/ / গিলোটিনে লিখে রেখো আগামীর ডি.এন.এ. – সায়ন ভট্টাচার্য

গিলোটিনে লিখে রেখো আগামীর ডি.এন.এ. – সায়ন ভট্টাচার্য

শেয়ার করুন

গিলোটিন আর বাংলা কবিতার মাঝখানে শোয়ানো রয়েছে সময়। আস্তে আস্তে গিলোটিনের ধারালো ফলা যত নীচে নেমে আসছে একজন কবির হাত ততই এগিয়ে যাচ্ছে সময়ের জামাকাপড় হাড় মাংসের দিকে। যতই হাতে লেগে যাচ্ছে সময়ের দেহ—তত বেশি করে ওই হাতটা হয়ে উঠছে একজন কবি–নাম অর্ণব সাহা। যে জানে “সারাটা রাত্রি ঘুমোতে পারি না….. এত ভয় করে!”

তবুও জীবনের মাংসপিণ্ড থেকে এক একটা ভয়ার্ত ভাষার কাঠামো, লালা, ঈর্ষা, ব্যকটেরিযা কিংবা ভাইরাসের ক্ষমতার বিরুদ্ধে ৫৫টা কবিতায় ভরা বই ‘নীচু গিলোটিন’– বাস্তবের গ্রানাইট তৈরি করবে।

অর্ণব সাহা বাংলা কবিতার এমন এক গেরিলা যাকে ছুঁয়ে দেখতে গেলে একটা হাই ভোল্টেজ প্রেম আর মননের প্রয়োজন হয়। তার কবিতার ভাষায় লুকিয়ে থাকে একটা রক্তাক্ত চুম্বনের সীমাহীন বিশ্বাস। অনেকটা, “গতজন্মের ঠিকানা বদলে গেছে/ ভুল দরজায় কড়া-নেড়ে-যাওয়া লোক” (কবিতা ১৪)

বাংলা কবিতার অনেকগুলো বিপজ্জনক ভুল দরজার বিরুদ্ধে অর্ণবের কবিতারা লড়াই করছে—এখানে অক্সিজেনহীনতায় ‘খসে যাওয়া তারা’-রা জানে “চুম্বনের মধ্যে থাকে ক্ষমতা-কাঠামো/ সঙ্গমে লুকোনো আছে ক্ষমতার বিষ” (কবিতা ২০)

সময়ের দেহের নীচে গিলোটিনের ব্লেড নেমে আসছে আরও—একটা হাত সেখান থেকে টেনে টেনে বার করে আনছে গোটা শহর। শহর কী? শহর এমন একটা সত্যি-মিথ্যার স্যন্ডউইচ যেখানে “জলন্ত ঝোপরপট্টি, হোলির আগের সন্ধেবেলা/ কোথায় আগুন জ্বলছে, রাস্তায় রাস্তায়/ খুঁজব বলে আরেকবার পথে নেমে দেখি:” (কবিতা ২৪) কী দেখি? কিছু কি সত্যিই দেখতে চাই– নাকি একটা বুটে চাপা ইঁদুরের ল্যাজের মতো ছটফট করতে থাকা দেহ নিয়ে মনে করতে থাকি এরই নাম জীবন! এক একটা কঙ্কাল ভেদ করে এনে শব্দগুলো তোলপাড় করছে— “ডিম, পিঁপড়ের সারি দীর্ঘ উট হয়ে চলে/ ওরা ছুটছে নিজেদের স্থায়ী বসতি গড়তে/ ধারাভির হাজার বাচ্চা সেভেন হিলসের গেটে/ মাথা ঠুকছে চিরাগ” (কবিতা ৩২)

কত রকমের গিলোটিন নেমে আসে একজন লেখকের খাতার উপর, কিংবা শিক্ষায়, একটা মঞ্চে দাঁড়ানো ভাঁড় আর দর্শকের মাঝে ঝুলে থাকে হাততালির আস্ফালন, পুঁজির সম্পন্ন বিস্ময় কীভাবে একটা মানুষের গা থেকে আস্তে আস্তে করে খুলে নেয় কাপড়—এ সবের মাঝে বাংলা কবিতার নদী ঢেউহীন হয়েই থেকে যায়!
তখনই আবার অর্ণবের কবিতা প্রশ্ন করে–“তাহলে, কী নিয়ে কথা বলব আমি?/ মৃত্যু উপত্যকাই আমার আমার একমাত্র বাসাবাড়ি” (কবিতা ৪৭)

আস্তে আস্তে সময়ের দেহে রাখা হাতের উপর গিলোটিনের ব্লেড ছুঁয়ে গেছে। কবিতার বই আসলে এমন একটা যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে আপনি দেখবেন কীভাবে আপনার দিকে ছিটকে আসা বুলেটের সামনে খোলা বুকে দাঁড়িয়ে থাকে কবি। দেখুন–
তার চেয়ে বরং আরেকবার
বন্দুকের টোটা হয়ে ছিটকে যাওয়া ভালো নেমেসিসকে সঙ্গী হিসেবে বরণ করা
” (কবিতা ৪৮)

কিংবা,

তোমাকে নিয়ে লিখতে শুরু করে
এ আমি কোন অরণ্যে পৌঁছলাম?
এখানে মাটি বিষের চেয়ে নীল
রাস্তাগুলো শ্বাপদসংকুল
” (কবিতা ৫৩)

‘আশিস নন্দীর স্বপ্নে আমিও একদিন’ কবির এই বই পড়া শুরু করি ২০১৮-য়, তার ঝাঁঝ প্রতিদিন তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে যেভাবে একটা দেশ ভাইরাসের আক্রমণকে ভয়াবহ করে তোলে, নিঃসঙ্গ করে তুলতে চাইছে ভবিতব্য। জিজেক আর জীবনানন্দের মাঝে বসে শব্দভেদী বাণ দ্বারা বিদ্ধ অর্ণব সাহার ‘নীচু গিলোটিন’ গোপনে তীব্র প্রেমের ভাষাকে কবিতার কণ্ঠে তুলে ধরে পেট্রোলের সুগন্ধ।

বই: নীচু গিলোটিন
লেখক: অর্ণব সাহা
প্রকাশক: হাওয়াকল
মূল্য: ১৫০/-

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *