বালিশ – প্রতিমা সেনগুপ্ত

শেয়ার করুন

এখন রাত্রি সাড়ে বারোটা। লালবাজার সিকিউরিটি সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট থেকে, কয়েকজন সরকারী অফিসার এসেছিলেন। ওরা মা’র কলিগ। কিসব যেন সমস্যা হয়েছে। সামান্য কথাবার্তা হল নিচু গলায়। ওরা মা’কে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন।

আমি – সিদ্ধার্থ রায়। দক্ষিণ কলকাতার একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ি। গল্ফগ্রিনের একটা বহুতলের চারতলার ফ্ল্যাটে মা’র সঙ্গে থাকি। আমার মা পেশায় একজন সরকারী অফিসার। আমার বাবা নেই। নেই – মানে আছেন। কিন্তু তিনি আমাকে স্বীকার করেন নি। বাবা, মাকে সন্দেহ করতেন। আমি বাবাকে কখনও দেখিনি। মা’কে দেখেছি – কেবল তাকেই জানি।

ওরা কেন মা’কে নিয়ে গেলেন? এতো রাতে? গোটা ফ্ল্যাট এখন শুন্–শান। ঘড়ির টিক্ টিক্ শব্দ ছাড়া অন্য কোন শব্দ নেই। আমি এঘর থেকে ওঘরে গেলাম। আবার মা’র শোবার ঘরে ফিরে এলাম। মা’র বিছানায় দু’টো মাথার বালিশ উল্টে পড়ে আছে। মা শুয়ে পড়ে ছিলেন।

আমার বুকের ভিতরটা কেমন খালি লাগছে। একদম ছোটো বেলা থেকে মা হঠাৎ কোথাও চলে গেলেই, আমার এই রকম লাগে। কষ্টটা চলতেই থাকে, যতক্ষণ না মা’র কাছে চলে আসি।

দু’টো হাত বাড়িয়ে বলি, – ‘মম! হাগ’।

মা আমাকে বুকে টেনে নেন। আমি উষ্ণ হয়ে উঠি। নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। ভাবি যত বাধা আছে সব বুঝি পেরিয়ে যেতে পারি। সত্যি কি তাই পারি। এতো যে বড় হয়ে গেছি, এখন পনেরো বছর বয়স। নাকের তলায়, দু’গালে দেখা দিয়েছে গোঁফদাড়ি। তার পরেও কেন যে ভয় পাচ্ছি?

মা বলেন, ‘আর কবে বড় হবি? আমিতো বুড়ো হয়ে গেলাম’।

মা’র ভীষণ সাহস। কোন কিছুতেই ভয় নেই। আর আমি, টিকটিকি দেখেই লাফাই।

নাঃ।

পুরো ফ্ল্যাটটা যেন আমাকে গিলে খেতে আসছে। মা মাঝে মাঝে ঘুমের ওষুধ খায়। অ্যালজোলাম বা ট্রাইজোলামের অনেকগুলো পাতা মায়ের ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে থাকে। সব ক’টা যদি এক সাথে খেয়েনি? কতদিন ভেবেছি, ফ্রিজ থেকে গ্লুকোজের কৌটো বার করে, এক গ্লাস গ্লুকোজের জলে সব ক’টা পাতা গুলে খেয়ে ফেলি।

কিন্তু মা যদি চলে আসে। তাড়াতাড়িতে মোবাইল, ফ্ল্যাটের চাবি কিছুই নেয়নি। কি করে ফ্ল্যাটে ঢুকবে? ওরা মা’কে কোথায় নিয়ে গেলেন?

‘আমি একটু আসছি’–বলে মা ওদের সঙ্গে চলে গেল?

আজ মা এমনিতেই অফিস থেকে দেরীতে ফিরেছিল। আমার জিওগ্রাফি টেস্টে নম্বর কম হয়েছে। মা’কে বলা হয়নি। ভাবতে, ভাবতে মা’র বিছানায় শুয়ে পড়ি। পাশ–বালিশটা চেপে ধরি বুকের কাছে। ওটাতে এখনও মা – মা গন্ধ। মা না আসা পর্যন্ত, আমাকে এভাবেই অপেক্ষা করতে হবে।

মা বলে –‘মানিক, তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল।’

আমি নাকটা মা’র মাথার বালিশে চেপে ধরি, সেখানে তখনও মা’র মাথার চুলের গন্ধ। আমাকে এভাবেই অপেক্ষা করতে হবে – যতক্ষণ মা না আসে। যতই ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারের দিকে আমার মন যাক, আমি কিছুতেই মা’র বিছানা ছেড়ে উঠবো না। গ্লুকোজ বানাবো না, কিচ্ছু করবো না….। শুধু অপেক্ষা করবো, কলিং বেলের। মা ঠিকই ফিরবে। আমি মা’কে জড়িয়ে ধরবো। ওর শরীরের উষ্ণতায়, আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে যে হিম–শীতল ভয়, তাকে মেরে ফেলে – জীবনকে খুঁজে নেবো।

শেয়ার করুন

Similar Posts

  • সমার্থক শব্দকোষ – অনির্বাণ ভট্টাচার্য

    বাংলাভাষার দেয়াল। কয়েকদিন পরপর খোলনলচে পাল্টে যায়। কী ভাষায় প্রথম কথা বলেছিলাম? কিছু কি বলেছিলাম? কোনও স্মৃতি থাকলে ভাল হত। অন্ধকার ঘরের ভেতর আরেকটা অন্ধকার ঘর। শূন্যতা। গর্ভ। জীবন। জ্যোতি বসুর বাংলায় লোডশেডিং। আমাদের মফস্বলে বুকে হেঁটে শুয়ে থাকা একের পর এক রোয়াকের শ্বাস নেওয়া। শীতঘুম না। বড় বেশিই জ্যান্ত। আমার বাংলা ভাষায় সেই রোয়াকের…

  • সম্পাদকীয়

    বাইবেলে কথিত আছে একসময় সারা পৃথিবী জুড়েই একটি মাত্র ভাষাই ছিল। মানুষ একে অপরের মনের ভাব বুঝতে পারতো সহজেই। ফলে তারা ঠিক করে বৃহত্তর মানব সমাজ তৈরী করবে। একটি নগরের পরিকল্পনা করে যেখানে একসাথে থাকতে পারবে তারা। এই ইচ্ছেতে ভিৎ গাঁথলো। ছড়িয়েছিটিয়ে না থেকে সমবেত বাসস্হানের জন্য নগর আর দূর্গ বানাতে শুরু করলো। কিন্তু ঈশ্বরের…

  • অন্তজা – শুভদীপ রায়

    শেষ পর্যন্ত তোমার কাছেই ফিরে আসি- বারবার, ক্ষতবিক্ষত অন্তঃকরনের কোনো নিরাময় তুমি জাননা- আমি জানি, তবু অহংকারের সামনে বারবার হেরে যাওয়া অসহায়, ঠিক তোমার মতোই, খেয়াল করি – তোমার পায়ের নুপুর , শিকল হয়ে কামড়ে ধরেছে, রক্ত ঝরছে , তবু তুমি নেচে চলেছ যমরাজের বুকের উপর, তোমার লখিন্দরকে বাঁচাতে,……. কিন্তু আমি পারি নি , ভরা…

  • একলা নারী – সোহিনী সামন্ত

    ধ্রুবতারার জ্বলজ্বলে অনুভূতিতে লক্ষ্যভেদের ব্যাপক আশা, পথের মোড়ে একলা হেঁটে চলার বিশেষ অভিধান , উন্মুক্ত করে পাখির মতন স্বাধীন অভিব্যক্তির অক্লান্ত নেশা…… স্যাঁতস্যাঁতে চৌরাস্তায় , কাঁকড় বিস্মৃত লালমাটি………… শত্রুর দামামা বাজে বকুলের অসহায়তায় …… দুর্বহ পথে একলা নারীর গৌরবের জয়গান, মুগ্ধ পলাশ ছুঁয়ে যায় একান্ত স্বাধীনতায়……।।

  • অন্য রকম বাঁচা – সুদীপ্তা

    আমি এক অতি সাধারন মেয়ে,, শরৎ বাবু, রবি বাবু অথবা হালের সুবোধ বাবু কেউই আমায় ধর্তব্য়ের মধ্যেই আনেন নাম। কি বললেন? কাব্য এ উপেক্ষিতা? ও উপাধি ও খাটে না আমার জন্য…. মেয়ে জন্মের যাবতীয় উপেক্ষা আর অবহেলা সত্বেও প্রাকৃতিক নিয়মেই যৌবন এসেছিল…. দেহে, মনে… বলে না যৌবনবতি কুক্কুরিও সুন্দরী? আমি তখন উদ্ভিন্ন যৌবনা আমি তখন…

  • ইতি কাদম্বরী – দেবব্রত মাইতি

    আমার আকাশে উঠবেনা আর রবি সেতো আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে অন্য পৃথিবী বন্ধ হচ্ছে শব্দ গান সুর মিলিয়ে যাচ্ছে পরিচিত ডাক এক এক করে নিভিয়ে চলেছি দীপ নিমজ্জিত আমি অন্ধকারে আমি এগিয়ে চলেছি অজানার পথে একা সখা ভালো থেকো তুমি শুধু একটু মনে রেখো আমায় কবিতা গানে গানে ইতি কাদম্বরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *