যদি নির্বাসন দাও – মালবিকা মিত্র

শেয়ার করুন

তিতি অরণ্যের বুক চিরে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে… পিঠের ঝুড়িতে উপচে পড়ছে মাইরা শাক, বিরসাই, চিরুসাই শাক, দাংনিং, বুরিং ইত্যাদি… আর আছে কমলালেবু… ভুটান পাহাড়ের থেকে আনা মিষ্টি রসালো কমলালেবু… নিজেদের খাবার জন্য আনা জিনিসগুলো নামিয়ে তারপর কমলালেবু নিয়ে বসবে মাদারীহাটের বাজারে… দেরি হলে খদ্দের পাবে না…ছুটতে শুরু করে ওরা… কবে থেকে ছুটছে?


“এরা বড় অদ্ভুত জাতি। এ অঞ্চলের ভূমিপুত্র নয়। অথচ কোথায় থাকত, কবে এখানে এসেছে, কেনই বা নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে এ দেশে এল, কিছুই জানে না। অথবা এমনও হতে পারে, বলতে চায় না। এখন তো তবু ওরা আমার সঙ্গে কথা বলে, আমাকে বন্ধু না ভাবলেও শত্রু অন্তত ভাবে না। প্রথম প্রথম তো কিছুই বলতে চাইত না।”
বিমল মজুমদারের কথাগুলো সেই থেকে ক্রমাগত অরিন্দমের কানে বাজছে।
সেদিন আড্ডা থেকে বেরুতে প্রায় আটটা বেজে গিয়েছিল। ততক্ষণে জলপাইগুড়ির রাস্তা শুনশান হয়ে গিয়েছে। (যে সময়ের কথা হচ্ছে, সেটা আশির দশকের শেষভাগ। সে সময় তো বটেই, এই শতাব্দীর প্রথম দশকেও সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। বিশেষ করে শীত ও বর্ষাকালে।) বিমল মজুমদারের বাড়ি বেগুনটারীর কাছেই। অরিন্দমও ল’ কলেজের পিছন দিকেই থাকে। দুজনের বাড়ি একই দিকে হওয়ায় এক সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছিল। দুজনের মধ্যে বয়সের পার্থক্যও খুব বেশী নয়। তাই আলাপ জমতে বেশীক্ষণ সময় লাগেনি। তখনই শুনল, ভদ্রলোক বাংলার শিক্ষক হলেও অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে রিসার্চ করেন। (সে সময় গবেষণার কাজে আজকের মতো বিধিনিষেধ ছিল না।) অ্যানথ্রোপলজি শব্দটা অরিন্দমের কাছে একেবারে অচেনা না হলেও, এই বিষয়ে বিশদে কিছুই জানত না। জনকল্লোলের অফিস থেকে বেগুনটারী অনেকটা রাস্তা। তাই যেতে যেতেই নানান তথ্য জানছিল অরিন্দম।


দলটা এগিয়ে চলেছে — নদী, ছোট ছোট ঝোরা পেরিয়ে — পাহাড় ডিঙিয়ে — “তে-হে-রোওওওওও”, হাঁক পাড়ে দলের সামনের মানুষটি — লম্বা একহারা চেহারা, ভাবলেশহীন মুখ, তামাটে রঙের শরীর, নাক চ্যাপ্টা, চোখের পাতায় এপিক্যান্থিক ফোল্ড — সূর্য ওঠার আর বেশী দেরী নেই — মাদারীহাটের বাজার বসে যাবে…


কোতোয়ালি থানা ছাড়িয়ে দিনবাজার যেতে যেতে, যে রাস্তাটা করলার পাড়ের দিকে বেঁকে গিয়েছে, সেই ত্রিশঙ্কু কোণেই জনকল্লোল দৈনিকের অফিস। অফিসঘর লাগোয়া একটা ছোট্ট প্রেসও আছে। কালি-কাগজের গন্ধে বোধহয় অদ্ভুত নেশা থাকে। তাই জলপাইগুড়ির প্রবল বর্ষণ কিংবা প্রখর শীত, সব কিছুকেই উপেক্ষা করে বছরের সব দিনই সন্ধেবেলা অফিসঘরে আড্ডা জমে। অরিন্দম এই আড্ডার নিয়মিত সদস্য। আড্ডাধারীরা সকলেই প্রায় শহরের বিশিষ্ট জন। নেতা থেকে আমলা, মাস্টারমশাই থেকে ব্যাঙ্ককর্মী সকলেই সারাদিনের কাজের শেষে এই পত্রিকার অফিসঘরে ভিড় জমায়। কোনো দিন দিনবাজারের খাস্তা কচুরি তো কোনো দিন নিরালা হোটেলের মামলেট — চা আর আড্ডা দুটোই জমে যায়।
এখানেই স্থানীয় এক স্কুলের মাস্টারমশাই বিমল মজুমদারের সঙ্গে অরিন্দমের আলাপ হয়েছিল।
সেদিন বিমল মজুমদার বলছিলেন, “ওরা নিজেদের ভুলে আছে। চারুচন্দ্র স্যান্যাল যখন ওদের সঙ্গে দেখা করেন, তখনও এমন কাউকে পাওয়া যায়নি, যে বলতে পারবে, ওরা কোথা থেকে এল। কেন এল এখানে। ওদের সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, ওরা যেন নিজেরাই নিজেদের ভুলতে চেয়েছে। এই নেচারটা কিন্তু মানুষের এমনি এমনি হয় না অরিন্দম। আমার মনে হয়, এমন কোনো গূঢ় যন্ত্রণার ইতিহাস ওদের অতীতজীবনে লুকিয়ে আছে, যে কারণে ওরা ওদের অতীত নিয়ে কাউকে বলতে চায় না। এমনিতেই আদিবাসীদের মনস্তত্ত্বের একটা দিক হল, ওরা বাইরের মানুষকে চট করে নিজেদের সমাজে স্থান দিতে চায় না। এই মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাটা কম বেশী সব আদিবাসীদের মধ্যেই তুমি দেখবে। কিন্তু এরা যেন নিজেদের সকলের থেকে গুটিয়ে রেখেছে।”


ছোট ছেলেটাকে নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়েছে ধানুয়া… বেশী বয়সের সন্তান… বৌ-টা তো ছেলেটাকে জন্ম দিয়েই মরে গেল… মা-হারা অতটুকু বাচ্চা… অপত্য স্নেহ বাকী সন্তানদের তুলনায় ওর ক্ষেত্রে যেন বাঁধনহারা হয়ে গিয়েছিল… ছোট থেকে আদর পেয়ে পেয়ে ছেলেটা একেবারে বেয়াড়া হয়ে উঠেছে… ডেমশার আঙিনায় বসে চোলাই খায়… সাতী নদী পেরিয়ে ওই দিকের জঙ্গলে যায়… অন্য জাতের লোকের সঙ্গে কী যে গুজগুজ করে কে জানে… বলে বলে বাক্যি হরে গেল ধানুয়ার…


অরিন্দমের একটা অদ্ভুত নেশা আছে। জানার নেশা। কেউ হয়তো বলল, অমুক জায়গায় অমুক জিনিস আছে, যা আর কোথাও নেই। অমনি অরিন্দম ছুটল সে জায়গায়। একবার তো রাজবাড়ীর দিঘিতে ডুব লাগিয়েছিল, এই নেশার টানে। রাজবাড়ী দীঘির পাড়ে দুটো প্রাচীন মন্দির আছে। একটা শিব মন্দির। অন্যটায় অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি নাকি রাখা থাকত। কিন্তু স্থানীয় লোকজন বলে দুর্গামূর্তিকে যতই শিকলে বেঁধে রাখা হোক না কেন, সে নাকি আপনে আপ দীঘির তলার মন্দিরে চলে যায়। কয়েকবার মন্দিরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপর হাল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সেই শুনেই অরিন্দম দীঘিতে ডুব দিয়েছিল। যদি সেই লুকোন মন্দির বা মূর্তি দেখতে পায়। কিন্তু দীঘি ভয়ানক গভীর। নিজের চেষ্টায় শেখা ডুব সাঁতারের জোরে অত গভীরে যাওয়া যায় না। তাই হতাশা ছাড়া আর বিশেষ কিছু অরিন্দমের কপালে জোটেনি।
এবারো অরিন্দম বেরিয়ে পড়েছে। বিমল মজুমদার বলছিলেন, ওদের অতীতেই রহস্য লুকিয়ে আছে। এই তথ্যটুকুই যথেষ্ট ছিল অরিন্দমের এই আচমকা বেরিয়ে পরার জন্য। ওর স্কুলের বন্ধু মাদারিহাট ব্লকের ক্লার্ক। ওই অঞ্চলেই থাকে। সুব্রত লাকরা। ওকে ব্লক অফিসের সামনে দাঁড়াতে বলেছে। সুব্রত এলাকাটা হাতের তালুর মতো চেনে। তাই রাস্তা চিনতে অসুবিধা হবে না। কিন্তু কী খুঁজতে যাচ্ছে অরিন্দম? ওদের অতীত? না অতীত ভুলে থাকা একটা উপজাতির বর্তমান? অরিন্দম নিজেও বোধকরি তা জানে না। জানে না, অরিন্দমকে ওরা ওদের কথা জানার অনুমতি দেবে কি না।
অনেকদিন অরিন্দম ভেবেছে, কেন ওর মধ্যে এমন অস্থিরতা জাগে। কোন দুর্বার নেশায় ও অজানার উদ্দেশ্যে ছুটে যেতে চায়। আসলে ওর ভিতরে লুকিয়ে থাকা বাউণ্ডুলে মনটা, থেকে থেকে ওকে ডাক পাঠায়। নীলনদীর পাড়ের লালপরীর রাজ্য খোঁজ করে বেড়ায় ও। জলপাইগুড়ির উচ্চবিত্ত সমাজের তো বটেই, মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষরাও একটু ছুটি পেলেই দার্জিলিং যায়, কালিম্পং, কার্শিয়াং যায়। কিন্তু অরিন্দম যায় রন্ধামালির চরে, তিস্তাবুড়ির গান শুনতে। কখনো যায় গোরুবাথানের গভীর অরণ্যে, পাহাড়ি ঝোরার খোঁজে।


দেউয়ে বসে বুড়ী সুকমা সেদ্ধ করা লাকা আলু থেতো করে হকোইতে ভরছে… সুকমার নাতিটা কাইবুর উপর বসে ইতিউতি চাইছে… নাতিটা মেয়ের ঘরের… মেয়েটা তো নেপালিকে বিয়ে করে জাতিচ্যুত হলই… তারপর ছেলেটাকে মায়ের কাছে রেখে কোথায় যে নিরুদ্দেশ হল… সুকমা গাঁয়ের বাইরে যায় না… সুকমার মতো বয়স্ক ব্যক্তি বা মহিলারা কেউই যায় না… কিন্তু দুমসি গাঁওয়ের সুগ্রীব কদিন আগে জলপাইগুড়ি গিয়েছিল… সেখানে রূপশ্রী সিনেমা হলের সামনে নাকি পার্বতীকে দেখেছে… মানে পার্বতীরই মতো কাউকে… ঠিক করে বলতে পারেনি সুগ্রীব… কে জানে কেমন আছে মেয়েটা… মনটা মাঝে মাঝেই বড্ড পোড়ায় সুকমার… মণ্ডল তো মেয়েটাকে জাতিচ্যুত করেই খালাস… কিন্তু পেটে তো সে ধরেছে…


অরিন্দমের মোটরসাইকেলটা শিববাড়ি রোড থেকে বেগুনটারীর মোড়ে এসে শিলিগুড়ি রোডে উঠল। গতকালের শিলিগুড়ি রেডিও স্টেশন থেকে সম্প্রচারিত খবরে বলাই হয়েছিল, আজ সারাদিন আকাশ অংশত মেঘলা থাকবে। উত্তরবঙ্গের জায়গায় জায়গায় হালকা থেকে ভারী বৃষ্টিপাতেরও সম্ভাবনা রয়েছে। শীতের শুরুতে এ অঞ্চলের আবহাওয়া মাঝেমধ্যে এমন বেগড়বাই করে। এ কথা অরিন্দম জানতোই। তাই ভোরবেলা নিজের মোটরসাইকেলটা নিয়ে বেরোনোর সময় তেলের পাশাপাশি, রেইনকোটটা সঙ্গে আছে কিনা দেখে নিয়েছে। অরিন্দম যখন বেরিয়েছে, তখনও দিনের আলো ভালো করে ফোটেনি। অবশ্য প্রায় পাঁচ-ছয় মাসব্যাপী শীতের দিনে জলপাইগুড়ি শহরের আকাশে সূর্য আর ক’দিন দেখা যায়? গত পাঁচদিন ধরে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। অরিন্দমের ঠাকুমা বলতেন, এ দেশে শনি মঙ্গলবারে বৃষ্টি শুরু হলে দিন সাতেকের আগে ধরে না। এ দেশ মানে জলপাইগুড়ি শহর। এর বাইরে যে একটা বৃহৎ দেশ রয়েছে, তা ঠাকুমা জানতেন না। অরিন্দমের ঠাকুরদা রংপুরের লোক হলেও ঠাকুমা বরাবরই এখানকার। খুব বেশী জল্পেশ্বর ছাড়িয়ে জটিলেশ্বর অব্দি গিয়েছেন। ঠাকুমার কথা অবশ্য না ধরলেও চলে। বুড়ী সারাদিন এমন আগরুম-বাগরুম কথা নিজের মনেই বকবক করতেন, আর পাড়ায় ঘুরে ঘুরে থানকুনি পাতা তুলতেন। অরিন্দমের বাবা ছিলেন ভয়ংকর পেট রোগা মানুষ। থানকুনি পাতার রস নাকি পেটের রোগের উপশম করে।
শান্তিপাড়া বাস স্ট্যান্ডে বাসগুলো ধোয়ামোছার কাজ চলছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এই চত্বর সরগরম হয়ে উঠবে। আকাশের মেঘ, ভোরের ঘনিয়ে ওঠা কুয়াশার মধ্যে দৃষ্টি চলে না। তার মধ্যে মাঝেমধ্যে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে। উইনচিটারের উপর রেইনকোটটা চড়িয়ে নিল অরিন্দম। অঘ্রাণের শেষে এই বৃষ্টিতে ভিজলে আর রক্ষে নেই। এমনিতেই স্যাঁতসেঁতে বলে এ অঞ্চলের বদনাম রয়েছে। এবারে হাড় কাঁপানো শীত পড়বে, মনে হচ্ছে।
গোশালা মোড় থেকে পাহাড়পুরের দিকে ঘোরার আগে একটা পান বিড়ির দোকানের সামনে মোটরসাইকেলটা দাঁড় করালো অরিন্দম। বাড়ি থেকে বিস্কুটের প্যাকেট, বাপুজি কেক আর কমলালেবু এনেইছে। এক বোতল জলও সঙ্গে রেখেছে। এ অঞ্চলের জল খুব খারাপ। যেখান সেখান থেকে জল খাওয়া যায় না। খেলেই নির্ঘাৎ রক্ত-আমাশা হবে। এক প্যাকেট চারমিনার কিনল অরিন্দম। আর কয়েকটা লেবু লজেন্স। এখান থেকে তোর্সার দূরত্বই প্রায় একশো কিলোমিটারের উপরে। সুতরাং পৌছুতে সময় লাগবে।

অপরূপা সইনঝানি বসেছে তিতি নদীর তীরে… যে নদী কবির কল্পনায় হয়েছে মুজনাই… এত স্বচ্ছ তার জল, যে মুখ দেখা যায়… সইনঝানি তাকেই বানিয়েছে নিজের আয়না… নাইতে এসেছে সইনঝানি… তিতি নদীর জলে স্নান সেরে শৃঙ্গার করবে সে… নদীর তীরে খুলে রাখে মেরা, তোম্বা, বিজিং, পারি… দিনশেষের মেঘভাঙা চিকন রোদ উঁকি দিচ্ছে পাহাড়ের আড়াল থেকে… রোদের সুতো সইনঝানির মখমলি ত্বকে বুনেছে আলপনা… লোভে চোখ ঝিকিয়ে ওঠে পিদুয়ার… সম্পর্কে সইনঝানি তার বৌদি বটে… কিন্তু লোভ কবেই বা সম্পর্ক অসম্পর্ক মেনেছে… পিদুয়া এসে সইনঝানিকে নিজে বক্ষলগ্না করতে চায়… বাধা দেয় সইনঝানি… কিন্তু নারী শরীরের প্রতি যার একবার লোভ জন্মেছে, তার ভালো মন্দের বিচার থাকে না…. সইনঝানিও তো যে-সে মেয়ে নয়… সেও সইনঝার সহধর্মিণী; অর্ধাঙ্গিনী আক্ষরিক অর্থেই… ছুরি দিয়ে সে গলা কেটে দিল পিদুয়ার… তিতি নদীর জল রক্তে গাঢ় লাল রঙ ধারণ করল… পিদুয়া নিজের ভুল বুঝতে পারে… লুটিয়ে পরে সইনঝানির পায়ে… সইনঝানি ক্ষমা করলেও শাস্তিস্বরূপ পিদুয়ার চোখ দুটো বসিয়ে দিল মাথার পিছন দিকে… নারীই তো যুগে যুগে অপশক্তির বিনাশ করেন… দেবতার জন্ম হল সন্ধ্যার রক্তরাগ মেখে…


“ওদের দেবতা ইশপা। তিনি উভয়ত নারী এবং পুরুষ। একই দেহে মহাকাল ও মহাকালী। আমাদের শাস্ত্রে আমরা যাকে অর্ধনারীশ্বর বলে চিহ্নিত করেছি। ভেবে দেখ অরিন্দম, একটা ট্রাইব, যাদের স্ক্রিপ্ট নেই, নিজস্ব বর্ণমালা নেই, কিন্তু মূল ধর্মের সঙ্গে একটা সরু সুতোর মতো যোগসূত্র রয়েই গিয়েছে। ওরা কিন্তু অর্ধনারীশ্বরের ব্যাপারটা জানে না। ওরা কোনো মূর্তিপূজাও করে না। ওদের মন্দিরে রাখা আছে দুটো বিরাট আকারে ঢোল। যাকে ওরা বলে বাকুং। এই বাকুংজোড়ার একটা মহাকালের প্রতিকৃতি, অপরটা মহাকালীর।” শীতের নিঝুম রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিমল মজুমদার বলছিলেন। অরিন্দম হারিয়ে যাচ্ছিল, এক রহস্যে ঘেরা অতীতে।
“ওদের পূর্বপুরুষ কারা, একেবারেই কি জানা যায় না?” জিজ্ঞাসা ছিল অরিন্দমের গলায়।
“যে ভাষাটা ওরা বলে, তার ভাষাতাত্ত্বিক বিচার করলে দেখা যাবে এটা টিবেটো-বার্মিজ ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। সম্ভবত তিব্বতীয় উপগোষ্ঠীর সেওয়ারি বিভাগ থেকে এসেছে। সেদিক থেকে দেখলে তো মনে হয়, এরা তিব্বত অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল কোনও এক সময়। যদি তাই হয়, তবে তিব্বতের…”
সেদিন বিমল মজুমদারকে কথা শেষ করতে না দিয়ে জ্ঞান জাহির করেছিল অরিন্দম, “কিন্তু তিব্বতে তো বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত। দলাই লামাও তো তিব্বতী। কিন্তু আপনি যা বলছেন বিমলদা, তাতে তো মনে হচ্ছে না এরা বৌদ্ধ। বরং হিন্দুই বলা যায়। তাহলে?”
মৃদু হেসে ছিলেন বিমল মজুমদার, “সে তো অনেক পরের কথা। বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হওয়ার আগেও তিব্বতের নিজস্ব একটা ধর্ম ছিল। ভাষাতাত্ত্বিক এবং ধ্বনিতাত্ত্বিক বিচারে এরা তিব্বতি-বর্মী গোষ্ঠীভুক্ত। দেখো অরিন্দম একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ভাষার জন্ম কিন্তু একটা নির্দিষ্ট স্থানে, একটা নির্দিষ্ট কালে হয়। সুতরাং এই প্রমাণটাকে আমরা কিছুতেই অবহেলা করতে পারি না। আর হিন্দুধর্ম কী? বৌদ্ধধর্মও কি হিন্দুধর্ম থেকেই জন্ম নেয়নি?”
উত্তর দেয়নি অরিন্দম। ধর্ম নিয়ে অত মাথা ঘামানোরই বা সময় কোথায়? তাছাড়া তার অত জ্ঞানও নেই। তাই কথা ঘোরাতে জিজ্ঞেস করেছিল, “কিন্তু ওরা এল কী করে? এলই বা কেন?”


ইশরি মনে করে, সে কেইজি বংশের পঞ্চদশ পুরুষ… আজন্মকাল ধরে ওরা পুরোহিতের কাজ করে আসছে… গাঁয়ের আর পাঁচটা লোক তাকে মান্যিগন্যি করে… ধানুয়া এসেছিল নিজের সমস্যা নিয়ে… দীনেশ, মানে ধানুয়ার ছোট ছেলেটা দিনে দিনে বড় লায়েক হয়ে উঠেছে… ভুটান পাহাড়ে যায়… নিজের সমাজের কেউই তার বন্ধুলোক নয়… সাতী নদীর তীরে গিয়ে নাকি বনভোজন করেছে… কে জানে সাতী নদীর জল পানও করেছে কি না…. ও নদীর জল যে অভিশপ্ত, তা কি জানে না ধানুয়া… ছেলের এই বনভোজনের খবর শোনা ইস্তক সে ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে… ধানুয়া তাই আজ ইশরির কাছে এসেছিল… হাজার হোক ইশরি ডেমশার প্রধান পুরোহিত… সে ডেকে বোঝালে যদি দীনেশের মতিগতি ফেরে…


পাহাড়পুরের মোড় ছাড়িয়ে যখন তিস্তা ব্রিজের উপর উঠলো অরিন্দম, তখন মেঘ আর কুয়াশা যেন আরও গাঢ় হয়ে চেপে বসেছে পথের উপর। একহাত দূরত্বেই কিছু দেখা যাচ্ছে না। নীচে নদীর দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল অরিন্দম। সাদা পর্দা ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। এমন অবস্থায় মোটরসাইকেল চালানো ভীষণ বিপজ্জনক। গতবছরই বর্ষার সময়ের কথা। এত বৃষ্টি হচ্ছিল, যে তিস্তার জল দেখা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন কুয়াশার নদী বইছে। ব্রিজের উপরটাও কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়েছিল। জলপাইগুড়িরই নিয়োগীবাড়ির এক ছেলে মোটরসাইকেল করে ব্রিজের উপর দিয়ে আসছিল। অ্যাক্সিডেন্টটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল জানে না অরিন্দম। হতে পারে প্রবল বর্ষায় মোটরসাইকেল স্কিড করেছিল, কিংবা এও হতে পারে বৃষ্টি আর কুয়াশায় কিছু দেখতে পায়নি। কিন্তু ছেলেটিকে বাঁচানো যায়নি। বর্ষার তিস্তা ভয়ংকরী। অনেকবার দেখেছে অরিন্দম, বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিতে তিস্তার দিকে চাইলে ধোঁয়ার নদী ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়ে না।
মোটরসাইকেল থেকে নেমে পড়ল অরিন্দম। ব্রিজটা হেঁটেই পেরোবে।
“ওরা নিজেদের সমাজের লোক ছাড়া কাউকেই নিজেদের গ্রামে থাকতে দিত না। তবে এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। নেপালি, রাভা, মেচরা আস্তে আস্তে গ্রামে থাকতে শুরু করেছে।” বিমল মজুমদার যখন কথাটা বলেছিলেন, দিনবাজারের শেষ দোকানটাও ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে।
“কিন্তু কেন?” অরিন্দমের মনে অনেক প্রশ্নই পাক খাচ্ছিল।
এর উত্তরে বিমল মজুমদার একটু চুপ করে ছিলেন, “ওদের আদি বসতি কোথায়, তা এখনো জানতে পারিনি। হয়তো আরও ডিটেইলে রিসার্চ করলে জানতে পারবো। কিন্তু ওরা একটা সময় ভুটান পাহাড়ে থাকত। আর ওদের পাশের পাহাড়ে থাকত ডয়া নামে একটা উপজাতি। এই ডয়াদের সঙ্গে ওদের প্রকৃতিগত এবং আচার আচরণগত কিছু মিল আছে। কিন্তু ডয়ারা ছিল ভীষণ অ্যারোগেন্ট প্রকৃতির। সম্ভবত ভূমি নিয়ে ওদের সঙ্গে ডয়াদের বিরোধ শুরু হয়। এরা খানিকটা শান্ত প্রকৃতির হওয়ায় ডয়াদের সঙ্গে পেরে না উঠে ভুটান পাহাড় ছেড়ে চলে আসে। ওরা বলে, ডয়ারা এত অত্যাচার করেছিল, যে ওদের পূর্বপুরুষের রক্তে নাকি সাতী নদীর জল লাল হয়ে উঠেছিল। সেই থেকে সাতী নদীকে ওরা অভিশপ্ত বলে মনে করে। তারপরই ভুটান ছেড়ে আরও দক্ষিণে এই ইন্দো-ভুটান বর্ডারে এসে বসতি স্থাপন করেছে।”
“কিন্তু ওরা কারুর সঙ্গে মিশতে চায় না কেন?” দিশারি ক্লাবের সামনেটায় তখন দুটো কুকুর ঘুমের আয়োজন করছে।
এবারেও ভাবতে হল বিমল মজুমদারকে, “ওরা গ্রামের বাইরে যেতেও পছন্দ করে না। আমরা যেমন তীর্থ করতে যাই, ওদের কোনো তীর্থস্থান নেই। শুধু ওরা মানে ভুটানের বাদু পাহাড় সইনঝানির প্রতীক। সইনঝানির বাসও সেখানেই। ওরা বাদু পাহাড়ের দিকে মুখ করে ময়ু পূজা করে। আমার নিজের বিশ্বাস, ওই পাহাড়েই ওদের আদি বাস ছিল। অন্তত ডয়ারা তাড়িয়ে দেওয়ার আগে অব্দি। দ্যাখো অরিন্দম, আমার মনে হয় এটার পিছনে ওদের কোনো না কোনো ভুলে যাওয়া স্মৃতি কাজ করে। অর্থাৎ, ওরা শুনে এসেছে, নিজেদের নিয়ে সুখে থাকতে হয়। নিজের জাতের বাইরে আর কারুর সঙ্গে বেশী মেলামেশা না করাই ভালো। এবারে, কেন এই কথাগুলো ওরা বংশানুক্রমিকভাবে শুনছে, এই কথার শিকড় কোথায়, ইত্যাদি কিছুই ওরা জানে না। তবে হ্যাঁ, ওরা এ কথা প্রায়ই বলে নিজেদের মাতৃভূমি থেকে ওরা নির্বাসিত হয়েছিল।”
“নির্বাসন… ” অরিন্দমের স্বরে সেদিন শুধুই বিস্ময় ছিল। একটা গোটা জাতি নির্বাসিত হল? কী এমন অপরাধ ছিল তাদের? জানা যাবে না হয়তো কোনদিনই।
“আমার মনে হয়,” বিমল মজুমদার বলছিলেন, “এই যে ওরা কারুর সঙ্গে মিশতে চাইত না, এর পিছনে ভয় কাজ করে। সম্ভবত যে অপরাধের কারণে ওরা নির্বাসিত, সেই অপরাধজনিত ভয়ই ওদের সকলের থেকে আইসোলেটেড করে রাখে। হয়তো এমন অপরাধ, যার ব্যাখ্যা কারুর কাছেই দেওয়া যায় না। ওরা আজ আর সেই কারণটা মনে করতে পারে না। কিন্তু কিছু সংস্কার থাকে, যা মানুষের মনোভূমিতে চিরকালীন প্রভাব ফেলে। আর সেটা যদি মাতৃভূমি থেকে নির্বাসনের মতো বইড় ঘটনা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। এবং যেহেতু একসঙ্গে পুরো দলটাই নির্বাসিত হয়েছিল, তাই দলের প্রত্যেকের মনেই সংস্কারটা রয়ে গিয়েছে।”
“তার মানে বিমলদা, এরা যে মূল গোষ্ঠী থেকে বেরিয়েছিল, তারা এখনো কোথাও না কোথাও রয়ে গিয়েছে।”
“নিশ্চয়ই। থাকাই তো উচিৎ, যদি না বড় কোনো বিপর্যয়ে সকলে ধ্বংস হয়ে গিয়ে থাকে। হয়তো তুলনা করলে দেখবে এদের কিছু কিছু অভ্যেস এখনো সেই মূল গোষ্ঠীর মতোই রয়ে গিয়েছে। কিন্তু কিছু অভ্যেস, কিছু গল্প আলাদা হয়ে গিয়েছে। যে কারণে এরা আলাদা ট্রাইব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।”
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময়ও অরিন্দমের মনে নির্বাসন শব্দটা গেড়ে বসেছিল। দেশভাগের সময়, রংপুরে ভিটেমাটি ছেড়ে আসা ওর ঠাকুরদাও বলতেন না, তিনি নির্বাসিত? আজ ও টোটোপাড়া যাচ্ছে, যদি কোনও সূত্র থেকে এই টোটো জনজাতির নির্বাসনের ইতিহাস জানতে পারে, সেই আশায়। হয়তো বৃথা আশা। এবং অকারণ ওর এই জিগীষা। তবু কেউ কেউ তো অদ্ভুত হয়। যে অকারণেই প্রকৃতির রহস্য খুঁজে বেড়ায়।


আজ সারাদিনটা বৃথা গেছে ওদের… ওরা শিকার করতে বেরিয়েছে… সারাদিন পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে একটাও পশুর দেখা পায়নি… কিছু না নিয়ে ঘরে ফেরে কী করে… বাড়ির লোকের শুকনো মুখগুলো মনে করলেই যন্ত্রণা হচ্ছে… খাবে কী ওরা… কিন্তু আজ ওদের ভাগ্য সঙ্গ দিচ্ছে না… এদিকে দিন শেষ হয়ে আসছে… সূর্য পশ্চিম পাহাড়ের কোলে ডুবতে বসেছে… পাহাড়ে সন্ধ্যা দ্রুত নামে… দ্রুত অন্ধকার ঘনিয়ে আসে… ছায়া ছায়া হয়ে এসেছে চারিদিক… হঠাৎ একজন চেঁচিয়ে উঠলো, “সম্বর”… সবাই ছুটল সেই দিকে… ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুটে গেল সম্বরটাকে লক্ষ্য করে… দলপতি বলল, ” সম্বরের মাথাটা আলাদা রাখো, কাল মণ্ডলকে উপহার হিসেবে দিতে হবে”, (ওদের সমাজে এটাই নিয়ম। শিকার যা-ই পাক। তার মাথাটা গ্রামের মোড়লকে উপহার হিসেবে দিতে হবে।)… এদিকে রাত ঘনিয়ে এসেছে পাহাড়ে… দলপতির নির্দেশে পুরো দলটা ঠিক করল জঙ্গলেই ছাউনি ফেলবে… সেই মতো বন্দোবস্তও হল… কিন্তু সকালবেলা হতেই চমকে উঠলো সকলে… এ কী দেখছে তারা… সন্ধ্যার অন্ধকারে সম্বর মনে করে গোরু মেরেছে… এ যে পাপ! ঘোরতর পাপ… দলপতি বলল গোরুর মাথা মাটিচাপা দিয়ে দাও… মোড়লকে কিছু বলার দরকারই নেই… কিন্তু… কিন্তু শেষরক্ষা হল না… গোহত্যার কথা মোড়লের হাত ঘুরে রাজার কানে গেলই… আর রাজা গোহত্যার অপরাধে পুরো দলটাকেই নির্বাসিত করলেন…


সেই থেকে টোটোরা ছুটছে। ছুটতে ছুটতে… পাহাড়, বন, নদী পেরিয়ে গেছে। থিতু হতে চেয়েছে যখনই, কোনো না কোনো ভাবে আঘাত পেয়েছে। কখনো ডয়ারা তাদের ভিটেমাটি ছাড়া করেছে। কখনো আধুনিক সভ্যতা তাদের সংস্কৃতিকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। তারা নাকোশা বানাতে ভুলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার ঘরে থাকছে। নিজেদের টোটোভাষা ভুলে নেপালি কি হিন্দিতে কথা বলছে…
নিজের সংস্কৃতি নিয়ে, নিজের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে বাঁচার আনন্দ নির্বাসিতরা জানবে কী করে?
(সমাপ্ত)

শব্দ-তালিকা:
দাংনিং, বুরিং – বুনো আলু
তে-হে-রো – তাড়াতাড়ি চলো
ডেমশা – মন্দির
লাকা আলু – এক ধরনের তেতো আলু যা মূলত শূকরের খাবার
হকোই- শূকরের খাবার দেওয়ার কাঠের তৈরি গামলা
কাইবু – সিঁড়ি
সইনঝা ও সইনঝানি – মহাকাল ও মহাকালী। ইশপারই দুই রূপ
পিদুয়া – ভূত প্রেত অপশক্তির দেবতা
মেরা, তোম্বা, বিজিং, পারি – টোটো মহিলাদের পোশাকের অংশ
কেইজি – পুরোহিত
দেউ – বারান্দা
নাকোশা – টোটোদের প্রাচীন পদ্ধতিতে বানানো বাড়ি

তথ্যসূত্র:
১. এ সোসিওলজিক্যাল স্টাডি অফ দ্য টোটো ফোক-টেলস – ডঃ বিমলেন্দু মজুমদার
২. দ্য টোটো – ডঃ বিমলেন্দু মজুমদার
৩. আদিম আদিবাসী টোটো – প্রমোদ নাথ
৪. টোটো জনজাতির সামগ্রিক পরিচয় – ধনীরাম টোটো
৫. জলপাইগুড়ি জেলার রাজবংশী লোকসংস্কৃতি: সংগ্রহ, সমীক্ষা ও বিশ্লেষণ – প্রহ্লাদ শর্মা
৬. রিলিজিয়াস বিলিফ অ্যান্ড প্র‍্যাকটিসেস অব দ্য টোটো ট্রাইব অব ওয়েস্ট বেঙ্গল – মন্টু বড়াই
৭. মধুপর্ণী, জলপাইগুড়ি জেলা সংখ্যা, ১৯৮৭

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.