তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়ের গুচ্ছ কবিতা – জাদুচৈতন্য

শেয়ার করুন


জাদুচৈতন্যের তলায় জিভ জৈবশলাকার মতো কাঁপে—
এই তির্যক বিদ্যা আয়ত্ত হল। স্থাণু পথ এমন কঙ্কাল হয়ে
শুয়ে আছে সহজ ভঙ্গিমায়, আমাদের গমন আজও
সহজ মনে হয়। মনে হয় দুই ন্যুব্জ ছুরি পরস্পর কাটাকাটি
পেরিয়ে আমাদের প্রসব করে থেমে গেছে, এবার আমরা
পরবর্তী ছেদক হিসাবে পথ কাটতে কাটতে এগোব।
জাদুচৈতন্যের তলায় কিছুই রৈখিক নয়, যেন বৃত্তের কন্দরে
ভক্তিযোগ জিভ জৈবশলাকার মতো দিক থেকে দিকে
ঘুরে যায়। ঘুরে যায় দুরূহ ইশারার দিকে, আমি সারল্যে
পরম পেয়ে থেমে গেছি। কিন্তুএই থামা বোধি নয়,আয়ু নয়।
পাখি ও উড্ডয়ন যতকাল বিপরীত না হবে, আমাদের
যাত্রাগুলি ততকাল উর্বর হবে না।


তুমি মা না দৈত্যের দুহিতা, এই চিন্তায় মাথা ডুবে যায়।
অতিরিক্ত শিশুকাল হল, মৌন সময় হল, চিৎকারের চেয়েও
অধিক কম্পাঙ্কে স্তব্ধ থাকতে শিখেছি একা একা।
তুমি মা না দৈত্য দুহিতা, এই চিন্তা স্নানের ভিতরে
দেহে বর্শার মতো বিঁধছে… যাই হও, যাই হও, যেটুকু নির্মাণ
আমি রেখে যাচ্ছি আমাদের বস্তির জ্যোৎস্নায়,তার শামুকগতি
তোমার কৃষ্ণযোনির দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসবে, মা,মা
ডাকতে ডাকতে জরায়ু অবধি তার রসময় সরণ তুমি টের পাবে
বৃদ্ধদশায়; তুমি দৈত্যের দুহিতা হলে নির্মাণের মাথা কেটে
খেয়ো যা পাবে—অস্তিত্ববিধি,জপ,কুরবানীর উট, পাথর—
সর্বস্ব ও কিছু-না।তবুও সামান্য কিছুমাতৃচিহ্ন প্রকট হলে
একা স্তনমর্দনে আমাদের রক্ত দাও।যত হাঁ-মুখ প্রসব করেছ,
সবাই তোমার সামনে আশার পাঁজর নিয়ে ব’সে…


অতঃপরঘুম কেননাযা খেলা হওয়ারছিল,তা গত।
যা সৎকারেরউপচার ছিল,তা ক্রমশ লোপ পেতে পেতে
কপিশ ঝরনার মতো মৃত্যুপথগামী।আমরা সায়ংকাল থেকে
বাঁচা আরম্ভ করেছি, ভোরঅবধি জরা থাকবে না।বিগ্রহ ধারণা
ক’রে শত্রুশ্রীচরণকমলে সন্তানের কাটা মাথা নামিয়ে রেখেছি,
এই উৎসর্গে অমরাবতীঅবধি একটি শিরশিরে অসুখ ছুটে গেল।
যা ভক্তি,তা ভয়ের প্রতিবিম্ব।জেনেছি এমন সত্য,এখন
ঘুমের ভিতর এষণা থমথম করে, যা খুঁজছি তা সন্ধানের অতীত,
এ তো পরিবর্তিতহওয়ার নয়।শুধুঘুমের দুয়ার আর ঠেলা যায় না
ব’লে,আমাদের নিদ্রাগুলি ফলপ্রসূহবে নাকখনও।


আর কোনো অর্থ নেই;অর্থের সীমানা এত ব্যথা দেয়!
যা লেখা হয়েছে বা হবে,জাদুচৈতন্যের অন্দরে তার ধোঁয়ায়
শুধুসঙ্গীতজ্যান্ত থাকতে পারে।বাকি যা সমালোচনা, কিংবা
নিন্দার নির্মোক তুলে সখ্যের আকুতি,তা আজ কৃত্রিম লাগে,
আকর্ষণীয়লাগে।এই ভ্রম অধিকের উপহার নয়,স্বল্প উন্মাদ
এনে তাদের হাতের ত্বকে অর্থের আগামী রেখে দেখি কোনো
দ্যুতি জাগে কি না।আর কোনোঅর্থনেই, নিকট নৌকার মতো
আশ্রয়ের শিশ্ন তুলে ডেকে নেওয়াসোহাগে সোহাগে।
এ-ই কি সঙ্গমস্পৃহা?এ-ই কি ধ্যানের তন্তু?
যেটুকু ধী,নিয়তিতাড়িত,তার ধ্যান নিগূঢ় তৎসম।
প্রাচীনে আশ্বাস জ্যান্ত রাখি,তাই আজনতুন সহজে নেওয়াযায়।
এর কোনো অর্থ নেই,থাকাও আবশ্যক কিছুনয়।


অভিসন্ধি এমন শত্রু করো,যেন প্রেমের অন্তিম শুধু
তারই হাতে জাগরূক থাকে।মা কিংবা দৈত্যের দুহিতা,এই
অবান্তর সন্দেহের ভেতর শুধুসন্ত্রাসের গাছপালাদেখি।
সুতরাংভুল ছিল।যা কিছুঠিকের মতো মনে হয়,তাইভ্রম—
এমন আপ্তবাক্যে আরওকালো সর্বনাশ হয়।জৈবশলাকার মতো
জিভ নড়ে।যেন মুহূর্তেইতেতো সত্যি ঠিকরেএসে কোপ ভাঙবে
অণ্ডের তলায়।এ অণ্ড কার?মা না দৈত্যদুহিতার?
কিছুইআলাদা নয়।রন্ধনে মাংসের ধৈবত শুনে
জলজীবনের কথা মনে পড়ে।মনে পড়ে লঘু ধ্বংস আমাদেরনয়।
আমাদেরখেলাগুলি সংজ্ঞাহীন,পাঠকের গুহা থেকে সন্তাপে
দূরত্ব বজায় রাখে।আত্মীয়তাশত্রুর জরায়ু।অভিসন্ধি আপাতত
যেখানে যা স্নায়ু আছে টান ও মৃত্তিকা বরাবর,সব কেটে
শূন্য হওয়া।তারপর মুখ স্থির করা।আপাতত এই সত্যে
স্থির হয়ে আছি—কথার জন্তুর মুখে
আর খাদ্য হব নাকখনও।


জাদুচৈতন্যের ওপর সমস্তই জঙ্গম।সময়ের বশবর্তী নয়।
ফলত পরিমাপের অযোগ্য যা কিছু,সমস্তই উচ্চকোটির
অস্তিত্ব হয়ে প্রতিবেশী;নির্মোহ কালের পিঠে তাদের নরম
চলাচল আমাদের স্বচক্ষে দেখার জন্যনয়।চোখ বন্ধহলে
হয়তো যদি-বা সামান্যও দৃশ্যমান হয়,সমস্ত হয় না।
জাদুচৈতন্যের নীচে শলাকা জৈব না অজৈব নাকি মধ্যবর্তী
সমঝোতায় নিজ প্রমা স্থাপন করেছে,আমরা জানি না।
জানি নাযা আয়ুধ ভেবে চৈতন্য বরাবর নিক্ষেপ করি
শিকার বধের আশায়,আদপে তা হত্যা চায়,নাকি ফুল ও ফুলের
করোটি নিয়ে নামতে চায় মাংসেরদুয়ারে।
জাদুচৈতন্যের নীচে মহান হওয়ার লক্ষ্যেকাদের বিকার নড়ে আজ?
ন্যুব্জ ছুরি দুই হল,চার হল,এইভাবে বেড়ে বেড়ে বড় বেশি
পিতা মাতা হল।ওদের রমণ হবে।রক্ত হবে।শুক্র হবে।
আমরা হব অতঃপর।আবার পাখি ও উড্ডয়নের সহবাস আমাদের
সহ্য হবে না।যাত্রাপথ এমনই জটিল,তবুও সহজ ভেবে
হেঁটেহেঁটেআসছি জঙ্গলে।
এভাবে মরণ হলে,আর যেন শাপ না জেগে থাকে!

