তবু শোন এ মৃতের গল্প – মালবিকা মিত্র

শেয়ার করুন


(১)

হাওড়া জেলা হাসপাতালের লাশকাটা ঘরের সামনে দিয়ে দ্রুত হাঁটছিলাম। জায়গাটা আমার এমনিতেই পছন্দের নয়। ফরম্যালিনের গন্ধ আর অদ্ভুত নাম না জানা ওষুধের গন্ধে ম ম করে জায়গাটা সর্বক্ষণ। গা গুলিয়ে ওঠে। অনেকদিন আগের প্রায় ফিকে হয়ে আসা স্মৃতিতে নতুন করে রঙের পোচ পড়ে।

ভোটার লিস্টের সামারি রিভিশনের কাজ জোর কদমে চলছে। তাই আপাতত আন্দুল রোড থেকে ওল্ড কালেকটরেট বিল্ডিংয়ে নিজের অস্থায়ী অফিস বসিয়ে নিয়েছি।

লোকটাকে গতকালও দেখেছি। রোগা কঙ্কালসার চেহারা। দলা পাকানো শরীর। সারা গায়ে তেল না পড়ার দরুন খড়ি উঠেছে। লোকটাকে কে এনে ফেলে গেছে ভগবানই জানে। একটা ছেঁড়া কম্বল নিয়ে কোনও মতে মুড়ি দিয়ে হাওড়ার এই প্রবল শীতের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। রোগে না হোক, শীতেই তো মরে যাবে লোকটা। সঙ্গে তো কাউকে দেখিও না।

“দুটো খেতে দিবি মা..”

চমকে পায়ের কাছে তাকালাম। এমনিতেই আজ আসতে দেরী হয়ে গেছে। তাই প্রায় ছূটছিলাম। দেরীর মুখে যত্তসব… মুখে একরাশ বিরক্তি জড়ো হল নিমেষেই। কিন্তু কেউ খেতে চাইলে আমি চট করে এড়িয়ে যেতে পারি না। আর এরাও কী করে যেন বুঝে যায়। বেছে বেছে আমাকেই টার্গেট করে কেন কে জানে?

মনে মনে বিরক্ত হলেও, গলার স্বরে কোন ভাঁজ পড়ল না। এ আমার স্বভাব না সরকারি চাকরি করার দরুন স্বশিক্ষিত অভ্যেস, জানি না।

“এখানে তোমায় কী খেতে দিই বলতো? টাকা দিলে খেয়ে আসতে পারবে?”

“পায়ে ঘা হয়েছে, চলতে ফিরতে তো পারি না…” গলার স্বরে যন্ত্রণা স্পষ্ট। কী একটা মায়া মাখানো ছিল বৃদ্ধের মুখে। দেরী হচ্ছে জেনেও দাঁড়িয়ে গেলাম।

“তুমি এই রকম খোলা জায়গায় শুয়ে আছো কেন? হাসপাতালে কী বেড নেই?”

“আমি কিছুই জানি না রে মা। পাড়ার ছেলে ছোকরাগুলান এইনে এই খানে ফেইলে চলে গেল। আমি তো কতবার করে কইলাম, এই শীতটার রাত্রে আকাশের নীচে কেমন করে থাকব। তা তারা শুনলনি।”

“তোমার বাড়ি কোথায়? বাড়িতে কে কে আছে?”

“বাড়ি তো সেই উদয়নারায়ণপুরে। বাড়িতে..” বৃদ্ধ আনমনা হল বুঝি। কারুর কথা মনে করছে। কিন্তু দাঁড়িয়ে তার জীবন বৃত্তান্ত শুনি এমন সময় আমার হাতে কোথায়?

“দাঁড়াও দেখি। কী খাবার আনা যায়।” ততক্ষণে দেখে নিয়েছি আউটডোরের সামনে একটা লোক ডিম পাউরুটি নিয়ে বসেছে। ভাতের ব্যবস্থা করতে পারলেই ভালো হতো। কিন্তু ভাত তরকারি আনবোই বা কীসে, আর বৃদ্ধ খাবেই বা কীসে?

বেশী করে পাউরুটি টোস্ট আর ডিম সেদ্ধ এনে বৃদ্ধের হাতে দিলাম, “তোমার যে পায়ে ঘা, হাসপাতালে আউটডোরে টিকিট করোনি কেন? ওদের দেখালে ওরাই তো ব্যবস্থা করে দিত। আর তোমার স্বাস্থ্য সাথী কার্ড নেই?”

অদ্ভুত এক আলো ফুটে উঠল বৃদ্ধের মুখে, “ওরা যে বলল, আমি মরে গেছি।”

বৃদ্ধের মুখের ফুটে ওঠা আলো বা বৃদ্ধের কথা — কোনটারই অর্থ বুঝলাম না।

(২)

সামারি রিভিশনের কাজটা এবার বিশ্রী রকম বেশী। অফিসে বসে সব কাজ কমপ্লিট করা যাচ্ছে না। অফিসটাকে ঘাড়ে করে বাড়ি অব্দি বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে। ফাইলপত্র নিয়ে হাসপাতালের ভিতর দিয়েই হাঁটছিলাম। ক্যান্টিন থেকে খানিকটা ভাত তরকারি অ্যালুমনিয়াম ফয়েলের বাক্সে প্যাক করিয়ে নিয়েছি। লোকটা যদি এখনো থাকে ওই এক জায়গায়… রাতের খাবারটা হয়ে যাবে।

লোকটা হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। পায়ের দিক থেকে কম্বলটা সরে যাওয়ায় ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দগদগে ঘা। দুটো মাছি উড়ছে ঘাটাকে ঘিরে। আমার মতো নিটপিটে লোকের ঘেন্না হওয়ার জন্য এই দৃশ্যটা যথেষ্ট। কিন্তু কেন জানি কোন বিবমিষার উদ্রেক হলো না আমার। বরং কেমন একটা মন্দলাগায় মনটা ভরে গেল। কেমন অসহায়ের মতো ঘুমচ্ছে লোকটা। ডাকতে গিয়ে মায়া লাগল আমার। খাবারটা সন্তর্পণে পাশে নামিয়ে রেখে সরে আসতে যাবো, এমন সময়..

“কত্ত খাবার এনেছ গো মেয়ে? কত্তদিন ভাত খাইনি…” বৃদ্ধের গলায় শিশুর উচ্ছ্বাস।

“তুমি বাড়ি যাও না কেন দাদু? শুধু শুধু এখানে পড়ে থেকে কষ্ট পাচ্ছ। আবার হাসপাতালের ভিতরেও যাচ্ছো না।”

“আমার যে পায়ে ঘা। আমি তো চলতে ফিরতে পারি নে। আর হাসপাতালের ডাগতারবাবুদের কত্ত কাজ। তারা এখানে এসে দেখবে কেন?”

কথাটা মিথ্যে নয়। একে ধরে যদি আউটডোরে নিয়ে যাওয়া যায়, একমাত্র তাহলেই একটা হিল্লে করা যাবে। নইলে কারই বা দায় পড়েছে। আর এই জায়গাটা ডাক্তার নার্সদের হাঁটাচলার রুট থেকে একটু আড়ালে।

“তোমার ছেলে মেয়ে কেউ নেই? তারাই বা তোমাকে এমন দশায় ফেলে রেখেছে কী আক্কেলে?”

“ছেলে মেয়ে?” বৃদ্ধ পলকে অন্যমনস্ক হয়ে গেল, “ছিল তো। গাঁয়ের বাড়িতে। তারপর কী যে হল…”

“তোমার গাঁ কোথায়?”

“ওই যে, উদয়নারায়ণপুরে।”

“উদয়নারায়ণপুরের কোথায়?”

বৃদ্ধ স্মৃতি হাতড়াচ্ছে তখন, “একটা গাঁয়ে…”

“আরে কোন গাঁয়ে?”

“তা তো মনে পড়ে না মেয়ে। কত কিছুই তো স্মরণে নাই। একখান ছেলে ছিল… একটা ছোট্ট নাতনী… পুতুলের মতো ফুটফুটে… হামা দিয়ে দিয়ে আমার নিকট আসত…”

“তো তারা কোথায় এখন?”

“বাড়িতে..”

“তো তোমাকে এখানে আনলে কে?”

“পাড়ার ছেলে ছোকরারা। ওদের কেলাবের সামনে পড়ে থাকতাম, খেতে চাইতাম, ঘা দিয়ে পচা গন্ধ বেরুত বলে আমাকে এখানে থুয়ে গেল…”

“বাবা। উদয়নারায়ণপুর থেকে গাড়ি ভাড়া করে তোমাকে এখানে রেখে গেল?”

“না গো মেয়ে, ওরা তো শিবপুরে থাকে।”

আমার মাথাটা গুলিয়ে গেল। একবার বলছে উদয়নারায়ণপুরে বাড়ি, একবার বলছে শিবপুরের ক্লাবের ছেলেরা ওকে হাসপাতালে রেখে গেছে। বৃদ্ধের মনে যে আসলে কী চলছে বোঝা দায়।

“আমি তো শিবপুর থেকেই আসছি।”

“তুমি উদয়নারায়ণপুর থেকে শিবপুরে এলে কী করে?”

“ওই ছেলের বৌ বলল, নাতনীটা আমার কোলে ওঠে, আমার ঘা থেকে নাতনীটারও ঘা হয়ে যাবে। আমি বাড়ির বারান্দায় থাকতাম তারপরে। তারপর… তারপর… “

“তারপর? “

“তারপর ওরা একদিন বাড়ি বন্ধ করে কোথায় যেন চলি গেল। আমি যে বাড়ি আগলায় পড়ে থাকবো, খাবো কী? পোড়া পেট যে মানে না। মিথ্যা বলবো নে, ছেদ্দায় হোক অছেদ্দায় হোক, ছেলের বৌটা তাও দু’বেলা খেতে দিত। তাই বেরিয়ে পড়লেম। শিবপুরে এক বোন থাকত, দুসসম্পক্কের। কিন্তু কাউরে খুঁজে পেলেম নে। সেই থেকেই কেলাবের সামনের রোয়াকে থাকিতেম। যে যা খেতে দিত তাই খেতেম।”

পুরো জার্নিটা চোখের সামনে পরিষ্কার হল।

“কোনও রোজগার নেই তো তোমার।”

“রোজগার থাকলে কী আর ছেলেটা এমন করত মেয়ে?”

“বৃদ্ধভাতা বলে একটা স্কীম আছে জানো? কোনও দিন বিডিও অফিসে খোঁজ নিয়েছ?”

“ওরা যে বলল, আমি মরে গেছি। তাই আমাকে কোনও কার্ড দিবে নি।”

“কে বলল তুমি মরে গেছ? এই তো আমার সামনে জলজ্যান্ত বসে আছ তুমি।”

“ওই বাবুরা বলল মেয়ে। ওই কি একটা কার্ড বলে না, সেটা করালে বলে আমার পায়ের ঘা-টা সেরে যাবে। তাই গেলেম, ছেছড়ে ছেছড়ে…”

“ওরা কী বলল?”

“আমার তো কোনও আধার কার্ড তারপর কী বলে প্যান কার্ড নাই।”

“এপিক কার্ড নেই?”

বৃদ্ধ অবাক চোখে আমার দিকে চেয়ে রইল।

নিজের ভুল বুঝতে পারলাম, “মানে ভোটার কার্ড। যা দিয়ে ভোট দিয়েছ। কি, ভোট দিয়েছ তো?”

ঘাড় নাড়ল বৃদ্ধ, “হ্যাঁ দিয়েছি তো, ভোটের কার্ড ছিল তো।”

“হ্যাঁ, তো সেই কার্ড দেখাওনি স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের ওখানে?”

“দেখালেম।”

“তো কি বলল?”

“কার্ড অন্য জায়গার। “

বুঝলাম ব্যপারটা। বৃদ্ধের নাম তো উদয়নারায়ণপুরের ভোটার লিস্টে, শিবপুর ওই ভোটার কার্ড নিয়ে কাজ করবে কেন?

“তো বাড়ি ফিরে গেলে না কেন?”

হাসল লোকটা, বড় করুণ হাসি, “কেলাবের একটা ছেলে আমার ভোটের কার্ড নিয়া কী করল, তারপর কইল আমার ভোটের কার্ড কেনসিল হয়ে গ্যাছে। বলল, বলল আমি তো অনেক আগেই মরে গ্যাছি।”

চমকে উঠলাম। বৃদ্ধ তখনও বলেই চলেছে, “তা মরণের তো সময় হয়েই গ্যাছে, আগে মারলেই কী পরে মারলেই কী?”

হাত বাড়িয়ে বললাম, “ভোটার কার্ডটা দেখি তোমার। আছে সঙ্গে?”

“আমার এই একটাই পুটলি রে মেয়ে। এটা ছাড়া আর কোনও সম্পত্তি নেই।” একখানা নোংরা কাপড়ের পুটুলি হাতড়ে যখের ধনের মতো কার্ডটা বের করল লোকটা।

নিজের মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তুলে নিলাম। তারপর বললাম,”তোমাকে কাল বলবো কী হয়েছে তোমার কার্ডে। আজ আসি।”

নিভে আসা চোখে একবিন্দু আশার আলো দপ করে জ্বলে উঠল। কিন্তু মুখে কিছু বলল না।

(৩)

