/ / বাবরি মসজিদ এবং সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি – বিনয় কোঙার
|

বাবরি মসজিদ এবং সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি – বিনয় কোঙার

শেয়ার করুন

রামজন্মভূমি ও বাবরি মসজিদ বিতর্ক

বর্তমানে হিন্দু ধর্মান্ধরা মসজিদ ভেঙ্গে রামমন্দির তৈরি করার দাবিতে সারা দেশকে সাম্প্রদায়িক বিষে জর্জরিত করার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতীয় সংহতি বিপন্ন করার এবং মানুষকে বর্বরতার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। পাশে অনেক জায়গা থাকলেও সেখানে মন্দির করবে না। মন্দির মসজিদ দুই-ই পৃথক তৈয়ার করে পুরানাে মসজিদটিকে জাতীয় সৌধ হিসাবে রাখার প্রস্তাবেও তারা রাজি নয়। সমস্ত ইতিহাস ও তথ্য–প্রমাণকে অস্বীকার করে দাবি করেছে যে রামচন্দ্র বাবরি মসজিদের জায়গাটিতেই জন্মেছিলেন। যুক্তি ও তথ্য সহকারে সমগ্র বিষয়টি আলােচনা করা দরকার।

ইতিহাস না মহাকাব্য

ভারতের ইতিহাসের গবেষকদের মধ্যে যাঁরা পুরােধা, ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করেন, তাঁরা দেখিয়েছেন, রামায়ণ কোন ইতিহাস নয়, মহাকাব্য। কবির কল্পনাই তাঁর জন্মস্থান। বেদ্, উপনিষদ, পুরাণকে যিনি আত্মস্থ করেছিলেন সেই ঈশ্বরবিশ্বাসী মহান কবি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে রামায়ণ কোন ঘটনাবলীর ইতিহাস নয়, ভারতের চিরকালের ইতিহাস, (প্রাচীন সাহিত্য)। অর্থাৎ এতে সমগ্র যুগের মানুষের ব্যথা-বেদনা- আনন্দ-সমাজের সমস্ত টানাপােড়েন প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, ‘এই সমস্ত ইতিহাসকে ঘটনামূলক বলিয়া গণ্য করিবার কোন প্রয়ােজন নাই, আমি ইহাকে ভাবমূলক বলিয়া মনে করি’ (ভারতীয় ইতিহাসের ধারা)। সাহিত্য-কাব্য ইতিহাস নয়, সমাজের দর্পণ। শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন দেখিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, কম্বােডিয়া, মালয়, চীন প্রভৃতি দেশে দেশে রামায়ণের অন্তত ১৫ ধরনের কাহিনী পাওয়া যায় এবং সেই সব কাহিনীর একটির সাথে আর একটির মিল নাই। ঘটনার ইতিহাস নানারকম হয় না, লোকগাথাই স্থান ও কাল ভেদে বদলিয়ে চলে।

রামচন্দ্রকে বর্তমানে অবতার বলা হয়। কিন্তু মূল রামায়ণে মহাকবি বাল্মীকি রামকে মানুষ হিসাবেই চিন্তিত করেছেন, দেবতারূপে নয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “কবি যদি রামায়ণে নরচরিত্র বর্ণনা না করিয়া দেবচরিত্র বর্ণনা করিতেন তবে তাহা রামায়ণের গৌরব হ্রাস করিত।” (প্রাচীন সাহিত্য)

শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন দেখিয়েছেন মে মূল রামায়ণের রামচন্দ্র মানুষ ছিলেন। ভারতে কালিদাসই প্রথম রামের উপর দেবত্ব আরোপ করেন এবং রামায়ণের উত্তরকান্ড মূল রামায়ণের অংশ নয়, কালিদাসের রচনার ভিত্তিতেই পরবর্তী কালে এটি সংযােজিত হয় এবং রামের উপর দেবত্ব আরােপ করা হয়।

রামায়ণে বর্ণিত অযোধ্যা কোথায়?

