/ / সামান্য একটা চিঠি – উমাপদ কর

সামান্য একটা চিঠি – উমাপদ কর

শেয়ার করুন

প্রিয় বারীন দা
আশা করি কুশলেই আছো। তোমাকে নিয়ে কিছু লিখতে বলা হয়েছে আমাকে। কী লিখি আমি? শুধুই আকাশ পাতাল ভাবছি। ভেবে ভেবে প্রথম বাক্যটাই এখনও ঠাওরাতে পারলাম না গো। এত কথা এত প্রাণ এত ভালোবাসা এত কাহিনি আর উপকাহিনি। কী দিয়ে যে শুরু করব তাই ভেবে পাইনা। সম্পর্কের মধ্যে যে এত আঠা আছে আগে এতটা ভেবে পাইনি। তুমি বলছ ‘আমি ইহলোকে আর নেই।’ কথাটার সত্যতা প্রমাণে তুমি সত্যিই ফিজিক্যালি অন্তর্হিত হয়েছ আমাদের কাছ থেকে। কিন্তু তোমার অস্তিত্ব তো অনুভব করে চলেছি সর্বদাই। তাই না এই প্রয়াস। কোথা থেকে শুরু করি বলোতো? কঠিন প্রশ্ন, সে জীবনের হোক আর সাহিত্যেরই হোক তা তো বারবার তোমার কাছ থেকে জেনে নিয়েছি। নিরলস তুমি আপ্রাণ আমার নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছ তোমার পড়াশুনা তোমার অভিজ্ঞতা আর তোমারই চেতনা দিয়ে। সেই সব উত্তরে আর আলোচনায় ঋদ্ধ হয়েছি আমি। হ্যাঁ এমনটা হয়েছে কিছু প্রশ্নোত্তরে আরও প্রশ্ন জেগে উঠেছে। তাকেও প্রশ্রয় দিয়েছ কোনোরকম রাগ না করে। আবার এমনও হয়েছে কিছু প্রশ্নত্তোরে অতৃপ্তি রয়ে গেছে আমার। কিন্তু তুমি বিমুখ করোনি কখনও। তাই তো আজ তোমাকেই জিজ্ঞাসা করছি— কী দিয়ে শুরু করি?
আচ্ছা আচ্ছা, তোমার সঙ্গে প্রথম চাক্ষুষ আলাপটাকেই নাহয় একটা ধরতাই হিসেবে নিই। ৯৮ সাল। এর আগে তোমার নাম শুনেছি অনেক। তুমি কৌরব। তুমি ‘নতুন কবিতা’ নিয়ে খুব মেতে আছো। ভালোভাবেই জানি। আমরাও তখন ‘রৌরব’-এ মাতোয়ারা। তো বহরমপুর নিবাসী কবি সুশীল ভৌমিক প্রায় জোর করেই আমার গুটি কয়েক কবিতা তোমার নামে কৌরব-এ পাঠিয়ে দিল। কিছুদিনের মধ্যেই তোমার পোস্টকার্ড— কবিতা ছাপা হবে কৌরবে। তারপর আবার চিঠি, তুমি আসছ বহরমপুর সুশীলদার বাড়ি, আমি যেন দেখা করি। কিছুটা ভয় মেশানো শ্রদ্ধা আর কৌতূহল নিয়ে গেলাম সুশীলদার বাড়ি। এত বড় একজন চিন্তক, এমন জাগ্রত এক পত্রিকার কর্ণধারদের অন্যতম একজন, তাঁর কাছে গিয়ে কী করব কী বলব কী আলোচনা করব, একটা দ্বিধাতেই ছিলাম। কিন্তু সুশীলদা পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কালে আর হাতে হাত মেলানোর সময় কী করে যে মনে হল তুমি আমার অনেক দিনের পরিচিত। আমি জানি (পরে নানাভাবে বুঝেছি, দেখেছি) এ তোমার এক মহৎ গুণ অপরিচিতকে খুব সহজে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা। তোমার উষ্ণ হাত, তোমার আকর্ণ হাসি আর বিস্তৃত বক্ষপট আমার সারা শরীরেও রোমাঞ্চ সৃষ্টি করেছিল, জানোতো আজও মনে আছে। প্রথম দিনেই তোমার কথায় পড়লাম বেশ কয়েকটি কবিতা আর একটি নাতিদীর্ঘ গদ্য। তুমি একজন অনুজকে বলছো এমন করে বেশ কিছু কথা বলেছিলে আমার মনে আছে। তোমার কথা আমার মধ্যে এক ভাবনার পরিসর খুলে ধরেছিল আর কিছু সম্ভাব্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। সেবারেই তুমি বহরমপুরের আর সমস্ত কবিদের সঙ্গে বাইরে কোথাও মিট করে পরিচিত হতে চেয়েছিলে। তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই সেদিনই সন্ধ্যায় আমরা মিলিত হয়েছিলাম বহরমপুর রবীন্দ্রসদনের সামনে আর পেছনে। সমীরণ ঘোষ, কৃষ্ণেন্দু ঘোষ, দেবাশিস ঠাকুর, রাজা ভট্টাচার্য আরও কেউ কেউ। সবাই কবিতা পড়ল। তুমিও পড়লে কিছু কবিতা। প্রায় প্রত্যেককেই তোমার কবিতার বই দিলে। একদিনেই তুমি এত কাছের হয়ে গেলে সকলেরই। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি কাউকে। সবাই তোমার আপন হয়ে উঠেছিল। তারপর থেকে যতবার বহরমপুর এসেছো সে সুশীল ভৌমিকের বাড়িতেই হোক কোনো গেস্ট হাউসে হোক বা আমার বাড়িতেই হোক প্রত্যেকবার তোমার সঙ্গে দিনভর ঘোরাঘুরি আর সন্ধ্যায় কবিতার আড্ডা। বারীন ঘোষাল থেকে তুমি বারীন-দা হয়ে গেলে। আর এই যে এখন তুমি তুমি লিখছি তখন তো তা ছিল না। ছিল আপনি আর তুমি। কখন যে তা তুমি আর তুই-এ পরিণত হয়ে গেছে তা আর মনে রাখাই সম্ভব হয়নি। আমি জানি এসব তোমার কাছে কোনো ইতিহাস নয়। কারণ তোমার আদতই এটা। এই তোমার কাছে স্বাভাবিক, যা তুমি চিরকাল করে এসেছো সব জায়গায় সব ক্ষেত্রে প্রায় সবার সঙ্গে। স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে তোমার এই ভূমিকাকে কে না হৃদয়ঙ্গম করেছে?
এর পরের ধাপেই আমার শুধুই মনে আসে কত কবির সঙ্গে যে আলাপ করিয়ে দিয়েছ তুমি। গুনে শেষ করা যাবে না। অপরিচিতকে করিয়েছ পরিচিত, স্বল্প পরিচিতকে ঘনিষ্ট, এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছ সম্পর্কগুলোকে। পায়ে সর্ষে লাগানো ছিল তোমার। পশ্চিমবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যেখানেই গেছ, সেখানকার কবিকূ্লকে বলেছ আমাদের মতো স্বল্প পরিচিত প্রায় অপরিচিত কবিদের কথা। আবার সেখানকার কবিদের কথা আমাদের কাছে। এমনকি দেশের বাইরেও অনেক কবির সঙ্গে অন্তত আমার যোগাযোগ তোমার উৎসাহ আর প্রশ্রয়েই। চাকুরিসূত্রে যেখানে যেখানে বদলি হয়ে গেছি সেখানকার কবিদের বলেছ আমার কথা, যোগাযোগ করার কথা। তোমার কথাতেই তারা এসে যেচে যোগাযোগ করেছে। কবিসঙ্গ ভালোবাসো তুমি। অন্যকেও সে পথের পথিক করেছ। কত নাম বলব! নাম যে ফুরাবেই না। আমি জানি এইসব কথাবার্তা শুধু আমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, সবার অভিজ্ঞতাই নিঃসন্দেহে এমনই। এ বিষয়ে তুমি যেমন কৃতকর্মা তেমনই উদার। তাই তো ‘ছাপাখানার গলি’তে এক আলোচনায় অনেকদিন আগেই লিখেছিলাম এ সময়ে আমার দেখা আমার জানাশোনা কবিতার সবচেয়ে বড় দূত এক হাফ মোটা মানুষ যাঁর হাতে থাকে একটা ব্যাটন, আর সেই ব্যাটনটা সে সবার হাত ঘুরিয়ে নেয় একবার করে। তারপর তারা নিজেই সেই ব্যাটনটাকে ভালোবাসতে শেখে আর আরও মানুষের (কবিতাকারী) দিকে এগিয়ে দেয়। এটা একটা প্রসেস, চলতে থাকে অন্তহীন। কবিতার অক্লান্ত দূত তুমি। কবিতা-অন্ত প্রাণের ঠিক যেমনটা হওয়া উচিৎ ঠিক তেমনই। হালে কবিতা লিখতে আসা তরুণ থেকে আমাদেরও বয়স পেরিয়ে যাওয়া লেখালিখি করতে আসা কবি গদ্যকারের এমনই অভিজ্ঞতা। তোমার ব্যাটন টা ঘুরেই চলবে, তাতে যে উত্তাপ রয়েছে তা সহজে কমে আসার নয়।
আড্ডা ভালোবাসতে তুমি। কবিতার আড্ডা। আমার কথাই ধরা যাক না, যেটা আমি জানি। কত আনুষ্ঠানিক আড্ডা আর ঘরোয়া আড্ডায় যে তোমাকে পেয়েছি তা গুনে শেষ করা যাবে না। জামশেদপুরের তোমার বাড়ি গেলেই কবিতার আড্ডা। কলকাতায় আমার ফ্ল্যাটে এলে কবিতার আড্ডা। তোমার নামেই চলে আসতো সবাই। প্রতিবছর জলপাইগুড়ি আর ডুয়ার্সে বা সিকিমে কয়েক দিনের ঘোরা আর কবিতার আড্ডা। প্রতিবছর ভালোপাহাড়ে কবিতার ক্যাম্প। কয়েকদিন ধরে মিলিত হওয়া, কবিদের কবিতা পাঠ আর আলোচনা সময়ের হিসেব না করেই। ত্রিপুরা, শান্তিনিকেতন, বহরমপুর মালদা দুর্গাপুর যেখানেই একত্রে গিয়েছি সেখানেই সে অঞ্চলের কবিদের নিয়ে চলত উপর্যুপরি কবিতার আড্ডা। মন দিয়ে একাগ্রতার সঙ্গে কবিতা শোনা আর কবিতার ওপর আলোচনা। নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে বিশ্লেষণ। এসবে এমনই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলে যে এই আড্ডাতে গ্যাপ পড়লেই বেরিয়ে পড়তে কোথাও না কোথাও। আমি জানি এই অভিজ্ঞতা শুধু আমারই নয়। এই অভিজ্ঞতা কারো কারো আমার চেয়েও আরও অনেক বেশি। কবিতা নিয়ে এত মাতোয়ারা থাকতে কবিতা নিয়ে এত চর্চা করতে খুব কম কবিকেই দেখেছি। কবিতা জ্ঞান কবিতাই ধ্যান। তেমনই তোমার একটা মূর্তি আমাদের অনেকের মধ্যে অনেক অনেক দিন জাগরূক হয়ে থাকবে।
যে-কোনোরকম নতুনকেই তুমি বাহবা দিতে। যে-কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তোমার ছিল সমান আগ্রহ। কত কবি তোমারই কিছু কথা শুনে, তোমার একটি চিঠি পেয়ে বা লিখিত আলোচনা পড়ে নিজেকে রিচার্জ করে নিতে পারত তার অন্ত নেই। তুমি নতুনের অভিসারী। নতুনের পূজারী। জরাজীর্ণ পুরোনোকে ভেঙে বেরিয়ে আসার মন্ত্র তোমার চলনে আর প্রকাশে। বাংলা কবিতার মূল ধারা তোমাকে কবিতা করতে সহায়তা করেনি, বা বহুল প্রচলিত মূলধারা আর তোমাকে সন্তুষ্ট করতে পারছিল না। তাই তুমি লাফ দিলে। লাফ দিলে কিন্তু একটা লক্ষ্যকে সামনে রেখে। শুধু শুধুই ভেঙে ফেলা নয়। ভাঙা আবার একই সঙ্গে নতুন গড়ে তোলা। আর সে শুধু বহিরঙ্গে নয় অন্তরঙ্গেও আমূল বদল। নতুনকে আবাহন করতে হলে পুরাতনকে বিসর্জন দিতে হয়। পুরোনো প্রভাব মুক্ত কবিতাই তাই তোমার কাছে নতুন কবিতা। তোমার বিস্তৃত চেতনাপথই রচনা করল ভেতরের আমূল বদলকে। শুধু আঙ্গিকে বদল করলে তা হতো প্রাণহীন। অন্তরঙ্গের পরিবর্তন ব্যতিরেকে আমূল বদল সম্ভব হয় না। তাই একটি তত্ত্বকেও সামনে আনলে তুমি, নাম দিলে ‘অতিচেতনা’। অতিচেতনায় উদ্বুদ্ধ একজন কবি পুরোনোকে বর্জন করে নতুনে অভিষিক্ত হবে, এই তো বাসনা এই তো যাচনা, এই তো খোঁজ় আর তারজন্য নিরন্তর ভ্রমণ। এসব কথা সবাই জানে। এখানে এগুলো বলা শুধু এই কারণেই যে এই নতুন পথে চলার ক্ষেত্রে তুমি যেমন অভিসারী হয়েছ, তেমনিভাবে এই ভ্রমণে আরও আরও অনুজ কবিকে প্রেরণা জুগিয়ে গেছো, উদ্বুদ্ধ করেছো। এইভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে অনেককে নিয়ে বন্ধুর চলার পথকে ক্রমে অতিক্রম করতে আমার সময়ে আমি তো সেভাবে আর কাউকে দেখিনি।
তোমার ভেতরে ছিল এক প্রাণবন্ত পাঠক সত্ত্বা। যতবার তোমাকে যত বই দিয়েছি, প্রত্যেকবার তুমি তা পড়ে তোমার ভালোলাগা মন্দলাগাগুলো অকৃপণভাবে জানিয়েছ। সেখানে যে বিশ্লেষন থাকত তা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভালোটুকু খুঁজে বার করতে তোমার জুড়ি নেই। আমি জানি এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শুধু আমারই নয়। যে কোনো কবির এই প্রাপ্তি। যারা তোমাকে বই দিয়েছে, তারা তোমার জ্ঞাপন পায়নি এমনটা কখনো হয়নি। তরুণ থেকে তরুনতররা এভাবেই কবিতায় লেগে থাকায় তোমার কাছ থেকে পেত অক্সিজেন। তুমি যেন তোমার চেতনা ও প্রজ্ঞা দিয়ে সেই তারুণ্যকে করতে আলোকিত। আর সেই আলোকে একজন অন্ধও পেতো প্রকৃত পথের দিশা। সেলিব্রেটি ছিলে না তুমি, ছিলে প্রকৃত বন্ধু ও পথের দিশারী। যখন বই পেয়ে কিছুই উচ্চবাচ্চ না করাটাই ছিল অগ্রজের ভূমিকা তখন তোমার এই কার্যকরী ভূমিকা শুধু আমাকেই নয় সবাইকেই করত মোহিত। কবি বারীন ঘোষালের চেয়ে পাঠক বারীন ঘোষাল কোনো অংশেই কম ছিল না। আর এই পাঠকসত্ত্বাই খুঁজে খুঁজে বের করত তরুণতম কবিটিকে। এ ছিল তোমার কবিতার অন্বেষণ, তথা নতুন কবির।
প্রথম জীবনে এবং দ্বিতীয় জীবনের অনেক সময় ও অনেক ক্ষেত্রেই তুমি ছিলে একাকী যাত্রী। কিন্তু কোথাও দমে যাওয়ার ব্যাপার ছিল না। ব্যক্তিগত দুঃখকে পাত্তা না দিয়ে নিরলসভাবে কবিতায় সমর্পিত ছিলে। তাই প্রথম জীবনের স্থুলতা নয় দ্বিতীয় জীবনের সূক্ষতাই ছিল তোমার জীবনের মূল মন্ত্র। সেখানেও তুমি ছিলে জেদি এবং আপোষহীন। নিজের চেতনা ও বিশ্বাসের ওপর ছিল অগাধ আস্থা। কাউকে ছোট না করেও নিজের পথ চলাতে তাই তোমার কোনো অসুবিধাই হয়নি। সিংহহৃদয় ছিল তোমার। তাই অনেক সময়ই আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে রক্তাক্ত হলেও প্রত্যাঘাত করো নি বিপুল উৎসাহে। এসব ক্ষেত্রে নীরবতাই ছিল তোমার অভিপ্সা আর পাথেয়। বদলে ভালোবাসা পেয়েছো বহু মানুষের। আর সে ভালোবাসাই তোমাকে জীবন্ত করে তুলত। বলতে ‘ভালোবাসাই আমার পাসওয়ার্ড’। বিনিময়ে কিছু না চেয়ে ভালোবাসতে বলেই তো এত ভালোবাসা তুমি পেয়েছো। গুটিকয় ছাড়া তোমাকে যে এত মানুষ প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত সে তো তোমারই অর্জন।
তুমি ছিলে লিট্ল-ম্যাগাজিনের প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক। লিটিল-ম্যাগাজিনই ছিল তোমার সাহিত্যকীর্তির ধারক ও বাহক। নিজে যেমন একটি লিট্ল-ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত ছিলে শেষাবধি, তেমনি অনেক লিট্ল-ম্যাগাজিনের সম্পাদক পরিচালকের সঙ্গে ছিল তোমার মধুর সম্পর্ক। খুব কম লিট্ল-ম্যাগাজিনই ছিল যারা তোমার কাছে লেখা চেয়ে পায়নি। কোনোদিন বানিজ্যিক ও মিডিয়া শাসিত পত্র-পত্রিকায় লেখা্র জন্য যেমন লালায়িত ছিলে না তেমনি লেখোও নি। এসব কথা সকলেরই জানা। আর তারা এর প্রমাণ পেতো বইমেলা বা লিটল-ম্যাগাজিন মেলায়। বছরের পর বছর এই সমস্ত মেলায় তোমার সক্রিয় উপস্থিতি বহু অনুজ ও তরুণের কাছে প্রেরণার সামিল হয়েছিল। শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না অনেকদিনই। সেসব তুচ্ছ করে বিগত দুটো মেলাতেই তুমি সপ্রাণ উপস্থিত ছিলে। প্রাণ থেকে লিট্ল-ম্যাগাজিনকে ভালো না বাসলে এমনটা করা যায় না। এ এক ধরণের নিষ্ঠা। লিট্ল ম্যাগাজিন কেন্দ্রিক নিষ্ঠা।
আজ তোমার কথা লিখতে গিয়ে কতটুকুই বা লিখতে পারলাম! যাই লিখি না কেন, তাই বড় কম হয়ে যাবে। কোনোকিছুতেই তোমাকে আঁটানো যাবে না আমি জানি। তুমি এত বড় যে যতটুকুই উল্লেখ করি যতদিকগুলোকেই উন্মোচিত করার প্রয়াস চালাই তাই বড় ছোট হয়ে যাবে। তুমি আত্মার আত্মীয়, যতটুকু তোমায় পেয়েছি তা আমার কাছে অতলান্ত ও অফুরাণ। কবিতার ক্ষেত্রে, কবিতা ভাবনার ক্ষেত্রে, আর কবিতার সম্ভাবনাময় পরিসর সৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ও জ়ীবনানন্দ দাশের পর আমাকে এত বড় ঝাঁকুনি আর কেউ দেয়নি। আমি মনে করি, এ-কথা শুধু আমারই কথা নয়, একথা তোমার অনেক অনুজেরও।
বারীনদা আমার প্রণাম নিও। ভালো থেকো তুমি। সবসময় যেমন বলতে ‘ভালো আছি, ফার্স্টক্লাস আছি’, জানি আজও তাই বলবে। আর আমিও সেটা শুনে আশ্বস্ত থাকব। তোমার কণ্ঠস্বর যে শুনতে পাচ্ছি, শুনতে পাবো বহুকাল, কেননা তোমার অধিষ্ঠান যে আমার অন্তরে। শুধু মনে হচ্ছে বলছ—‘কিরে কবিতা শোনাবি না?’ শোনাবো বারীনদা। কিছুদিন পরেই শোনাবো। অনেক ভালোবাসা নিও।

ইতি তোমার উমা।
১০/১১/২০১৭

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.