/ / স্তব্ধ রেখার পাশে – পার্থজিৎ চন্দ (৭ম পর্ব)

স্তব্ধ রেখার পাশে – পার্থজিৎ চন্দ (৭ম পর্ব)

শেয়ার করুন

সপ্তম পর্ব

হায় হতভাগিনী।
স্রোতে বৃথা গেল ভেসে-
কূলে তরী লাগে নি, লাগে নি।।

কাটালি বেলা বীণাতে সুর বেঁধে, কঠিন টানে উঠল কেঁদে,
ছিন্ন তারে থেমে গেল যে রাগিণী।।

এই পথের ধারে এসে
ডেকে গেল তোরে সে।
ফিরায়ে দিলি তারে রুদ্ধদ্বারে-
বুক জ্বলে গেল গো, ক্ষমা তবুও কেন মাগি নি।।

-রবীন্দ্রনাথের এ গানের কাছে বারবার ফিরে আসেনি এমন মানুষ বিরল; কেন ফিরে আসি আমরা এ গানের কাছে তার কোনও ‘উত্তর’ সম্ভবত কোনও দিন পাওয়া সম্ভব নয়। শিল্পের সব থেকে বড় জয় ঠিক সেখানেই লুকিয়ে থাকে। সেখানে ‘সন্ত্রাস’ প্রকাশ্য সেখানেও শিল্প আমাদের তাড়া করে নিয়ে যায়; চিতার হাঁ-মুখে ও হাঙরের ঢেউয়ে লুটোপুটি খেতে খেতে আমরা মৃত্যুর কাছে নিজেদের সমর্পণ করি। আবার শিল্প কিছুক্ষেত্রে এ-গানের মতো হাহাকারে পূর্ণ, কোনও প্রকাশ্য সন্ত্রাস নেই, তবু বারবার তার কাছে আমাদের ফিরে যেতে হয়।

কিন্তু সার্থক শিল্প সব সময়ের চাঁদের উলটো পিঠের বাস্তবতা আমাদের সামনে তুলে ধরে, এ গানের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে।

এ গান আত্মবিলাপের পবিত্র ধ্বনি বহন করে চলেছে। নিজের দিকে তাকিয়ে রাতের পর রাত, প্রহরের পর প্রহর, কোটি কোটি বছর কাটিয়ে চলেছে একটি নীলাভ তারা। এ মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুপিণ্ড, প্রতিটি কণা, প্রতিটি পরমাণু আসলে ‘সঙ্গীহীন’। চির-বিরহের পথ বেয়ে তারা চলেছে মৃত্যুর দিকে, ফুরিয়ে যাবার দিকে। সময় প্রতিটি বস্তুকে নিঃসঙ্গ থেকে অধিকতর নিঃসঙ্গ করে তুলছে।

মহাজগতের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সে নিঃসঙ্গতার বোধ, একদিন তারা আবিষ্কার করে সে নিঃসঙ্গতাকে।

গানটিকে নিছক ‘প্রেমের’ গান হিসাবে দেখতে ইচ্ছা করে না, এ আসলে প্রতিটি বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা বেদনার বহিঃপ্রকাশ।

লক্ষ করার, এ গানের ‘হতভাগিনী’ আত্ম-আবিষ্কারের পথ ধরে তার একাকিত্বকে ছুঁয়ে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। বীণাতে সুর বাঁধার প্রক্রিয়া ছলনা মাত্র, তার ছিন্ন হওয়াই নিয়তি। রাগিণী থেমে যাওয়াই পরিণতি।

কিন্তু এখানে একটি প্যারাডক্স লুকিয়ে রয়েছে, রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘এই পথের ধারে এসে / ডেকে গেছে তোরে সে।’

যে ডেকে ডেকে ফিরে গেছে সেও তো তার একাকিত্ব নিয়েই এসেছিল, ‘পূর্ণ’ হয়ে উঠতে চেয়েছিল। রুদ্ধদ্বারে সে বারবার করাঘাত করেছে হয়তো, নিশ্চয় দরজার ওপারে থাকা মানুষটির মধ্যে প্রবল ছদ্ম-প্রতিরোধ ছিল। একবার ফিরিয়ে দেবার পর সে আবিষ্কার করছে বুক জ্বলে যাবার বিষয়টি। ক্ষমা না-চাওয়ার অভিমানটুকু পার হতে পারলেই ‘মিলন’ সার্থক হয়ে উঠত। কিন্তু তা হবার নয়, হয় না। সৃষ্টির নিয়মের মধ্যেই এমন এক ‘শর্ত’ ও ডিজাইন থাকে যা সে মিলনকে সার্থক হয়ে উঠতে দেয় না।

বস্তুর একাকিত্বেই হয়তো সৃষ্টির পূর্ণতা, মাঝে মাঝে মনে হয় বস্তুর এই একাকিত্বই সৃষ্টির চালিকা শক্তি। কোটি কোটি অস্তিত্ব থেকে উত্থিত একাকিত্বের প্রবল তাড়না সৃষ্টিকে চালিত করে নিয়ে চলেছে।

কিন্তু গানটির কাছে বসে আরেকটি কথাও মনে হচ্ছিল, আসলে সে মনে হওয়া কথাটি বহুদিনের ভাবনা; ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে আসছিল আমার কাছে।

যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের মধ্যে প্রবলভাবে খেলা করে যায় নারী-সত্তা।এই নারী-সত্তার প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের গান থেকে শুরু করে সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া বিভিন্ন শিল্পের মধ্যে তীব্রভাবে বর্তমান।

যে গানটির উল্লেখ করা হয়েছে এখানে সেটি অতি-অবশ্যই এক ‘নারী’র গান। অর্থাৎ আমরা লিঙ্গ-পরিচয়ের সূত্র ধরে নারী-পুরুষ বিভাজনের যে ধারায় নির্মিত সেই ধারা বেয়ে নির্মিত হওয়া এক নারীর গান। কিন্তু গানটির স্রষ্টা ওই একই পথ বেয়ে নির্মিত হয়ে ওঠা একজন ‘পুরুষ’।

যে মুহূর্তে গানটি রচিত হচ্ছিল সে মুহূর্তে কি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ভর করেছিল নারী-সত্তা?

ফ্রয়েডিও সাইকোঅ্যানালিসিসের সঙ্গে এই সেলফ-ফেমিনাইজেশন প্রক্রিয়ার পার্থক্য আছে। সৃষ্টির গূঢ়-স্তরে খেলা করতে থাকে এ প্রক্রিয়া। হাজার হাজার বছরের সামাজিক ব্যবস্থার আড়ালে সন্তর্পণে সেকেন্ড-সেক্সের নির্মাণ ঘটেছে। কিন্তু শিল্প নিজেই ধারণ করেছে রয়েছে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ সত্তা (অথবা অধিকতর নারী-সত্তা); ফলে সেখানে এসে ‘বাইসেক্সুয়ালিটি’ শব্দটিও ফিকে হয়ে আসে। বাইসেক্সুয়ালিটির মধ্যে যে লিঙ্গ-পরিচয় রয়েছে, দুই লিঙ্গপরিচয়ের যে ইশারা রয়েছে এখানে সেটি অনুপস্থিত। রবীন্দ্রনাথের গানে যে বিষয়টি ঘটেছে সেটি লিঙ্গ-নিরপেক্ষতা, লিঙ্গ-সচেতনতার বাইরে তার অবস্থান। ফলে সেখানে নারীর কান্না’কে ধারণ করতে প্রতিবন্ধকতার সামনে পড়তে হয় না পুরুষ’কে; অথবা পুরুষের ক্ষেত্রে নারী’র।

গুস্তাভ ক্লেমট-এর ছবির একমাত্র পরিচয় বা বিস্তার নিশ্চয় man’s female masculinity-র মধ্যে বা তার চার-পাশে ঘুরে শেষ হয়ে যেতে পারে না। গুস্তাভের ছবিগুলি তাদের যাবতীয় রহস্যময়তা ও আকর্ষণ নিয়ে আমাদের কাছে ফুটে থাকে। কিন্তু তাঁর নিজস্ব শিল্পীসত্তার ক্ষেত্রে এই man’s female masculinity বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ক্লেমটের অডিপাল-রিভোল্ট হিসাবে যে বিষয়টিকে চিহ্নিত করা হয় তার সঙ্গে ঊনবিংশ শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি ও সে সূত্র মেনে নারী-শরীরের চিত্র-নির্মাণ পদ্ধতিটিকে ভেঙে চুরমার করে দেবার বিষয়টিও রয়েছে।

শিল্পী মাত্রই বিদ্রোহী, অজড় যা কিছু তাকে ভেঙে চুরমার করে না-দেওয়া পর্যন্ত নিজের পথটি খুঁজে পাওয়া সম্পূর্ণ হয় না। ক্লেমট বিষয়টিকে সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছিলেন।

‘আমি কলঙ্কিত করবো নম্র শাদা কাগজের কুমারী-স্তব্ধতা;

অস্তির শিশিরবিন্দু মুঠো করে মিশে যাব ঘাসে,

আক্রোশে সৃজন করবো শব-ব্যবসায়ী এক ছন্দের দেবতা

গ্রন্থের কুয়াশা ছিঁড়ে জ্বলে উঠবো বজ্রমেহ ঊর্ণার আকাশে,

আমার শরীরী মেধা স্বপ্নহত্যা জ্বলে উঠবে প্রজাতির ঢেউয়ের চুল্লিতে

মাংসের বন্দীত্ব বস্ত্র-পরিহার করে যাব হরফের ব্যক্তিগত স্নানে;

ইভনিং পুরকায়স্থের সঙ্গে প্রতি শনিবার যাব মৃত্যুনীল নিষিদ্ধপল্লীতে;

কুমারীর গর্ভকোষে; এভাবে অভ্যাসমুগ্ধ মৃত্যুযাপনের থেকে চাই রূপান্তরঃ

আমার যা-কিছু নেই তারই জন্যে মোহগ্রন্ত আমি পূজা করবো প্রিয়

অজানার ক্ষত;

অক্ষরের মেঘাবৃত সৌরউরসের ঘুমে উঁকি মারবে অনন্য ঈশ্বর-

বাথটাবে ফেনার মধ্যে স্নানরত মাকড়শার মতো!’ (ট্যারান্টেলা/ অনন্য রায়)

-নম্র শাদা কাগজের কুমারী-স্তব্ধতা’কে ভেঙে ডিসটার্বেন্স তৈরি না-হওয়া পর্যন্ত শিল্পের সফর শুরু হয় না। এবং একজন শিল্পী যে কী নিপুণভাবে নিজেকে মুছে দিতে দিতে শুধু সৃষ্টিকে জাগিয়ে রাখতে পারেন তার সার্থক উদাহরণ হতে পারেন গুস্তাভ ক্লেমট । জীবনে অসংখ্য মহিলার সঙ্গে সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছেন; মহিলারা অসম্ভব পছন্দ করতেন তাঁকে। আবার একই সঙ্গে তিনি ছিলেন চির-বিষণ্ণ।

ক্লেমট’কে জাপান, ইজিপ্ট ও বাইজান্টাইন চিত্রকলা প্রভাবিত করেছিল সব থেকে বেশি। ১৮৬২ সালে জন্মগ্রহণ করা ক্লেমন্ট ১৮৭৯ সালে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে একটি শিল্প-সংস্থার সূচনা করেন।

ক্লেমটের নারী’রা প্রায় সকলেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। রেঁনেসা-পর্বে যোনির আভাস বোঝাতে যে ‘ভি’ আকৃতির অস্পষ্ট চিহ্ন ব্যবহার করা হত, অথবা যোনির কাছ বরাবর ভেসে যাওয়া পাতার ছবি তুলে ধরা হত ক্লেমট সে ধারাটিকে বাতিল করে দেন।

নারী-যৌনতা ও নারী-চিহ্ন অঙ্কনের ক্ষেত্রে তিনি অনেক বেশি সাহসিকতা ও আধুনিকতার প্রমাণ দিয়ে ছিলেন।

১৮৮৩ সালে সৃষ্টি হওয়া ‘দ্য ফেবল’ ক্লেমটের আশ্চর্য নির্মাণ।

ক্যানভাসের একদম মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে নগ্ন-নারী। বাম-দিকে তার পায়ের কাছে ঘুমন্ত সিংহ, সিংহের মাথার কাছে গাছের ডালে খেলা করছে কয়েকটি ইঁদুর।

নগ্ন-নারীটি যেন ক্যানভাসটিকে দু’ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। ডান-দিকে দুটি সারস ও একটি শেয়াল।

প্রায়ান্ধকার বনের মধ্যে অভিনীত হয়ে চলেছে এক নাটক। প্রত্যেকের ভূমিকা নির্দিষ্ট, ক্লেমট ডিপ-স্পেসে গাঢ়-বাদামী ও ধূসর রঙ ব্যবহার করেছেন। সবুজের পেলবতার বদলে এ দুটি রঙ চিত্রনাট্যে পৃথক মাত্রা যুক্ত করেছে।

সিংহের বিপুল নিদ্রার পাশে ইঁদুরের খেলা করে চলা যে কন্ট্রাস্ট তৈরি করছে তা ডান-দিকে অনুপস্থিত। সেখানে লক্ষ করলে দেখা যাবে একটি সারসের ঠোঁটে ধরা একটি শিকার। শেয়ালটি একটি কাচের পাত্রের কাছে বসে এবং সে কাচের পাত্রটির ভেতর রয়েছে কয়েকটি ব্যাঙ।

অনেকেই ক্লেমটের ছবিতে ‘বাহ্যিক’ উপাদানের স্বল্পতার দিকে ইঙ্গিত করেন। ক্লেমট তাঁর ছবির পরতে পরতে যেসব মাত্রা রেখে গেছেন তা নজরে পড়ে না অনেকের। ‘দ্য ফেবল’ ছবিটি সে ধারণা খণ্ডন করে দেবার পক্ষে আদর্শ।

এ নারী’র নগ্নতার দিকে তাকিয়ে মনে হয় সে স্বেচ্ছায় খুলে ফেলেছে তার পোশাক। সে তার উন্মুক্ত স্তন ও যোনি নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত নয়। এবং সে নারীর মুখ ফেরানো রয়েছে ঘুমন্ত সিংহের উলটো দিকে।

ঘুমন্ত সিংহের মধ্যে পুরুষ যৌনতার আভাস পাওয়া যায়; কিন্তু নারীর এই উদাসীন মুখ ফিরিয়ে থাকা কি তার যৌন-পরিচয়ের সম্পূর্ণতার সাক্ষ্য দেয়?

(দ্য ফেবল- ১৮৮৩)

-শুধু তাই নয়, নারীটির হাতে ধরা রয়েছে প্রাচীন পুথির মতো একটি স্ক্রল। সে কি নতুন বার্তা এনেছে এ নাটকের মাঝখানে?

সারসের ঠোঁটে ধরে থাকা ব্যাঙটিকে দেখে অবধারিতভাবে মনে পড়বেই সেই স্থবির ব্যাঙের কয়েক মুহূর্ত ভিক্ষা চেয়ে নেবার কথা, কিন্তু কাচের জারের সামনে বসে থাকা শেয়াল ও জারের ভেতরের মধ্যে বদ্ধ ব্যাঙের বিষয়টিকে সহজে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এ কি জীবনের অনতিক্রম্য ট্র্যাজেডির প্রকাশ? ওই ব্যাঙ কি আসলে প্রতিটি মানুষের অস্তিত্ব’কে জানান দিয়ে চলেছে?

একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে, জারের সংকীর্ণ মুখ বেয়ে ব্যাঙ কোনও দিনই বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে না, অর্থাৎ ‘মুক্তি’ বলতে আমরা যা বুঝি তা ব্যাঙের সাপেক্ষে অলীক বিষয়মাত্র।

মাঝে মাঝে তার কাছে নেমে আসবে সফেদ সারসের ঠোঁটের মতো মৃত্যু।

মৃত্যুর এ রঙ ক্লেমট আমাদের ‘উপহার’ দিয়ে গেলেন যেন, মৃত্যুও যে কী অপরিসীম সফেদ রূপে আমাদের কাছে আসতে পারে তা এ ছবি দেখে বোঝা যায়।

কিন্তু যে প্রশ্নটি বারবার ঘুরেফিরে আসবে তা হল, এই চিত্রনাট্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটি আসলে কে? সমস্ত ফেবল-কে ধারণ করে থাকা এ নারী কি ‘প্রকৃতি’? তার হাতে ধরে থাকা গোপন পুথির পাঠোদ্ধার করতে করতে আমাদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে।

ক্যানভাসের ডিপ-স্পেসে ক্লেমট বনপথের ইশারা রেখেছেন। এখানেও তিনি ব্যতিক্রমী, সাধারণত বনপথের ইশারা ক্রমশ অন্ধকার বয়ে নিয়ে আসে আমাদের কাছে। অথচ এ ছবিতে বনপথ আলোকিত। যেন কিছুটা পথ অতিক্রম করলেই আলোকিত জগৎ, অথচ সে পথটুকুর আগেই শুরু ও স্থির হয়ে রয়েছে গূঢ় এক নাটক।

১৮৯৫ সালে ক্লেমট সৃষ্টি করেছিলেন বিখ্যাত দুটি চিত্র- ‘মিউজিক-১’ এবং ‘লাভ’। ‘মিউজিক-১’ ছবিটির কাছে ফিরে যাবার এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে সৃষ্টির ভেতর খেলা করে যাওয়া সুর প্রবলভাবে ‘অশান্ত’। তার ভেতর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে এক শান্ত ঝাউগাছ।

ক্লেমটের ‘মিউজিক-১’ ছবিটির কাছে যাবার মুহূর্তে মনে পড়ছিল আরেকটি গান’ও, ‘পিনাকেতে লাগে টঙ্কার- / বসুন্ধরার পঞ্জরতলে কম্পন জাগে শঙ্কার’।

‘জটিল’ বাদ্যযন্ত্রের কাছে স্থির হয়ে রয়েছে একটি মেয়ে, তার পোশাকের রঙ কালো। লায়ারের তার ছুঁয়ে থাকা মেয়েটি রূপান্তরিত হচ্ছে সুরে।

(মিউজিক-১/ ১৮৯৫)

-লায়ারে হলুদ রঙ বিষণ্ণতার প্রবাহ বয়ে আনছে এবং ঠিক তার পিছনের ক্যানভাসের অংশটি ক্লেমট আকাশি, সবুজ, পিঙ্ক ইত্যাদি রঙে ভরে দিচ্ছেন। আকাশি’র ব্যবহার বেশি এবং ক্লেমট ‘বিডস’-এর আকারে অন্যান্য রঙের ছোপ দিয়ে গেলেন। নারীর ঋতুচক্র’কে মনে করিয়ে দিতে পারে এই বিডস-গুলি।

কিন্তু ছবিটির মধ্যে প্রবল সন্ত্রাস’ও রয়েছে, শুধুমাত্র মেয়েটি ও লায়ারের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে না ছবিটি। কারণ ক্লেমট ক্যানভাসের ডিপ-স্পেসে খুলির ইশারা বুনে দিয়েছেন। মহাজাগতিক ক্ষতের মতো জেগে রয়েছে তিন’টি কালো-অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ অথবা জরায়ু। ছবিটির বাম-দিক ও ডান-দিকে থাকা দুটি মূর্তি ক্যানভাসটির সমতা রক্ষা করছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘বজ্রভীষণ গর্জনরব প্রলয়ের জয়ডঙ্কার।। / স্বর্গ উঠিছে ক্রন্দি, সুরপরিষদ বন্দী-’।

কী আশ্চর্য, এখানে দুটি পুরুষ-মূর্তি যেন বজ্রভীষণ গর্জনরব-কে পরিস্ফুটিত করছে।

বাম-দিকের মিথিক্যাল পুরুষ-মূর্তি ও ডান-দিকের স্ফিংস- বালিরঙ ধূসরতার একটি রেখায় তাদের সংযুক্ত করেছিলেন ক্লেমট । ছবিটির দিকে চেয়ে থাকলে কিছুক্ষণ পর মনে হয়, লায়ারটি যেন গিলে ফেলবে মেয়েটিকে।

শিল্পী লুপ্ত হয়ে যাবে, শিল্পী লুপ্ত হয়ে হয়তো পুষ্ট করে যাবে শিল্প-কে।

‘When love beckons to you, follow him,

Though his ways are hard and steep,

And when his wings enfold you yield to him,

Though the sword hidden among his pinions may wound you.’

-কখলিল গিব্রান তাঁর ‘দ্য প্রফেট’ গ্রন্থে প্রেম সম্পর্কে এ কথাগুলি যেমন বলেছিলেন তেমনই বলেছিলেন,

‘To melt and be like a running brook that sings its melody to the night,

To know the pain of too much tenderness.

To be wounded by your own understanding of love;

And to bleed willingly and joyfully.’

– ক্লেমট -এর ‘লাভ’ ছবিটির দিকে তাকালে বোঝা যায় প্রেম রাত্রির অন্ধকারে একটি পাহাড়ি নদীর ধীরে মিলিয়ে যাবার শব্দের মতো অপার্থিব কিছু।

(লাভ- ১৮৯৫)

-ক্যানভাসের নীচের দিক থেকে অন্ধকার ক্রমাগত ফিকে হতে শুরু করেছে। রাত্রির অন্ধকারে নারী ও তার পুরুষ। নারীটির চোখ বন্ধ, তার তিরতির করে কেঁপে ওঠা স্তব্ধ হয়ে রয়েছে ছবিটিতে। পুরুষটির ঠোঁট ও নারীর ঠোঁটের মধ্যে সামান্য দূরত্ব; আলিঙ্গনের মধ্যে সমর্পণের ছাপ স্পষ্ট।

এবং এ দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছে তিনটি মূর্তি, শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য-কে সূচিত করা তিনটি মূর্তি। একদম ডান-দিকের যৌবনের মূর্তির দিকে নজর রেখে স্তম্ভিত হয়ে যেতে হবে এক-সময়ে। নিজের ভেতর অসম্ভব এক ‘প্লেজার’ নিয়ে থিতু হয়ে রয়েছে নারী-মূর্তিটি। এখানেও নারী-যৌনতার বিশেষ দিকটিকে ফুটিয়ে রেখে যেতে ভুললেন না ক্লেমট ।

‘বিথোভেন ফ্রিজ’ ছবিটি সৃষ্টি হয়েছিল ১৯০২-এ।

এ ছবিটি প্লাস্টারের উপর কেসিন পেইন্ট।

-ছবিটির ডান-দিকে বেশ কয়েকটি নারী-মূর্তি, তাদের

(বিথোভেন ফ্রিজ- ১৯০২)

শরীর-কে ভেঙেচুরে দিয়েছেন ক্লেমট। ছবিটির নিচের দিকে তিন-নারী যেন ভাসমান, তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাচ্ছে ছবিটির মাঝখানে থাকা গরিলার। ক্যানভাসের ডান-দিকে ঊর্ধাঙ্গ-অনাবৃত পৃথুলা মহিলাটির উপস্থিতি নিষিদ্ধপল্লীর কথা মনে করিয়ে দেবে। মহিলা চেয়ে রয়েছে আত্মরতি-তে মগ্ন এক মহিলার দিকে। সে মহিলার চুল লাল, তার চুলের মধ্যে খেলা করছে সর্বনাশের মতো তারা-রা। একই সঙ্গে ‘সর্বনাশপন্থী’ কয়েকজন নারী ও গরিলার উপস্থিতি ছবিটির সম্পদ।

ছবিটির মধ্যে দিয়ে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা এক প্রত্ন-ঝড়; গরিলার চোখে কোনও মণি নেই। তার ভাঙা-দাঁতের ফাঁকে অপেক্ষা করছে অনন্ত ক্ষুধা। পৃথিবীর যাবতীয় সুন্দর-অসুন্দর এক সঙ্গে এসে ক্যানভাসের স্পেস-টিকে অধিকার করে নিচ্ছে এ ছবিটিতে। কিছু শিল্প-সমালোচক, যেমন Gottfried Fliedl-মতে, ‘The real theme of the pictorial narrative is not struggling and fighting, but the testing of the individual’s capacity to suffer and endure reality. Indeed, it can be seen as a metaphor of a man’s ability to hold his own in real life.’

ক্লেমট গোপন জাদুকর; এখন তাঁর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আশ্চর্য সব প্রবণতা ও চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়। যেমন এখন তাঁর ল্যান্ডস্কেপের সামনে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করা যায় সেখানে মানুষের উপস্থিতি প্রায় নেই-ই। এমনকি মানুষের তৈরি যে স্থাপত্য বা কীর্তি ফুটে রয়েছে তাঁর ছবিতে সেখানেও মানুষ-কে যেন শোষকযন্ত্রের মতো শুষে নিয়ে ক্যানভাসের বাইরে নীরবে স্থাপন করে এসেছেন ক্লেমট।ন্যারেটিভ-এলিমেন্টের অনুপস্থিতি তাঁর ছবিকে পৃথক করে তুলেছে সমসময়ে। ক্লেমট-এর সমালোচকরা তাঁর ল্যান্ডস্কেপ-কে ‘undisturbed by kinetic energy’ বলে উল্লেখ করতে পছন্দ করেছেন।

এটা সত্যি যে ক্লেমটের প্রকৃতির ছবিতে ডায়নামিক বা নাটকীয় উপাদান কম, প্রায় নেই বললেই চলে। নাটকীয় উপাদান যেটুকু রয়েছে তার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য, অতি-উঁচু দিগন্তরেখা।

মানুষ নেই, ক্লেমটের ছবিতে প্রকৃতির অন্যান্য বস্তুসমূহ নিজেদের ‘বায়োলজিক্যাল কসমস’ নির্মাণ করে নিয়েছিল, এমনটাই মনে করেন কেউ কেউ।

ক্লেমট কি তাঁর ছবিতে প্রকৃতিকে ‘আনডিস্টার্বড’ রাখতেই চেয়েছিলেন প্রবলভাবে? এবং তার জন্য যা যা পদ্ধতি গ্রহণ করার তাই করেছিলেন?

একটি চমকপ্রদ তথ্যের দিকে তাকিয়ে অবাক হতে হয়। চিত্রকলার সঙ্গ পরিচিত প্রায় সবার জানা, ক্যানভাস আয়তক্ষেত্রাকার হলে তার মধ্যে হরাইজন্টাল মুভমেন্ট ফুটিয়ে তোলার একটি স্বাভাবিক পরিসর পাওয়া যায়।

ক্লেমট তাঁর ল্যান্ডস্কেপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বর্গাকৃতি ক্যানভাস ব্যবহার করেছিলেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এবং তাদের অধিকাংশের আকৃতি ছিল একশো-দশ বাই একশো- দশ সেন্টিমিটার। ফলে সেখানে ‘গতি’র ফুটে ওঠার অবকাশ এমনিতেই কমে এসেছিলে।

‘ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেন’ এমনই এক বর্গাকৃতি ক্যানভাসে সৃষ্টি হওয়া চিত্র।

(ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেন- ১৯০৬)

-গাঢ় সবুজের সঙ্গে ক্লেমট হলুদ ও হালকা নীল রঙের ব্যবহার করেছেন। ব্রাশ স্ট্রোকগুলি ছোট ছোট। ছবিটির একদম সামনে ও বামদিকে দুটি বড় গাছের উপস্থিতি

এবং অন্যান্য গাছগুলির দূরবর্তী উপস্থিতি ‘ডেপথ’ তৈরি করেছে। প্রকৃতির এই শান্ত ও অনন্ত সৌন্দর্যের মাঝখানে কোনও ‘বাহ্যিক’ উপাদানের অস্তিত্ব নেই, যা রয়েছে তা হল গাছের ফাঁক দিকে এক-চিলতে আকাশের চিহ্ন।

ক্লেমটের ‘বার্চ ফরেস্ট’ ছবিটির কাছে বসে থাকতে থাকতে ভেসে উঠছিল বহু বছর আগেকার পাতাঝরা শাল-জঙ্গল, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’-এর কথা। পাতাঝরা গাছের সঙ্গে মানুষের বিষণ্ণতার আশ্চর্য সংযোগ রয়েছে।

শক্তি লিখেছিলেন, ‘আমরা কালই তোমাদের কাছ থেকে দূরে গিয়ে ভালোবাসা-ভরা চিঠি ফেলে দিচ্ছি পোস্টম্যানের হাতে।’ মানুষের এই ছলনার পাশাপাশি জেগে থাকে বৃক্ষের আনন্দ,

‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান ঘুরতে দেখেছি অনেক

তাদের হলুদ ঝুলি ভরে গিয়েছে ঘাসে আবিল ভেড়ার পেটের মতন

কতকালের পুরোনো নতুন চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছ ওই

হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যানগুলি

একটি চিঠি হতে অন্য চিঠির দূরত্ব বেড়েছে কেবল

একটি গাছ হতে অন্য গাছের দূরত্ব বাড়তে দেখিনি আমি।।’

(বার্চ ফরেস্ট- ১৯০২)

-‘বার্চ ফরেস্ট’ ছবিতে বার্চ-গুলি ঋজু নয়; ক্ষতবিক্ষত মানুষের মতো ঈষৎ হেলে পড়া। হলুদের স্তুপের ভেতর তারা দাঁড়িয়ে রয়েছে। হলুদ, বাদামী ও গাঢ় কালছে রঙ ছবিটিকে বিষণ্ণতা প্রদান করেছে।

ক্যানভাসের নিচের অংশের থেকে উপরের অংশে বেশি গাঢ় রঙের ব্যবহার। উপরে তাদের ডালপালা একে অপরের দিকে ঝুঁকে এসেছে, তার ইশারা রয়েছে। কিন্তু নিচের দিকে তারা প্রকাশ্যে কিছুটা দূরত্বে। তা হলে কি মাটির ভেতর শিকড়ে শিকড়ে তাদের গূঢ়-সংযোগ বিদ্যমান!

‘অ্যভেনিউ’ ছবিটি তিনি সৃষ্টি করেছিলেন ১৯১২-এ।

(অ্যভেনিউ- ১৯১২)

-এ ছবিটিতেও কোনও ‘মানুষ’ নেই, অথচ মানুষের তৈরি বাড়ির চিহ্ন রয়েছে। খিলানের আকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে বার্চ-গাছের সার। মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া পথের প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বাড়ি। গাছগুলি যেন জীবন-যন্ত্রণা সহ্য করে চলা, নীরবে হাহাকার করে চলা মানুষের দল। মানুষের তৈরি ঘরবাড়ি ক্লেমটের ছবিতে অলংকার হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সে অলংকার যে কতোটা অমোঘ তার চিহ্ন পাওয়া যেতে পারে ১৯১১-তে সৃষ্টি হওয়া ‘ফার্মহাউস ইন অস্ট্রিয়া’ ছবিটিতেও।

ক্যানভাসের নিচের দিকে ক্লেমটের সিগনেচার নিয়ে অবস্থান করছে ঘাস ও ফুলের বাগান। তাঁর অতি-প্রিয় বার্চ-গাছ দু’দিক থেকে একে অপরের প্রতি আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে ঝুঁকে পড়েছে। এখানে গাঢ় সবুজের সঙ্গে ধূসর শেডস ব্যবহার করেছেন শিল্পী।

(ফার্মহাউস ইন অস্ট্রিয়া- ১৯১১)

-এবং ক্যানভাসের গভীরতর অংশে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি ও তার কেসমেন্ট যেন নীরবে তাকিয়ে রয়েছে এ প্রকৃতির দিকে। ক্যানভাসটিকে কিউবিস্ট-ঘরানার শিল্পীদের মতো ভেঙে দেবার বদলে তিনি ‘ফ্ল্যাট’ রেখে দিতে পছন্দ করলেন এ ক্ষেত্রে। যদিও প্রকৃতির বেশ কিছু ছবিতে তিনি ক্যানভাসকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে দিয়েছিলেন।

ক্লেমটের ‘প্রকৃতি’তে মানুষের উপস্থিতি এতই কম যে তা আমাদের রীতিমতো ভাবিত করে তোলে, বারবার আমরা খুঁজে পেতে চাই তার উত্তর – কেন? কেন? কেন?

ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে ইউরোপে প্রকৃতির উপর যে ধ্বংসলীলা চলেছিল তার বিরুদ্ধে হয়তো এক ধরণের প্রতিরোধ রেখে গিয়েছিলেন ক্লেমট তাঁর ছবিতে।

প্রকৃতি থেকে মানুষ’কে আরও দূরবর্তী দ্বীপ করে তুলতে হবে; মানুষ প্রকৃতির কেউ নয়। অন্তত এই ধ্বংসযজ্ঞের পর মানুষ প্রকৃতির অংশ হবার অধিকার হারিয়েছে। ক্লেমট কি তাই মানুষ’কে সচেতনভাবে সরিয়ে রেখেছিলেন তাঁর প্রকৃতির ছবিগুলি থেকে?

ক্লেমটের self-feminization, male femininity এবং ওম্যানহুড নিয়ে যে বিচিত্র ভাবনা তা তাঁর মৃত্যু-চেতনাকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছিল।

১৯১১ সালে সৃষ্টি হওয়া ‘লাইফ এন্ড ডেথ’ ছবিটির দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

(ডেথ এন্ড লাইফ- ১৯১১)

-গাঢ় ধূসর ক্যানভাসের ব্যাকগ্রাউন্ড নির্মাণ করার সঙ্গে সঙ্গে ক্লেমট মৃত্যুকে আহ্বান করলেন। ছবিটির বামদিকে একটি খুলি চেয়ে রয়েছে জীবন ও জন্মের উৎসবের দিকে। খুলিটির পোশাক রঙিন, তার পোশাকে ক্রশ আঁকা। ছবিটির ডানদিকে ফুলের বিছানায় শুয়ে রয়েছে কয়েকজন নারী ও এক শিশু। এক সুঠাম পুরুষ আলিঙ্গন করে রয়েছে এক মহিলা’কে।

ডানদিকে মহিলার সংখ্যাধীক্য আমাদের এক সময়ে ভাবিত করবে। ক্লেমট কি বোঝাতে চাইলেন যে সৃষ্টি’তে মূলত নারীর ভূমিকাই মুখ্য?নবজাতকের ছবি নিশ্চিতভাবেই জীবনের অনন্ত আনন্দের কথা মনে করিয়ে দেবে।

ছবিটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙের ব্যবহার। ব্রাশের সবল স্ট্রোকে ক্লেমট রঙের ছোপ দিয়ে ছবিটির মধ্যে ছোট ছোট বর্গক্ষেত্রের মতো কিউবিকলস নির্মাণ করেছেন। জীবনের রঙ বিচিত্র, জীবনের প্রকাশের রঙ’ও বিচিত্র।

কিন্তু ছবিটির আরেকটি মাত্রাও রয়েছে, বেশ অনেক ক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হতে পারে সদ্যজাত’কে নিয়ে কালো অন্ধকার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে নোয়া’র নৌকা। যে ফুলের শয্যায় শুয়ে রয়েছে নারী’রা এবং শিশুটি সেটি কিছুক্ষণের মধ্যে পরিবর্তিত হয়ে যাবে একটি জলযানে এবং খুলির পোশাকে আঁকা ক্রশের উপস্থিতি এ ধারণাকে পুষ্ট করবে।

যে ছবিটির মধ্যে দিয়ে ক্লেমটের ছবি ঘিরে এ সফর শেষ হয়ে সেটিকে শিল্পীর অবসেশনের সর্বোৎকৃষ্ট প্রকাশ বলে গণ্য করা হয়; ছবিটির নাম ‘ড্যান’।

মিথের ড্যান-কে ভেঙেচুরে দিয়ে ক্লিমট নিজস্ব ড্যান-কে নির্মাণ করেছিলেন ১৯০৭-সালে। ক্লিমট-এর নিজস্ব ধারণা ও অবসেশন অনুযায়ী self-contained female sextuality কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এ ছবি তার নিদর্শন।

(ড্যান- ১৯০৭)

-ছবিটিতে সোনালি আভায় মোড়া নগ্ন নারী মূর্তি দেখা যাচ্ছে। যেন সোনা গলে গলে পড়েছে তার শরীরে। ড্যান-এর শয়নভঙ্গিমা ও বোজা চোখ আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে তার মেদুর-যৌনতা। সে নিজের মধ্যে নিজের যৌনতাকে আশ্রয় করে নিদ্রা ও জাগরণের মধ্যে ভেসে রয়েছে। পুরুষ যে যৌনতার সাক্ষাৎ পায়নি তার ভেতর ড্যান যেন সে যৌনতাকে আবিষ্কার করছে এ ছবিতে।

ছবিটির মধ্যে কোনও ব্ল্যাঙ্ক স্পেস নেই; দর্শক অসহায় মাত্র। শুধু ড্যানের শয়নভঙ্গিমার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোনও উপায় নেই।

এ ছবি এক নারীর omnifruitfulness-কে ধারণ করে রয়েছে। সে নিজের ভেতর নিজে ‘সম্পূর্ণ’।

ক্লেমটের নারী-চিত্রণ সম্পর্কে অনেকে দুটি শব্দ ব্যবহার করেন, autonomous femininity।

নারীর এ বিচিত্র নার্সিসিস্টিক যৌনতার প্রকাশ ক্লেমটের ছবিতে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। তবু তিনি শুধুমাত্র সে পরিসরে নিজেকে বন্দি রাখেননি।

অথবা কে জানে, হয়তো ‘শিল্পের’ মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে নারী-সত্তা তাকেই হয়তো তিনি আজীবন খুঁজে চলেছিলেন।

শুধু কি ‘শিল্প’? ‘শিল্পীর’ ভেতরও কি সে সত্তা প্রবলভাবে কাজ করে চলে না? যেমন করে চলেছিল রবীন্দ্রনাথের গানে!

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.