রামায়ণের অযোধ্যা কোথায় সে সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের সংশয় আছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে বর্তমান অযোধ্যরি অতীত নাম ছিল সাকেত। খ্রীঃ পূঃ পঞ্চম শতাব্দীতে স্কন্দগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য তার বাসস্থান সাকেতে নিয়ে আসেন এবং তার নাম দেন অযোধ্যা।

বাল্মীকির মত অনুসারে রামের জন্ম ত্রেতাযুগে, অর্থাৎ প্রায় ৫ হাজার বছর আগে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণায় খ্রীঃ পূঃ অষ্ট শতকের আগে বর্তমান অযোধ্যায় কোন জনবসতির চিহ্ন পাওয়া যায় নি। খ্রীঃ পূঃ অষ্ট শতকের পরে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যে পাওয়া চিহ্ন অনুযায়ী তখনকার জীবনযাত্রা ছিল সরল এবং আদিম। অথচ রামায়ণে অট্টালিকা, প্রাসাদ ও নাগরিক জীবনের বিবরণ আছে।

খ্রিষ্টীয় ৪র্থ শতাব্দীতে ফা-হিয়েন এবং খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে হিউয়েন সাঙ পরিব্রাজক হিসাবে ভারতে অনেক দিন কাটিয়েছেন এবং অনেক স্থান পরিদর্শন করেছেন, কিন্তু তাতেও আযােধ্যাকে রামজন্মভূমি বা হিন্দুদের ধর্মস্থান বলে চিহ্নিত করেন নি। হিউয়েন সাঙ অযােধ্যাকে বৌদ্ধদের পবিত্রস্থান বলে উল্লেখ করেছেন। এমন কি অযােধ্যায় পুরাতাত্ত্বিক খনন কার্যে প্রাচীন পােড়া মাটির জৈন মূর্তি পাওয়া গেছে কিন্তু রামের কোন স্মৃতিচিহ্ন পাওয়া যায় নি।।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দাবিমতো যদি সত্যই ১৫২৮ খ্রীষ্টাব্দে মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ তৈরি হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই জনচিত্তে সেজন্য আলোড়ন বা গুঞ্জন থাকবে। অথচ প্রসিদ্ধ রামসাধক, সারা জীবন যিনি রামচন্দ্রকে নিয়েই গবেষণা করেছেন এবং ‘রামচরিত মানস’ রচনা করে রামায়ণকে জনপ্রিয় করেছেন সেই সাধক তুলসীদাস ১৫৩২ খ্রীস্টাব্দে এই অযােধ্যাতেই জন্মগ্রহণ করে সারাজীবন কাটিয়ে ১৬২৩ খ্রীস্টাব্দে দেহত্যাগ করেছেন। মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ করার মতাে একটা অন্যায় ঘটনা তিনি উল্লেখ করবেন না—বদ্ধ উন্মাদ বা দাঙ্গাবাজ ছাড়া একথা কেউ বিশ্বাস করবে না।

বর্তমানে অযােধ্যায় বহু রামমন্দির আছে, কিন্তু এদের কোনটি ষােড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগের পূর্বের তৈরি নয়। রামানন্দী ধর্মগােষ্ঠীর উত্থান এবং তুলসী দাসের রামচরিত মানসের প্রভাবেই মােগল আমলেই এগুলি তৈরি হয়েছে। আইন-ই-আকবরি-তে রামচন্দ্রের প্রতি আকবরের অত্যন্ত শ্রদ্ধা দেখানাে হয়েছে, কোন বিরুপতা নয়। এই সমস্ত বাস্তব তথ্য প্রমাণ করছে যে মন্দির ভাঙ্গার গল্পটি পুরাপুরি বানানো।

কোথা থেকে এই বিতর্কের শুরু

ব্রিটিশ সাম্রাজাবাদই বিভেদের স্বার্থে এই চক্রান্ত শুরু করেছিল। আগেই বলা হয়েছে যে, ব্রিটিশ কর্মচারী পি কার্নেগী সিপাহী বিদ্রোহের পর সরকারী নথিতে এটা লিখলেন। পরে ১৯০৫ সালে মুসলিম লীগের জন্মের ঠিক আগের বছরে আর এক সরকারী কর্মচারী এইচ আর নেভিল গেজেটে একই কথা বললেন। এবং ১৯২০ সালে আর এক ইংরাজ রমণী মিসেস এ এস বিভারিজ বাবর ঐ মসজিদ তৈরি করেছিলেন বলে উল্লেখ করে বললেন যে, ইসলাম যেহেতু অন্য ধর্ম সহ্য করে না, সুতরাং অনুমান করা যায় যে বাবর নিশ্চয়ই মন্দির ভেঙ্গেই মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী লুটের স্বার্থে কি অদ্ভুত যুক্তি!

বিভারিজের এই বক্তব্যের পরই ১৯২৫ সালে হিন্দুমহাসভার প্রতিষ্ঠা হলাে এবং মন্দির পুনরুদ্ধারের দাবি উঠতে শুরু করল। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় সারা দেশ যখন উত্তাল, তখন সাম্রাজ্যবাদীদের স্ত্রীড়নক সাম্প্ৰদায়িক শক্তিগুলি পরিকল্পিতভাবে শুরু করল সাম্প্রদায়িক বর্বরতা। দেশ হলাে বিভক্ত। হিন্দু দাঙ্গাবাজরা গান্ধীজিকেও খুন করল। আর তার পরের বছর — ১৯৪৯ সালের ২৩শে ডিসেম্বর গভীর রাত্রে ৫০/৬০ হিন্দু দাঙ্গাবাজ মসজিদের প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে মসজিদ চত্বরে রাম-সীতার দুটি ছোট্ট মূর্তি বসিয়ে দিয়ে বাইরে প্রচার শুরু করে দিলো যে জন্মস্থানে রামচন্দ্রের উদয় হয়েছে। অলৌকিকবাদে নেশাগ্রস্ত হাজার হাজার মানুষকে টেনে নিয়ে আসা হলাে।

কনস্টেবল মাতাপ্রসাদ (হিন্দু) থানায় উপরােক্ত মর্মে ডায়েরি করলেন, ম্যাজিস্ট্রেট নায়ার এই ঘটনা জানিয়ে গোবিন্দবল্লভ পন্থকে তার পাঠালেন। পন্ডিত নেহরু হুকুম পাঠালেন মূর্তি সরিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু ‘জনচিত্তে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে’-এই যুক্তিতে তা করা হলাে না। সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের কাছে কূপমন্ডুক বুর্জোয়া নেতারা নতি স্বীকার করলেন। লালবাহাদুর শাস্ত্রী আদালত দেখালেন। আশ্চর্যজনকভাবে আদালত জবরদখলকারীদের সরিয়ে না দিয়ে স্থিতাবস্থার হুকুম দিলেন। অর্থাৎ মসজিদের দরজা বন্ধ হয়ে গেল, পূজা চলতে লাগল। গাধীজীকে হত্যা করা হয়েছিল আকস্মিকভাবে, আর তারই সতীর্থরা ধীরে সুস্থে তাঁর আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে দিলেন মসজদের চত্বরে। ফৈজাবাদের জেলা কংগ্রেস সম্পাদক অক্ষয় ব্রহ্মচারী এই জন্য বর্বরতার প্রতিবাদে আদর্শের মৃত্যু ঠেকাবার জন্য ১৯৫০ সালে ২ বার অনশন করলেন, কিন্তু শাসকগােষ্ঠী রইল নির্বিকার। যেটুকু বাকি ছিল পরে সাম্প্রদায়িক ডেটের স্বার্থে রাজীব গান্ধীর উত্তরপ্রদেশের অ্যাডভােকেট জেনারেলের সম্মতিক্রমে মসজিদের পুরো চত্বরটাই হিন্দু ধর্মান্ধদের হাতে সঁপে দেওয়া হলাে।

***

পরের ঘটনা–ইঁটপূজা কেন?

হিন্দু ধর্মাধরা মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির বানাবার জন্য ইঁটপূজার ডাক দিল। ভারতে হাজার হাজার হিন্দু মন্দির আছে, কোটিপতিরা নিয়তই প্রত্যেক শহরে তৈরি করাচ্ছে, কিন্তু কোন দিন তার জন্য ইঁটের পূজা করার কথা শােনা যায় নি। মন্দির নয়, ইঁটপুজার নাম করে ভারতের গ্রামে গ্রামে সামপ্রদায়িক বিদ্বেষকে জাগিয়ে তােলাই ছিল উদ্দেশ্য। রাজীব গান্ধী ইঁট বয়ে নিয়ে যাবার অনুমতি দিলেন, ভাগলপুরে বীভৎস দাঙ্গা বাধাতে দিলেন, ডিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুমতি দিলেন কিন্তু সি পি আই (এম) ও সি পি আইকে প্রতিবাদ সভার অনুমতি দিলেন না। অযােধ্যা থেকেই ‘বজরঙ্গবলী কি জয়’ আওয়াজ (বন্দেমাতরম নয়) তুলিয়ে রাম রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করলেন। ইতিহাস প্রমাণ করল যে দেশের সংহতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত প্রতিরোধে বুর্জোয়ারা ইতিহাসগতভাবে অক্ষম।

যুক্তি নয়, গায়ের জোর

যুক্তির সাহায্যে, সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত মারফত মীমাংসার কথা বললে বি জে পি ও বিশ্বহিন্দু পরিষদ নেতারা বলছেন যে সন্তানের পিতা কে তা যেমন আদালত বলতে পারে না, মা-ই পারে, তেমনি রামের জন্ম স্থান আদালত নয়, তারাই ঠিক করবেন। অর্থাৎ তাঁরা ঠিক করেছেন যে তাঁরাই রামের মা, রামায়ণে বর্ণিত কৌশল্যা নয়। মানুষকে যারা নির্বোধ ভাবে তাদেরই এই স্পর্ধা হতে পারে।

অভিজাত ব্যক্তিগণও যেখানে ৫০০ বছর আগের তাঁদের পূর্বপুরুষের জন্মস্থান সুনির্দিষ্টভাবে কোন্ ভূমিথন্ডে তা বলতে পারেন না, ৫০০ বছর আগের শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থান নিয়েও যেখানে বিতর্ক আছে, বুদ্ধদেবের জন্মের মাত্র ৩ শত বছরের মতাে পরে সম্রাট অশােক যেখানে বুদ্ধদেবের জন্মস্থান হিসাবে লুম্বিনী গ্রাম চিহ্নিত করলেও সুনির্দিষ্ট স্থানটি চিহ্নিত করতে পারেন নি, তখন ৫ হাজার বছর আগে ভূ-প্রকৃতি ও জনপদের এত উত্থান পতনের পর রামচন্দ্র ঠিক ঐ মসজিদের জায়গাতেই জন্মেছেন এটা কেমন করে জানা গেল— গায়ের জোর ছাড়া কোনো উত্তর নাই।

ব্রিটিশের লালিত ধর্মান্ধরা একটা কথা বিশ্বাস করাতে চায় যে হিন্দু মন্দির ধ্বংস করাই যেন মুসলিম সম্রাটদের নীতি ছিল। কিন্তু এটা নির্জলা মিথ্যা। ধর্মবিদ্বেষের জন্য মন্দির ধ্বংসের নজির বিশেষ নাই। যুদ্ধ বিগ্রহের সময় অনেক মন্দির, সাম্প্রতিককালে অমৃতসর মন্দিরের মতােই যুদ্ধের ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু ধর্মবিদ্বেষে করা হয় নি। এছাড়া মন্দিরগুলি ছিল প্রচুর সােনা-রুপা ইত্যাদি সম্পদের ভাণ্ডার। আজকের প্রসিদ্ধ মন্দিরগুলিও সেই সাক্ষ্যই দেয়। সেইজন্য মন্দির ধংস করা হতাে সম্পদের জন্য, ধর্মের জন্য নয়। এ কাজে হিন্দু রাজারাও কম যায় নি। কালাপাহাড়ের কথা না হয় ছেড়ে দেওয়াই হলাে। ‘কলহনের রাজতরঙ্গিনী’ থেকে জানা যায় যে একাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরের রাজ হর্ষ সম্পদের জন্য এত মন্দির ধ্বংস করেছিলেন যে সেই কৃতিত্বের জন্য তাঁর সেনাপতি উপাধি পেয়েছিল দেবৎপাটন নায়ক। একইভাবে পারমার রাজা সুকাত বর্মণ (১১৯৩-১২১০ খ্রীঃ) গুজরাট আক্রমণ করে সম্পদের জন্য প্রচুর সংখ্যক জৈন মন্দির ধ্বংস করেছিলেন।

মুঘল সম্রাটরা সাধারণভাবে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দেশ শাসন করতেন—এমন ধারণা ইতিহাসের বিকৃতি। মােঘল আমলে বড় বড় জায়গীরদাররা প্রধানত ছিলেন হিন্দু, উচ্চপদসহ রাজকর্মচারীদের ভাল অংশই ছিল হিন্দু, মােঘল আমলেই অযােধ্যার রামমন্দিরগুলি গড়ে উঠেছিল, আজকের অমৃতসর স্বর্ণমন্দিরের পিছনেও ছিল মােঘল সম্রাটের দান।

দাঙ্গাপন্থীরা আওয়াজ তুলেছে যে একজন আগে হিন্দু বা মুসলমান, পরে মানুষ। এটা মিথ্যা। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কোন ঈশ্বরের ধারণা বা ধর্মবিশ্বাস ছাড়াই মানুষ সামজবদ্ধভাবে প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে সম্পদ সৃষ্টি করতে শিখেছে, নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছে। ঈশ্বর বা ধর্মের ধারণা এসেছে অনেক পরে। কোন ধর্মবিশ্বাসেরই বয়স আড়াই হাজার বছরের বেশি নয়। বৈদিক ধর্মের সাথে আজকের হিন্দু ধর্মের মিল নাই, তবু বেদ থেকে যদি হিন্দু ধর্ম ধরা হয়, তাহলেও তার বয়স সওয়া তিন হাজার বছরের বেশি নয়। কিন্তু তা ধরতে গেলে হিন্দু মৌলবাদীরা মুসকিলে পড়বেন, কারণ গােমাংস আর অস্পৃশ্য থাকবে না। বৈদিক যুগে কৃষি ছিল না, পশুপালন ও শিকারই ছিল জীবিকা। তাই গােমাংস তখন নিষিদ্ধ ছিল না, সম্মানিত অতিথির জন্য গােবৎস বধই ছিল রীতি। পরে খ্রীঃ পূঃ ৯ম শতাব্দী নাগাদ লোহা আবিষ্কারের পর চাষের প্রসার ঘটে। আজকের মতাে ট্রাকটার ছিল না, মৃত্যুহার বেশি থাকার ফলে গরুর বংশ বৃদ্ধির হারও ছিল কম। তাই কৃষির বিকাশের স্বার্থে ধমের অনুশাসন দিয়ে গােবধকে নিষিদ্ধ করতে হয়েছিল। এবং সেটাই তখনকার দিনে সঠিক ছিল। রামায়ণের কাহিনীর মধ্যেই শিকার হতে কৃষিতে উত্তরণের স্বীকৃতি আছে। রামকে বিবাহ করতে হয়েছিল হরধনু ভঙ্গ করে, অর্থাৎ শিকারের প্রতীক ধনু ভাঙা হলো, এবং বিবাহ করলেন সীতাকে যাঁর জন্ম হালের মুখে। আরও জমিতে হাল দেবার কর্ষণ রেখাকে উত্তরভারতে ‘সীতা’ বলে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “গৌতম যে ভূমিকে (অহল্যা) কর্ষণ করিতে পারে নাই রাম তাকে সজীব করিয়া কৃষি নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়াছিলেন।” (ভারতীয় ইতিহাসের ধারা)

ধর্ম আত্মিক বিশ্বাসের বিষয়। ধর্মপালন করতে হলেও আগে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়, সম্পদ তৈরি করতেও হয়। বিবেকানন্দের ভাষায়, “ধর্মের কিছু প্রভাব আছে বটে, কিন্তু অর্থনীতির সাহায্যেই সে পরিচালিত হয়। পেটের চিন্তা, অন্নের চিন্তা মানুষের প্রথম…তারপর মাথার” (বিঃ সমগ্র, পৃ ৫৯৭)। তাই মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে আগে তাকে শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত, পুঁজিপতি বা জমিদার হতে হবে, তারপরে সে হিন্দু বা মুসলমান।

শ্রেণীশাষণকে যারা চিরস্থায়ী করতে চায়, কোটি কোটি মেহনতী মানুষকে যারা খাদ্য, বাসস্হান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সব অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে অল্প কিছু পরগাছাকে সম্পদের পাহাড়ে বসাতে চায়, তারাই ধর্মবিশ্বাসকে মূলধন করে মানুষকে দাঙ্গাবাজ পশুতে পরিণত করতে চায়। এরা হিন্দু, মুসলমান, খ্রীস্টান-কাউকেই ভালবাসে না, ভালবাসে সাম্রাজ্যবাদী ও একচেটিয়া পুঁজির টাকার থলিকে।


মূল প্রবন্ধ:- সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করছে কারা এবং কেন? প্রকাশিত হয় দেশহিতৈষী, ১৯৯০ সালের শারদ সংখ্যায়। মূল প্রবন্ধটি থেকে বানান অপরিবর্তিত রেখে মাঝের কিছু অংশ পুনর্মুদ্রিত করা হল।

শেয়ার করুন

Similar Posts

3 Comments

  1. সাম্প্রতিক সময়ের উপযোগী বিষয় নিয়ে এই লেখা প্রকাশ করার জন্য আপনপাঠ কে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *