/ / যে মানুষটা পাহাড়ের দিকে হাঁটা দিয়েছিল – পীর মোহাম্মদ কারওয়ান অনুবাদ : গৌতম চক্রবর্তী
|

যে মানুষটা পাহাড়ের দিকে হাঁটা দিয়েছিল – পীর মোহাম্মদ কারওয়ান অনুবাদ : গৌতম চক্রবর্তী

শেয়ার করুন


[লেখক পরিচিতি : পীর মোহাম্মদ কারওয়ান একজন পুশতু ভাষার প্রতিষ্ঠিত কবি এবং গল্পকার । পীর মোহাম্মদ কারওয়ান, আফগানিস্তানের তানি জেলার নারিজি গ্রামের মানুষ । এখন অব্ধি তাঁর তিনটি কবিতার সংকলন এবং দুটি গল্পের সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ।]

গলিটার ভেতর দিয়ে লোকটা হনহনিয়ে এগোতে থাকে। উন্মাদের মতন সামনের দিকে রাস্তার ওপর তখন তার বড় বড় চোখ দুটোর শূন্য দৃষ্টি আর গলির আনাচে কানাচে ঠিক সেইসময় জটলা করা কিছু মানুষ অনেকদিনের বদভ্যাসজনিত কারণে কলার খোসা রাস্তার মাঝখানে আলগোছে ফেলে চলেছে। হেঁটে চলা মানুষটা চলার গতি এতটুকু না কমিয়ে খোসাগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগোতে চায় আর এগোতে গিয়ে আচমকাই পা পিছলে পথের মধ্যে যায় পড়ে। তাকে লক্ষ করে চলা মানুষগুলো তার এ হেন্ অবস্থা দেখে একসঙ্গে হেসে ওঠে। ক্ষিপ্ত হয়ে এতটা পথ হেঁটে আসা মানুষটা উঠে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড রাগে এই হেসোরামদের উদ্দেশ্যে গাল পাড়তে পাড়তে সে বলে ওঠে, “একবার নিজেদের দিকে ভালো করে তাকা রে গাড়লের দল! গোটা দেশটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে আর ওনারা দাড়িয়ে দাড়িয়ে দাঁত ক্যালাচ্ছেন। এতটুকু লজ্জাসরম যদি থাকত এদের!”
সে তড়িঘড়ি জায়গাটাকে পেছনে ফেলে চলে আসে আর নিজের মনে বিড়বিড় করে, “আল্লাহ! এমন একটা দিনও কী আমার নসিবে লেখা নেই, যেদিন অন্তত এই গলিটা দিয়ে আমি সুস্থ শরীরে বেরুতে পারব? এখন আবার রেডিওগুলোর বকবকানি শুরু হবে। আল্লাহ রে আল্লাহ! কী সব খবরের বাণী ওগুলো থেকে ভকভকিয়ে বের হয়!”

সে আর কয়েক পা এগোতে না এগোতেই গলির দুপাশের দোকানগুলোয় রেডিওগুলো চলতে শুরু করে। ক্ষণিকের মধ্যে আহত এবং নিহতদের সমাচার সম্প্রচার আরম্ভ হয়। আর সব কটা রেডিও যেন একসঙ্গে বেছে বেছে দেশের সমস্ত খারাপ খবর চারপাশে ছড়াতে শুরু করে। রেডিওগুলো থেকে সেই বেরিয়ে তার দিকে ধেয়ে আসা কথাগুলো যেন কোনও ধারালো ছুরির মতন তার বুকে বসে হৃদপিণ্ডটাকে দু-টুকরো করতে থাকে। হাঁটতে থাকা লোকটা চিৎকার করে ওঠে, “সব কটা থেকে মিথ্যে কথা বেরোচ্ছে। এরা সবাই বিকিয়ে গেছে। সব্বাই ঘুষ খেয়েছে।”

