সোনালি সুতো – শ্রেয়া ঘোষ

শেয়ার করুন

(১)

আগে, মানে অনেক দিন আগে, যখন ছোটো ছিলাম একেবারে, কুকুর দেখে ভয় পেতাম খুব। ভয়টা আমার মনে, তখন যে আমি, তার মনে ঢুকিয়েছিল কিঞ্জল, যাকে ওই নামে কদাপি কেউ ডাকত না, চিনত না—কিঞ্জল থেকে কিনু থেকে কানা। সেই শোধ নিতেই কি ও কুকুরকে বরাবর কুত্তা? কুকুর দেখলেই ও ঢিল কি পাথর? 

—কুত্তাগুলো হেভি হারামি। শালাদের শেষ করে ছাড়ব আমি। 

তখন ওর বয়স এগারো-বারো। আমি সাত-আট। স্কুল যেতে কি রাস্তার উলটোদিকের মুদিখানায় টুকিটাকি, সব সময়ে ও আমার সঙ্গে। তাই কুকুরগুলো আমাকে কিঞ্জলের দোসর ভেবে দেখলেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার জুড়ত। রিলে রেসের মতো সেই শব্দতরঙ্গ আমাদের গলি থেকে বড়োরাস্তা, সেখান থেকে শিবমন্দিরের গলি, তারও পর বাজার। এভাবেই। এভাবেই পাড়া বেপাড়ার সব পশুগুলিই আমাকে অব্যর্থ শত্রু বলে চিহ্নিত করেছিল।

—কখনও কি তোকে কুকুর কামড়েছিল? ওই যে জলাতঙ্ক? তেষ্টা পেলেও জল খেতে পারে না মানুষ। তারপর ছাতি ফেটে মরে। পেটে চোদ্দটা ইঞ্জেকশন। এইসব? মারিস কেন তবে ওদের দেখলেই?

—ওসব বুঝবি না তুই। মা-বাবা, ঠাম্মির খুকুমণি হয়ে থাক যেমন আছিস। গাড়িওলা বর বিয়ে করিস আর ওই লোমওয়ালা কুত্তা পুষিস। কী নাম দিবি সেই শুয়োরের বাচ্চার–কানা? 

সত্যি বলতে উচ্চারণ অযোগ্য বিশাল এক শব্দভাণ্ডারের অধিপতি হয়ে উঠেছিলাম আমি ওই সাত-আটেই, যা আমার মতো দুবেণী, বার্ষিকে প্রাইজ পাওয়া বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়ের পক্ষে অতীব বিস্ময়কর আহরণ। এবং ওই সাত-আটেই, কারও নির্দেশ বিনাই বুঝেছিলাম এই একান্ত সম্পদ গোপন রাখতে হবে। আজীবন। প্রায় শিশু বয়সে আজীবনের ব্যাপ্তির ভাবনা অসম্ভব যদিও।

রাগে পাগলের মতো হয়ে কানা যখন এই কথাগুলো আমাকে বলত, ওর কটা চোখের মণি আরও কপিশ, ফর্সা গাল টকটকে হয়ে যেত। ভূগোল বইতে পড়া আগ্নেয়গিরির কথা মনে পড়ত। অবচেতনে একটা অব্যর্থ অগ্ন্যুৎপাতের আশঙ্কা ঘন হতে শুরু করেছিল ধীরে। বাড়িতে যদিও কেউ বলেনি আমাকে কিছু, আরেকটু বড়ো হতে নিজেই এড়িয়ে গেছি কিঞ্জলকে। ডাকলে না শোনার ভান, সঙ্গে এলে এটা-ওটা বলে কাটিয়ে দেওয়া।ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিল, নোংরা কথা… ঘুমন্ত আগুন–পাহাড় জাগছে–ভুল হয়নি বুঝতে। ভয়ের চোরাস্রোত কাটাতেই সাহসের দেখনদারি। মা-বাবার কথা কানে এসেছে আড়াল থেকে—কোচিং-এ যাওয়া আছে, এদিক-ওদিক, বন্ধুদের বাড়ি-টাড়ি। সব বন্ধ করে ঘরে তো আটকে রাখতে পারব না খুকুকে। ওর সঙ্গেও যখন ঘোরাঘুরি করেছে বারণ করেছি কি? সরে এসেছে নিজেই যখন ভালো মন্দের ফারাক বোঝার বয়স হয়েছে। আমার বুক দুরদুর করেছে। অ্যাসিড ট্যাসিড কিছু বা আরও খারাপ সম্ভাবনা, উড়িয়ে দিতে পারিনি। হাতে একটা স্মার্ট মোবাইল থাকলে অনেক কিছুই…।  

(২)
  
ঘটনাটা সত্যি। কী করে জানি না। কোচিং থেকে ফিরছিলাম। একা নয়, বিপাশা, পিউ, কবিতারাও ছিল।

 —ওই পিছু নিয়েছে কানাটা। আমি বলেছিলাম, পা চালা। কিঞ্জল সাইকেল হাঁটিয়ে একটু দূরে। নাছোড়। নাছোড় এঁটুলি। রিক্সাটা উলটো দিক থেকে খুব ধীরে ধীরে। মাইক নিয়ে একটা ছেলে কিছু বলছিল। কান করে শুনিনি। সবটুকু শরীর আর মন শুধু কিঞ্জলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টায়। ধাক্কা খেতাম উলটো দিক থেকে আসা রিক্সাটায়। শেষ মুহূর্তে হ্যাঁচকা টান মেরে সরিয়েছে বন্ধুরা। বোধবুদ্ধি অসাড় ওই কয়েকটা মুহূর্ত। চেতনা ফিরল ওই মাইকের কথাগুলোতেই। হালকা বাদামি, ঘাড়ে একটা সাদা রাইট চিহ্নের মতো, একটা পা খুঁড়িয়ে হাঁটে, গোল্ডি বলে ডাকলেই লেজ নাড়ে, পেটে বাচ্চা… কিছু ভাবতে হয়নি। ঘোরের মধ্যে বন্ধুদের হাত ছাড়িয়ে রাস্তার মাঝখানে দৌড়ে এসে দাঁড় করিয়েছিলাম রিক্সাটা। হাঁপাচ্ছিলাম। ঘামছিলাম। চেঁচিয়ে বলেছিলাম—কম-বেশি দু ঘণ্টা মতো হবে, পড়তে আসার সময়ে। জলট্যাঙ্কির কাছে রিক্সা স্ট্যান্ডে। তারপর নিজেও উঠে পড়েছিলাম রিক্সায়। হয়তো কিঞ্জলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে নেবার সুযোগটা কাজে লাগানোর জন্যেই শুধু। কিন্তু গোল্ডি একইভাবে বসেছিল ওখানে। বন্ধুরা পরে অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিল, আমরা তো এলাম এক সঙ্গেই।জল ট্যাঙ্কির দিকে কখন গেলি? 

(৩)

হর্স হুইস্পারারদের ব্যপারটা জেনেছি অনেকদিন পর। ততদিনে পুরোনো এইসব স্মৃতি হালকা একটা দাগের মতো শুধু। দাগ বা জরুল। জরুল, যা নাকি জন্মদাগ। আবছা হয়েও থেকে যাবে সমস্ত জীবন। মিলিয়ে যাবে না। তদ্রূপ কিছু একটা, ছাইচাপা। পরে একদিন ছাইগুলো উড়ে গেছে। সাইকোলজি নিয়েই গ্র্যাজুয়েশন, পোস্ট গ্র্যাড। বিদেশেও সেমিনার, ট্রেনিং। ডিগ্রীগুলো দরকার ছিল পেশাটা নিয়ে সিরিয়াসলি এগোতে।  

আত্মবিশ্বাস তৈরি হচ্ছিল। সেই প্রথম দিন থেকেই। গোল্ডি হারিয়ে গেছে এটুকু শুনেই আমি দেখতে পেয়েছিলম ওকে। দেখাটা অলীক ছিল না আমার কাছে, সেই মুহূর্তে। তাই দৌড়ে গিয়ে সন্ধান দিয়েছিলাম। এই ঘটনাটার কোনো ব্যখ্যা দিতে পারেননি কেউই। সম্ভাব্য সূত্র একটা আমিই খুঁজে নিয়েছি। হারিয়ে গিয়ে যে সংকেতগুলো নিঃসরণ হয়েছে স্বতই ওর মন থেকে, কোনোভাবে ধাক্কা দিয়েছে আমার চেতনায়। এতাবৎ ইন্দ্রিয়গুলি যেন ঘুমিয়েছিল। হঠাৎ চেতনায় ফিরেছে। নতুন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শব্দ, দৃশ্য ধরতে পারছে তারা। অচেনা সংকেতগুলি ধরা দিচ্ছে আমার বোধে। কাঁটা দিয়ে উঠেছে গায়ে। আমার দম আটকে এসেছে। শরীরের সব স্বেদগ্রন্থি প্রস্রবণের ন্যায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বন্ধ চোখের সামনে ফুটে উঠেছে ছবিগুলো। ছবিগুলো আমি দেখছি না। গোল্ডি দেখছে বা সন্টু বা কালু বা নেড়ি। পৌঁছে দিচ্ছে ওরা আমার কাছে। কোনো অস্বাভাবিকতা আমি তো খুঁজে পাই না। যেমন টেলিভিশনের ছবি দেখ না তোমরা? গান শোনো না রেডিওতে? এফ এম এ গান, চটুল ইয়ার্কি? কত কত তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। কার বোধে কে ধরা দেবে, কে কাকে স্পর্শ করবে, স্পর্শে ম্যাজিক হবে কোন্ মুহূর্তে কেউ জানে না। প্রত্যেকের রিসেপশন পৃথক। এই যে কমলা ফুল ছাপ লং স্কার্টের রঙটা আমি যেমন দেখছি, তুমি কিন্তু তার থেকে একটু আলাদা। অথবা স্বাদের কথাই ধরো। কিঞ্জল কী অসম্ভব ঝাল খেতে পারত। আর আমার জিভ জ্বলে যেত, চোখ লাল হয়ে যেত। আর স্মৃতি… আজ পঁচিশ বছর পরেও ওর সঙ্গে কাটানো সময় থেকে একটা সেকেন্ডও হারায়নি আমার মন থেকে। আবেগ নেই, একটা অবসন্ন শূন্যতা। অথচ কিঞ্জলের মনে সময়টা আবছা। আর সেই আবছা স্মৃতি ওর মাথায় লুকিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরিটাকে, এখন যা ঘুমিয়ে পড়েছে, কোন্ কম্পাঙ্কের তড়িচ্চুম্বক তাকে পুনরায় জাগিয়ে তুলবে, ভয়ংকরভাবে জাগিয়ে তুলবে, তারও ক্যালকুলেশন আছে। আমি জানি। একা আমি-ই। 

এই সব কথাগুলো কিছু নিজের সঙ্গে, কিছু হারানো কুকুরের সন্ধানে আমার কাছে আসা মানুষগুলোর সঙ্গে।

(৪)

—কোনও সাধারণ বুদ্ধির মানুষ এসব বিশ্বাস করবে বলে মনে করেন আপনি?

—আমার কাজ তো সাধারণ বুদ্ধির বাইরে যা কিছু তা নিয়েই। আমি ফেসবুকে তোমাদের পোস্ট দেখেছি কখনও। পুরোটাই যে ভান, তা বুঝতে অসাধারণ বুদ্ধি আমার লাগেনি। জন্মদিনে কেক কাটছ, জামা পরিয়েছ, চোখে কালো চশমা দিয়ে ছবি তুলেছ কেন? ভ্যাক্সিনেশন পুরো করিয়েছ ওর? বাড়িতে লোক এল আর ওকে বারান্দায় আটকে রেখেছিলে? রেগে গিয়ে ও হিসি করেছিল বলে সে রাতে খাবার দাওনি? এই সব পোস্ট করেছ ফেসবুকে। লাইক পেয়েছ। দেখতে পেয়েছ। দেখতে পাওনি আমার অভিসম্পাত। আমার শৈশব থেকে জমিয়ে রাখা অশ্লীল খিস্তির বন্যা ছোটাই ওদের মুখের ওপর। ওরা কুঁকড়ে যায়। আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কটা চোখ আরও কপিশ হয়ে ওঠে। কানা হাততালি দিয়ে ওঠে। তোমাদের সাধারণ বুদ্ধিকে আমি শয়তানি বলি। তোমাদের বিশ্বাসে আমি থুতু দিই। থু, থু, থু। ওরা পকেটে রুমাল হাতড়ায়। সে হাত অসাড় হয়ে যায়। ওদের গাল বেয়ে, মুখ বেয়ে ঘন তরল নামতে থাকে। নিজেকে নিজে ঘেন্না পাচ্ছ তো? প্রাণকে ঘেন্না করেছ। শাস্তি পেতেই হবে। শাস্তি আমি দেব।

মাণিক নাম দিয়েছিলেন বাচ্চাটার। ও সাড়া দিয়েছে কখনও? খেয়াল করেছিলে? কবে থেকে খাওয়া বন্ধ করেছিল সেটাও জানো না। আজ আসতে হল আমার কাছে। আসতে হতোই। তুমি জানতে না। আমি জানতাম।

আমি রেগে উঠি, সেই শরীরি রাগ ওদের ত্রস্ত করে, ওদের মাথা নীচু হয়ে যায়। ক্রোধের তাপ একটা অচেনা কম্পাঙ্কে ওদের ছুঁয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারি। সেই তাপ ওদের সন্দেহ আর কূট বুদ্ধিকে ঝলসে দেয়। দু পেয়ে নিষ্ঠুরতাকে ঘায়েল করার টেকনিক বলতে তো এটুকুই।

(৫)

—মানুষের মনের কথা বুঝতে পারেন? কুকুর বিড়ালের সঙ্গে যেমন কমিউনিকেট করতে পারেন, মানুষের সঙ্গে?
 
—কুকুরের সঙ্গে কথা বলা যায়। মুখের ভাষার তোয়াক্কা করতে হয় না। দূরত্ব থাক যত খুশি। দেখা, শোনা কিছুই আটকায় না। কেন জানো? ওরা মনের ভাবকে মাস্কিং করে না। দুঃখ, আনন্দ, ভয়, রাগ—সব জেনুইন। তোমাদের মতো মেকি নয়। মনটা পরিষ্কার পড়তে পারবে। তুমি এসেছ হারিয়ে যাওয়া কুকুরের সন্ধানে। বুন্নি হারিয়ে গেছে। ওকে দেখিনি তো আমি কোনদিন। ওর অস্তিত্বটুকুও তো জানতাম না আমি এতাবৎ কাল। কিন্তু তোমরা ছবি দেখালে। নাম, লিঙ্গপরিচয়, বয়স। আমার পাঠানো সংকেত ধাক্কা মারছে ওকে। সময় লেগেছে। অচেনা আমি। সংকেতগুলো চিনতে তাই সময় লেগেছে। কিন্তু ভাব হয়ে গেল আমাদের। ওর মনের কথা পৌঁছে গেল। গোল্ডেন কর্ড একটা সেতুর মতো জুড়ে দিল আমাদের। আমার সব মন আর প্রাণ একত্র করে ডাক পাঠিয়েছি। আমাকে বিশ্বাস করেছে ও। তাই পালটা সিগনাল পাঠিয়েছে আমাকেও। যা দেখেছি, শুনেছি যা বলেছি তোমাদের। তোমরা খুঁজে পেয়েছ ওকে।

হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজগুলো আসে। আসতেই থাকে। 

—ভাইয়া। আন্দাজ আড়াই বছর। ছেলে কুকুর। একটা কান ভাঙা। স্টেরিলাইজেশনের পর ক্যাম্প থেকে নিখোঁজ। অথবা বিস্কুটি। তিন বছরের মেয়ে কুকুর। এক বছর পূর্ণ হবার আগেই নিউটার করা। তিন দিন খাওয়া বন্ধ ছিল। তারপর হারিয়ে গেছে। গল্পগুলো ওরাই বলে আমাকে। আধখাপচা হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলো শেষ করি আমি। ডগ কম্যুনিকেটর। 

বুন্নি, কিটু, পুতুল, লালি, পাণ্ডে কত জনকে দেখতে পেয়ে খুঁজে দিয়েছি। অবিশ্বাস্য সব সাফল্যের গল্প। লোকমুখে ছড়িয়ে গেছে। এই কলকাতায় বসে খুঁজে দিয়েছি হারানো কুকুর পুরী থেকে, নয়ডা থেকে, দেরাদুন থেকে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দুঃখের গল্প, আতঙ্কের গল্প, অভিমানের গল্প। সব শুনতে পাই। লুকিয়ে কোথায় বসে আছে, দেখতে পাই। চারটে পা থাকতে হবে শুধু। মেরুদণ্ড হতে হবে অনুভূমিক। এটুকুই শর্ত সফল একটা কমিউনিকেশনের।

এসব কথা হারানো কুকুরের সন্ধানে আমার কাছে আসা মানুষগুলোর সঙ্গে। প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করেছি স্পষ্ট। তবে তা শুনতে পেয়েছে সকলে। আর কিছু কথা, আমার ব্যর্থতার কথা, ক্রোধ আর কান্না লুকোনো আছে অন্দরে। কারও সাধ্য নেই নাগাল পাবার। গোল্ডেন কর্ডের অদৃশ্য একটা গোপন সেতু নির্মাণ চলছে সন্তর্পণে। শুরু থেকে শেষ অব্দি পথটার নক্সা রেডি।

বুন্নি, কিটু, পুতুল, লালি, পাণ্ডে, সুখিয়া – হারিয়ে গিয়েছিল। চেনা জগতটা থেকে ছিটকে গিয়ে ফিরতে পারছিল না। ফিরিয়ে এনেছি আমি ওদের। অচেনা জগতটার অনুপুঙ্খ বিবরণ পাঠিয়ে দিয়েছে আমাকে। ফ্লাইওভারের নীচে ঘাপটি মেরে, চাউমিনের দোকানের পিছনে আবর্জনার স্তূপে,নতুন থানার উলটোদিকের অটোস্ট্যাণ্ডের আড়ালে। নিখুঁত পথনির্দেশ—দুধের ডিপো পেরিয়ে, বাচ্চাদের ইস্কুলের পাশ দিয়ে চলে এসো। খিদেয় আর পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পার্কে স্ট্যাচুর তলায় লুকিয়ে থেকে রুটম্যাপ পাঠিয়েছে। উলটোদিকের ভাতের হোটেলের উচ্ছিষ্ট খেতে রাস্তা পেরিয়ে যেতে হয় গভীর রাতে, এলাকার কুকুরগুলো ঘুমোলে। ওদের হারিয়ে যাওয়া, লুকিয়ে থাকার প্যাটার্নটা বুঝতে কেটে গেছে দিনের পর দিন। কেটে গেছে অজস্র ঘুমহীন রাত। তৈরি করেছি নিখুঁত মডেল একটা।

তারপর খেলার দিকটা উলটেছি। এবার প্রথম দানটা আমার। নাম, বয়স, চেহারা—একটু একটু করে চলেছে নির্মাণপর্ব। তৈরি হয়েছে কুত্তা। কানা কুত্তা। বুড়ো মতো। হাত পা খসখসে। চুলকে চুলকে ঘায়ের মতো। গাল ভাঙা। চোখের নীচে গভীর কালশিটে। একটা পা টেনে হাঁটে। লক আপে রড দিয়ে পিটিয়েছিল যেবার, তারপর থেকে। ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটে। হাঁটার সময়ে নুয়ে পড়ে পিঠটা। মেরুদণ্ড ভূমির সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল। দূর থেকে মনে হবে চারপেয়ে জীব একটা। কটা চোখ। তবু সেই কটা চোখ রেগে গেলে জ্বলে ওঠে এখনও। দেখেছি আমি। এতগুলো বছর লেগে গেল খুঁজে পেতে।

রাত নিঝুমে সিগনাল পাঠাই আমি। একের পর এক। অবিরাম। কানা… কানা… কিঞ্জল… আয়। সোনালি সুতো জড়িয়ে গেছে। হাতে, পায়ে, মুখে। সোনালি সুতোয় জড়িয়ে গেছে কানা। সাড়া দিতেই হবে। কানাকে সাড়া দিতেই হবে। আজ নয় কাল। ভাঙাচোরা অসম্পূর্ণ কমিউনিকেশনটা শেষ করতেই হবে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *