/ / নারীজীবনের চলনের যে ছন্দ জাতি-দেশ-কাল-শ্রেণী-সীমাতীত, সেই গল্প যে কোনো নারীর, প্রায় সকলের – সুরঞ্জনা রায়

নারীজীবনের চলনের যে ছন্দ জাতি-দেশ-কাল-শ্রেণী-সীমাতীত, সেই গল্প যে কোনো নারীর, প্রায় সকলের – সুরঞ্জনা রায়

শেয়ার করুন

ভাষাশিক্ষার পর থেকে কবিতার সত্যতা বুঝে নেবার এক অবিমৃষ্যকারী তাগিদে সাহিত্য শিক্ষার দিকে অগ্রসর হয়েছিলাম। ছন্দ, আঙ্গিক, তত্ত্বকথা মায় ভাষাবিজ্ঞান কিছু কিছু রপ্ত হবার পর যা জানা গেল, তা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক, সন্দেহ নেই। জানলাম, এহো বাহ্য। “সব্ ঝুঠ হ্যায়”। কারণ, কবিতার সত্যতা ঈশ্বরজ্ঞানের সমান। ঈশ্বরজ্ঞান মানে, বিশ্বাসে মিলায় সত্য, তর্কে বহুদূর! কবিতা যে আছে, এইটুকুই সত্য, বাকি সাধনা, মনশ্চর্চা। ঈশ্বররূপে মা (কালী), বাবা (শিব), সন্তান (গোপাল) সব সত্য, তখনই, যখন তাঁরা মানসচিত্রে প্রকট হন। এইবার বুদ্ধি বলল, ইহার নাম কল্পনা ভাই, সত্যরূপী ঈশ্বরকে এমনভাবে ভেবে নেওয়া – সাধনার নামে, এ শুধু কবিতাচর্যা। অর্থাৎ, কবিতার সত্যতা নিছক কল্পনায়, যাঁরা তাঁকে পেয়েছেন তাঁরা বলেন, তিনি নিরাকার, নির্গুণ, নির্বেদ এবং কল্পনাতীত! তাও তারা পায়, আমরা সত্য জেনে দিন গুজরান করি।

সীতা হেমব্রম কে? কে? কে? কে? – নীচু জাতি? ধর্ষিতা? অত্যাচারিতা? ভয়ঙ্কর কিছু হয়েছিল? খবরে এসেছিল? বেঁচে আছে না মেরে ফেলেছে–হয়তো তার কালো, নোংরা নোংরা কাপড়ে পেঁচানো বা নগ্ন শরীরের, থ্যাঁতলানো মাংসপিণ্ডের মতো দেহটার ছবি ছেপেছিল মিডিয়ায়? সীতা হেমব্রম কালোই হবে, ধপধপে ফর্সা না নিশ্চয়… সীতা কালো না হলেও, হেমব্রম কালো না হয়ে যায় না, তারপর বোঁচা নাক, উঁচু দাঁত, বড়ো কপাল, মোটা ঠোঁট–নিশ্চয় হবে। আমাদের লজ্জা হবে না এরকম ভাবতে, আর হলেও আমরা নারাজ–ওই ওদের এরকমই দেখতে হয়! কিন্তু সীতা হেমব্রম নাকি কবিতা লিখেছে! বলছে, “আমি সীতা হেমব্রম”। আবার আহ্লাদ উথ্লে ওঠে। উফ! দেখেছো–ইয়ে should speak and she has spoken already! আহ্লাদ কমে যায়, কারোর বা মরে যায় নীচে কবির নাম দেখে–যাহ… সেই উচ্চবর্ণের ‘তাহাদের কথা’ বলে দেবার গল্প তাহলে! তখন বুঝি, এটা একটা কবিতা। সামাজিক কবিতাও বলা চলে। একটা পুরো কবিতার জন্ম হয়েছে একটি কবিতার বইয়ের নাম থেকে। ভেতরেও আছে বোঝাই করা আরওআরও অনেক কবিতা।
‘আমি সীতা হেমব্রম’ থেকে কিছু বাছাই কবিতার কথা নিয়ে এই লেখা।

তিন নম্বর বাসা রুইছে মাঠাবুরুর ছা
ইজের কাচতে হয়, কেমন কেমন বাস উঠছে শকরি
শরীরের, নাকের সিকনি ওটা? শবরের চোখ দিয়ে ডললাম
পেয়াঁজ খোসার পহুলা যে পাতলা মাখম, সেইরকমের স্লেট্!
উবু হয়ে কত্তবার
শেকল টেনে দেখি
নখে ঘষটানি খায়
চোখে জল আসে এত মোলাম

‘লালের ডগায় চকের দাগ
সেলেটে পেনসিল কাগে খাক্’ – এই বললেই দৌড় দৌড়
নীরদাসুন্দরী ইস্কুলে প্রথম ঘন্টা ইস্তক শেকল টেনে দাগ দেখার
গল্প
ক্রমে আরো জোনাকি পোকা, আমঝুঁকি বেগুনের মত মেয়েরা
গোল হয়ে শুনতে চায় আমাকে
রাতে জিয়োনো বারকোশের পুঁটির মত কিলবিল্ করছে মেয়ে হরফ
আমাদের অজ্ঞতার শুরু হচ্ছে ঐখানে
যেখানে তিন নম্বর ঘর রুইছে মাঠাবুরুর ছা

মাঠাবুরুর ছা। রুইছে; ধান নয়, তিন নম্বর বাসা… অথবা ঘর।
ইজের কাচে কেউ, শরীরের গন্ধ শকরি বা এঁটো। দৃশ্যকল্প চলতে থাকে। ইন্দ্রিয়গুলি একে একে জেগে ওঠে আমাদের। স্বাদ থেকে আঘ্রাণ–বা ঘ্রাণযন্ত্রের নির্যাস–শিকারের মতো তীক্ষ্ণ অনুভূতি–সেই চোখে ডলা লাগার সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের উল্লেখে চোখে জ্বালা ধরার কথা মাথায় আসতে না আসতেই পেলবতার গল্প। সেই ত্বক, যে জানে পেঁয়াজ ছাড়াবার রহস্য। সেই জানবে পেঁয়াজের খোসার মাখমের স্পর্শ। শিকলে লেগে থাকে ধাতব ঘসটানির আওয়াজ।
এই ইন্দ্রিয়যাত্রা নারীশরীরের। পরবর্তী কথাগুলোয় মালুম চলে। ক্রমে ইস্কুল পেরিয়ে… (নীরদাসুন্দরী ইস্কুল, বালিকা বিদ্যালয়? কল্পনা তাই বলে, কারণ শেকলের দাগ গোনার গল্প খুব মেয়েলী উপকথার অংশ) পৌঁছে যাচ্ছি আমঝুঁকি বেগুনের দিকে? সেটি কী বস্তু? আমঝুঁকি এক গাঁয়ের নাম, সেই গাঁয়ের বেগুনের মতো সব মেয়ের দল গল্প শুনতে চায়–মেয়ে হরফের জীবনের নামে যে দাপাদাপির ছবি পাই তাতে কত গল্প যে খুলে যায়…। ঈশ্বর জানেন, কল্পনায় তাঁকে পাওয়া যায়!
অথচ, মাঠাবুরুর পাহাড়ের কথায় গল্প শুরু হয়েছিল… ধানের মতো আশ্রয় বুনছে সেখানে, সেখানকার দেশজ সন্তানেরা।
নারীজীবনের চলনের যে ছন্দ জাতি-দেশ-কাল-শ্রেণী-সীমাতীত, সেই গল্প যে কোনো নারীর, প্রায় সকলের। গল্পগুলি সাধারণ। পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে ইজের কাচার মতো–করতে হয়, করে যেতে হয়। কৈ মাছ জিইয়ে রাখতে হয়; বারকোশে কৈ মাছ জিইয়ে রাখা যায় না, মাছ ছিটকে পড়ে। একথা সে-ই জানে, যে মাছ জিইয়ে রাখে।
“ক্রমে গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল” – খুব জানা এই জীবনানন্দীয় দৃশ্যকল্প ব্যবহারের এই বলিষ্ঠ সাবলীলতা একটি নারীর অবদান। কবির সাফল্য এইখানেই। এইখানেই আরও পড়ব’র খিদে বেড়ে যায়।
শিল কোটার মরসুম
আদিযুবতীর গোড়ালির কাছে অজাগর পানের ডাবর
ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে মরসুমি স্তন্যপায়ীরা
নাকের চাবি কানের লতিতে কু দিয়ে ফঙ্গবেনে বসন্ত নামছে
আমার কন্ঠার হাড় ধরে, লিহাফ পেরিয়ে জানু
পাটাতনের শেষ মাদীশঙ্খের হাঁ এ
যতদূর এগিয়ে যাওয়ার পর আর কেউ
কোনো মরদ ফেরে নি কোনদিন
আর ঠিক এ পর্যন্ত বাউলিয়া কাঁদরের রেকাব স্বর তুলছে
শালের থালায় এঁটো পাত, লাট্টুর মতো পেঁয়াজ , এক ফালি
ধানি মরিচের ঘর নীরব হয়ে চেয়ে থাকে টায়ারের ঘুরন্তমুখে
শবরীর মা যেন শিল কাটানোর ভয়ে
প্রতিটা ভোরবেলা ঘুমের হাঁড়ির তলায় আঙুল চালিয়ে দেখে
কতটা ‘যুপতি’ হল মেয়ে
শিলনোড়ার গল্প বাঙালি পরবে আদি ও অকৃত্রিম। অকৃত্রিম, কারণ, মশলাপাতি বেটে-টেটে নিয়ে রান্না বসানোর সেই রীতি ফুল্লরা থেকে রঙ্গমালার গল্প পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু শুধু পরবেই নয়, শিলপাটা সরবে উপস্থিত বিবাহকালীন অনুষ্ঠানে। পাতি মশলাপেষণের যন্ত্র হিসেবে নয়, শিলনোড়ার ভূমিকা সেখানে সংসারের যাবতীয় বালাই-নক্সার প্রতীক। বিবাহযন্ত্রের জাঁতাকলে পিষে যাবে মানব-মানবীর কোমল হৃদয়–ইত্যাদি।
শিল কোটার মরশুম বললে তাই এতগুলি কথা হুড়হুড় করে স্মরণে আসে। কিন্তু মরশুম? শিল পাথরের ধার বাড়াতে ছেনী দিয়ে তাকে কুঁদে দিতে হয়। পাথরের বুকে ছন্দে ছন্দে জমা পড়বে আঘাতের চিহ্ন। আঘাত যত সরেস, কাজও তত বেশি। ধার কমে গেলেই আবার পাথর কুটিয়ে নাও। মাখনের মতো সব মশলা বেটে নেওয়া যাবে। কিন্তু বিশেষ বিশেষ কালে এই শিল কোটা হয়, এমনটা নয়। তাহলে কি এই শিলকোটার মরশুমের নামে আবার একটা গল্প লিখে দেওয়া হল? দেখা যাক।
শুরুর দ্বিতীয় লাইনেই পাই মরশুমি স্তন্যপায়ীদের কথা। মেরুদণ্ড বা কশেরুকা বিশিষ্ট প্রাণীদের কথা আমরা জানি, যারা মাতৃগর্ভের বাইরে এলে, সাদা একজাতীয় তরলের উপর খাদ্য ব্যাপারে নির্ভর করে। এই তরলের উৎস মাতৃশরীরের একটি বিশেষ গ্রন্থি। মানবজাতীয় প্রাণীদের পুরুষ শ্রেণী এই গ্রন্থির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ বোধ করে প্রথম রিপুর প্রভাবে। আদিযুবতীর পায়ের কাছের ঘুমন্ত পানের ডাবর নির্দেশ করে দেয় যুবতীটির পান খেয়ে রাঙিয়ে নেওয়া ঠোঁটের কথায়, পান খেয়েই না পায়ের কাছে ডাবর নামিয়ে রাখে কেউ। আর সেই নামিয়ে রাখা ডাবরের নিস্তব্ধতার সময়ে, পলাতক স্তন্যপায়ীর দল চলে গেলে, কানের লতি, নাকের ডগা থেকে ঝরে পড়ে কাম–যখন দেখি, ঠিক তারই পরে দুর্বল বসন্তের কু-ডাকের রূপকল্প এসে দাঁড়ায় কবিতায়। কণ্ঠার হাড়, আবরু ছেড়ে জানু পেরিয়ে মাদী শঙ্খের উল্লেখে কবিতা এঁকে দিচ্ছে এক পূর্ণ নারী শরীর–যে শরীর টেনে নিতে পারে যে কোনো পুরুষকে– মন্ত্রমুগ্ধের মতো। লক্ষ্যণীয়, স্তন পান করা সন্তানের দলের গতিবিধি এইসব, এই পুরুষ স্তন পান করে, তারা স্তন্যপায়ী, কিন্তু অন্য পরিচয়ে তারা কি আততায়ী?
পরের স্তবকে ঝলকে ওঠে জ্বালা–পেঁয়াজের ঝাঁজ, ধানি মরিচ–কবিতাটির সর্বাঙ্গে জ্বালা ধরে ওঠার ইঙ্গিতটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ঘুরন্ত চাকার দৃশ্যকল্পে–কালের চাকা এরকমই ঘুরতে থাকে, আর জীবন্ত হয়ে ওঠে ‘মরশুম’ শব্দটি… তাহলে সময়ে সময়ে এই পেষণ আসলে মরশুমি, যখন আদি যুবতী মায়ের মেয়ে জোয়ান হয়, তার ঘুমের ভেতর শরীরের হাঁড়ির খবর রাখে মা–মেয়ে ‘যুপতি’ হলেই তাকে পিষে ফেলার মরশুম এসে যাবে তো! উল্লেখ্য, যুপতি শব্দটি যৌথ অর্থে প্রকট এইখানে–যুবতী শব্দের দেশী রূপ এবং তৎসম যুপতি–অর্থ–গুলিয়ে যাওয়া।
যে ভয় এবং সংশয় নিয়ে এই কবিতা দাঁড়িয়ে আছে, নারীহৃদয়ের আদি অকৃত্রিম উদ্বেগচিত্র হয়ে, তার প্রকাশচিত্রের নাম সীতা হেমব্রম। সীতাকে নিয়ে শান্তি ছিল না কোনোদিনও, কোনো মায়ের, তার উপরে সে দলিত (শব্দটির রাজনৈতিক পরিচয় ফেলে এগিয়ে আসুন, পদদলিত হিসেবে পড়ুন একে, এই অনুরোধ রইল। কবিতা তো সহমর্মিতারই এক রূপ, নয় কি?) এই থেকেই মনে হয়, প্রতি নারী নিজের ভেতরেই রেখে দেয় তার নিজস্ব নারীসত্তার প্রতিরূপ, সেই নিজের কন্যা–কন্যা যুবতী হলে সে গিলে খাবে যে কোনো মরদ, স্তন দেবে তাকে, যে কিনা সন্তানও হতে পারে তার–কিন্তু নিজে পিষে যাবে প্রতিবার–প্রতিটি শিল কোটার মরশুমে।
কবিতার ভাষা যখন সাধু থেকে চলিত থেকে উপভাষার অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে বিক্রয় করে চলে নারীজনমের অবচেতনের ভয়, তখন কথাগুলি নিছক কোনো শ্রেণীর নারীর কলমজাত, সে প্রসঙ্গ অবান্তর। যে কথা বলারই ছিল, তাই বলা হয়েছে মাত্র–চিরন্তন কান্না কবিতার রূপ পেয়েছে এখানে।
বর্শা শেখার ক্লাস
এক
সোনাখড়কে মাছের পেলবতা চক্ চক্ করছে ফলায়
নীবিবন্ধ গামছায় শতাব্দীর শিরা ফাটানোর কাজ
এবার হাতে নিলাম, তাক্ করেছি পাগলা ঝোরার বিল
বুনো কামিনীর মাদক আতর মিশে যাচ্ছে , নুয়ে যাচ্ছে
কালিদহে
গাঙ শালিখের বাসায় রাত্রিকালীন ভামের চোখ জ্বললে
শূলে দেব । নিষাধের তুক্ গাঁজিয়ে উঠবে পৃক্ষভুখার ঘাম
রক্ত থেকে , রোজ সেই শুখা থালায় বাতাসার মেজ সেজ
ক্ষীরপুলি ভেবে আমি আঙুলের মাড়
ভাঙি। আঙুল চেবাই তেষ্টায়
শরীর মটকে দেখি কোথাও তার হাড়ে দুধ বইছে কি না
দুই
গোধূম পুড়িয়ে চ্যাপটা রুটি করছে বনদুর্গারা
তার সঙ্গে খেসাড়ির ডাল সাঁতলে ডুমো আলু
পাতের সবুজ ঢেকে দিচ্ছে আটকৌড়ের দল
মুগ পাতায় লিখতে হবে ছড়া, গলা দেবে
নাচিয়ে বাজিয়েরা
বড়ির খাটের পায়া ধরবে হলুদ গাঁদার মালা
কাসুন্দি আমচুড়ের পাশে সে ও বসেছে, আর বছর
এমনই কোনো দিন যে তার মরা ছাওয়াল কোলে পেয়েছিল
কান্না নেই
শুকনো খট্ খটে
এই কবিতাটি আসলে যুদ্ধের কবিতা। অথবা যুদ্ধ প্রস্তুতির। সোনাখড়কে মাছ দেখেছেন কখনও? যদি না দেখেন, তাহলে বলা মুশকিল এর গড়নে কেমন বর্শার ফালের টান দেখা যায়। সে মাছের চকচকে দেহের মতো যার অস্ত্র, তার পরনে কোমরে মাত্র একটি গামছা। এই অবধি এক মেছুনি মেয়ের ছবি ছিল। কিন্তু পরবর্তী শব্দগুলো একে একে বলে দিচ্ছে অন্যমাত্রার এক যুদ্ধ প্রস্তুতির সুর। শিরা ফাটানো, রক্ত গড়ানো শূলে চড়ানোর গল্পে ঢুকে পড়ছি আমরা। অথচ, এই যুদ্ধে মিশে আছে গৃহস্থালির ছবি। সেখানে কামিনী ফুলের গাছ আছে, গাঙ শালিকের বাসা আছে, আছে ভাম বিড়ালের আনাগোনা। সে বিড়ালের চোখ জ্বলে উঠলে আসবে শাস্তির অমোঘ মুহূর্ত। শাস্তি হবে শূলে চড়িয়ে। কিন্তু কাকে? সেই উত্তর নেই। কিন্তু এ যেন শত্রুর ওপরে নজর রেখে এক মনে করে যাওয়া এক যুদ্ধ প্রস্তুতি মাত্র।
এই মনে মনে ভুলের সময় গণনা তাই এক ধরনের বয়ে যাওয়া নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কবিতায়। এক নিশ্বাসে পড়ে যেতে যেতে খেয়াল থাকে না ‘নিষাধ’ শব্দটির উপস্থিতির। প্রথম পাঠে মনে হয়েছিল নিষাদ, পরের বারে নিষেধ এবং শেষমেষ আসল শব্দটি এক চমকপ্রদ মোড়ে এসে দাঁড় করায়। তাহলে এ কি পাগলের অর্থহীন প্রলাপ? নাকি উন্মাদিনীর পাঠক্রমে আমরা ঢুকে পড়েছি এই নিষাধ শব্দটির হাত ধরে, যেখানে অন্নহীনের রক্ত থেকে শিকারি এবং নিষেধের বাধা পেরিয়ে, থালায় রাখা বাতাসাকে ক্ষীরপুলি ভাবে নেওয়ার ভুলটুকুকে সম্বোধন করার জন্যই এই অর্থহীন নিষাধ শব্দের আগমন? আঙুলের অবশতা যেন ভাতের মাড়ের মতো, সুঘ্রাণ এবং হড়্হড়ে! হাড়ে খুঁজে নেওয়া দুধের নিশান বলে দেয় শেষে, এই যুদ্ধপ্রস্তুতি অনাহারের বিরুদ্ধে, দারিদ্রের বিরুদ্ধে। কবিতা নয়, প্রলাপের মতো হাহাকার–ক্ষিদে মেটানোর নানান ফন্দির একরকম। গাঙ শালিকের সংসার, ভাম বিড়ালের আগমন, পাগলা ঝোরার বিলে তাক্ করে বসে থাকা এক অভুক্ত সময়ের গল্প–কামিনী ফুলের গন্ধ যৌনতা আনছে না–বিষাক্ত কালিদহে নুয়ে পড়ছে সব–রক্তে যখন গেঁজে ওঠা ভাতের অপেক্ষা শুধু রয়ে যাচ্ছে বাকি…
বাকি কবিতার অবয়ব ধরে দিচ্ছে এই প্রলাপের ছাপ। এক উৎসবের ছবি ছেনে উঠে আসছে সেই মায়ের চোখ, যে মাছের বর্শায় অনাহারকে গেঁথে তুলে কান্নাহীন চোখে করে অপর্যাপ্ত আয়োজন–রুটি আর খেসারির ডাল সঙ্গে আলুর আয়োজন–তারপর শুধু উৎসব–মুগের পাতায়, গাঁদার মালায় এবং কাসুন্দি বা আমচুড়ের মতো জমিয়ে রাখা খাদ্যের উল্লেখে–ধীরে জানা গেল, সেই মেয়েটি, কোমরে গামছা জড়িয়ে, বিলের জলে মাছ দেখতে দেখতে, স্বপ্ন দেখছে উৎসবের; আগের বছরের অনাহারে মৃতবৎসা মা এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে–কান্না ছাড়া তার আর সব কিছুই আছে।
‘বর্শা শেখার ক্লাস’ নিয়ে চলে গেল আমাদের আবার, সেই সীতার কাছে–যার যুদ্ধ রাবণের সঙ্গে না, রামের সঙ্গেও না–শরীরের সঙ্গে–ক্ষিদে যার ধর্ম আর ধর্ম রক্ষা না হলে, মৃত্যু যেখানে অনিবার্য!

বই:- আমি সীতা হেমব্রম
কবি:- বল্লরী সেন
প্রকাশক:- আপনপাঠ
মূল্য:- ₹৬৫টাকা

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.