দু-কানে আঙুল গুঁজে সে দৌড়তে শুরু করে। তার পরা সাদা কাপড় ধুলোয় ধুলাকার হয়ে যায়। আশেপাশের লোকজন তাকে দেখে হাসে; আরো একবার হাসে। ভিড়ে ভরা গলিটা থেকে লোকটা অবশেষে বের হয়। চৌ-মাথায় পৌঁছেও সে একই গতিতে হাঁটতে থাকে। চারিদিকে খবর কাগজওয়ালারা চিৎকার করে চলে, “খবর, খবর! আসুন, আসুন, কিনে নিন একদম জবর খবর! এক্কেবারে তাজা খবরটা পড়ে যান।“ প্রত্যেকটা খবর কাগজ মৃত আর মৃতপ্রায়দের সমাচারের আঁচে গনগনে লাল হয়ে আছে। প্রতিটা খবর কাগজের প্রথম পাতায় ছিল তাদের দেশের একটা নকশা যা আকারে প্রকারে দেখতে অনেকটা কোনও বড় সড় মাছের মতন। নকশাটাকে আদতে দেখতে লাগছিল সেইসব মাছেদের মতন যারা ভয়ানক কোনও ঝড়ের দাপটে নদী থেকে উঠে এসে কখনো সখনো শুকনো ডাঙায় আছড়ে পড়ে ছটপট করে। কাগজের ওপরের সেই নকশাটা ছিল আবার মাঝখান দিয়ে কেটে দু-ভাগে ভাগ করা। হেঁটে চলা মানুষটা, কাগজওয়ালাগুলোর দিকে ঘুরেও তাকায় না। সেই আগের মতন সামনের দিকে উন্মাদের মতন তাকাতে তাকাতে, সেই একই গতিতে সে হেঁটে চলে। হঠাৎই তাঁর সামনে একজন কাগজওয়ালা এসে দাঁড়ায়। যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে এমন এক আর্তি ভরা স্বরে সে হেঁটে চলা মানুষটির মুখের সামনে খবর কাগজটা তুলে ধরে বলে,” নিন, আসুন! এক্কেবারে তরতাজা খবরটা কিনে ফেলুন।” সামনের পাতার টুকরো করা নকশার ওপর হেঁটে চলা মানুষটা তাকায়। নকশাটার সারাটা শরীরকে যেন এফোঁড়ওফোঁড় করা হয়েছে। লোকটার চোখ ছলছল করে ওঠে। চিৎকার করে সে বলে, “হায় রে আল্লা! কোন নির্বোধ জুলুমবাজ মাছটাকে এভাবে কেটেছে? এই দেখো, এই একটা টুকরো এইদিকে চলে গেছে আর আরেকটা টুকরো ওইদিকে চলে গেছে।” এই কথা শুনে কাগজওয়ালা হাসিতে ফেটে পড়ে । মুখে বলে, “আরে পাগল ভাই, এটা মাছ নয়। এ হল গিয়ে আমাদের দেশের নকশা!” লোকটা তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে আসে আর দৃঢ় বিশ্বাসে ভর করে বলতে শুরু করে, “আফগানী* দিয়ে সব কটা খবর কাগজকে চাকর-বাকর করে রেখেছে। এরা সবাই মিথ্যে কথা বলে। এদের প্রতিটি কথা বিষে ভরা। ভাইসব, এই সমস্ত লেখা আপনারা পড়া বন্ধ করুন। জেনে রাখুন এসব খবর একসময় আমাদের মৃত্যুর কারণ হবে; আমাদের ধীরে ধীরে উন্মাদে পরিণত করবে; আমাদের একজনকে আরেকজনের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। ভাইসব, এইসব মিথ্যুকরাই একদিন আমাদের ওপর বিপর্যয় ডেকে আনবে; আমাদের দেশটাকে আমাদের থেকে কেড়ে নেবে। ভাইসব, আপনারা শুনুন…!” আশেপাশের মানুষগুলো আরেকবার হেসে ওঠে আর লোকটা সেখান থেকে তাড়াতাড়ি দৌড়ে পালায়।
লোকটা ভিড়ভাট্টা, জটলাগুলো পেছনে ফেলে সোজা নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরের সামনে এসে পৌঁছয়। ঘর বন্ধ। ঘরের চাবি বের করবে বলে সে পকেটে হাত দেয়। পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে সে একসময় পকেটের ভেতর হয়ে থাকা গর্তটাকে আবিষ্কার করে। আর তাঁর হাত সোজা গর্তটার ভেতর দিয়ে গলে যায়। আস্তে আস্তে শরীরের কোষগুলোয় রাগ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। উন্মাদের মতন লোকটা তাঁর চারপাশ নিরীক্ষণ করে চলে। একসময় হাতের কাছে সে একটা জুতসই লোহার রড খুঁজে পায় আর তাই দিয়ে দরজায় লাগানো তালাটাকে বেঁকায়; আর বেঁকিয়ে ভেঙে ফেলে। ঘরের ভেতরে বসবার উপক্রম করলে পরে, এতক্ষন ধরে হেঁটে আসা মানুষটার রাগী, রাগী মুখটায় একটা হালকা হাসির রেশ ছড়িয়ে যায়। ঘরে সবকিছু এলোমেলো, অগোছালো। তাঁর সমস্ত প্রিয় বইগুলোকে এক জায়গায় করে আর তারপর একটা কাপড় পেতে, তার ওপর বইগুলোকে রাখে। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে কিছু পুরনো খবর কাগজ। সেদিকে তাকিয়ে রীতিমতো রেগে গিয়ে লোকটা বলে ওঠে, “এইসব আফগানীর জোরে কেনা হয়েছে । “সে দাঁত কিড়মিড় করে আর বলে চলে,” এদের একটাকেও আমি রেয়াত করবো না।” এই বলে লোকটা কাগজগুলোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে। আর এইদিকে আসছে এমন কারোর পায়ের শব্দ সে শুনতে পায় এবং চিৎকার করে ওঠে, “কে? কে হতে পারে যে এদিকে আসছে? এখানেও কী এরা আমাকে একটু একা থাকতে দেবে না! শহরের অন্য কোথাও অন্য কারোর খবর কাগজ নষ্ট করতে না পারলেও, আমার কাছে থাকা কাগজগুলো নিয়ে আমি যাই করি, তাতে কার কী আসে যায়? আমি আমার টেলিভিশনটাকেও শেষ করে দিতে পারি আর রেডিওটাকেও ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলার ক্ষমতা ধরি। এই সবকিছু আফগানী দিয়ে খরিদ করা হয়েছে। এই মিথ্যে বলার যন্ত্রগুলোর একটাকেও রেহাই দেওয়া হবে না। এই সবগুলোর ওপর আমি প্রতিশোধ নেবো। আমি পাহাড়ের দিকে চলে যাবো। এমন শহরে থেকে আমার কোনও কাজ নেই, যেখানকার প্রতিটা অলিতেগলিতে মিথ্যে বেচা হয়। সেইসব মিথ্যে কথা যা মুরগি দুয়ে দুধ বের করার মতন অমোঘ সত্য।”

তাঁর লাঠির ঘায়ে টেলিভিশন স্ক্রিনের শরীরে ফাটল দেখা দেয়। তখন এক দল বন্ধু দেখা করবে বলে তাঁর বাড়িতে এসে হাজির :

– আরে করছো কী তুমি? টেলিভশনটার তো দফারফা করে দিলে একেবারে!

-ও ঠিকই বলেছে। টেলিভিশন সেটটার যথেষ্ট দাম আর এই কাগজগুলোও তো দেখছি ছিঁড়ে ফিরে একাকার করেছো। ছিঁড়ে না ফেললে, ওইগুলো দিয়ে অন্তত তুমি তোমার বইগুলোকে কভার করতে পারতে।
তাঁর আরেক বন্ধু বলে ওঠে।

এইসব শুনে সেই একটু আগের হেঁটে আসা লোকটা ভীষণ রেগে যায় আর বলে, “মিথ্যে দিয়ে আমি আমার বইগুলোকে ঢাকবো না। আমি এগুলোকে, এই সব কটাকে ধ্বংস করব। এই সবকিছু আফগানী দিয়ে ওরা কিনে নিয়েছে। আমি রেডিওটাকেও ভেঙে চুরমার করে দেবো।” লাঠির ঘায়ে রেডিওটা মড়মড় করে ওঠে। “এই সবকিছু আফগানী দিয়ে ওরা কিনে নিয়েছে। আমি এদের একটাকেও রেয়াত করব না। এই সবকটা খবর কাগজে আসলে লুকিয়ে আছে, আমাদের খুলি তাক করে কালাশনিকভ থেকে ছোড়া বিষাক্ত বুলেটের চিহ্ন। আর এই রেডিও আর টেলিভিশন থেকে বেরিয়ে আসা খবরের প্রতিটা শব্দ হলো আদতে এক একটা বিষ মাখানো ছোরা যা আমাদের হৃদপিণ্ডটাকে কেটে দু-ভাগ করে ওই মাছটার মতন। এই সবকিছু আফগানী দিয়ে কিনে নেওয়া হয়েছে; – এই কাগজ, টেলিভিশন, রেডিও সব। আমি এদের একটাকেও রাখব না।”

লোকটার বন্ধুরা তাকে জড়িয়ে ধরে। “তুমি তো পুরোপুরি উন্মাদ! আমরাও তো একই কথা বলি। আমরাও তো বলি এই সবকিছু, কিছু আফগানির বিনিময়ে বিকিয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে, এইভাবে লাঠি দিয়ে পাগলের মতন সবকিছু ভেঙে ধ্বংস করে ফেলতে হবে? এই জিনিসগুলো যা তুমি নিজে খরচ করে কিনেছো। এ তো অনেকটা নিজের সম্পত্তিতে নিজেই আগুন দিচ্ছি এমন ব্যাপার স্যাপার হয়ে দাড়ালো। “রাগে ফুটতে থাকা, অনেকক্ষন আগের সেই হেঁটে আসা মানুষটা হাসে আর বলে, “তুমি কিচ্ছু জানো না, কিচ্ছু বোঝো না। আদতে তুমি নিজে উন্মাদ! আল্লাহ রে আল্লাহ, এরা নিজেরা সব এক-একটা পাগল আর বলে কিনা আমি পাগল! তুমি যা বলছো সেটার প্রেক্ষিতে আসল সমস্যাটা কোথায় তা তোমাকে ব্যাখ্যা করে বোঝানোর মতো ধৈর্য আমার নেই। এই বিষ মাখানো মিথ্যেগুলো তোমাদেরকে এক্কেবারে পাগল বানিয়ে ফেলেছে। আমাদের আলোচনা এখানেই শেষ। আমি আমার সমস্ত ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছি আর এখন এইসমস্ত কিছুর ব্যাখ্যা দেওয়ার আর প্রয়োজনবোধ করি না।”

সেই হেঁটে আসা মানুষটা, তাঁর বইগুলো কাপড়ে মুড়ে নিয়ে উচ্চস্বরে এবার বলে ওঠে, “বন্ধুরা চললাম। এই শহরকে তোমাদের হেফাজতে রেখে এবার আমি বিদায় নিচ্ছি।”


*আফগানী : আফগানিস্তানের মুদ্রা

শেয়ার করুন

Similar Posts

One Comment

  1. অসাধারণ অনুবাদ। গল্পের বিষয় যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গল্পকার একজন সাহসী লেখক। এক নিঃশ্বাসেই যেন গল্পটি পড়ে ফেললাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *