, অভিজিৎ সেনের গোড়ার দিকের লেখায় আছে, সৈকতের গল্পে আছে ।
    প্ৰ Project ব্যাপারটার একটা অন্য মাত্রাও আমরা এখানে যুক্ত করতে চাচ্ছি, গৌতমদা । যেমন ধরুন, স্বতঃপ্রণোদিত Project work বা গবেষণাকর্ম ছাড়াও, কেউ হয়ত কোনো Agency বা House -এর কাছ থেকে বরাত পেলেন । ধরা যাক উপন্যাসের ক্ষেত্রেও এটা হতে পারে – হচ্ছেও ইউরোপ, আমেরিকায় তো উক্ত বরাতপ্রাপ্ত লেখক লাইব্রেরি, ইন্টারনেট, field work বা work shop ইত্যাদির সঙ্গে ইমাজিনেশন-কে কাজে লাগিয়ে তাঁর creative text তৈরি করলেন । এখন এই বিশেষ subject বা বিশেষ অঞ্চল বা বিশেষ কালখন্ড সম্পর্কে সেই লেখকের নিজস্ব প্যাশন বা অভিজ্ঞতাটা এখানে খুব জরুরি বলে মনে না-ও করা হতে পারে । তো, গৌতমদা, এই জাতীয় Creative text বা গবেষণাধর্মী উপন্যাস (কাব্য) সম্পর্কে আপনার অভিমত জানতে ইচ্ছে করছে ?
  • সামন্ততান্ত্রিক যুগে সাধারণ মানুষ, না জেনেই, শিল্পবস্তুর জন্য অর্থবিনিয়োগ করতেন । খাজনা জমা হত রাজকোষে, সেখান থেকে রাজা মন্দির, মসজিদের জন্য টাকা যোগাতেন । ইউরোপে রাজার সঙ্গে ধর্ম প্রতিষ্ঠানও এই কাজ করতেন । বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম শিল্পকর্মের প্রায় সমস্তটাই এই পদ্ধতিতে গড়ে উঠেছে । – তুমি Project work বলছ, আমি একটি পুরোনো কথা ব্যবহার করছি -‘commissioning of work of art’ | তুমি ভারতবর্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছ স্থলপথে, তোমার ক্যারাভান বামিয়ান বুদ্ধের নিচ দিয়ে এগিয়ে চলেছে, তোমার কী অবস্থা হবে, ভাবো ! অনেক রাজা শিল্পবোদ্ধা ছিলেন, অনেকেই ছিলেন না, যাঁরা ছিলেন না তাঁরাও কার হাতে কাজ তুলে দিতে হবে অন্তত এটুকু বুঝতেন । সভ্যতার ইতিহাসে পেট্রনদের গুরুত্ব অপরিসীম – খাজনার টাকা তাঞ্জাভুরের মন্দির নির্মাণে ব্যয় না হয়ে, যদি আফিম কেনায় খরচ হত, তাহলে ভালো হত কি ? অনেক শিল্পীর ব্যাক্তিত্ব এমনই ছিল যে পৃষ্টপোষকরা ট্যা-ফোঁ করতে সাহস পেতেন না । যেমন মিশেল অঞ্জেলো । গ্রূনেওয়ার্ল্ডের মতো অনেক শিল্পী পৃষ্ঠপোষকের আনুকুল্য পাননি । যাঁরা এই system – এর বাইরে ছিলেন সেই লোকশিল্পীদের অবস্থা ছিল আরও খারাপ, সমাজ দু’মুঠো চাল দিত তাঁদের দয়া করে, তাঁরা যে মানব সভ্যতার চৈতন্য ধারক এবং বাহক এ কথাটা কেউ বুঝতে পারে নি । ধনতন্ত্রের উত্থানের সঙ্গে এই সুপ্রাচীন ব্যবস্থাটি এক আকস্মিক ভাঙনের মুখে এসে পড়ল, কিন্তু শিল্প মৃত্যুহীন । রিলে রেসের দন্ডটি তুলে নিলেন Dickens র মতো সাংবাদিক । সংবাদ পত্রের ভূমিকা এখন অনেক বদলে গেছে, কোথাও কোথাও তারাই রাজাদের শূন্য স্থানে অধিষ্ঠান করছে । এর ফল যে সম্পূর্ণভাবে অশুভ, আমি তা বলব না । কিন্তু sponsorship থেকে কালজয়ী সাহিত্য উঠে আসবে, এমন মনে হয় না । কালজয়ী সাহিত্যের জন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে সেই মাঝির দিকে, যিনি একদা লিখেছিলেন ‘এ ভবসাগর রে, কেমনে দিব পাড়ি’। তার ভাবসন্তানরাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবেন । এমন লেখকের sponsor দরকার পড়ে না, পদ্মা নদী তার sponsor |
    প্ৰ আচ্ছা, গৌতমদা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাব । অমিতাভ গুপ্তর ‘সরমা ও পরমা’ প্রবন্ধের কথা মনে পড়ছে এখন । মনে পড়ছে ‘জনপদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আম পাতার মুকুট’-এর কবি অভিরূপ সরকারকে লেখা আপনার অসামান্য চিঠিগুলোর কথা । এটা সেই সময়ের কথা যখন ইতিমধ্যে এই বইগুলো আমাদের হাতে এসে গেছে – ‘অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’, ‘অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে’, ‘যখন আনন্দ ঋতু’, ‘যাত্রা মন্ত্র’, ‘ঘন কৃষ্ণআলো’…। অমিতাভ গুপ্ত, অঞ্জন সেন প্রমুখের কলমে ‘উত্তর আধুনিক চেতনা’র কথা পড়ছি । সমস্ত মিলিয়ে এক নতুন আলোর জগৎ যেন । তো, সেই সময়কার কথা, উত্তর আধুনিক চেতনা বা আন্দোলন সম্পর্কে আপনার মতামত বা ধারণা আপনার নিজের মুখে শুনতে চাই ।
  • তুমি একরাম আলি ও অনির্বাণ ধরিত্রীপুত্রের বইয়ের উল্লেখ করছ, এদের সঙ্গে কিন্তু উত্তর আধুনিকতা কাব্য আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই । এমন-কি, এভাবেও বলা যায়, অমিতাভ গুপ্তের ‘আলোর’ সঙ্গে উত্তর আধুনিকতার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই । ‘আলো’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে, তখন অমিতাভ গুপ্তের বয়স মাত্র বাইশ বছর । উত্তর আধুনিকতার কথা উঠছে এর পনেরো বছর বাদে । অমিতাভদা যা বলছেন তার দুটি দিক আছে । একটি আবেগের, অন্যটি বিশ্লেষণের । বিশ্লেষণের দিকটা আমায় তত স্পর্শ করে নি, কারণ আমার পড়শোনা বেশ নড়বড়ে । আবেগের দিকটা খুব টানে; অমিতাভদা বলতেন একটাই মহাকবিতা লেখা হচ্ছে, সেটা লিখছে অনেকে । অমিতাভদা একশো শতাংশ কবি, ওর কথার অর্থ আবেগ ও কল্পনা দিয়েই ধরতে হবে । বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একাধিক অসঙ্গতি যদি দেখিয়ে দেন কোনো পণ্ডিত, আমি অবাক হব না । একবার ওর অসুস্থতার খবর পেয়ে বাড়ি গেছি, সুভদ্রা বৌদি দরজা খুলে দিলেন; ভিতরে গিয়ে দেখি খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে, সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে, উনি ভাবছেন । আমার ধারণা তত্ত্ব নয়, কবিতা এবং প্রাত্যহিক আচরণের ভিতর দিয়ে অমিতাভদার কথা বুঝতে হবে । পুরুলিয়ায় কবিদের মধ্যে লাঠালাঠির সম্পর্ক বিষয়ে উনি অবহিত ছিলেন কিন্তু তার বীভৎসতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা হয়ত ছিল না । একবার পুরুলিয়ায় গিয়ে এটা লক্ষ করে । বাকি সময়টা কাটিয়ে দিলেন দুই দলকে মিলিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় । ঐক্যের একটা বোধ অমিতাভদার মধ্যে কাজ করে – তত্ব দিয়ে এই জায়গায় পৌঁছনো যাবে না, এটা প্রেমের এলাকা ।
    প্ৰ এবার আমরা আবার ‘অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’-এ ফিরে যাব । বইটির ১৯ নং কবিতাটি এভাবে শুরু হয়েছে ‘রিকসার উদরে যে তিন মদ্যপ রাত্রি ছিঁড়ে খেত / তারা ভালো হয়ে গেছে, …।’ যেন একটা আখ্যান শুরু হচ্ছে । এই ‘তিন মদ্যপ’ কারা, গৌতমদা, যারা এখন ভালো হয়ে গেছে ?
  • আরো অনেকের মতো, একসময় টিউশন করে আমায় হাতখরচা চালাতে হত – বেশ রাত হত বাড়ি ফিরতে । মাথায় কবিতার ভূত, কলকাতায় কোনো বন্ধু নেই, সেইসময়েরই একটি দৃশ্য এটি । ধরো, তিনটে বেহেড মাতাল একখানা হাতে টানা রিকশায় উঠেছে , তৃতীয়জন অন্যজনের কোলে বসে টলছে, প্রথমজন বেহুঁশ, তার মাথাটা রিকশার পেছন থেকে ঝুলছে, অন্যজন কী করতে চাইছে, কোথায় যেতে চাইছে, তা তারাই জানে । আর আছে পুরোনো টায়ার কেটে তৈরি করা চটি পরা এক রিকশাচালক । কত যে ক্লান্ত, দুঃখী মানুষ থাকেন কলকাতায় |
    প্র মনে করুন ‘… এই জল প্রকৃত শ্মশান বন্ধু, এই জল রামপ্রসাদ সেন’ এবং ‘… আমার সঙ্গে এল অন্নপূর্ণা ও শুভকাল’ – এই প্রবাদপ্রতিম ধ্রুবপদগুলোর স্রষ্টা আপনি নন | বাংলা ভাষা ও ঐতিহের চিরসম্পদ | এখন এতদিন পর এই পদগুলো সম্পর্কে আপনার ব্যাক্তি প্রতিক্রিয়া কী ? কীভাবে নেবেন এদের পাঠক হিসেবে ?
  • ভাবনার স্তরে থাকার সময় লেখার সঙ্গে লেখকের রক্তের সম্পর্ক থাকে | লেখাটি শেষ হয়ে গেলেই দূরত্ব | তোমার উক্তির মধ্যে যে ভালোবাসা দেখছি তার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেই বলতে চাই, বিগত তিরিশ, চল্লিশ বছরে যা লেখা হয়েছে তার মুল্যায়নের সময় এখন আসে নি | কলকাতা মহানগরীর রাস্তায় ঘুরে ঘুরে এই পংক্তিগুলি আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলুম একসময়ে, এই কুড়িয়ে পাওয়া অন্য কারুর হাতেও হতে পারত | হলে, আমার জীবনটা অনেক সোজাসাপ্টা হত, আমার বাবা মাকে আমার কল্যানের জন্য এতটা দুশ্চিন্তা ভোগ করতে হত না |
    প্র একেবারে শুরুতে আমি প্রেরণা / নিয়তি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন রেখেছিলাম | প্রেরণা এবং প্রজ্ঞাকে কীভাবে অনুভব করেন গৌতমদা ? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী ?
  • এই অঞ্চলে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই । মহামানবদের জীবন থেকে কিছু কিছু অনুমান গড়ে তোলা যায়, এই পর্যন্ত| একটি তরুণ নির্ভার মন না পেলে প্রেরণা তার কাজ করতে পারে না বলে আমার ধারণা | তরুন আইনস্টাইন ট্রামে চেপে patent আপিসে যেতেন রোজ এবং ভাবতেন এই ট্রামের গতি যদি বাড়ে এবং বাড়তেই থাকে, তাহলে কী কী হতে পারে | আমার কাছে প্রেরণার এটি একটি দৃষ্টান্ত | চিন্তার স্তরে এই প্রকার Breakthrough-র জন্য বোধহয় বাইরের সহায়তা প্রয়োজন | আমার বিশ্বাস ভানুসিংহের পদাবলীতে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণভাবে প্রেরণার উপর নির্ভর করে লিখে গেছেন | এরপর শুরু হয়েছে অবিরাম প্রচেষ্টা,পরিশ্রম | পদার্থবিদ্যায় আমার কোনো জ্ঞানই নেই তবু মনে হয়, এক সময়ে এসে আইনস্টাইন দেখতেন প্রাকৃতিক নিয়মগুলি কোনো ভাবে তার চোখের সামনে ভাসছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে | এই অবস্থাকেই আমি সজ্ঞা ভাবতে চাইছি |
    প্র আপনি কী ভাবে এবং কখন বুঝতে পারেন যে একটা লেখা হয়ে উঠলো ?
  • তুমি তো লেখ, তুমি তো নিজেই জানো যে একটি লেখাই নির্ধারণ করে দেয় কীভাবে এবং কোথায় থামতে হবে | আসলে লেখাটা থামছে না কিন্তু, ওটা সাময়িক বিরতি | লেখকের কানে লেখাটি এতক্ষন বিড়বিড় করছিল, এখনও করছে কিন্তু আরও নিচু স্বরে , কবি আর শুনতে পাচ্ছেন না, তাই তার লেখাও সমাপ্ত |
    ‘আমারে তুমি অশেষ করেছো’- রবীন্দ্রনাথ কী এমনি – এমনি বানিয়ে লিখলেন কথাগুলো |
    কত যে গিরি কত যে নদীতীরে
    বেড়ালে বহি ছোট এ বাঁশিটিরে
    কত যে তান বাজালে ফিরে ফিরে
    কাহারে তাহা কব | |
    প্র লেখা চলাকালীন আপনার শারীরিক – মানসিক অবস্থা কীরকম থাকে ? অফিস-বাড়ির কাজকর্ম, বাজার হাট দৈনন্দিন টুকিটাকি কাজকর্ম করতে কি তখন ভালো লাগে ? সব ঠিকঠাক চলে ? এই মুহূর্তে কী লিখছেন, কী ভাবছেন আপনি ?
  • লেখা চলাকালীন যে-কোনো লেখকই খুব গোলমালে পড়ে যায়, আমিও এর বাতিক্রম নই | আমি লক্ষ করেছি, রিকশা, ঠেলাগাড়িও বুঝতে পারে এই লোকটার মধ্যে লেখা তৈরি হচ্ছে আগে, দিনের বেলায় লাইনগুলোকে মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে রাত্রিবেলায় লিখতুম | এখন নানা প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে দিন কাটছে, নিজেকে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি | একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছি | এইসঙ্গে কিছু -কিছু গদ্যরচনা বিষয়েও ভাবছি |
    প্র আপনার প্রিয় গ্রন্থ ? যা আপনি সবসময় মাথার কাছে রাখতে চান ?
  • এই বয়সে এসে মনে হয় একজন মানুষের খুব বেশি সংখ্যক বইয়ের প্রয়োজন নেই | গুনে দেখিনি এখনো, তবে মনে হয় সংখ্যাটি পঞ্চাশ ষাটের বেশি হবে না | কিন্তু পঞ্চাশ- ষাটের সংখ্যায় পৌছনোর জন্য একজন মানুশকে বেশ কয়েক হাজার বই পেরিয়ে আসতে হয় | একজন পাঠকের এই যাত্রা খুবই আশ্চর্যময় এক কাহিনি | পঞ্চাশ-ষাটটি বই অবিরাম তার মনের মধ্যে অবিরাম আনাগোনা করে, কখনো কখনো কোনো একটি বই খুলে চোখ বুলিয়ে নেয় সে, যেন পরের দিন সকালে তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা | পঞ্চাশ-ষাটটি পবিত্র ভুতের সঙ্গে বসবাস করে সে | যদি তুমি একটিই বই বাছতে বল, আমি মহাভারতের উল্লেখ করব | যদি একাধিক বই বাছতে বল, আমি প্রশ্নটি থেকে নিষ্কৃতি চাইব, কারণ এই ধরনের নির্বাচন মনের ওপর অসম্ভব চাপ সৃষ্টি করে | মূল মহাভারত আমি চোখেও দেখি নি | মহাভারত পড়া শুরু হয়েছিল শিশুসাহিত্য সংসদের সচিত্র মহাভারত থেকে, তারপর যোগীন সরকার, তারপর রাজশেখর বসু এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ | বইটিতে একটা বিভাজন রেখা আছে বলে আমার মনে হয় : উদ্যোগপর্ব | উদ্যোগপর্বের আগে পর্যন্ত মহাভারত খুবই উচ্চমানের কাহিনি, পারিবারিক কলহের বিবরণ | উদ্যোগপর্ব থেকে কিন্তু একটা উত্তরণ লক্ষ করা যায়, এটার জন্য ওটা, ও-টার জন্য সেটা – এইসব প্রশ্ন গৌণ হয়ে যায় | আমরা যত এগোতে থাকি বুঝতে পারি, মহাভারতের, প্রধান বার্তা হচ্ছে প্রক্ষালন | যে মলিনতা নিত্য জমা হয়ে চলেছে আমাদের জীবনে তার প্রক্ষালনের ব্যবস্থা আছে | এমন একটা বই আর লেখা হবে না, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় |
    আরো একবার একটা পুরনো গল্প শোন | কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, পাণ্ডবরা রাজ্য ফিরে পেয়েছেন কিন্তু এত নরহত্যার জন্য তীব্র অপরাধবোধে তাঁরা আক্রান্ত | শেষে ঠিক হল পাপমোচনের জন্য তাঁরা মহাদেবের কাছে যাবেন, কারণ একমাত্র মহাদেবই পারেন এত পাপ গ্রহণ করতে | মহাদেব তখন কাশীতে অধিষ্ঠান করছেন, তিনি খবর পেয়ে বিচলিত হয়ে পড়লেন কারণ এত পাপ গ্রহণ করার ক্ষমতা তাঁরও নেই | পাণ্ডবদের এড়িয়ে চলার জন্য তিনি পালিয়ে এলেন পাহাড়ে, গুপ্তকাশীতে | পাণ্ডবরা কাশী পৌঁছে দেখলেন মহাদেব অন্তর্ধান করেছেন, খবর পেয়ে তাঁরাও পথ অনুসরণ করে এলেন গুপ্তকাশী | মহাদেব ততক্ষণে গুপ্তকাশী থেকে পালিয়ে চলে এসেছেন আরো দুর্গম এলাকায়, যেখানে আজ কেদারনাথের মন্দির দাঁড়িয়ে আছে | পাণ্ডবেরা হাল ছাড়লেন না, কেদারনাথে এসে মহাদেবের পায়ে পড়লেন | মহাদেব এবার তাঁদের আর ফিরিয়ে দিতে পারলেন না | কেদারনাথের মন্দিরের দেওয়ালে পঞ্চপাণ্ডব আজও বিরাজ করছেন | আমার কাছে এটি মহাভারতের মূল বার্তা, ক্ষমাপ্রার্থনা, repentence |
    প্র প্রিয় কবি ? প্রিয় ব্যাক্তিত্ব ?
  • একজন বাছতে গেলে উত্তর খুব সহজ ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’| এই বিষয়ে অন্য কোনো সময় বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে | প্রিয় ব্যাক্তিত্ব বলতে কী বোঝাতে চাইছ বুঝলুম না, সেই জন্য প্রশ্নটি নিজের মতো করে নিচ্ছি | আমি মনে করি মানবচেতনা হল প্রকৃতির শ্রেষ্ঠতম কীর্তি, এই চেতনার ভিতর দিয়ে প্রকৃতি আবার নিজেকে দেখতে পায়, পরিপূর্ণতা পায় | মনুষ্যচেতনার কয়েকটি শিখর আছে যেগুলি recorded history-র মধ্যে পড়ে না যেমন ভগবান বুদ্ধ, যীশু খ্রিস্ট, হজরত মোহম্মদ, আদি শঙ্করাচার্য, বেদ ব্যাস, বাল্মীকি | যাঁরা recorded history-র মধ্যে পড়েন, তাদের মধ্যে যদি একজন শ্রেষ্ঠ মানবকে বেছে নিতে হয়, তাহলে আমি দা ভিঞ্চির উল্লেখ করব | মনুষ্যচেতনার সমস্ত গুণ একটিই শরীরের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে, এমনটি আর দেখা যায় না | লিওনার্দো দা ভিঞ্চি একেবারে একা একজন মানুষ, তাঁর ধারে কাছে আর কেউ নেই |
    প্র প্রিয় উপন্যাস ?
  • কোনো একটি বইয়ের কথা উল্লেখ করতে পারছি না, আবার একাধিক বইয়ের নাম উল্লেখ করতে চাইছি না কারণ তাতেও অনেক বই বাদ পড়ে যাবে | এ প্রশ্নটা থাক |
    প্র কমলকুমার এবং বিভূতিভূষণ – এই দুজনের মধ্যে বাছতে বললে আপনি কাকে বাছবেন ?
  • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় |
    প্র বিভূতিভূষণ এবং দস্তয়েভস্কি – এই দুজনের মধ্যে কে ?
  • এ প্রশ্নেরও কোনো জবাব নেই আমার কাছে |
    প্র তরুন কবিদের কাছে, ভাবীকালের কবিদের কাছে আপনার বার্তা আমরা পৌঁছে দিতে চাই | কিছু বলুন ?
  • তরুন কবিদের প্রতি আমার বার্তা ? আমি তো তাদের বার্তার অপেক্ষায় থাকি |
    প্র লেখার সময় এবং লেখার পরেও কোনো নির্দিষ্ট গোপন পাঠক / বা পাঠক গোষ্ঠীর কথা আপনার কি মাথায় থাকে ? আপনি কি ওয়াকিবহাল – কে বা কারা পড়বেন এই লেখা বা বই ?
  • লেখার প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করার বিদ্যে এখনো অর্জন করেনি মানুষ | লেখার সময় আর অন্য কিছু মাথায় রাখা বোধহয় সম্ভব নয় | লেখক তখন সাধারণ কাজে ভুল করে, ডানদিকে যেতে গিয়ে বাঁদিকে চলে যায় | লেখাটি একসময় শেষ হয় | এখন লেখকের মধ্যে একজন গৃহিণীও আছে যে বাকি কাজগুলো করে | ‘অধর ছুঁয়ে বাঁশিখানি চুরি করে হাসিখানি’ – এই লাইনটি রবীন্দ্রনাথ যখন লিখেছিলেন তখন কোনো পাঠকের চেহারা তাঁর সামনে ছিল না বলে তো মনে হয় |
    প্র ভবিষ্যতে কি মানুষ কবিতা লিখবে – পড়বে ? কবিতার কি আর প্রয়োজন হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে ?
  • এই প্রশ্নটি নিয়ে কোনো সংকটের ছবি আমি দেখি না | কবিতা লেখার চর্চা যদি উঠে যায়, কোনো ভয় নেই | জীবন চলবে, শিল্প বেঁচে থাকবে, the unselfishness of art বেঁচে থাকবে |
    ‘তোমার মহাবিশ্ব মাঝে হারায় নাকো কিছু | ‘
    _______________________
    [ মহাবাহু পত্রিকার অষ্টম সংখ্যা, বর্ষা ১৪১৭ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়ে পুনরপ্রকাশ করা হয়েছে ]


শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.