|

জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল (গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী) – অনুবাদ: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য ( পর্ব ৯ )

শেয়ার করুন

মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ; অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

পর্ব–৯

আমার মায়ের কথা অনুযায়ী বাবা-মা’র প্রথম দেখা হয় একটি শিশুর মৃত্যুর পর উপাসনার সময়। কিন্তু সেই শিশুটি যে কে তা তাঁরা কেউই ঠিক করে বলতে পারেননি। মা সেদিন উঠোনে বসে বান্ধবীদের সঙ্গে গান গাইছিলেন। প্রচলিত প্রথা হল কোনো শিশু মারা যাওয়ার পরবর্তী নয় রাত্রি ধরে সেই শোকগ্রস্ত পরিবারে ভালোবাসার গান গাওয়া হয়। হঠাৎই একটি পুরুষকণ্ঠ এসে যোগ দেয় সেই সমবেত সঙ্গীতে। সব মেয়েরা ঘুরে তাকায় তার দিকে আর পুরুষটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যায়। হাতে তালি দিতে দিতে তখন তারা গাইছিল ‘এই পুরুষটিকে আমরা বিয়ে করব।’ তবে আমার মা যে খুব একটা বিচলিত হয়েছিলেন, এমনটা নয়। সেকথা তিনি বলেও ছিলেন, ‘আর একজন বহিরাগত ছাড়া আমার আর বেশি কিছু মনে হয়নি।’ বাস্তবিক বাবা তাই-ই ছিলেন। টাকার অভাবে কার্তাহেনা দে ইন্দিয়াসে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে তখন তিনি সবেমাত্র এখানে এসেছেন এবং সদ্য পাওয়া টেলিগ্রাফ অপারেটরের চাকরির জন্য ওই এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে অতি সাধারণ এক জীবন কাটাচ্ছেন। সেই সময়ের একটি ছবিতে ধরা আছে ছদ্ম আভিজাত্যের আড়ালে তাঁর দরিদ্র চেহারাটি–পরনে তৎকালীন ফ্যাশনের ঘন কালো রঙের সিন্থেটিক কাপড়ের টাইট-ফিটিং স্যুট ও চারটে বোতাম দেওয়া জ্যাকেট, শক্ত কলার, চওড়া টাই আর মাথায় বেতের চ্যাপ্টা টুপি। এর সঙ্গে পরেছিলেন খুব সরু তারের ফ্রেম ও পরিষ্কার কাচের হালফ্যাশনের একটি গোল চশমা। তখন যারা তাঁকে চিনত তারা ভাবত তিনি একজন বোহেমিয়ান, নিশাচর ও অসচ্চরিত্র ব্যক্তি, যদিও সারা জীবনে তিনি এক ফোঁটা মদ বা একটা সিগারেটও খাননি।

সেই দিন মা তাঁকে প্রথম দেখেন। কিন্তু বাবা মাকে দেখেছিলেন তার আগের রবিবারে, গির্জায় প্রার্থনার সময়। সেখানে মায়ের সঙ্গে ছিলেন তাঁর পিসি ফ্রান্সিসকা সিমোদোসেয়া। স্কুলের পাঠ শেষ করে বাড়ি আসার পর এই পিসির অভিভাবকত্বেই তাঁর দিন কাটত। পরের মঙ্গলবারে আবার বাবা তাঁদের দেখেন–বাড়ির সদরের কাছে বাদাম গাছের নীচে বসে সেলাই করছেন। তাই ওই শিশুর মৃত্যু-উপাসনার রাতে বাবা জানতেন যে মেয়েটি কর্নেল নিকোলাস মার্কেসের কন্যা, যে কর্নেলের সঙ্গে দেখা করার জন্য বেশ কিছু সুপারিশপত্র তিনি সঙ্গে এনেছেন। সে রাতে মা-ও জেনে যান অনেক কথা, যে ওই ছেলেটি অবিবাহিত, ঘন ঘন প্রেমে পড়ে, দারুণ ভালো কথা বলতে পারে বলে মুহূর্তের মধ্যে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়, অবলীলায় কবিতা লিখতে পারে, জনপ্রিয় গানের সঙ্গে সুন্দর নাচে আর আবেগমথিত সুরে ভায়োলিন বাজানোয় ওস্তাদ। মা আমাকে বলেছিলেন যে শেষ রাতে সেই ভায়োলিন শুনলে চোখের জল ধরে রাখা যায় না। তিনি যে যে সুর বাজাতে পারতেন তার মধ্যে এক সুবিখ্যাত রোম্যান্টিক ওয়াল্টজ ‘নাচ শেষ হওয়ার পরে’ সমাজে তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। যে কোনো সান্ধ্যসঙ্গীতের আসরেও তা হয়ে উঠেছিল অপরিহার্য। তাঁর আন্তরিক ব্যবহার ও ব্যক্তিগত আকর্ষণ শক্তির প্রভাবে আমাদের বাড়ির দরজাও তাঁর জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং পারিবারিক মধ্যাহ্নভোজে তাঁকে প্রায়ই দেখা যেতে থাকে। কার্মেন দে বোলিবারের[১] মেয়ে তিয়া মামা ফ্রান্সিসকা যেই জানতে পারলেন যে তাঁর নিজের জায়গার কাছাকাছি সুক্রে শহরে বাবার জন্ম, তাঁকে আপন করে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না। লুইসা সান্তিয়াগা বিভিন্ন সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠানে এই পাণিপ্রার্থীর তাঁকে মুগ্ধ করার রকমারি প্রচেষ্টা বেশ উপভোগ করতেন, কিন্তু কখনও ভাবেননি যে তিনি এর চেয়ে বেশি কিছু চাইবেন। কেন-না তাঁদের দুজনের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আসলে লুইসা সান্তিয়াগার স্কুলের এক বান্ধবীর সঙ্গে ছেলেটির গোপন প্রণয়ের ঢাল হিসাবে ব্যবহৃত হত। এমনকি তাদের দুজনের বিয়েতে তিনি ধর্ম-মা হিসাবে উপস্থিত থাকতেও রাজি হয়েছিলেন। তখন থেকে ছেলেটি লুইসাকে ধর্ম-মা বলে ডাকতেন আর লুইসা ছেলেটিকে বলতেন ধর্ম-ছেলে। তাহলে এটা সহজেই অনুমান করা যায় লুইসা সান্তিয়াগা কতখানি বিস্মিত হয়েছিলেন যখন এক রাতে নাচের আসরে এই নির্ভীক টেলিগ্রাফ অপারেটর তাঁর কোটের কলারের বোতামঘরে গুঁজে রাখা ফুলটি তুলে নিয়ে তাঁকে দিয়ে বললেন:

—‘এই গোলাপের সঙ্গে আমি আমার জীবন আপনাকে সমর্পণ করলাম।’

সেটা কোনো তাৎক্ষণিক আবেগ ছিল না, একথা বাবা আমাকে বহুবার বলেছেন, বরং অন্য সমস্ত মেয়েকে দেখার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে লুইসা সান্তিয়াগাই একমাত্র তাঁর উপযুক্ত। অন্যদিকে লুইসা ভেবেছিলেন এই ঘটনাটা একটি সাহসী দুষ্টুমি মাত্র, যা ছেলেটি তাঁর বান্ধবীদের সঙ্গে প্রায়শই করতেন। এতটাই কম গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে নাচের আসর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় গোলাপটা কোথায় যে ফেলে দিয়েছিলেন তা খেয়ালও করেননি। কিন্তু ছেলেটির তা নজর এড়ায়নি। পূর্বে মেয়েটির একজন গোপন প্রেম-প্রার্থী ছিল। এক ভাগ্যহীন কবি, যে তাঁর ভালো বন্ধুও বটে। কিন্তু কোনোদিনই তার নিষ্প্রাণ কবিতা মেয়েটির হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ গাব্রিয়েল এলিহিয়োর গোলাপ এক অবোধ্য রাগ হয়ে তাঁর রাতের ঘুম কেড়ে নিল। তাঁদের এই প্রেম নিয়ে যখন মায়ের সঙ্গে আমার প্রথম সরাসরি আলোচনা হল, ততদিনে তাঁর বেশ কয়েকটি সন্তান হয়ে গেছে। সেই আলোচনায় তিনি স্বীকার করেছিলেন, ‘ওঁর কথা ভেবে ভেবে রাগে আমার ঘুম হচ্ছিল না, কিন্তু যে কারণে আমি আরও বেশি রেগে যাচ্ছিলাম তা হল যতই আমি রাগছি ততই তাঁর কথা বেশি ভাবছি।’ তারপর সপ্তাহের বাকি দিনগুলো তিনি কাটালেন এই বুঝি তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে–এই ভয় নিয়ে এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করতে না পারার যন্ত্রণায়। ধর্ম-মা ও ধর্ম-ছেলে থেকে তাঁরা যেন পরস্পরের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠলেন। এরই মধ্যে একদিন বিকেলবেলায় বাদাম গাছের নীচে বসে সেলাই করতে করতে ফ্রান্সিসকা পিসি তাঁকে ঠাট্টা করে বললেন:

—‘শুনলাম তোকে নাকি কেউ গোলাপ ফুল দিয়েছে।’

ঠিক যেমনটা সচরাচর ঘটে থাকে, এক্ষেত্রেও লুইসা সান্তিয়াগাই সবশেষে জানতে পারলেন যে তাঁর হৃদয়ের গোপন উথালপাথালের কথা ইতিমধ্যে সকলেই জেনে গেছে। মায়ের সঙ্গে এবং বাবার সঙ্গেও যে অগণন কথোপথন আমার হয়েছে তাতে দুজনেই এ ব্যাপারে একমত ছিলেন যে তাঁদের বিস্ফোরক প্রেমকাহিনির তিনটি চূড়ান্ত মুহূর্ত ছিল। প্রথমটি ছিল ‘পাম সানডে’-র[২] বড়ো প্রার্থনা সভায়। লুইসা গির্জায় ফ্রান্সিসকা পিসির সঙ্গে বসেছিলেন যেখানে নিউ টেস্টামেন্টের চিঠিগুলো পড়া হয় তার পাশের বেঞ্চে। হঠাৎ শুনতে পেলেন মেঝের টালির উপর ছেলেটির ফ্লামেঙ্কো নাচের জুতোর হিলের শব্দ এবং তাঁকে এত কাছ দিয়ে যেতে দেখলেন যে তাঁর গায়ের উষ্ণ আতরগন্ধের ঝলক অনুভব করলেন। ফ্রান্সিসকা পিসি তাঁকে দেখেননি আর ছেলেটিও এঁদেরকে খেয়াল করেছেন বলে মনে হল না। কিন্তু সত্যিটা হল, এ সবই ছিল ছেলেটির পূর্বপরিকল্পিত। এঁরা যখন টেলিগ্রাফ অফিসের সামনে দিয়ে গেছেন তখন থেকেই তিনি পিছু নিয়েছেন। তারপর ছেলেটি দরজার কাছে একটা থামের পাশে এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন যাতে তিনি মেয়েটিকে পেছন থেকে দেখতে পান, কিন্তু মেয়েটি তাঁকে দেখতে না পায়। কয়েক মুহূর্ত পরে লুইসা সান্তিয়াগা আর উদ্বেগ দমন করতে পারলেন না ও পিছনে মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালেন। আর তখনই রাগে তাঁর মরে যেতে ইচ্ছে করছিল, কারণ ছেলেটি তাঁর দিকেই তাকিয়ে ছিলেন এবং তাঁদের দৃষ্টি বিনিময় হল। আমার বাবা বৃদ্ধ বয়সে যখন এই কাহিনি আবার আমায় গল্প করছিলেন, দারুণ খুশির সঙ্গে বলেছিলেন, ‘ঠিক যেমনটা ভেবেছিলাম তেমনটাই হয়েছিল।’ কিন্তু মা চিরকাল বলে এসেছেন যে ফাঁদে পা দেওয়ার রাগে তিনি তিন রাত ধরে ঘুমোতে পারেননি।

দ্বিতীয় মুহূর্তটি হল যখন ছেলেটি মেয়েটিকে একটা চিঠি লিখল। একজন কবি ও রাতের গোপন বেহালাবাদকের কাছ থেকে যেমন চিঠি আশা করা যায় তেমন কিন্তু নয় চিঠিটা। বরং একটা ছোট্ট উদ্ধত চিরকুট, যাতে দাবী করা হচ্ছে যে পরের সপ্তাহে সান্তা মার্তায় যাওয়ার আগে যেন তাঁকে উত্তর দেওয়া হয়। মেয়েটি যথারীতি কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে ফেললেন। স্থির করলেন, যা তাঁকে সুস্থভাবে বাঁচতে দিচ্ছে না তাকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে দিতে হবে। তখন ফ্রান্সিসকা পিসি লুইসাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে খুব বেশি দেরি হওয়ার আগে একবারের জন্য হলেও সাড়া দেওয়া দরকার। তিনি হুভেনতিনো ত্রিয়োর সেই বিখ্যাত দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন। হুভেনতিনো ত্রিয়ো ছিল এক প্রেমিক যে তার অধরা প্রেমিকার জন্য তার বারান্দার নীচে প্রতিদিন সন্ধে সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকত। মেয়েটি যতভাবে সম্ভব তাকে অপমান করত এবং সব শেষে, প্রতি রাত্রে, বারান্দার উপর থেকে এক মূত্রধানী ভর্তি পেচ্ছাপ হুভেনতিনোর মাথায় ঢেলে দিত। তবুও তাকে নিবৃত্ত করতে পারত না। তারপর, সব রকমের আক্রমণের পর, সেই অপরাজেয় ভালোবাসার আত্মোৎসর্গে অভিভূত হয়ে হুভেনতিনোকেই সে বিয়ে করে। আমার বাবা-মায়ের প্রেম কাহিনি অবশ্য এরকম চরম সীমায় পৌঁছোয়নি।

লুইসার মনের অবরোধ ভেঙে ফেলার তৃতীয় মুহূর্তটি ছিল একটি জমকালো বিয়ের আসর। সেখানে দুজনেই নিমন্ত্রিত ছিলেন। এত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে না-যাওয়ার মতো কোনো অজুহাতও লুইসা সান্তিয়াগা খুঁজে পাননি। গাব্রিয়েল এলিহিয়োও ঠিক এই কথাটা ভেবেছিলেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সব কিছুর জন্য প্রস্তুত হয়ে। সেখানে গিয়ে মেয়েটি দেখলেন যে হলঘরের মধ্যে দিয়ে গাব্রিয়েল তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। বুঝতে পারলেন এর অবধারিত উদ্দেশ্য হচ্ছে নাচের প্রথম আসরে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো। কিন্তু নিজের মনকে তিনি দমন করতে পারছিলেন না। ‘দেহের মধ্যে দিয়ে রক্ত এত দ্রুতগতিতে প্রবাহিত হচ্ছিল যে বুঝতে পারছিলাম না তা রাগে হচ্ছিল না ভয়ে’, মা আমাকে বলেছিলেন। বাবা অবশ্য তা বুঝে নিয়েছিলেন এবং লুইসাকে বললেন সেই মোক্ষম কথাটি, ‘আপনার মুখে হ্যাঁ বলার দরকার নেই, কারণ আপনার হৃদয়ই তা বলে দিচ্ছে।’

মেয়েটি কোনো কথা না বলে তাঁকে সেই হলঘরের মধ্যে, নাচের যে সুর বেজে চলেছে তার মধ্যে একা দাঁড় করিয়ে রেখে চলে গেলেন। কিন্তু আমার বাবা ব্যাপারটাকে নিজের মতো করে আত্মস্থ করে নিলেন। আমাকে বলেছিলেন,

—‘আসলে আমি খুশিই হয়েছিলাম।’

লুইসা সান্তিয়াগা নিজের উপরই প্রচণ্ড রেগে গেলেন যখন মাঝরাতে তাঁর ঘুম ভাঙালো বিষাক্ত ওয়াল্টজ ‘নাচ শেষ হওয়ার পরে’-র টুকরো টুকরো সুর। পরের দিন সকালেই গাব্রিয়েল এলিহিয়োর দেওয়া সমস্ত উপহার ফেরত দিয়ে আসলেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অবমাননা ও বিয়ের আসরের ঘটনা নিয়ে জল্পনার জাল হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া তীরের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, যা আর ফেরানো গেল না। সকলেই মনে করল গ্রীষ্মের কালবৈশাখীর এ এক লজ্জাজনক সমাপ্তি। এই ধারণাটা আরো দৃঢ় হল যখন লুইসা সান্তিয়াগা ফের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে তাঁর মা তাঁকে সারিয়ে তোলার জন্য নিয়ে গেলেন পাহাড়ের পাদদেশে স্বর্গীয় পরিবেশের মধ্যে মানাউরে নামক এক জায়গায়। দুজনে কোনোদিনই স্বীকার করেননি যে সেই মাসগুলোয় তাঁদের মধ্যে কোনোরকম যোগাযোগ ছিল। কিন্তু সেকথা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কেন-না লুইসা সান্তিয়াগা যখন সুস্থ হয়ে ফিরলেন তখন দেখা গেল যে তাঁদের দুজনের ভুলবোঝাবুঝিরও অবসান হয়েছে। আমার বাবা বলেছিলেন যে স্টেশনে তিনি মায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, কেন-না মিনা আগেই বাড়িতে টেলিগ্রাম করে ফেরার কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। আর স্টেশনে লুইসা সান্তিয়াগা যেভাবে তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সম্ভাষণ করার জন্য তাতে গাব্রিয়েল ফ্রীম্যাসনের চিহ্ন খুঁজে পান এবং তাকে ভালোবাসার প্রত্যুত্তর বলেই গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু লুইসা সেকথা অস্বীকার করতেন লজ্জা ও জড়তার সঙ্গে। একই ব্রীড়াবনতভাবে স্মরণ করতেন সেই সময়ের দিনগুলোর কথা। তবে সত্যটা হল এই যে তারপর থেকে দুজনকে বেশ সহজভাবেই একসঙ্গে দেখা যেতে লাগল। শুধু বাকি ছিল সেই শেষ ধাক্কাটা, যা তাঁকে দিলেন তাঁর পিসি, পরের সপ্তাহে, সেলাই করতে করতে:

—‘মিনা কিন্তু সব জানে।’

লুইসা সান্তিয়াগা সব সময় বলেছেন, সেই যে নাচের মাঝখানে গাব্রিয়েল এলিহিয়োকে দাঁড় করিয়ে রেখে চলে এসেছিলেন, সেদিন থেকে মনের মধ্যে এক প্রবল টানাপোড়েন দমিয়ে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু নিজের পরিবার বিরোধীতা শুরু করলে তাঁর জেদ এত বেড়ে যায় যে সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি অর্জন করেন। সেটা ছিল ভয়ংকর এক যুদ্ধ। কর্নেল ব্যাপারটার বাইরে থাকার চেষ্টা করতেন, কিন্তু মিনা যখন বুঝতে পারলেন তাঁকে যতটা নিরীহ বলে মনে হচ্ছে আসলে তিনি তা নন, তখন তাঁকে দোষারোপ করতেন এবং কর্নেল তা এড়িয়েও যেতে পারতেন না। সবাই পরিষ্কার বুঝতে পারল যে মেয়েটি নয়, ছেলেটিই আসলে অবাধ্য। কেন-না সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রেমিকই হল দোষী, সীমালঙ্ঘনকারী। পুরুষানুক্রমে চলে আসা এই বদ্ধমূল সংস্কার, যার আগুন এখনও নেভেনি, আমাদের সমাজে তৈরি করেছে অনূঢ়া মেয়েদের এক বিরাট গোষ্ঠী এবং ছেলেদের পরিণত করেছে অসংযমী, যার পরিণাম অসংখ্য বিবাহবহির্ভূত সন্তানের জন্ম।

বন্ধুরা বয়স অনুযায়ী এই প্রেমিক-প্রেমিকার পক্ষে ও বিপক্ষে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। আর যারা কোনো পক্ষেই নেই, ঘটনার অভিঘাত তাদেরও কোনো এক দিকে টেনে নিয়ে গেল। অল্প বয়সিরা সোৎসাহে ওই দুজনের সঙ্গ নিল। সর্বোপরি গাব্রিয়েল এলিহিয়োর সঙ্গে, কারণ তিনি সামাজিক সংস্কারের বলি হিসাবে নিজের অসহায় অবস্থানকে তখন ভালোই উপভোগ করছেন। বিপরীতে বয়স্কদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই লুইসা সান্তিয়াগাকে বড়োলোক ও ক্ষমতাবান পরিবারের সেই অমূল্য রত্ন হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করল যাকে ওই মামুলি টেলিগ্রাফ অপারেটরের ভালোবাসার জন্য নয়, স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে পেতে চাইছে। আর লুইসা নিজে, যিনি এক সময় বাধ্য ও শান্ত মেয়ে ছিলেন, এখন বিরোধী শক্তির সঙ্গে মোকাবিলায় সদ্য প্রসব করা সিংহীর মতো ভয়ংকর হয়ে উঠলেন। তখন পারিবারিক অশান্তি এমন চরমে পৌঁছেছে যে একটা ঘটনায় মিনা মেজাজ হারিয়ে পাউরুটি কাটা ছুরি উঁচিয়ে তেড়ে গেলেন মেয়ের দিকে। লুইসা কিন্তু নিরুদ্বিগ্নভাবে যেখানে ছিলেন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। পরমুহূর্তে মিনা যেই তীব্র ক্রোধের বশবর্তী হয়ে নিজের এই অপরাধমূলক আচরণ সম্বন্ধে সচেতন হলেন সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘হে ভগবান!’ এবং সোজা গিয়ে হাতটা ধরলেন উনুনের গরম কয়লার উপর, যেন কৃত অপরাধের কঠিন প্রায়শ্চিত্ত করছেন।

গাব্রিয়েল এলিহিয়োর বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তি ছিল তাঁর জন্ম-কাহিনি। তিনি মায়ের বিবাহ-বহির্ভূত সন্তান। তাঁর মায়ের মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে একজন স্কুল মাস্টারের সঙ্গে সাময়িক সম্পর্কের ফলে গাব্রিয়েলের জন্ম হয়। তাঁর নাম আরহেমিরা গার্সিয়া পাতেরনিনা–ছিপছিপে চেহারার স্বাধীনচেতা সাদা চামড়ার এক মেয়ে। তাঁর আরও পাঁচটি পুত্র ও দুটি কন্যা ছিল। এই সন্তানেরা জন্ম নেয় তিনজন ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের ঔরসে যাদের কাউকেই তিনি বিয়ে করেননি বা কারুর সঙ্গেই এক ছাদের নীচে বাস করেননি। সিন্সে শহরে তাঁর জন্ম ও সেখানেই তিনি থাকতেন এবং কঠিন পরিশ্রম করে সন্তানদের পালন করেছিলেন এমন এক আত্মনির্ভর ও আনন্দময় সত্তা নিয়ে যা আমরা, তাঁর পৌত্র-পৌত্রীরা এক পাম সানডের দিনে কামনা করতে পারি। গাব্রিয়েল এলিহিয়ো সেই ব্যতিক্রমী বংশের এক উল্লেখযোগ্য উত্তরাধিকারী। বিয়ের রাতে প্রচণ্ড ঝড়-ঝাপটার মধ্যে রিয়োয়াচার এক পালতোলা জাহাজে চড়ে যখন যাচ্ছেন, প্রায়শ্চিত্ত করার ভঙ্গিতে তিনি মাকে বলেছিলেন যে সতের বছর বয়স থেকে শুরু করে তখনও পর্যন্ত তাঁর পাঁচজন কুমারী মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল। এমনকি একথাও স্বীকার করেছিলেন যে আচি শহরে টেলিগ্রাফ অপারেটরের কাজ করার সময় আঠেরো বছর বয়সে তাঁর এক পুত্রসন্তানও হয়, নাম আবেলার্দো, বছর তিনেক বয়স তখন সেই ছেলেটির। কুড়ি বছর বয়সে আইয়াপেলে কাজ করার সময় অন্য আরেক প্রেমিকার সঙ্গে কয়েক মাসের একটি মেয়ে আছে–নাম কার্মেন রোসা। কিন্তু তখনও পর্যন্ত তিনি তাকে দেখেননি। এই মেয়েটির মাকে কথা দিয়েছিলেন যে ফিরে গিয়ে বিয়ে করবেন এবং সে ইচ্ছাও তাঁর ছিল। কিন্তু লুইসা সান্তিয়াগার প্রতি ভালোবাসা তাঁর জীবনের সব কিছু ওলট-পালট করে দিল। ছেলেটিকে আইনানুগ স্বীকৃতি আগেই দিয়েছিলেন, অনেক পরে মেয়েটিকেও তা দেন, কিন্তু সে-সব শুধুই নিষ্ফলা আইনের আনুষ্ঠানিক মারপ্যাঁচ। তবে এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে তাঁর এই প্রথাবহির্ভূত আচরণ কর্নেল মার্কেস নীতিগতভাবে মেনে নিতে পারেননি। কারণ কর্নেলের নিজেরই বৈধ তিনটি সন্তান ছাড়া বিভিন্ন মহিলার সঙ্গে বিয়ের আগে ও পরে আরও ন’টি সন্তান ছিল এবং তাঁর স্ত্রী তাদের সকলকেই আপন সন্তানের মতো দেখতেন।

টীকাঃ
১। কার্মেন দে বোলিবার: কলোম্বিয়ার কার্তাহেনা দে ইন্দিয়াসের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি শহর।
২। পাম সানডে: ইস্টারের আগের রবিবারে অনুষ্ঠিত খ্রিস্টানদের একটি ধর্মীয় উৎসব।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.