/ / শারদসংখ্যার একাল-সেকাল – প্রবীর মিত্র

শারদসংখ্যার একাল-সেকাল – প্রবীর মিত্র

শেয়ার করুন

প্রতি বছর পুজোর বেশ কয়েকদিন আগে থাকতেই ঢাকিরা দূরদূরান্ত গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে ঢাক বাজানোর বরাত পাবার আশায়। কিন্তু তারও কিছুদিন আগে থেকেই শরতের ভোরে শিউলি গাছের নীচে যেমন একটা একটা করে টুপটুপ করে শিউলি ফুল পড়তে থাকে ঠিক সেইভাবে বিভিন্ন পাবলিকেশন হাউস থেকে প্রকাশিত হতে থাকে একটার পর একটা নানাধরনের পুজোবার্ষিকী। ছোটোবেলায় আমার জন্য বরাদ্দ ছিল আনন্দমেলা ও দেব সাহিত্য কুটিরের পুজোবার্ষিকী। আমাদের যিনি কাগজ দিতেন তাঁকে বলাই থাকত শারদীয় আনন্দমেলা বা দেব সাহিত্য কুটিরের পুজোবার্ষিকী বেরোলেই যেন সেটি দিতে কোনো দেরি না হয়, আর সেটা প্রথমে হাতে নিয়েই আগে নতুন বই-এর গন্ধ শুঁকতাম যা আজও ত্যাগ করতে পারিনি, তারপর ডুবে যেতাম আগমনীর আনন্দপাঁজিতে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী, সমরেশ মজুমদার, সমরেশ বসু, সুচিত্রা ভট্টাচার্য, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শিবরাম চক্রবর্তী ইত্যাদি আরও বহু লেখকের অসাধারণ সব নানাধরনের গল্প ও উপন্যাস, তার সাথে অবশ্যই মন ভরিয়ে দিত অসাধারণ কিছু রঙিন বা সাদা কালো ইলাস্ট্রেশন, গল্পের চাহিদা অনুযায়ী। সেই সময় আমার আবার একটু আধটু ছবি আঁকার ঝোঁক থাকায় নারায়ণ দেবনাথ, বিমল দাস, দিলীপ দাস, শৈল চক্রবর্তী, দেবাশিস দেব, সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, ময়ূখ চৌধুরী বা তুষার চ্যাটার্জি প্রমুখ শিল্পীদের আঁকা আমার কাছে একটু বাড়তি গুরুত্ব পেত। সবচাইতে মুগ্ধ করত দেব সাহিত্য কুটিরের নারায়ণ দেবনাথ ও আনন্দমেলায় বিমল দাসের নিখুঁত ইলাস্ট্রেশন। এরপর বই-এর বাজারে একে একে প্রকাশিত হত বিনোদনমূলক শারদীয়া যেমন ‘নবকল্লোল’, ‘প্রসাদ’, ‘উল্টোরথ’, ‘আনন্দলোক’। অপরদিকে সাহিত্য পত্রিকা বলতে ‘দেশ’, ‘বর্তমান’, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ এবং ‘স্টেট্‌সম্যান’ পত্রিকাও প্রকাশ করত তাদের ইংরেজি ও বাংলা অ্যানুয়াল ইস্যু। অন্যদিকে রাজনৈতিক দৈনিক মুখপত্রগুলিও হাত গুটিয়ে না বসে থেকে তাঁরাও প্রকাশ করতে থাকলেন তাদের শারদীয়া ইস্যু, যেমন ‘গণশক্তি’, ‘দেশহিতৈষী’, ‘কালান্তর’ ইত্যাদি। এই বঙ্গদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে এরকম বিশেষ ঋতুকালীন সাহিত্যপত্রিকা আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। আজ শারদসংখ্যার সেকাল আর একাল নিয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক।

পুজো উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রথম কবে প্রকাশিত হয়েছিল সে সম্বন্ধে যতদূর জানা যায়, ব্রাহ্ম সমাজের কুলপতি কেশবচন্দ্র সেন ‘ভারত সংস্কার সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সভার সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সুলভ সমাচার’-এর একটি সংস্করণ ‘ছুটির সুলভ’ প্রকাশ করেছিল ১৮৭৩ সালে পুজোর সময়। অবশ্য আলাদা করে পুজোসংখ্যা বলে এতে কোনও উল্লেখ ছিল না, কারণ সম্পাদক কেশবচন্দ্র সেন নিজে ছিলেন ব্রাহ্ম তাই তিনি এইসব মূর্তি পুজোপদ্ধতির বিরুদ্ধে ছিলেন। এই ‘ছুটির সুলভ’ প্রকাশিত হয়েছিল ১২৮০ বঙ্গাব্দের ১০ আশ্বিন, বৃহস্পতিবার (২৫/০৯/১৮৭৩)। দাম ধার্য হয়েছিল এক পয়সা। প্রকাশিত হবার ঠিক দশদিন আগে অর্থাৎ ১লা আশ্বিন এই বিশেষ সংখ্যাটির একটি খুব সুন্দর বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল ‘সুলভ সমাচার’ পত্রিকায়।

‘ছুটির সুলভ!!! ছুটির সুলভ!!! 
 আগামী ছুটি উপলক্ষে সুলভের বিশেষ একখণ্ড বাহির হইবে।
উত্তম কাগজ, উত্তম ছাপা। দাম কিন্তু ১ পয়সা।
মজা করিয়া পড়িতে পড়িতে ঘরে যাও। একটা পয়সা দিয়ে সকলের কিনিতেই হইবে।
দেখ যেন কেউ ফাঁকি পোড় না।’

‘সুলভ সমাচার’ পত্রিকার এই বিজ্ঞাপনটিই পুজো সংখ্যার প্রথম বিজ্ঞাপন হিসাবে ধরা যেতে পারে। অনেকরকম মনোগ্রাহী রচনা আর ছবিতে সাজানো ছিল এই প্রথম পুজো সংখ্যাটি যা প্রকাশের সাথে সাথেই তৎকালীন পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে দেয়। এই সংখ্যার সূচিপত্রে ছিল সাহিত্য বিষয়ক লেখা, সমাজ সচেতনতা বিষয়ক লেখা, বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা এবং তার সাথে তৎকালীন সমাজের উপর লেখা একটি সত্য ঘটনা যা পরিবেশিত হয়েছিল একটু হাসি আর মজার মোড়কে।

‘সুলভ সমাচার’ বেশিদিন না চললেও এর আইডিয়া অনুসরণ করে পুজোর সময় ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’–এ প্রকাশিত হত দুর্গাপুজোর উপর বেশ কিছু পদ্য। অবশেষে বাংলার ১৯১৩ সালে ‘মাসিক ভারতবর্ষ’ পত্রিকা তাদের আশ্বিন মাসের সংখ্যাটি একটু বৃহৎ আকারে অনেক খ্যাতিমান লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ করে শারদীয়া সংখ্যারূপে প্রকাশ করে। ওই সংখ্যায় লিখেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, নিরুপমা দেবী প্রমুখ তৎকালীন লেখকগণ। ১৯২২ সালে ‘মাসিক বঙ্গবাণী’ নামে একটি পত্রিকা তাঁদের পুজো সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করে অমরকথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’ গল্পটি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার দু’দিন পরেই আত্মপ্রকাশ যে দৈনিকের, সেই ‘বসুমতী’ পত্রিকা ১৯২৫ থেকে ১৯২৭ পর পর তিনবছর পূজাসংখ্যা হিসেবে ‘বার্ষিক বসুমতী’ প্রকাশ করে। সম্পাদক ছিলেন সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সত্যেন্দ্রকুমার বসু। মাসিক বসুমতী পত্রিকার আলাদা শারদীয়া সংখ্যা পাঠক মহলে বিশেষ সাড়া ফেলে দেয়। ‘মাসিক বসুমতী’ সর্বপ্রথম তাদের পুজোসংখ্যাতে প্রকাশ করে একটি উপন্যাস যা আগে কোনো শারদীয় পত্র পত্রিকায় দেখা যায়নি। তিন বছর ধরে এনারা শারদীয়া সংখ্যায় বিভিন্ন স্বাদের উপন্যাস ছেপেছিলেন এবং উপন্যাস লেখকদের তালিকায় ছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, অনুপমা দেবী, দেবেন্দ্রকুমার বসু প্রমুখ লেখকলেখিকাগণ। বসুমতীর ১৯২৭ সালের পুজোসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক, ‘পরিত্রাণ’ এবং চারুচন্দ্র সেনগুপ্তের আঁকা মা দুর্গার একটি রঙিন ছবি। ঠিক সেইসময় ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব পত্রিকা ‘ভারতী’-র পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয় তাদের পুজোসংখ্যা যার দাম ছিল এক টাকা। এই সংখ্যার প্রধান আকর্ষণ ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘ষোড়শী’, যেটির নাট্যরূপ দিয়েছিলেন হাসির রাজা শিবরাম চক্রবর্তী এবং পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘ভারতী’ নামের একটি কবিতা। স্বরলিপিসহ দুর্গা-চণ্ডী এবং শিবগীতি রচনা করেছিলেন সরলা দেবী। মূলত ঠাকুরবাড়িতে একটা ব্রাহ্ম আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও সরলা দেবীর এই লেখা ছাপা হয়েছিল। এছাড়াও এই পত্রিকায় ছিল রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি ও লালকালিতে ছাপা প্রাচীন দুর্গার ছবি।

দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা দুই পাতার প্রথম শারদীয়া পত্রিকা প্রকাশ করে ১৯২২ সালে যা বিনামূল্যে দৈনিক কাগজের সাথে দেওয়া হয়েছিল। পুজোসংখ্যা হিসাবে এর আলাদা গুরুত্ব বোঝানোর জন্য পৃষ্ঠার লেখাগুলি লালকালিতে ছাপা হয়েছিল। বেশ কয়েকবছর বিনামূল্যে পুজোসংখ্যা কাগজের সাথে বিতরণ করার পর ১৯২৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা প্রথম আলাদাভাবে ৫৪ পাতার একটি পুজোসংখ্যা প্রকাশ করে এবং দাম ছিল দুই আনা কিন্তু সেটা ছিল ছবিহীন, লালকালিতে ছাপা। কোনো উপন্যাসের বালাই ছিল না, শুধুই প্রবন্ধ। বলাই বাহুল্য এই পুজোসংখ্যাগুলোকে পাঠকমহল একেবারেই নেয়নি। অবশেষে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে আনন্দবাজার ১৯৩৫ সালে তাদের পুজোসংখ্যার খোলনলচে পালটে দিয়ে প্রকাশ করে একেবারে নতুন ধরনের পুজোসংখ্যা। এবার দাম ধার্য হল আট আনা। সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রবন্ধ লিখেছিলেন তখনকার দিনের খ্যাতনামা লেখক ও মনীষীরা। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, স্যার যদুনাথ সরকার, আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিধুশেখর শাস্ত্রি, অন্নদাশঙ্কর রায় প্রমুখ ব্যাক্তিগণের লেখা এই সংখ্যাকে সমৃদ্ধ করেছিল। নরেন্দ্র দেব নামে এক প্রাবন্ধিক লিখেছিলেন তৎকালীন বাংলা সিনেমার উপর একটি লেখা। এই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের একটি আশীর্বাদী কবিতা এবং তার সাথে ছিল সজনীকান্ত দাশ, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখের কবিতা এবং ছিল নন্দলাল বসুর আঁকা বেশ কয়েকটি ছবি। শোনা যায়, প্রায় ত্রিশ হাজার কপি বেশ কয়েকদিনের মধেই নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৯ নাগাদ আনন্দবাজার তাদের পুজোসংখ্যার জন্য ছাপে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘শহরবাসের ইতিকথা’ এবং তার পাশাপাশি ছোটোগল্প লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন একটি বড়ো গল্প, ‘রবিবার’। গল্পটি যখন রবীন্দ্রনাথ লেখেন তখন তাঁর খুব অর্থকষ্ট চলছিল আর সেই অবস্থার কথা তিনি অনুজ কবি বুদ্ধদেব বসুকে একটা চিঠি লিখে জানিয়েও ছিলেন। “অর্থের প্রয়োজনে আজ আমাকে গল্প লিখতে হচ্ছে, অর্থ উপার্জনের অন্য কোনও পথ জানিনে–বিপদে পড়লে সরস্বতীকে পাত্তা করে লক্ষ্মীর দরজায় কড়া নাড়তে হয়, এখন যে লেখাটি লিখছি সেটি বিক্রি হবে এবং ভবিষ্যতে আমাকে আরও লিখতে হবে সেই একই কারণ। ব্যবসাটা অর্থকরী নয় কিন্তু কারও কাছ থেকে ভিক্ষা চাইবার থেকে অন্তত ভদ্র।” আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি বন্যাপীড়িতদের সাহায্যার্থে দান করেছিলেন।

পরের বছর অর্থাৎ ১৯৪০ সালে আনন্দবাজারের শারদীয়া সংখ্যায় ছাপা হয় রবীন্দ্রনাথের ‘ল্যাবরেটরি’ উপন্যাসটি, যদিও পরবর্তীকালে ‘ল্যাবরেটরি’ উপন্যাস হিসাবে মান্যতা পায়নি কিন্তু আনন্দবাজারে এটি উপন্যাস হিসাবেই ছাপা হয়েছিল। অত্যন্ত অসুস্থতার মধ্যে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই ‘ল্যাবরেটরি’ যখন শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তখন রবীন্দ্রনাথ খুব খুশি হয়েছিলেন এবং ডাক্তারের বারণ সত্ত্বেও শারদসংখ্যাখানি হাতে নিয়ে পরম মমতায় আগাগোড়া চোখ বুলিয়েছিলেন। ১৯৪১ সালের শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায় যখন রবীন্দ্রনাথের ‘প্রগতি সংহার’ গল্পটি ছাপা হয় তখন তিনি কয়েকমাস আগেই ইহলোক ত্যাগ করেছেন। আনন্দবাজার ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছু শারদীয়া পত্রিকায় লিখেছিলেন যেমন ‘বিজলী’, ‘বাতায়ন’, ‘যুগান্তর’ ইত্যাদি।

আনন্দবাজার হাউসের আর একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যপত্রিকা হল ‘দেশ’। ১৯৪৩ সালে দেশ পত্রিকা যখন তাদের প্রথম পুজোসংখ্যা বের করে তখন এটি সাধারণ সংখ্যার থেকে একটু বেশি পাতা যুক্ত করে প্রকাশিত হত। ১৯৪৯–এ দেশ পত্রিকা তাদের পুজোসংখ্যায় প্রথম উপন্যাস ছাপে, সুবোধ ঘোষের ‘ত্রিযামা’, যেটি চলচ্চিত্রায়িত হয় ১৯৫৬ সালে উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের অসাধারণ অভিনয়সমৃদ্ধ করে। বেশ কয়েকবছর চলার পর দেশ-এর প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক সাগরময় ঘোষ ১৯৬৫ সাল নাগাদ স্থির করেন এবার থেকে প্রত্যেক পুজোসংখ্যায় তিনটি করে উপন্যাস থাকবে। উপন্যাস লেখার দ্বায়িত্ব পড়ল সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমরেশ বসু এবং তরুণ সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়–এর উপর। প্রকাশিত হল সুনীল গাঙ্গুলির প্রথম উপন্যাস, ‘আত্মপ্রকাশ’, দেশ পত্রিকাতে। সেই শুরু তারপর আমৃত্যু সুনীলবাবু দেশ পত্রিকা ও আনন্দবাজার পত্রিকার জন্য লিখে গেছেন কালজয়ী সব উপন্যাস, ছোটোগল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী এবং অবশ্যই কবিতা। দেশ পত্রিকায় এর আগে ছোটোগল্প লিখলেও সেই বছর শারদীয়া দেশ পত্রিকায় ছাপা সমরেশ বসু ‘বিবর’ নামের উপন্যাসটি সমগ্র পাঠকমহলে একেবারে আলোড়ন ফেলে দিল। এক শ্রেণীর বাঙালি পাঠক তাঁকে অশ্লীল লেখক হিসাবে দেগে দিয়েছিলেন। সব প্রচলিত প্রথা ভেঙে দিয়ে সমরেশবাবু লিখেছিলেন এই বিতর্কিত উপন্যাসটি কারণ এর আগে অন্য কোনো শারদীয়া সংখ্যা এমন বিতর্কিত লেখা ছাপানোর সাহস দেখায়নি। পরবর্তী সংখ্যার দেশ পত্রিকাগুলোতে ‘বিবর’- এর পক্ষে বিপক্ষে প্রচুর চিঠি ছাপা হয়েছিল। সর্বপ্রথম চিঠিটি ছিল সন্তোষকুমার ঘোষ-এর লেখা এবং সেটা ছিল এই উপন্যাসের পক্ষে। ‘বিবর’- এর জনপ্রিয়তা এমন জায়গায় চলে গিয়েছিল যে আমরা দেখতে পাই মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’-তে চাকুরিপ্রার্থীকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, “‘বিবর’ পড়েছ, বাই সমরেশ বোস?” অর্থাৎ এই শারদ উপন্যাসগুলি সাহিত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটা সামাজিক পরিসরে প্রবেশ করে। ‘বিবর’ সত্যি কিংবদন্তিতুল্য ব্যবসা করে ও রীতিমতো বিখ্যাত হয়ে যায়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যেমন দেশ পত্রিকায় তাঁর ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাসের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঠিক তেমনি সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘পায়রা’ আত্মপ্রকাশ করে শারদীয়া দেশ পত্রিকায়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’ প্রকাশিত হয় শারদীয়া দেশ পত্রিকার পাতায়, অপরদিকে সমরেশ মজুমদারের প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’ প্রকাশিত হয় সেই দেশ পত্রিকাতেই, তবে সেটি শারদীয়া সংখ্যায় নয় দেশ-এর বিশেষ বড়দিন সংখ্যায়। তবে এর নেপথ্যে একটি মজার ঘটনা ছিল। সমরেশবাবুর এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় যে তিনি যখন প্রায় নিশ্চিত যে দেশ পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় তাঁর প্রথম উপন্যাস ছাপা হবে তখন একদিন সম্পাদক সাগরময় ঘোষ তাঁকে ডেকে পাঠালেন দেশ পত্রিকার দপ্তরে। সাগরময়বাবু বললেন, “মনে করুন আপনি সাগরময় ঘোষ, দেশ পত্রিকার সম্পাদক, আর আমি সমরেশ মজুমদার। শারদীয়া ‘দেশ’ পত্রিকায় পাঁচটা উপন্যাস ছাপা হবে তার সাথে আমার লেখা প্রথম উপন্যাস, ঠিক এই সময় আপনার হাতে একটা অপ্রকাশিত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি এলো এবং সেটা যার পাণ্ডুলিপি তাঁর এই বছর জন্মশতবর্ষ এবং তাঁর নাম যদি অমরকথা শিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হয় তাহলে আপনি কী করবেন আমার লেখা প্রথম উপন্যাস ছাপবেন না অমরকথা শিল্পীর অপ্রকাশিত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি ছাপবেন? এর উত্তরটা আপনি যদি দেন তাহলে আমি সেই মতো সিদ্ধান্ত নেব”, বলে থামলেন দেশ পত্রিকার প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। সব শুনে সমরেশবাবু ফাঁপরে পড়লেন, তিনি ধীরকণ্ঠে বললেন, “অবশ্যই অমর কথাশিল্পীর অপ্রকাশিত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি ছাপবেন”, এই কথা বলে তিনি দেশ পত্রিকার দপ্তর থেকে সটান বেরিয়ে এসেছিলেন, তিনি বড্ড আশা করেছিলেন যে তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস দেশ পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হবে। অবশেষে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশিত হল শারদীয়া দেশ পত্রিকা এবং সেখানে সমরেশ-এর বন্ধুরা দেখলেন সমরেশ-এর লেখা উপন্যাস সেখানে নেই। এরপর নানা প্রশ্নের সন্মুখীন হলেন সমরেশ। এরপর মাসদুয়েক পর আনন্দবাজার পত্রিকার ‘দেশ’ পত্রিকার বিশেষ বড়দিন সংখ্যার একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল সমরেশবাবুর। বিভিন্ন লেখার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে একটিমাত্র উপন্যাসের নাম, ‘দৌড়’, লেখক সমরেশ মজুমদার এবং তার সাথে সেই প্রথম ‘দেশ’ পত্রিকায় রঙিন ইলাস্ট্রেশন থাকছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সমরেশ, আবার ভালো করে খুঁটিয়ে পড়লেন বিজ্ঞাপনটা। ১৯৭৬ সালে ‘দেশ’-এর সেই বিশেষ বড়দিন সংখ্যায় তাঁর প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পর সমরেশ গিয়েছিলেন সম্পাদকমশাই-এর সাথে দেখা করতে। সাগরময়বাবু সেদিন সকৌতুকে বলেছিলেন, “কি ভাই সমরেশ, এখন খুশী তো? খুব রেগে গিয়েছিলে তো আমার উপর? একটা ব্যাপার ভেবে দেখ, পুজোসংখ্যা ‘দেশ’-এ তোমার উপন্যাস বেরলে–মোট পাঁচটা উপন্যাস অর্থাৎ চারটে উপন্যাস পড়ার পর পাঠক তোমার উপন্যাস পড়ত, আর এই বিশেষ সংখ্যায় সবেধন নীলমণি তোমার ‘দৌড়’ উপন্যাস। লোকে পড়তে বাধ্য হবে ভাই”। সমরেশবাবুর কথায় জানা যায় সেদিন সাগরময়বাবুর এই সুন্দর যুক্তি তাঁকে বেশ ধাক্কা দিয়েছিল।

এরপর শঙ্করের ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’, রমাপদ চৌধুরীর ‘খারিজ’ ইত্যাদি কালজয়ী উপন্যাসগুলি শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায় বিভিন্ন সময় ছাপা হয়েছিল এবং যেগুলি পরে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে বিভিন্ন পরিচালকের দ্বারা। ১৯৬৭ সালে সদ্য প্রয়াত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহের প্রথম উপন্যাস ‘সীতাগড়ের মানুষখেকো’ প্রকাশিত হয় শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকায়। মূলত এটি ছিল শিকার কাহিনি।

সন্দেশ পত্রিকা নতুন ভাবে ১৯৬১ সালে প্রকাশ না পেলে বাঙালি পাঠককুল সত্যজিৎ রায়কে শুধুমাত্র একজন চলচ্চিত্রকার হিসাবেই জানতেন। ১৯১৩ সালে ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোরের হাতে তৈরি এবং বাবা সুকুমার রায়ের অকালমৃত্যুর পর বন্ধ হয়ে যাওয়া এই পত্রিকাকে আবার ১৯৬১ সাল থেকে নতুন করে বাঁচানোর জন্য সত্যজিৎ লিখতে থাকেন কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, ছোটোগল্প ইত্যাদি। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে নবকলেবরে প্রকাশিত হতে থাকল সন্দেশ পত্রিকা। এই পত্রিকার জন্য সত্যজিৎ সৃষ্টি করলেন প্রফেসর শঙ্কু নামক একটি বৈজ্ঞানিক চরিত্র এবং লিখলেন তাঁর প্রথম কল্পবিজ্ঞানের গল্প ‘ব্যোমযাত্রীর ডায়রি’। এই গল্পটি তিনি হালকা চালে লিখেছিলেন এবং লেখার সময় তিনি প্রোফেসর শঙ্কু চরিত্রটি নিয়ে সিরিজ করার কথা ভাবেননি। ১৯৬৪ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত দ্বিতীয় শঙ্কু-কাহিনি ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও হাড়’ থেকে যথাযথভাবে শঙ্কু সিরিজের সূচনা হয়। ১৯৭৫ সালে আনন্দবাজার গ্রুপ যখন ছোটোদের জন্য আনন্দমেলা পত্রিকা প্রকাশ করে তখন সেখানে প্রতিবছর পুজোসংখ্যায় সত্যজিৎ রায় একটি করে প্রোফেসর শঙ্কুর কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস লিখতেন।

১৯৬৫ সালে সন্দেশ পত্রিকার জন্য ছোটোগল্প ও শঙ্কু কাহিনি লেখার পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় আরও চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন কিশোর পাঠক পাঠিকাদের জন্য। রহস্যভেদী প্রদোষ চন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা এবং তার খুড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জনকে নিয়ে সত্যজিৎ লেখেন প্রথম ফেলুদার রহস্য উপন্যাস ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’। কাহিনির পটভূমি ছিল তাঁর প্রিয় শহর দার্জিলিং। গল্পটি এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে সন্দেশ দপ্তরে বিভিন্ন জায়গা থেকে চিঠি আসতে থাকে এইরকম আরও রহস্য উপন্যাস লেখার জন্য। সন্দেশ পত্রিকার পর ১৯৭০ সালে শারদীয়া দেশ পত্রিকায় ফেলুদার একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এটির নেপথ্যে একটি গল্পও ছিল। এক সাহিত্যিক বন্ধুর কাছে শোনা, তবে ঘটনাটা সত্যি কি মিথ্যে জানি না। ১৯৭০ সালে প্রয়াত হন ব্যোমকেশ-স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, এর আগে তিনি দেশ পত্রিকায় একটা করে রহস্যগল্প লিখতেন, কিন্তু তাঁর দেহ রাখার পর একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়। একদিন ঘটনাচক্রে চলচ্চিত্র প্রযোজক আর. ডি. বনশলের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে দেশ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক সাগরময় ঘোষের সাথে দেখা হয়ে যায় সত্যজিৎ রায়-এর। সাগরময়বাবু সেখানেই বলে বসলেন, শারদীয়া দেশ পত্রিকার জন্য একটা গোয়েন্দা গল্প লিখে দিতে হবে জরুরিভিত্তিতে। সত্যজিৎ রায় সেই সময় চলচ্চিত্রের কাজে ভীষণ ব্যস্ত। তিনি তাঁর অপারগতার কথা জানালেন, কিন্তু দেশ পত্রিকার জহুরী সম্পাদক ওত সহজে দমবার পাত্র নন। এর কিছুদিন পরে তিনি আবার মানিকবাবুর সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন, কিন্তু সত্যজিৎ রায় তাঁর তৎকালীন বর্তমান অবস্থার কথা জানিয়ে তা সবিনয়ে প্রত্যাখান করেন।

এবার সম্পাদকমশাই একদিন সটান চলে আসেন মানিকবাবুর বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে। সত্যজিৎ রায় সাগরময় ঘোষ-কে দেখে বললেন, ‘সাগরদা, আপনি ব্লাড প্রেশারের রুগি, সিঁড়ি ভেঙে খুব কষ্ট করে উপরে আসলেন।’ সম্পাদকমশাই তখন দরদর করে ঘামছেন আর হাঁফাচ্ছেন দেখে বড্ড মায়া হল সত্যজিৎ-এর। কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পর সত্যজিৎ রায় নিজে থেকেই বললেন, ‘আপনি ভাববেন না সাগরদা, আমি দু-চার দিনের মধ্যেই আপনাকে একটা গল্প পাঠিয়ে দেব।’ সত্যজিৎ রায় তাঁর সাগরদাকে দেওয়া কথা রেখেছিলেন। দিনরাত এককরে চলচ্চিত্র ও সন্দেশ সম্পাদনার কাজ সামলে তিনি লিখে ফেলেছিলেন ফেলুদাকে নিয়ে একটি গোয়েন্দা উপন্যাস, যার পটভূমি ছিল সিকিম। সত্যজিৎ রায় সেই সময় সদ্য শেষ করেছেন সিকিমের উপর তাঁর তথ্যচিত্র। সেই সিকিম ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাতে রহস্য মিশিয়ে তৈরি করলেন ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’। ১৯৭০ সালে ব্যোমকেশ চলে গেলেন আর দেশ পত্রিকায় আবির্ভাব ঘটল ফেলু মিত্তিরের। পরবর্তী বছর ১৯৭১ সালে ফেলু ও তোপসের সাথে যুক্ত হয় গড়পাড়ের লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ু। গল্পের নাম ‘সোনার কেল্লা’। এরপর সত্যজিৎ রায় যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন পর্যন্ত শারদীয়া দেশ পত্রিকার জন্য লিখে গেছেন একটার পর একটা ফেলুদার রহস্য গল্প।

১৯৬০ সালে দেব সাহিত্য কুটির একটু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মাসিক পত্রিকা নবকল্লোল প্রকাশ করে এবং সেই বছর থেকেই শারদীয়া নবকল্লোলের আত্মপ্রকাশ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, নীহাররঞ্জন গুপ্ত প্রমুখ বিখ্যাত লেখকদের রচনায় সাজানো ছিল সেই সংখ্যাটি। তারাশঙ্করের ‘মঞ্জরী অপেরা’ উপন্যাসটি নবকল্লোলের হাত ধরেই পাঠকদের সামনে আসে। পাশাপাশি নবকল্লোল একটা দীর্ঘ সময় ধরে সিনেমা ও থিয়েটার নিয়েও বিভিন্ন বিনোদনমূলক লেখাও ছাপতে শুরু করেছিল। শারদীয়া নবকল্লোলে আজও দেখা যায় প্রতিটি গল্প উপন্যাসের শেষে লেখক লেখিকাদের সাদাকালো নিজস্ব পাসপোর্টসাইজ ছবি। নবকল্লোল ছাড়াও বিনোদনমূলক বা সিনেমা-থিয়েটারের পত্রিকা হিসাবে উল্টোরথ ও তারপর প্রসাদ, সিনেমা জগত, মাসিক ঘরোয়া পত্রিকার বেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। দেশি বিদেশি সিনেমা বা থিয়েটার সম্পর্কিত বহু তথ্যমূলক লেখা এরা বিভিন্ন সময় পরিবেশন করে গেছেন। এদের শারদসংখ্যাগুলিতে উপন্যাস ও গল্প লিখতেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, বনফুল, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, প্রফুল্ল রায়, মহাশ্বেতা দেবী, কালকূট (সমরেশ বসু) প্রমুখ খ্যাতনামা সাহিত্যিক। মহাশ্বেতা দেবীর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাজার চুরাশীর মা’ প্রসাদ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বশেষ উপন্যাস ‘প্রাণেশ্বরের উপাখ্যান’ প্রকাশিত হয় উল্টোরথ পুজো সংখ্যাতেই। দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট সিনেমা ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকার ও সিনেমার শুটিং এর নানা আপডেট প্রকাশিত হত এই পত্রিকায়। তার সাথে চিত্রতারকাদের নানাধরনের রঙিন ছবি ও গসিপ। এই পত্রিকাগুলোর চাহিদা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, কলেজ স্ট্রিটে লোকে লাইন দিয়ে এই পত্রিকাগুলি সংগ্রহ করত। এদের পথ অনুসরণ করে এরপর আনন্দবাজার গ্রুপও শুধুমাত্র বিনোদনমূলক একটি রঙিন পত্রিকা প্রকাশ করে ১৯৭৪ সালে পুজোয়। প্রথম সংখ্যাটিই ছিল পুজোবার্ষিকী। পরবর্তী বছর জানুয়ারি মাস থেকে প্রতি মাসে ‘আনন্দলোক’ পত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে। বর্তমানে আনন্দলোক, নবকল্লোল ও প্রসাদ পত্রিকা এখনও টিকে আছে আর অন্যগুলো বহুদিন আগেই সিঙ্গল স্ক্রিনের মতো দেহ রেখেছে।

আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে একটা সময় প্রকাশিত হত পাক্ষিক ‘বেতার জগত’। মূলত বেতারের আগামী পনের দিনের সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানসূচি প্রকাশ করা হত। তার সঙ্গে থাকত কিছু সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন লেখকের। এদের পূজোসংখ্যাটি ছিল দেখার মতো। মহালয়ার অনুষ্ঠানসূচির পাতায় আকাশবাণীর চিরকালীন জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’–র সময়সূচি এবং শিল্পী তালিকা দেওয়া হত ছবিসহ। তারপর একটা সময় দূরদর্শন পুরোদমে চালু হবার পর বন্ধ হয়ে যায় ‘বেতার জগত’।

দৈনিক ইংরেজি নিউজপেপার সংস্থাগুলোও তাঁদের শারদীয়া পত্রিকা প্রকাশ করত। ৬০ এর দশকে তুষারকান্তি ঘোষ সম্পাদিত ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-এর শারদীয়া ইস্যু বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এই ইংরেজি শারদীয়া পত্রিকায় লিখতেন বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ। আনন্দবাজার গ্রুপেরও একটি ইংরেজি দৈনিক ছিল সত্তরের দশকে, ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড’। যেহেতু এই গ্রুপের শারদীয়া আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকা বেশ জনপ্রিয় ছিল তাই পুজোর সময় এনারা কোনো শারদীয়া সংখ্যা না প্রকাশ করে কালীপুজোর সময় এনারা প্রকাশ করতেন বিশেষ দীপাবলী সংখ্যা। পরে অবশ্য এই কাগজটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯৮২ সাল নাগাদ আনন্দবাজার গ্রুপ প্রকাশ করে তাঁদের নিজস্ব দৈনিক ইংরেজি সংবাদপত্র ‘দি টেলিগ্রাফ’। আশির দশকের শেষের দিক থেকে ইংরেজি দৈনিক ‘দি স্টেট্‌সম্যান’ ও তাদের অ্যানুয়াল ইস্যু প্রকাশ করতে থাকে পুজোর সময়।

একটা সময় এইচ এম ভি প্রতি বছর পুজোর সময় তাঁদের নতুন লং প্লে রেকর্ড প্রকাশ করত। বাংলা ও বোম্বাই-এর বিখ্যাত-অখ্যাত শিল্পীদের নিয়ে নানা রকম বাংলা গানের রেকর্ডের পাশাপাশি সেইসব গানের কথা ও শিল্পীদের ছবিসহ একটি বই প্রকাশ পেত এইচ এম ভি থেকে ‘শারদ অর্ঘ্য’ নাম দিয়ে। পরে রেকর্ড যুগ শেষ হয়ে যাবার পর ১৯৮৮ সালে ‘শারদ অর্ঘ্য’ প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেলেও পরে সাগরিকা ক্যাসেট কোম্পানি থেকে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ পেত ‘সা রে গা’ নামে। শুধুমাত্র দেশি ও বিদেশি সঙ্গীত নিয়ে এই রকম পত্রিকা সেই সময় খুব বিরল ছিল আর প্রতি সংখ্যায় পত্রিকার সাথে বিনামূল্যে পাওয়া যেত একটি করে বাংলা গানের অডিও সিডি। এদের শারদসংখ্যাটিও দেখার মতো ছিল। সঙ্গীতের নানা খবরের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, বিভিন্ন প্রবন্ধ সবই ছিল সঙ্গীত নির্ভর। বর্তমানে এটি বন্ধ হয়ে গেলেও শারদীয়া প্রতিদিন কাগজটি কিন্তু প্রতি বছর নিয়ম করে তাদের শারদ সংখ্যার সাথে একটি করে রবীন্দ্র সঙ্গীতের অডিও সিডি বিনামূল্যে বিতরণ করে।

প্রতি মাসে বেলুড় মঠ থেকে প্রকাশিত হয় উদ্বোধন ধর্মীয় পত্রিকা। মূলত স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তার ফসল এই মাসিক পত্রিকাটি প্রতি বছর তাদের শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি ধর্মীয় পত্রিকা যেমন ‘তত্ত্বমসি’, ‘ভাবমুখে’, ‘মাতৃপূজা’ এবং লোকমাতা রানী রাসমনী সংস্থা থেকে প্রকাশিত ‘মাতৃশক্তি’ ইত্যাদি ধর্মীয় প্রধান পত্রিকাগুলিও তাদের শারদসংখ্যা প্রকাশ করে নিয়মিত। দৈনিক আজকাল পত্রিকা প্রতি বছর তাদের অসামান্য শারদ সংখ্যার পাশাপাশি একটা সময় শুধুমাত্র খেলা নিয়ে একটা মাসিক পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ করত যেখানে দেশ বিদেশের ক্রীড়া সম্পর্কে লিখতেন বিভিন্ন দলের খেলোয়াড় এবং ক্রীড়া সাংবাদিক। বিজ্ঞান নিয়ে কিশোরদের পত্রিকা কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান-এর কথাও উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যিক ও পর্যটক অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর সম্পাদনায় শুধুমাত্র ভ্রমণ নিয়ে গোটা একটা মাসিক পত্রিকা আজও বেরোয়। প্রতি বছর নিয়ম করে পুজোর আগে দুটি করে শারদীয়া সংখ্যা এনারা প্রকাশ করেন। নানা ধরনের ভ্রমণ বিষয়ক লেখা, তার সঙ্গে অসংখ্য রঙিন ছবি এবং একটি করে ভ্রমণ বিষয়ক ডিভিডি একেবারে বিনামূল্যে।

অনেক বড়োদের কথা হল, এবার একটু শিশু বা কিশোর সাহিত্যের দিকে তাকানো যাক। বাংলায় ছোটোদের জন্য প্রথম একটি পুজোবার্ষিকীর কথা ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ছোটো জামাতা শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়। তিনি যখন আমেরিকায় ছিলেন তখন তিনি দেখেছিলেন বড়োদিনের সময় সবাই ছুটি উপভোগ করে এবং প্রচুর নতুন নতুন বই প্রকাশিত হয় ছোটোদের জন্য এবং সেগুলি সাংঘাতিক বিক্রি হয়। ছোটোরা বড়োদিনের ছুটি উপভোগ করে সেই সব নতুন নতুন বই পড়ে। সেই থেকেই নগেন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন যদি নিজের দেশে দুর্গাপূজোর ছুটিতে এইরকম একটা পত্রিকা বের করা যায়। ১৯১৮ সালে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, প্রকাশিত হল ‘পার্বণী’ নামে একখানি পুজোবার্ষিকী। নামকরণ করলেন ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, শরৎচন্দ্র ছাড়াও বহু দিকপাল লেখক এই পত্রিকায় শিশুদের জন্য লিখলেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘চণ্ড’ গল্পটির পাশাপাশি আলপনা নিয়ে সুন্দর একটি ছবিসহ প্রবন্ধও লিখেছিলেন। সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘খাই খাই কর কেন, এস বস আহারে’। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন নন্দলাল বসু।দেড় টাকা দামের এই বই প্রকাশের কয়েকদিনের মধ্যেই ‘পার্বণী’ বাজার থেকে উধাও হয়ে গেল। ছোটোদের কাছ থেকে চাপ আসতে লাগল পুনর্মুদ্রণ করার জন্য। পরবর্তী বছর নগেন্দ্রনাথ প্রবাসে থাকার জন্য ‘পার্বণী’ প্রকাশিত হয়নি। এর জন্য তাঁর আফসোসের সীমা ছিল না। ১৯২০–তে ‘পার্বণী’র দ্বিতীয় বা শেষ সংখ্যা বের হয় এবং তারপর নানা কারণে সেটা আর প্রকাশ পায়নি। ওই সময়ে এম সি সরকার অ্যান্ড সন্‌স্‌ থেকে ‘রংমশাল’ নামে একটি বার্ষিকী বেরিয়েছিল অল্পকালের জন্য।

১৯২৬ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত সুদীর্ঘকাল ধরে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বার্ষিক শিশুসাথী’। ‘বার্ষিক শিশুসাথী’ হঠাৎ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়নি। ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি। ‘বার্ষিক শিশুসাথী’ প্রকাশের চার বছর আগে আশুতোষ লাইব্রেরির উদ্যোগেই প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক ‘শিশুসাথী’। আশুতোষ লাইব্রেরির সঙ্গে ছোটোদের লেখকদের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। খগেন্দ্রনাথ মিত্রের মতো ক্ষমতাবান লেখক তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। ছিলেন ‘বাংলার ডাকাত’–এর যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত। মাসিক ‘শিশুসাথী’–র সূচনা‌বর্ষে খানিক আত্মকথার ভঙ্গিতে লেখা হয়েছিল, ‘তোমরা অনেকদিন হইতে আমার প্রতীক্ষায় আছো, তাহা আমি জানি। আমারও আসিবার আগ্রহ কম ছিল না, তবু আসিতে পারি নাই। সময় না হইলে ফলগাছে ফল ধরে না, ফুলের গাছে ফুলের পাপড়ি খোলে না। তোমাদের পায়ের নীচে ওই যে ঘাসগুলি, তাদের গায়েও নতুন পাতার শ্যামল শোভার বিকাশ হয় না।’ ‘বার্ষিক শিশুসাথী’–র একটি ঘরানা তৈরি হয়ে গিয়েছিল যা কখনও ঘরানাচ্যুত হয়নি। মেজাজমর্জিতে শুধু এক নয়, অঙ্গসজ্জা, এমনকি লেখক–সূচিও প্রায় একইরকম। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, কালিদাস রায়, বিশু মুখোপাধ্যায়, সুনির্মল বসু, স্বপনবুড়ো, ফটিক বন্দ্যোপাধ্যায়, এস. ওয়াজেদ আলি, গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শিবরাম চক্রবর্তী, আশাপূর্ণা দেবী, নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, নরেন্দ্র দেব, ধীরেন্দ্রলাল ধর, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, জসীমউদ্দীন— ‘বার্ষিক শিশুসাথী’র দীর্ঘ পথ–পরিক্রমা এমন কতজনেরই না উপস্থিতিতে বর্ণময় হয়ে উঠেছে। এই পত্রিকাই প্রথমে অগ্রিম নিয়ে গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং ডাকযোগে সেইসব পাঠকদের ঘরে ঘরে পত্রিকা পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করেছিল।

১৯৬০ সালে দেব সাহিত্য কুটির একটু প্রাপ্তবয়স্কদের মাসিক পত্রিকা নবকল্লোল প্রকাশ করলেও এনারা মাসিক ‘শুকতারা’ নামে একটি শিশু পত্রিকা ভারতের স্বাধীনতার পরের বছরই ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে প্রকাশ করতে থাকেন। কিন্তু সেই সময় ‘শুকতারা’র কোনো পুজোসংখ্যা বের হয়নি এবং জনপ্রিয় পত্রিকা শুকতারার আগেও ১৯৩১ সালে দেব সাহিত্য কুটিরের দপ্তরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একটি বার্ষিকী গ্রন্থমালার প্রকাশে যা মূলত শিশুদের কথা চিন্তা করে প্রকাশ করা হবে। মাত্র এক মাসের প্রস্তুতিতে প্রকাশিত হয়েছিল ‘ছোটদের চয়নিকা’, বাংলা ভাষায় ছোটোদের কবিতার প্রথম সংকলন। সম্পাদনা করেছিলেন সুনির্মল বসু ও গিরিজাকুমার বসু। দুজনেই সুকবি। এই বার্ষিকীর পরিকল্পনাটি করেছিলেন বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যসেবী ক্ষিতীশচন্দ্র ভট্টাচার্য। শ্রীহট্ট থেকে আগত এই মানুষটির মাথায় অনেক পরিকল্পনা ঘুরপাক খেত। তিনি ‘মাসপয়লা’ নামে এক অভিনব পত্রিকা বের করেছিলেন। নিজে একটি প্রকাশনালয়ও স্থাপন করেছিলেন। বাংলা শিশুসাহিত্যে এঁর অনেক অবদান আছে। মাত্র এক মাসের প্রস্তুতিতেই ‘ছোটদের চয়নিকা’ প্রকাশিত হল। বাংলার বিশিষ্ট কবিদের আনুকূল্যে একটি চমৎকার সংকলন এই ছোটদের চয়নিকা। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন: “লিখতে যখন বলো আমায়/ তোমার খাতার প্রথম পাতে।/ তখন জানি কাঁচা কলম/ নাচবে আজো আমার হাতে।” আর এতে অলংকরণ করলেন বিশিষ্ট শিল্পী পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী, প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়, ফণিভূষণ গুপ্ত। এই অভিনব প্রকাশনাটি প্রকাশের অল্পকালের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে গেল। ‘ছোটদের চয়নিকা’ যেসব কবিতায় সমৃদ্ধ ছিল সেগুলির মধ্যে ছিল রবীন্দ্রনাথের তিনটি কবিতা। আরও প্রায় ত্রিশ কবির কবিতা ছোটদের চয়নিকায় ছাপা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, হেমেন্দ্রকুমার রায়, নরেন্দ্র দেব, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, গিরিজাকুমার বসু, কামিনী রায়, গিরিবালা দাসী, সুনির্মল বসু, গোলাম মোস্তাফা, বন্দে আলি মিঁয়া, জসীমউদ্দীন, বুদ্ধদেব বসু, সুবিনয় রায়, অখিল নিয়োগী প্রমুখ।

এরপর থেকে দেব সাহিত্য কুটীর দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে মহালয়ার দিন (১৯৩৩ ও ১৯৭৯ ব্যাতিক্রম) একটি বার্ষিকী বের করে যাচ্ছিল। বোর্ড বাঁধাই, নির্ভুল ছাপা, ভালো মানের কাগজে উচ্চমানের লেখা তৎসহ বিভিন্ন শিল্পীর হাতে আঁকা দুর্দান্ত ছবিতে ঠাসা এই বার্ষিকী মাত্র তিন-চার টাকায় পাঠকের হাতে তুলে দিত এই প্রতিষ্ঠান। শুধু স্মরণীয় নয়, অবিস্মরণীয় লেখাও ছড়িয়ে রয়েছে এই বার্ষিকীগুলোতে। পূজাবার্ষিকীগুলোর নামকরণগুলোও বেশ ভালো যেমন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে অপরূপা, শারদীয়া, অলকানন্দা, শ্যামলী, উত্তরায়ন, নীহারিকা, অরুণাচল, বেনুবীণা, ইন্দ্রনীল, শুকশারি, মণিহার, তপোবন, মণিদীপা, বলাকা, আগমনী, মন্দিরা, চন্দনা, প্রভাতী, দেবায়ন, দেব দেউল ইত্যাদি সব নাম। ১৯৮১–তে ‘আরাধনা’ প্রকাশের পর আর বার্ষিকী প্রকাশ পায়নি। তারপর তাঁরা তাঁদের নিজস্ব শিশু ও কিশোরপত্রিকা ‘শুকতারা’-র শারদ সংখ্যা প্রকাশে মন দেন। পূজাবার্ষিকীগুলোর নানা সময় আমরা পেয়েছি তৎকালীন খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের লেখা চমৎকার সব বিভিন্ন বিষয়ের গল্প–যেমন হাসির গল্প, ভূতের গল্প, রহস্য গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প, পুরাণের গল্প, সত্যি ঘটনা অবলম্বনে গল্প ইত্যাদি। লেখক তালিকায় থাকতেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, বনফুল, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, আশাপূর্ণা দেবী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, বীরু চট্টোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, কবিতা সিংহ, নটরাজন, হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, স্বপনবুড়ো, শিবরাম চক্রবর্তী প্রমুখ খ্যাতনামা সাহিত্যিকগণ। প্রখ্যাত নাট্যকার বিধায়ক ভট্টাচার্যের মজার নাটক ছিল দেব সহিত্য কুটীর বার্ষিকীর অন্যতম আকর্ষণ। ঘনাদা, টেনিদার গল্পের মতো মনোরম কাণ্ডকারখানা নিয়ে নাটক বেশ কয়েক বছর ধরে লিখেছিলেন বিধায়ক। তাঁর লেখা নাটকের একটি কমন চরিত্র ছিল অমরেশ। গল্পগুলিতে চাহিদা অনুযায়ী নিখুঁত ইলাস্ট্রেশন করতেন নারায়ণ দেবনাথ, দিলীপ দাস, শৈল চক্রবর্তী, ময়ূখ চৌধুরী বা তুষার চ্যাটার্জি প্রমুখ শিল্পীগণ। পাশাপাশি ছবিতে গল্প বা নানান স্বাদের কমিকস তৈরিতেও এনারা সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

১৯৮১–তে ‘আরাধনা’ দেব সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত শেষ বার্ষিকী হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে পাঠকের চাহিদা অনুসারে এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রতি বছর দুটি বা তিনটি করে পুরোনো পূজাবার্ষিকীগুলোর পুনর্মুদ্রণ করে প্রকাশ করা হয় মহালয়ার দিনে এবং দ্রুত তা নিঃশেষিত হয়ে যায়। দেব সাহিত্য কুটিরের কর্ণধারের কথায় জানা যায় পূজাবার্ষিকী পুনর্মুদ্রণের ধারাবাহিকতা বর্তমানে চালিয়ে যাওয়ার কারণ মূলত দুটি, নতুন প্রজন্মের পাঠকদের পুরনো লেখাগুলির সঙ্গে পরিচিত করানোর জন্য এবং প্রবীণেরা যাতে তাঁদের হারানো কৈশোরের স্মৃতিটুকু ফিরে পেতে পারেন।

১৯৬৮ সালে পুজোয় প্রকাশিত হয় শারদীয়া কিশোর ভারতী। প্রচুর গল্প, উপন্যাস, কবিতা, কমিক্স-এর সম্ভারে ভরা অতি চমৎকার একটি পুজাবার্ষিকী। নারায়ণ দেবনাথের অতীব জনপ্রিয় কমিকস নন্টে ফন্টে কিশোর ভারতী পত্রিকাকে একটা সময় অন্য জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিল। পরবর্তী বছর থেকে এটি মাসিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয় এবং আজও সমান জনপ্রিয়।

১৯৭৫ সাল নাগাদ আনন্দবাজার গ্রুপ থেকে প্রকাশিত হয় ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকাটি। সম্পাদক ছিলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এর আগে অবশ্য প্রতি রবিবার আনন্দবাজারে ছোটদের জন্য ‘আনন্দমেলা’ নামে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র বেরত যেটি সম্পাদনা করতেন বিশিষ্ট ছড়াকার বিমল ঘোষ। দেব সাহিত্য কুটিরে যোগদান করার আগে শিল্পী নারায়ণ দেবনাথ এই ক্রোড়পত্র-এ নিয়মিত অলংকরণ করতেন। পত্রিকা হিসেবে বেরনোর পর নীরেনবাবু জোর দিয়েছিলেন বিদেশি কমিকসের বাংলা অনুবাদের উপর যেটি তিনি নিজে করতেন পত্রিকার জন্য। পাশাপাশি প্রতিটি শারদীয়া আনন্দমেলার জন্য সত্যজিৎ রায় লিখতেন একটি করে উপন্যাস প্রোফেসর শঙ্কুর উপর আর নিজের গল্পের অলংকরণও তাঁর ছিল। পাশাপাশি লিখতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর কাকাবাবু সন্তু সিরিজ নিয়ে, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় লিখতেন বড়োমামা মেজমামা সিরিজ, বিমল কর লিখতেন কিকিরা সিরিজ, মতি নন্দী লিখতেন খেলা নিয়ে অসাধারণ উপন্যাস, সমরেশ বসু লিখতেন কিশোর গোয়েন্দা গোগোল-কে নিয়ে রহস্য উপন্যাস, সুচিত্রা ভট্টাচার্য লিখতেন মিতিন মাসিকে নিয়ে গোয়েন্দা উপন্যাস, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখতেন মজার সব গল্প। অলংকরণে থাকতেন সমীর সরকার, পূর্ণেন্দু পত্রী, দেবাশিষ দেব, সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, বিমল দাস প্রমুখ চিত্রশিল্পীগণ। পরবর্তী কালে আমরা শারদীয়া সংখ্যাতেও পেয়েছি বিদেশি কমিকস-এর বাংলা অনুবাদ এবং নিল ও ব্রায়েনের সর্বপ্রথম বাংলায় ক্যুইজ সংক্রান্ত লেখা এবং ফিচার। অতীতের সেই গৌরব না থাকলেও আজও আনন্দমেলা কিশোরদের কাছে সমান জনপ্রিয়। আরও কয়েকটি শিশুকিশোর পত্রিকার কথা না বললেই নয় যেমন চির সবুজ লেখা, মায়াকানন, আমপাতা-জামপাতা, ঝালাপালা, রঙ বেরং ইত্যাদি ছিমছাম শিশু-কিশোর পুজো সংখ্যাগুলোর চাহিদা এখনও রয়েছে।

একটা সময় ছিল পুজোর আগে কফি হাউস, পাড়ার চায়ের ঠেক, বাসে ট্রামে লোকেরা আলোচনায় মেতে উঠত এবার কোন পূজাবার্ষিকীতে কোন লেখক কি লিখছেন। এখন সেই ধারাটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। সবাই এখন মুঠোফোনে ব্যস্ত। সাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে অনেকেই এখন শুধু সব জায়গায় সব সময় বুড়ো আঙুল দিয়ে মেসেজ ফিড স্ক্রল করে যাচ্ছে আর কানে হেডফোন লাগিয়ে কি যে শুনে যাচ্ছে তা তিনিই জানেন। তবুও এই ঘোর স্মার্টফোন সর্বস্ব দুনিয়ার সঙ্গে রীতিমতো জুঝে তবু স্বমহিমায় টিকে আছে পূজা সংখ্যাগুলি। দেখা গেছে একটি ২০০ টাকা দিয়ে কেনা শারদসংখ্যায় যদি চারটি উপন্যাস থাকে এবং সেগুলির একটি বা দুটি যদি জনপ্রিয় হয় পাঠকদের কাছে তাহলে কিছুদিন পর বই আকারেই প্রকাশিত হয় সেই উপন্যাসটি এবং দাম হয় অনেক বেশি। কালের কোপে পড়ে আজ হয়তো হারিয়ে গেছে পুজোর গান কিন্তু আজকাল খুব শোনা যাচ্ছে খুব কম সংখ্যক লোক বই বা ম্যাগাজিন কিনে পড়ে। বাকিরা সবাই এখন মোবাইলে বা ল্যাপটপে ই-ফরম্যাটে শারদীয়া বই পড়ে। সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেল শুধু দুর্গাপুজোকে ঘিরে সারা বিশ্বে বাংলা ভাষায় (ম্যাগাজিন ফরম্যাটে বা ই-ফরম্যাটে) প্রকাশিত পত্রপত্রিকার সংখ্যা প্রায় হাজার তিনেক। এদের মধ্যে কিছু বাণিজ্যিক, কিছু অবাণিজ্যিক, কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় এই সব পত্রপত্রিকার মধ্যে সংখ্যায় প্রায় হাজারের কাছাকাছি শিশু কিশোর সাহিত্যের ভাণ্ডার। তবে এইসব পত্রিকাগুলোয় সিংহভাগ জায়গা করে নিয়েছে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন। গাড়ি থেকে শুরু করে জ্যোতিষীর খাঁটি রত্ন, সোনা, প্রসাধনী, টুথপেস্ট, ভোজ্য তেলমশলা, হেলথ ড্রিংক, বেনারসি শাড়ি, কোন্ মোবাইল কিনলে কি সুবিধা পাওয়া যায়, কোন্ ছাত্র কি বই পড়ে মাধ্যমিকে ফার্স্ট হয়েছে, কোন্ ব্যাংক থেকে লোন নিলে বিশেষ সুবিধা লাভ ইত্যাদি সব কিছু, তার পাশাপাশি পুরোনো ধারাবাহিকতায় শ্রীযুক্ত দুলাল চন্দ্র ভড়ও মাঝেমধ্যে আসেন ছবিসহ তাঁর ব্র্যান্ড তালমিছরির বিজ্ঞাপন নিয়ে। তার সাথে বেশ কিছু পত্রিকা আরও এককাঠি উপরে, যেমন তারা তাদের পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর জন্য শারদীয়াসংখ্যার বই-এর ভিতরে ছেপে দেয় বিখ্যাত সব পুজোমণ্ডপে বিনাবাধায় ঢোকার ছাড়পত্র। বলাবাহুল্য সাহিত্য চুলোয় যাক, স্রেফ ভিড়ের ঝামেলা থেকে বাঁচতে সেইসব পুজোসংখ্যাগুলোর চাহিদা সাংঘাতিক। একটা সময় ছিল পত্রিকার সম্পাদক বিভিন্ন লেখকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাগাদা করতেন লেখার জন্য আর সেই সব লেখকেরা সারা বছর হয়তো একটি কি দুটি উপন্যাস লিখতেন এবং সেগুলি বেশ জনপ্রিয় হত, আর এখন এক একজন লেখক-লেখিকা প্রায় সাত আটটা পত্র পত্রিকায় গল্প, উপন্যাস লেখেন বিভিন্ন পুজোসংখ্যার জন্য যার ফলে প্রতিটি লেখার মানের সঠিক বিচার তিনি করে উঠতে পারেন না। সেই জন্যই হয়তো কবীর সুমন তাঁর গানের মাধ্যমে বলেছেন ‘সাহিত্য মরে পুজোসংখ্যার চাপে’ (‘ইচ্ছে হোল’ এ্যালবাম, ১৯৯৩)। তা সত্ত্বেও আজও বাঙালি বোনাসের বাড়তি টাকা পেয়ে নতুন জামা জুতোর সাথে কেনে একটি করে শারদীয়া পত্রিকা।

তথ্যঋণ: বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও ইন্টারনেট এবং লেখায় ব্যবহৃত সমস্ত ছবি লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

3 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.