/ / চুরিবিদ্যার আখ্যান : প্রসঙ্গ ‘চোরের পাঁচালি’র পুথি – শুভাশিষ গায়েন

চুরিবিদ্যার আখ্যান : প্রসঙ্গ ‘চোরের পাঁচালি’র পুথি – শুভাশিষ গায়েন

শেয়ার করুন

‘চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড়ে ধরা’ প্রসিদ্ধ এই প্রবাদটির দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রাম বাংলায় বহু গল্প প্রচলিত আছে। বাংলার নানা প্রান্তে চৌর্যবৃত্তির উৎকর্ষতা এবং চোরের কৃতিত্ব সম্বন্ধে বহু আখ্যান ও রূপকথার প্রচলন আছে। এই চুরিবিদ্যাকে কেন্দ্র করে পাঁচালি রচিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে। ‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’য় চোরের পাঁচালি কাব্যের পুথি সম্পর্কে প্রথম আলোকপাত করেন চিন্তাহরণ চক্রবর্তী ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে চতুর্থ সংখ্যায় ‘চোরের পাঁচালি’ শীর্ষক আলোচনায়। এই পাঁচালিটিতে চোরচক্রবর্তী উপাধিধারী প্রসিদ্ধ চোরের চমকপ্রদক আখ্যান বর্ণিত হয়েছে। বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের পুথিশালায় ‘চোরের পাঁচালি’ পুথিটি রক্ষিত আছে। এই পুথিটির অধিগ্রহণ সংখ্যা ৮৮৬। এই পুথি সম্পর্কে চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর অভিমত—“দীর্ঘকাল ধরিয়া নানা প্রসঙ্গে পরিষদ কর্তৃপক্ষ ইহাকে একখানি মূল্যবান পুথি বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই পুথির আলোচ্য বিষয়ের কোন পরিচয়এযাবৎ কেহ প্রদান করেন নাই;”

চোরের পাঁচালির মূল উপজীব্য বিষয় হল চোরের চৌর্যবৃত্তির বর্ণনা করা। এই পুথিতে বীর কাশীশ্বরের ভণিতা থাকলেও কাব্যটি পশুপতি রচনা করেছিলেন। এই কাব্যটি গোলাম মওলা কর্তৃক সংরক্ষিত হয়েছিল। পুথির শেষে পাঁচালির অনুলিপিকাল পাওয়া যায়। ১১৭২ বঙ্গাব্দে পুথিটি অনুলিপি হয়। এই কাব্যে চোর কালীকার উপাসক। দেবীর কাছে তার চুরিবিদ্যার শিক্ষা। এছাড়া কবির সম্পর্কে পাঁচালি থেকে আর বিশেষ কিছু জানা যায় না। চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর মতে— “মনে হয় এক যুগে চোর চক্রবর্তীর নাম বাংলাদেশে প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিল এবং তাঁহার কীর্তিবিষয়ক নানা উপাখ্যান জনসমক্ষে প্রচলিত হইয়াছিল।” পৃথ্বীচন্দ্র রচিত ‘গৌরীমঙ্গল’ কাব্যে আমরা চোরচক্রবর্তীর উল্লেখ পাই—

চোরচক্রবর্তী কীত্তি ভাষায় রচিল।
বিক্রমাদিত্যের কীর্তি পয়ার রচিল।
।”

চোরের রীতি-নীতি সম্বন্ধে সাধারণকে সচেতন করাই আলোচ্য পাঁচালির উদ্দেশ্য। চোরের প্রশংসা বা উৎসাহিত করা কবির উদ্দেশ্য নয়, তাই পাঁচালির প্রথমে কবি বলেছেন —-

চৌরচক্রবর্তী কথা শুনিতে মোধুর।
জে কথা শুনিলে লোক হয় ত চতুর।।

কবি চোরের পরিচয় দিয়ে লিখেছেন, চোরের পিতা বিজয় নগরের রাজার পাত্র উগ্রসেন, মাতা গুণবতী। চোরচক্রবর্তী কাব্য, জ্যোতিষ ও অন্যান্য শাস্ত্র পড়ার পর তিনি চৌর্যবিদ্যা শেখেন। এরপর চম্পাবতী নগরের কর্তৃপক্ষের অত্যাচারে বিরক্ত হয়ে চোরের দল চোরচক্রবর্তীর কাছে নিজেদের দুঃখের কথা জানায়—

শুনিয়া প্রতিজ্ঞা কৈল চৌর খরবর।।
জতেক চৌরের মধ্যে আমি নরপতি।
আমা বিদ্যমানে করে এতেক দুর্গতি।।
শুনিঞা চৌরের কথা কোপিল প্রচণ্ড।
চম্পাবতী পুরীখান করিমু লণ্ডভণ্ড।।
তবে চৌরচক্রবর্তী নাম সাফল।।
চাম্পাবতী পুরীখান করিমু বিকল।।
নগরিঞা লোক সব করিমু ভিখারী।
কেমতে রাখিবে রাজা আপনার পুরী।।

গোপনে যাওয়া লজ্জার বিষয় মনে করে চোরচক্রবর্তী একটি পত্র দিয়ে নিজের প্রতিজ্ঞার কথা রাজাকে জানায়। তারপর ঊর্ধ্বজানু হয়ে কালীকার সাধনা করে। দেবীর বলে বলিয়ান হয়ে চোরচক্রবর্তী চম্পাবতী নগরের উদ্দেশ্যে সকালে যাত্রা করে। তপস্বীর বেশে চম্পাবতী পুরীতে প্রবেশ করে চৌকিদারের কাছে নিজের পরিচয় দেয়। ছদ্মবেশী চোরচক্রবর্তী শিশুকাল থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করে নানা তীর্থ ভ্রমণ করেছে। তীর্থ ভ্রমণের বর্ণনায় চৌকিদার সন্তুষ্ট না হয়ে রাজার কাছে যেতে বাধা দেয়।চোরচক্রবর্তী ছলনার আশ্রয় নিলে চৌকিদার ভয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। চোরচক্রবর্তী নিজের আসল পরিচয় দিয়ে নগরের মালির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তার ঘরে আশ্রয় নেয়। চোর সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ত্যাগ করে সাধু বা সদাগরের ছদ্মবেশ ধারণ করে। এই সাধুর ছদ্মবেশে একদিন নগরের গোয়ালিনীকে ঠকিয়ে ক্ষুধানিবৃত্তি করে। দ্বিতীয় দিন নাপিতকে ঠকিয়ে ক্ষৌরকার্য করে। তাঁতীকে ঠকিয়ে বহুমূল্যবান বস্ত্র সংগ্রহ করে। নগরের ঘরে ঘরে প্রতিদিন চুরি হতে থাকে। এসব করেও চোরের মন তৃপ্তহয় না। সে রাজ অন্তঃপুরে চুরি করবার জন্য দেবী কালিকার সাধনা করতে শুরু করে—

নিশিকালী মহাকালী উন্মত্তকালী নাম।
চরণে পড়হু মাতা আইস এই ধাম।।

দেবী বর দিলেন — “যাহা রাজ ঘরে আমি থাকিব সঙ্গতি।” চোরের ধন-সম্পদের আকাঙ্ক্ষা ছিল না —

চোর বোলে ধন লৌঞা আমি কি করিব।
রানি চুরি করি আমি কলঙ্ক থুইব।।

চোর রাজ অন্তঃপুরে গিয়ে নিদ্রামন্ত্রের দ্বারা সবাইকে ঘুম পাড়াল। রাজা ঘুম ভাঙতেই দেখে পাশে শুয়ে আছে এক রাক্ষসী। রাজা গুনিন ডেকে রাক্ষসী তাড়াবার চেষ্টা করে। চোরের স্ত্রী চিড়াকুটি ভাবল তার ঘরে দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে। পাড়াপড়শি সকলেই তার পুজো আরম্ভ করল। খবর পেয়ে রাজা এসে সমস্ত ব্যাপার বুঝতে পারল।

চোর ঠিক করল কোটাল দোসাদুরের ঘরে চুরি করে নিজের নাম সার্থকভাবে প্রকাশ করবে। কোটালের ঘরের রক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারল কোটালের একমাত্র কন্যা লীলাবতীর স্বামী সদাগর বিদ্যাধর দীর্ঘকাল বিদেশে আছে। কয়েকদিন পর চোর কোটালের বাড়িতে সওদাগরের ছদ্মবেশে আবির্ভূত হয়। সে নিজেকে কোটালের জামাতা বলে পরিচয় দেয়। চোর সেখানে রাত্রিযাপন করে। সকালে চোর রটিয়ে দিল রাজা কোটালকে বন্দি করেছে। সুতরাং চোর কোটালের দুই স্ত্রী কন্যা ও ধনরত্ন নিয়ে পালিয়ে যায়। এদিকে রাজা চোর ধরতে না পেরে কলাধার নামে এক সর্বজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়ে আসে। কলাধার লোকজন নিয়ে চোর ধরার জন্য যাত্রা করে।

তখন চোরচক্রবর্তী চিন্তিত হয়ে চণ্ডীর উপাসনা শুরু করে। তারপর রাত্রিতে একটি গুয়াপান ও একটি কাটারি নিয়ে কলাধারের বাড়িতে উপস্থিত হয়। অনেক ডাকাডাকির পর কলাধরকে রাজার গুয়াপান দেওয়ার অছিলায় তার হাত কেটে নেয়। এই কাটা হাত নিয়ে রাজার ঘরে গিয়ে চোর আবার সিঁধ কাটে। কেউ জেগে আছে কিনা জানার জন্য চোর কাটা হাতটি সিঁদের মধ্যে দিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়। অমনি রাজা তরবারির আঘাতে হাতটি ছিন্নভিন্ন করে। চোরকাটা হাত ফেলে পালিয়ে যায়। রাজা ভাবে চোরকে সনাক্ত করার একটি উপায় পাওয়া গেছে। সকালে চোর গণকের ছদ্মবেশ ধারণ করে রাজবাড়ীতে উপস্থিত হল। চোরের উপদ্রব শুনে গণক ক্রুদ্ধ —

পাজি পুথি এড়ি দৈবক মালসাট মারে।
তবে রুদ্রখড়ি গোসাই বুলিহ আমারে।।
আমিত ধরিঞা দিব চোরচক্রবর্ত্তী।
নৃপতি বলিল তবে বুজিব তোমার শক্তি।।

গণকবেশী চোর ছলনা করে রাজার কাছে কলাধরকে চোর সাব্যস্ত করে। চোর ও রাজা কলাধরের বাড়িতে উপস্থিত হয় এবং রাজা তাকে দেখে তিরষ্কার করে। রাজা তাকে কেটে ফেলার হুকুম দিলেন। রাজার পাইকরা তাকে বেঁধে নিয়ে আসে এবং নগরবাসী মনের সুখে তার উপর প্রহার করে।

কলাধারের উপর নগরবাসীর এই অত্যাচার দেখে চোরচক্রবর্তীর মনে দুঃখ হল। সে রাজাকে সমস্ত খুলে বলে। চুরি করা তার উদ্দেশ্য নয়, একথা সে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়। সমস্ত শুনে রাজা সন্তুষ্ট হয়ে নিজ কন্যা মালতিকে তার সঙ্গে বিবাহ দেয়। চোরও কিছু জিনিস মালিকে দিয়ে অপহৃত বাকীজিনিস ফিরিয়ে দেয়। কোটালের স্ত্রী-কন্যা ফিরে আসে। নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধি করে চোর রাজকন্যা মালতির সঙ্গে নিজের দেশে ফিরে আসে। স্বদেশের চোরচক্রবর্তী ব্রাহ্মণদের অনেক দক্ষিণা এবং উপহার দেয়। তারপর চোরেদের উপদেশ দেয়—

আপনার সুখে তোমরা জথা তথা জাও।
ব্রাহ্মণ সজ্জন এড়ি চুরি করি খাও।
ব্রাহ্মণ সজ্জন দাতা বৈষ্ণব তিনজন।
ইহার ঘরে চুরি না করিহ কখন।।
১০

এর পরেই কাব্যটি সমাপ্ত হয়েছে।

চোরের চুরি বিদ্যা এবং গৃহস্থের সতর্কতার কথা প্রাচীন কাব্যে উল্লেখিত হয়েছে। কাব্যটি অনেকটা ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরের অনুসরণ করেছেন কবি। সুন্দর যেমন বিদ্যার কাছে যাওয়ার জন্য প্রথমে মালির ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল। তেমনি চোরচক্রবর্তী চম্পাবতী নগরে এক মালির ঘরে আশ্রয় নেয়। দেববাদ নির্ভর মধ্যযুগের সাহিত্যে এরকম একটি সুন্দর আখ্যান কবি রচনা করেছেন যা সত্যি অতুলনীয় এবং তা বাংলা পুথিচর্চার ইতিহাসের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।

সূত্রনির্দেশ :

১. সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা; ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ; চতুর্থ সংখ্যা; সম্পাদনা -ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; প্রবন্ধ –‘চোরের পাঁচালি’; প্রবন্ধিক – চিন্তাহরণ চক্রবর্তী;বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ; কলকাতা; পৃষ্ঠা – ২১৬।[অতঃপর পত্রিকাটি সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা; ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ; চতুর্থ সংখ্যা; নামে উল্লেখিত হবে]
২. তদেব; পৃষ্ঠা – ২১৬।
৩. সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ; প্রথম সংখ্যা; সম্পাদনা -রজনীকান্ত গুপ্ত; প্রবন্ধ –‘গৌরীমঙ্গল’; প্রাবন্ধিক – রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী; বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ; কলকাতা; পৃষ্ঠা – ৫০।
৪. সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা; ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ; চতুর্থ সংখ্যা; পৃষ্ঠা – ২১৭।
৫. তদেব; পৃষ্ঠা – ২১৮।
৬. তদেব; পৃষ্ঠা – ২১৯।
৭. তদেব; পৃষ্ঠা – ২১৬।
৮. তদেব; পৃষ্ঠা – ২১৯।
৯. তদেব; পৃষ্ঠা – ২২১।
১০. তদেব; পৃষ্ঠা – ২২১।

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
শেয়ার করুন

Similar Posts

One Comment

  1. খুব ভালো লাগলো পড়ে
    একেবারে নতুন ধরন ও নতুন বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *