/ / কাস্তেটা দাও শান হো… – অংশুমান ঘটক

কাস্তেটা দাও শান হো… – অংশুমান ঘটক

শেয়ার করুন

হেই সামাল ধান গো
কাস্তেটা দাও শান হো
জান কবুল আর মান কবুল
আর দেব না আর দেব না
রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো

সলিল চৌধুরী

প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার সলিল চৌধুরীর এই গান আজও আমাদের শিহরিত করে।

তেভাগা, তেলেঙ্গানার সেই বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের পথ বেয়েই দেশের অন্নদাতারা তাদের দাবি আদায়ে আজ রাজপথে।

চলছে জান কবুল আর মান কবুল প্রতিরোধ। দাবি একটাই, প্রত্যাহার করতে হবে কালা কৃষি আইন।

দেশজোড়া কৃষকদের এই আন্দোলনের খবর আজ আর আমাদের দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। অথচ দেশীয় গণমাধ্যমের শিরোনাম থেকে মুছে গেছে এই আন্দোলনের খবর। তাতে বিন্দুমাত্র স্তিমিত হয়নি এই আন্দোলন, বরং তীক্ষ্ণতা আরও বেড়েছে।

৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯।
কয়েক হাজার কৃষক প্রায় ৬০০ ট্রাক্টর নিয়ে মিছিল করেছিলেন।
না, নয়াদিল্লি না।
বলছি ওয়াশিংটন ডি সি-র ঘটনা।

চার দশক আগে মার্কিন কৃষকরা এভাবেই ট্রাক্টর মিছিল করে দখল নিয়েছিলেন ন্যাশনাল মলের, ওয়াশিংটন ডি সি-তে। কৃষিপণ্যের সরকারি সহায়তা বৃদ্ধির দাবিতে।

কৃষিতে “মুক্ত বাজার” নিয়ে মার্কিন প্রশাসন যতই সওয়াল করুক, ওই আন্দোলনের পর থেকেই মার্কিন মুলুকে, প্রতি বছরই বেড়েছে কৃষিতে ভর্তুকির পরিমাণ।

আসলে ভারতের কৃষক আন্দোলনের ছবি উসকে দিয়েছে মার্কিন জনগণের চার দশক আগের স্মৃতিকে।
তাই সংহতি জানিয়েছেন তাঁরা।

শুধু মার্কিন জনগণই নয়, বিশ্বের বহু দেশ আজ ভারতের কৃষক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন।

গোটা দেশ যখন করোনার দাপটে বিপন্ন, তখনই ভারতীয় সংসদে পাশ হল কৃষি আইন।

বিগত কয়েক মাস যাবৎ উত্তাল গোটা দেশ, কৃষকদের এই বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনের ফলে। সরকার কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে দেশের অন্নদাতাদের বিরুদ্ধে। এইধরনের আইন পাশ করানোর আগে যে আলোচনা প্রয়োজন ছিল, কৃষক সংগঠন, কৃষি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে, তাও হয়নি।

যেখানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে এখনও কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না, যেখানে কৃষকদের আত্মহত্যা বেড়েই চলেছে প্রতিনিয়ত, সেখানে এই আইন কৃষকদের জীবনে আরও অন্ধকার নামিয়ে আনবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কী আছে এই আইনে? তা নিয়ে অনেক চর্চা হয়েছে নানা প্রবন্ধে। ইতিমধ্যে আমরা মোটামুটি ওয়াকিবহাল সে সম্পর্কে। এককথায় বলা যায় দেশের কর্পোরেটদের স্বার্থবাহী এই আইন। কর্পোরেটদের মুনাফা বাড়বে এই আইনের ফলে। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আপামর কৃষক সমাজ।
ফলত প্রতিবাদ, প্রতিরোধ অনিবার্য।

স্বাধীনতাত্তোর ভারতে এই রকম প্রতিবাদ, প্রতিরোধ দেখেনি আমার দেশ।

এই হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে, দিনের পর দিন খোলা আকাশের নীচে দিল্লির সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে অবস্থান চালিয়ে যাওয়া, নিঃসন্দেহে অভূতপূর্ব।

এই আন্দোলনে সামিল হয়ে শহীদ হয়েছেন কয়েক’শ কৃষক।

কৃষক সংগঠনগুলির সঙ্গে সরকারের আলোচনায় কোনো সমাধান সূত্র বের হয়নি এখনও।

এই আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করতে সরকার নানা কৌশল নিয়েছে, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। গত ২৬শে জানুয়ারি কৃষকদের ট্রাক্টর র‍্যালিকে কালিমালিপ্ত করতে সরকার যে কৌশল নিয়েছিলেন, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ছাত্র, যুব, শ্রমিক, মহিলা, বুদ্ধিজীবী সহ সমাজের সব অংশ আজ কৃষক সমাজের পাশে।

সম্প্রতি পাঞ্জাবের পৌর নির্বাচনে বিজেপি কার্যত ধরাশায়ী হয়েছে। ফলত এটা পরিষ্কার যে এই আইন কতটা ক্ষতিকর কৃষক সমাজের ওপর তা সাধারণ মানুষও বুঝে গেছে।

দেশজুড়ে ৫০০টিরও বেশি কৃষক সংগঠন একত্রিত হয়ে তৈরি হয়েছে “সংযুক্ত কৃষক মোর্চা”।

৯ই জুন, ২০২০।
অর্ডিন্যান্স জারি করার মধ্য দিয়ে নয়া কৃষি আইন কার্যকরী হয়।

এরপরেই শুরু হয় আন্দোলন। অসংখ্য প্রতিবাদ মিছিল, সভা, অবস্থান সংঘটিত হয়েছে কৃষি আইনের বিরুদ্ধে। আজও তা অব্যাহত। বিন্দুমাত্র ছেদ পড়েনি প্রতিবাদ, প্রতিরোধে।

সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের ‘খালিস্থানি’, ‘মাওবাদী’, ‘পাকিস্তানি’ ও ‘চীনের দালাল’ ইত্যাদি ইত্যাদি তকমা দেওয়া হয়েছে। আসল উদ্দেশ্য হল এই আন্দোলনকে ভাঙার চেষ্টা। এমনকি কৃষকদের ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে আন্দোলনকে ভাঙার কৌশল নিতেও দ্বিধাবোধ করেনি সরকার। কিন্তু আশার কথা হল, সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

কৃষি উৎপাদনের খরচ বেড়েছে বহুগুণ। কৃষক পাচ্ছে না ফসলের ন্যায্য মূল্য। ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ছে কৃষকরা। হতাশা বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। ফলত বাড়ছে আত্মহত্যা। সরকার উদাসীনতা দেখাচ্ছে এ বিষয়ে। যেখানে সরকারের থাকা উচিত কৃষকদের পাশে, সেখানে সরকার সাহায্য করছে কর্পোরেট কোম্পানিগুলিকে। উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে কৃষি উৎপাদনের বাজারকে কর্পোরেটদের সুবিধার্থে। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশকে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে ফসল কেনার দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে। নয়া কৃষি আইনে চুক্তি ভিত্তিক চাষের যে শর্তের কথা বলা হয়েছে, তাতে ভাগচাষি, কৃষি শ্রমিকদের সংকট আরও ঘনীভূত হবে। কর্পোরেট কোম্পানিগুলি মুনাফার স্বার্থে প্রযুক্তি নির্ভর হবেন। ফলত কাজ হারাবেন কৃষি শ্রমিক বা ক্ষেতমজুররা।

সরকার বলছে এই কৃষি আইনে লাভবান হবে কৃষক সমাজ।

তবে কেন এত বিক্ষোভ?

তাহলে কী আছে এই কৃষি আইনে?
সংক্ষেপে আমরা এখন এই বিষয়ে আলোচনা করব।

১) কৃষিজাত পণ্য বিপণন বিষয়ক (Promotion and facilitation act)
২) চুক্তি ভিত্তিক কৃষিকাজ বিষয়ক (Agreement of on price assurances and farm service act)
৩) খাদ্যপণ্যের মজুত বিষয়ক ( Essential commodities act)

এইটুকু বলা যায় যে এই আইনের ফলে,
ক) শুধুমাত্র কর্পোরেট সংস্থাগুলি লাভবান হবে।
খ) কৃষকরা পুরোপুরি বাজারের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন।
গ) কৃষকদের, কৃষি ব্যবসায়ী, বৃহৎ খুচরো ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারীদের মুখাপেক্ষী করে তুলবে।
ঘ) কৃষি বাণিজ্যে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে সব নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হবে।

সরকার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে—
এই আইনগুলি কৃষকদের সুযোগ করে দিল যে উৎপাদিত পণ্য যে কোনো জায়গায় বিক্রি করে দিতে পারবেন কিন্তু কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম (MSP) পাবেন কি?

বাস্তবতা হল, পাবেন না।

কর্পোরেট সংস্থাগুলি যে দাম ধার্য করবে সেই দামেই তা বিক্রি করতে বাধ্য হবেন তাঁরা। এখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ আর থাকল না।

এই আইনে কোথাও উল্লেখ নেই ন্যূনতম কত কৃষিজ পণ্য কেনা যাবে। অর্থাৎ যত খুশি কিনতে পারা যাবে।

চুক্তিভিত্তিক চাষে কৃষিজপণ্যের ওপর কর্পোরেট সংস্থাগুলির মনোপলি কায়েম হবে।

দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকই ভূমিহীন ও প্রান্তিক। এই আইনে তাঁদের অসহয়তা আরও বাড়বে। এই নিয়ে সিভিল কোর্টে কোনো মামলা করা যাবে না।

ফলত যেটা হবে, কৃষকদের উৎপাদন করতে হবে কৃষি ব্যবসায়ীদের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী।

দ্বিতীয়ত, অত্যাবশ্যক পণ্য আইন (ECA) সংস্কার করে খাদ্যশস্য, ডাল, ভোজ্য তেল, তৈলবীজ, আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদিকে অত্যাবশ্যক পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে খাদ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হবেই।

কৃষি ব্যবসায়ীরা কৃষকদের থেকে বেশি বেশি পণ্য কিনে নেবে এবং যত খুশি মজুদ করবে। ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করবে। কৃষি শ্রমিক ও ভাগচাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এই আইনগুলির ফলে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার ফলে কৃষি উপকরণগুলি জোগাড় করতে কৃষকরা সরকারের সহায়তা পাবে না। সরকার চুক্তি চাষে বেশি জোর দিলে বড়ো কৃষকরা সুবিধা পাবেন। চুক্তিচাষি একা নিজের ইচ্ছায় চুক্তি থেকে বেরতে পারবে না, কোম্পানির সম্মতি লাগবে। চাষি-কোম্পানি চুক্তিতে লাভ কোম্পানির, ক্ষতি চাষির। যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিজের ইচ্ছামতো স্থায়ী পরিকাঠামো বানাবে। সরকার পাশে না থাকলে মাঝারি ও গরিব কৃষকদের পক্ষে চাষ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

কৃষিতে যত বেশি কর্পোরেটদের অনুপ্রবেশ ঘটবে, তত বেশি যান্ত্রিকীকরণও ঘটবে। আর কাজ হারাবেন কৃষি শ্রমিকরা। কর্পোরেট সংস্থা নিজেদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য শ্রমের পেছনে খরচ কমাবে, যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। কৃষি শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়বেন।

ভাগচাষীরা আর জমি পাবেন না চাষের জন্য। কর্পোরেট সংস্থা সরাসরি জমির মালিকের সঙ্গে চুক্তি করে নেবেন।

এক সর্বগ্রাসী বাণিজ্যিক আধিপত্যের দাপটে আমূল পরিবর্তন ঘটবে ভারতীয় কৃষি চিত্রে।

মার্কিন সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা হেনরি কিংসিজার একসময়ে বলেছিলেন যে, “তুমি যদি খাদ্য সরবরাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারো, তবে তুমি আমজনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করবে।”

ফলত সামনে কঠিন লড়াই আমাদের। তাই পথই একমাত্র পথ। গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধের দূর্ভেদ্য প্রাচীর।
কবির ভাষায় বলি—

“বিরুদ্ধতার চাবুক ওঠাও হাতে
তোমার স্বদেশ লুঠ হয়ে যায়
প্রতিদিন, প্রতিরাতে…”

শেয়ার করুন

Similar Posts

2 Comments

  1. খুব সুন্দর ব্যখ্যা করেছেন। সংগ্রামী অভিনন্দন ✊

Leave a Reply

Your email address will not be published.