বৃদ্ধের খবর জোগাড় করতে দিন কয়েক লাগল। উদয়নারায়ণপুরের ভোটার লিস্টে কমলাকান্ত হাজরার নাম মৃত হিসেবে নোট করা আছে। ইসিআইয়ের পোর্টালে এপিক নম্বর ম্যাচ না করাতে, ফোন করেছিলাম আমারই এক দীর্ঘদিনের কলিগ সৈকতকে। ও উদয়নারায়ণপুরেই পোস্টেড। ছেলেটা খুব কাজের। অনেকেরই পুরনো এপিক নম্বর বাতিল হয়ে নতুন এপিক নম্বর এসেছে। কমলাকান্ত সময়মতো অ্যাপ্লাই করেনি হয়তো। তাই ইসিআই পুরনো নম্বর খুঁজে দিতে পারল না। অগত্যা সৈকত বাধ্য জুনিয়রের মতো প্রায় ২৪৭ টা পার্টের ভোটার লিস্ট তন্নতন্ন করে খুঁজে বলল কমলাকান্ত আসলে মৃত।

“এটা কী করে সম্ভব সৈকত? কেউ যদি সাত নম্বর ফর্ম ফিল আপ না করে তাহলে তাকে এক্সপায়ার্ড বলে নোটিফাই করা যায় কি?”

“আমিও বুঝতে পারছি না দিদি। দীর্ঘদিন যদি কেউ তার নিজের বাসস্থানে না থাকে তাহলে শিফটেড লেখা উচিৎ। কিন্তু এক্সপায়ার্ডটা…. আমাকে সামান্য সময় দাও দিদি। তোমাকে কাল পরশুর মধ্যে জানাবো। আর এই বিষয়ে কি করা উচিৎ সেটা তো তুমি নিজেই জানো। আর একটা অ্যাপ্লিকেশন কি করানো যায় না? পুরনো এপিকটা দিয়েই না হয় করাও। খুব সন্দেহ না হলে এইআরও রা তো পোর্টালে নম্বর ধরে চেক করে না।”

“এপিকের ব্যপারটা নিয়ে ভাবছি না সৈকত। কিন্তু রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট সে লোক কোথা থেকে আনবে? কে দেবে? যে ক্লাবের বারান্দায় কিংবা হাসপাতালের মর্গের সামনে পড়ে থাকে, তার পক্ষে কি রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট আনা সম্ভব? আর রইল বাকি বিএলওর সার্টিফিকেট? মধ্য হাওড়ার বিএলও কেন উদয়নারায়ণপুরের বাসিন্দার দায়িত্ব নেবে?”

“সব বুঝতে পারছি দিদি। কিন্তু ১৩ আর ১৪ নম্বর নোটিশ নিয়ে সাত নম্বর ফর্ম ফিল আপ করে তবেই তো ডিলিশন হয়েছে। এতগুলো প্রসেস কীভাবে হয়ে গেল সেটাই ধাঁধা।”

“তুমি ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখো সৈকত। যা যা জানবে আমাকে ভার্বাটিম জানিও।”

সৈকত ফোন ছেড়ে দিল। আমি ভাবতে বসলাম। আজ না হয় কমলাকান্ত হাজরার কথা জানতে পারলাম, কিন্তু গোটা দেশে এই রকম কমলাকান্ত হাজরা কত জন আছে কে জানে? যারা ভোটার তালিকায় মৃত। সিস্টেমকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, এমনকি সিস্টেম যারা চালায় তাদেরও দোষ দিয়ে লাভ নেই। এত বড় দেশ, এত জন সংখ্যা, শিক্ষার হার যেখানে এত কম, সেখানে ভুলের মাত্রা শূন্য শতাংশ হবে — এ কথা ভাবাই মহাপাপ।

কমলাকান্তকে নিয়ে এতখানি না ভাবলেও হতো। ইন ফ্যাক্ট, কেন ভাবছিলাম নিজেও জানি না। বোধহয় জলজ্যান্ত একটা মানুষের মৃত আখ্যায়িত হওয়াটাকে মন থেকে মানতে পারছিলাম না, তাই…

(৪)

এর মধ্যে দিন সাত আটেক কেটে গেছে। সৈকতের কাছ থেকে যা খবর পেলাম, তাতে বুঝলাম কমলাকান্তের ছেলে ছেলের বৌ ইচ্ছে করেই বৃদ্ধকে কিছু না জানিয়ে চলে গিয়েছিল। তারা জানত, কিছুদিনের মধ্যেই ক্ষিদের জ্বালা সহ্য করতে না পারলে বৃদ্ধ মানুষটা আপনিই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে। ছেলে ছেলের বৌ কিন্তু এখন উদয়নারায়ণপুরের বাড়িতেই থাকে। তার মানে কমলাকান্ত গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তারা ফিরে এসেছে। নিশ্চয়ই কোনও না কোনও শুভাকাঙ্ক্ষী তাদের খবরটি দিয়েছিল। তারপর সাত নম্বর ফর্ম ফিল আপ করে বিএলও স্টেটমেন্ট লিখিয়ে নিয়ে কমলাকান্তকে মৃত হিসেবে ঘোষণা করা তো কিছু সময়ের ব্যপার। কিন্তু কনসার্ন অফিসার যে কেন ডেথ সার্টিফিকেট দেখতে চাননি কে জানে? অবশ্য কয়েক হাজার ফর্ম যখন দিন পনেরোর মধ্যে ডিসপোজ করতে হয়, তখন অত খুঁটিয়ে দেখার মতো সময় থাকে না। আর তাছাড়া বিএলও স্টেটমেন্টের উপর চোখ বুজে ভরসা করার টেন্ডেন্সী থেকেই যায়।

অফিসে আসতে আসতে ভাবছিলাম কমলাকান্তকে কীভাবে সাহায্য করবো। আসলে আমারই মতো কোনও কর্মচারীর সইয়ের জেরে বৃদ্ধকে এত ভোগান্তি ভুগতে হচ্ছে। তাই হয়তো নিজের মনেই অপরাধবোধ জাগছিল। সৈকত অবশ্য বলেছিল বৃদ্ধকে ওর কাছে পাঠিয়ে দিতে। আপাতত কমলাকান্তর পায়ের ঘা-টা সারানোর ব্যবস্থা করা যায় কিনা তাই ভাবছিলাম। হাতে কিছু সময় নিয়েই বেরিয়েছি। দেখি, হাসপাতালের সঙ্গে কথা বলা যায় কিনা। আমি এই ক’দিনে অনেকবার চেষ্টা করেছি আউটডোরে নিয়ে যেতে। কিন্তু বৃদ্ধ নড়তেই রাজি নয়। পায়ে নাকি এত ব্যথা, নড়লেই মরে যাবে। আজ যদি একটা স্ট্রেচার পাওয়া যায়… কোথায় কী পাওয়া যায় তাও তো ছাই জানি না…

মর্গের কাছাকাছি পৌঁছে একটা ছোটখাটো ভিড় দেখে থমকে গেলাম। কয়েকটা ছেঁড়া ছেঁড়া বাক্য কানে এল,

“ক’দিন ধরেই তো এখানে পড়ে ছিল..”

“মরল কখন?”

“কাল রাতেই হবে..”

“কয়েকদিন ধরে যা ঠান্ডা পড়ছে। দিনেই হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে তো, রাত্তিরে না জানি এই খোলা জায়গায় কেমন ঠান্ডা হবে।”

“বাড়ির লোকই বা কী, বুড়ো লোকটাকে হাসপাতালেও ভর্তি করায়নি। এখানে ফেলে রেখে পালিয়েছে।”

“ঝ্যাঁটা মারি অমন বাড়ির লোকের মুখে।”

“এখন কী হবে? থানায় খবর দিতে হবে তো মনে হয়।”

“আরে না না। অত কিছু করতে হবে বলে তো মনে হয় না। রোজ এমন কত ভিখিরি মরে রাস্তা ঘাটে।”

“আরে মর্গের সামনেই তো মরেছে, বেওয়ারিশ লাশ হয়ে মর্গেই ঢুকে যাবে।”

ভেঙে আসা পায়ে মৃতদেহের কাছে এগিয়ে গেলাম। মুখে একটা নিশ্চিন্ত প্রশান্তি নিয়ে বৃদ্ধ ঘুমিয়ে আছে। মনে মনে খুব রাগ হলো। আমার বিগত দিনগুলির খাটনি চিন্তা ভাবনা সব জলে গেল। সেই মরলই যখন, আমাকে কয়েকটা দিন জ্বালালো কেন?

গতকালও যে অ্যালুমনিয়াম ফয়েলের বাক্সে খাবার দিয়ে গিয়ে ছিলাম, তার ঢাকনিতে ব্যাঁকাচোরা অক্ষরে কিছু লেখা,

“ছেলেটার অনেক দেনা হয়ে গেছিল। আমি না মরলে বাসরাস্তার ধারের জমিটা বিক্রী করতে পারতো না…”

বুঝলাম,

কমলাকান্ত মরিয়া প্রমাণ করিলেন, কমলাকান্ত মরেন নাই।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.