শেয়ার করুন

Similar Posts

  • |

    মঙ্গলেশ ডবরাল-এর কবিতা – ভাষান্তর: রূপায়ণ ঘোষ

    [কবি পরিচিতি: মঙ্গলেশ ডবরালের জন্ম হয় ১৯৪৮ সালে উত্তরাখণ্ডে। পরবর্তীতে কর্মসূত্রে দিল্লি নিবাসী। প্রখ্যাত ‘জনসত্তা’ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের পদে ছিলেন দীর্ঘদিন। শেষ দিকে ‘ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট’-এর পরামর্শদাতা হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। হিন্দি সাহিত্যের প্রগতিশীল ভাবধারার এই কবির কবিতা মূলত সামাজিক অবক্ষয়, গণচেতনা তথা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। ‘পাহাড় পর্ লাল্টেন’, ‘ঘর কা রাস্তা’…

  • |

    দেশ ভোলে না – পিউ দাশ

    মুখ ফিরিয়ে নিও না– একবার মুখ ফিরিয়েছিলাম আমি–আর দেশ হারিয়েছি– আর ভাষা হারিয়েছি যা হারিয়েছি তাদের নামও হারিয়েছি, আকার হারিয়েছি রয়ে গেছে কেবল কাগুজে মানচিত্রের উপর ফাঁকা কিছু স্থান– নিঃশব্দ, শুনশান; এখন রুখু হাওয়ায় কেবল ধুলো ওড়ে সেখানে রয়ে গেছে অর্থহীন কয়েকটা শব্দ; গোঙানির মত, সেই ভৌতিকতা–শিহরণ আনে মুখ ফিরিয়েছিলাম, তাই অপেক্ষায় আছি একদিন কেউ…

  • নারীর প্রতি – শাহিন চাষী

    তুমি চাইলেই পায়ের শিকল ছিঁড়তে পারো নির্দ্বিধায় যেমন ছেঁড়-সেলাই সুতার। তুমি চাইলেই প্রদীপ জ্বেলে মুছে নিতে পার অবলীলায় তোমার যাবতীয় অন্ধকার। কে দেয় তোমাকে বাঁধা? কে রোখে তোমার পথ? তুমি তো আমার জীবন সত্ত্বার জ্যোতির্ময় অহংকার। সাহসিনী হও, কেটে যাবে মেঘ, বাতাসে মিলাবে অনাহুত দীর্ঘশ্বাস, দিগন্তে আসবে আলোর বাণ। তুমি জাগলেই তোমার সীমান্ত জুড়ে বসন্ত…

  • রামকৃষ্ণ মহাপাত্রর পাঁচটি কবিতা 

    নিরুদ্দেশ দেখো এই পথের শেষ নেই কোনও,পায়ে পায়ে চঞ্চলতাফিরে যাবে গোধূলির দিকে,আমিও তোমার দিগন্ত-ছোঁয়াকান্নার ভেতর নিরুদ্দেশ হব একদিন… মাটিজন্ম বিকেলবেলায় বাড়ি ফিরছেনআমাদের বাবা,সাইকেলের চাকায় তখনওলাল ধুলোর ক্লান্তি। আমাদের বাবা সূর্য পেরিয়ে আসেন! তারপর মা আসন পেতেবাবাকে খেতে দেনফুটিয়ে রাখা দু’মুঠো আনন্দছায়া, আর আমরা ছয় ভাইবোনটানাটানির সংসারেবাবার ক্লান্তি, মায়ের আনন্দছায়ার মাঝেবেঁচে থাকিমাটিজন্ম নিয়ে। দিনশেষে দিনশেষে ফুরিয়ে…

  • সঞ্জীবন – কৌশিক গুপ্ত

    পদব্রজের ভেতরে থেকে যাবে অবধারিত রেললাইন শরীরের ওপর লাফিয়ে পড়া ট্রেনের অনিবার্যতা কালো বোতলের গায়ে লেবেল পাল্টে পাল্টে আসে শিবের পিঠে আসীন নিজেরই দেহ থেকে দূরে চালিত করছ বাকি পর্ব সুদর্শন চক্র হাতে এই অচেতনকে বিকীর্ণ করে ফেলছ বীজের পরিচয়ে ভূমিতে পড়ার আগেই অর্চিষ্মান খন্ডগুলি জ্বেলে দেবে পক্ষীশাবকের সাবালক হতে যে ক’টা স্তবক বাকি জন্মান্তর…

  • |

    প্রেম – সুতপা

    শব্দ। প্রতিশব্দ। সাতচললিশ, একাত্তর, বিরানব্বই, বিশ উনিশ… তলিয়ে যাওয়া স্মৃতি রাত জাগে অতীতের গহন ফুঁড়ে। জন্মভূমি জরাসন্ধ হয় বিনা দোষে। তবু জেন… এ আমার দেশ। আমার জন্মভূমি। আমার ভাষা। আমার প্রেম। সবুজ ঘাস আর লাল প্রান্তরের ডাকে তোমার কপালে মুছে দেব সীমানার বলিরেখা।

2 Comments

  1. অসাধারণ লেখা! যেন এই কবির জন্য অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন, গোপনে গোপনে।

    1. শ্রদ্ধা জানাই। ভালো থাকবেন 😊

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *