/ / একটা বাসের টিকিট – রিমি মুৎসুদ্দি

একটা বাসের টিকিট – রিমি মুৎসুদ্দি

শেয়ার করুন

বাসটা এত জোরে চলছে যে বাসে দাঁড়িয়ে থাকা প্যাসেঞ্জাররা টাল সামলাতে পারছে না। কেউ বা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। কেউ কেউ কোনোমতে হ্যাণ্ডেল চেপে ধরে টাল সামলাচ্ছে। সীটে বসে থাকা মানুষগুলোও খুব স্বস্তিতে নেই। কোনমতে চেপে বসে আছে। খালি মনে হচ্ছে এই বুঝি পড়ে যায়। একই রুটের দুটো বাসের মধ্যে রেষারেষির জেরে বাসের মধ্যে থাকা যাত্রীদের অবস্থা কাহিল। সামনের স্টপেজে কে আগে প্যাসেঞ্জার তুলবে সেই চেষ্টায় ফাস্ট-এন্ড-ফিউরিয়াসের সেই গাড়িটার গতিতে দুজনেই এগোচ্ছে। সামনের এই স্টপেজটায় বাসটা এমন ঘ্যাচ করে ব্রেক কষল যে শিবপ্রসাদের মনে হল পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অথবা চন্দ্র-সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি – এদের কোনো একটার অভাবে সে বুঝি এই ভূপৃষ্ঠ থেকে ছিটকে পড়ছে মহাকাশের মধ্যে। অতল শূন্যের মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে মনে হল সে যেন পড়ে আছে কোন তুলোর বিছানায়।

“কি হচ্ছে টা কি? আরে ঠিক করে ধরে দাঁড়ান না! যেই বাসটা একটু জোরে চলছে ওমনি সুযোগ নেওয়া শুরু? অসভ্য বদমাইশ কোথাকার!”

এরপর হয়তো শুরু হতো আরও গালিগালাজ। তার আগেই শিবপ্রসাদ ভদ্রমহিলাকে থামিয়ে দেয়। সত্যিই তো, তার মতো আর কেউ তো এরকম সামনের সীটে বসা মহিলার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েনি।

“আমাকে ক্ষমা করবেন দিদি, আসলে টাল সামলাতে না পেরে আর কি!” শিবপ্রসাদ মিনমিন করে বলে। শিবপ্রসাদের প্রায় মা-জ্যেঠিমার বয়সী একজন মহিলাকে দিদি বলায় তিনি বোধহয় একটু খুশীই হলেন। গলার স্বরটা একটু নরম করে তিনি বললেন, “শক্ত করে রডটা ধরে দাঁড়ান না! এই বাসটাও কিরকম চালাচ্ছে! নিজেরা রেষারেষি করে মরবে আর আমরা পাবলিক হয়রান হব!”

টিকিট-কন্ডাক্টর এগিয়ে আসছে। একজন বৃদ্ধ যাত্রী বললেন, “ও ভাই! কীভাবে চালাচ্ছ? একটু ঠিক করে চালাও না!” আর একজন অল্প বয়সী কলেজ পড়ুয়া বলে ওঠে, “ও দাদা! একটু ঠিক করে চালান না! এ যে দাঁড়ানো যাচ্ছে না!” পাশের আরেক যাত্রী উত্তেজিত স্বরে বলে ওঠেন, “কি হচ্ছে কি? ইয়ার্কি পেয়েছ? এমনিতে তো গরুর গাড়ি। এখন ৩৪বি বাসটা পাশে রয়েছে বলে ম্যারাথনের রেস লাগিয়েছ?”

আরেকজন মাঝ-বয়সী তো আর একটু বেশী উত্তেজিত। “মারব কানের গোড়ায় এক! কি পেয়েছিস কি? প্যাসাঞ্জাররা কি শালা মানুষ না হাঁস-মুরগি? যেমন করে ইচ্ছে তেমন করে টানবি না কি?”

কন্ডাক্টর নির্বিকারচিত্তে টিকিট কেটে চলেছে। সে জানে এই সময় উত্তর দেওয়া নিছক বোকামি। ‘মৌনং শ্রেয়’- এই ব্রত নিয়ে সে ভাবলেশহীন মুখে এগিয়ে চলেছে এক যাত্রী থেকে আরেক যাত্রীর দিকে।

টিকিটের খচখচ শব্দ, খুচরোর ঈষৎ ঝংকার কোনটাই শিবপ্রসাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না। তার দৃষ্টি সামনের লেডিস-সীটের জানালার বাইরে। কণ্ডাক্টরকে বাধ্য হয়েই বলতে হয়- “দেখি দাদা? টিকিটটা নেবেন!”

শিবপ্রসাদ দশ টাকার একটা নোট তার দিকে এগিয়ে, খুব নির্লিপ্ত স্বরে বলে, “একটা কেওড়াতলা দিন না?”

“কেওড়াতলা? এই বাস তো কেওড়াতলা যাবে না! আপনি ভুল বাসে উঠেছেন দাদা।”

“না, ঠিক বাসেই উঠেছি। যে ভাবে চালাচ্ছেন তাতে আর কোথাও না যাই কেওড়াতলায় ঠিক পৌঁছে যাব। তাই টিকিটটা ওখানেরই কেটে রাখছি।” শিবপ্রসাদের কথা শুনে বাসশুদ্ধ লোক হেসে ওঠে। একজন মন্তব্য করে, “যা বলেছেন দাদা। এমন চালাচ্ছে যে আমাদের কেওড়াতলা না হলে নিমতলা পাঠাবেই এই বাস।”

কন্ডাক্টর রাগে গজগজ করতে করতে চলে যায়। এতক্ষণে তার নির্বিকার মুখে ক্রোধের রেখা ফুটে উঠেছে। ঠাট্টাটা বোধহয় ঠিক হজম করতে পারেনি। শিবপ্রসাদের কাছে আর সে টিকিট চায় না।

বাসটা আস্তে আস্তে স্ট্যান্ডের দিকে এগোচ্ছে। ভিড়ও হালকা হয়ে এসেছে। দু’চারজন যারা লাস্ট-স্টপেজে নামবে তারাই শুধু বসে আছে। কন্ডাক্টর শিবপ্রসাদের দিকে আর একেবারেই লক্ষ করেনি। সেও চুপচাপ বসে আছে এতক্ষণ। লাস্ট স্টপেজে নামার সময় শিবপ্রসাদ টিকিটের টাকাটা এগিয়ে দেয় কন্ডাক্টরের দিকে। শিবপ্রসাদের মনে হলো একটা গালাগালি গিলে নিয়ে টাকাটা সে নিল এবং অবহেলা ভরে একটা টিকিট তার দিকে ছুঁড়ে দিল। শিবপ্রসাদের এবার বেশ হাসিই পাচ্ছে এরকম রাগ দেখে।

প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে এই শহর নাকাল। সারাদিন গনগনে রোদের তেজ। আর রোদ মরলেও স্বস্তি নেই। বৃষ্টির জন্য চাতকের মত অপেক্ষায় শহরবাসী। এই রকমই একটা গুমোট দিনের শেষে সন্ধ্যাবেলায় মেঘের গুড়গুড় শব্দ যেন মেঘমল্লার রাগের আলাপ। অফিসের ডেবিট-ক্রেডিটের কাজ শিকেয় তুলে সে আনমনে শুনছে মেঘের গর্জন। এককাপ চা খাওয়ার বড় ইচ্ছে হল তার। অসময় চা সে খায় না। তবু আজ ইচ্ছে হল। পকেট হাতড়ে খুচরো পয়সা বের করতে গিয়ে তার হাতে এল সকালে কণ্ডাক্টরের দেওয়া টিকিটটা। কন্ডাক্টর ছেলেটার রাগের কথা মনে করে ফিক করে একটু হেসে নিল ও। টিকিটটা পেপার-ওয়েস্টবিনে ফেলে দিতে গিয়ে খেয়াল করে যে একটার বদলে দুটো টিকিট দিয়ে দিয়েছে ছেলেটা। আশ্চর্য সে তো ন’টাকাই গুনে দিয়েছিল। আর টিকিট দুটো এগারো টাকার। আহারে, বেচারির তেরোটা টাকা মার গেল! সে বেচারিকে নিশ্চয়ই নিজের পকেট থেকে দিতে হবে। ভাবনাটা শিবপ্রসাদকে খুব একটা স্বস্তি দিল না। কারণ, সে দেখেছে যখনই তার কারণে কারও সামান্যতম আর্থিক ক্ষতি হয় তার কয়েকদিনের মধ্যেই শিবপ্রসাদের নিজেরও ভীষণ বড় রকমের আর্থিক ক্ষতি হয়। ব্যাপারটা হয়ত স্রেফ কাকতালীয় কিন্তু তার মনে কুসংস্কারের কাঁটাটা খচখচ করতে থাকে। চা খাওয়া মুলতুবী রেখে আবার ডেবিট-ক্রেডিটে সে মনোনিবেশ করে।

ক্ষতিটা এবার বড় তাড়াতাড়ি হল। একে অফিসের পাহাড়-প্রমাণ কাজ শেষ করে বেরোতে বেশ রাত হয়ে গেছে। তার উপর কোন বাস নেই। টানা পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করেও বাসের টিকি দেখা যাচ্ছে না। একটা শেয়ার ট্যাক্সিও পাওয়া যাচ্ছে না। হুশহাশ করে হণ্ডা সিটি, মারুতি, অল্টো আরও কত প্রাইভেট গাড়ী বেরিয়ে যাচ্ছে। ট্যাক্সি একটা কি দুটো আসছে তবে কোনোটাই খালি নেই। হল টা কি শহরটার? এ শহরের সবাই কি হঠাৎ বড়লোক হয়ে গেল। সবারই কি গাড়ী আছে নাকি? কোনও আশ্চর্য- প্রদীপের যাদুতে শহরের সব মধ্যবিত্তের বাড়ী-গাড়ীর স্বপ্ন কি সফল হল? নাহলে বাসস্ট্যাণ্ডও একেবারে ফাঁকা কেন? রাত প্রায় দশটা হবে। কিন্তু এ শহর তো এত তাড়াতাড়ি ঘুমায় না? লাস্ট বাস সাড়ে দশটায়। শিবপ্রসাদ বাস-স্ট্যাণ্ডে এসেছ তা প্রায় সাড়ে ন’টায়। এই এতক্ষণ সে না একটা বাস দেখেছে না কোন মানুষকে দেখেছে বাসস্টপে। এইবার দূরে একটা বাসের হেডলাইট দেখা যাচ্ছে। যাক্ বাঁচা গেল। হাত উঁচিয়ে বাসটাকে থামানোর জন্য বাসস্টপ থেকে কিছুটা এগিয়ে আসে সে। বাসের নম্বরটা এবার দেখতে পায়। যাক্ একেবারে বাড়ীর স্টপেজেই নামা যাবে। বাসটা শিবপ্রসাদের কাছে এসে একটু গতি কমালে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সে। এ কি বাসে যে একজনও যাত্রী নেই। সামনের সীটে কন্ডাক্টর বসে আছে জানলার দিকে মুখ করে। যাক তুলেছে যখন যাবে নিশ্চয়ই। বাসস্টপেও তো সে একাই ছিল।

একটা জানালার ধারে বসে পড়ে শিবপ্রসাদ। বাসটা আরও কিছুটা এগোনোর পর কন্ডাক্টর টিকিট নিতে এল। গুণেগুণে ন’টাকা এগিয়ে দিল সে। “না দাদা, বাইশ টাকা।”

“কি বাইশ টাকা? রাত হয়েছে বলে কি বাসেও লুঠ করবে না কি?”

“আরে না দাদা। সকালে আপনাকে এগারো টাকার দুটো টিকিট দিয়ে ফেলেছিলাম না! আপনিও তো দিব্যি নিয়ে চলে গেলেন। দিয়েছিলেন তো ন’টাকা! তাহলেই বুঝুন আপনার জন্য আমার কেমন লস হল!”

“আরে আচ্ছা মুশকিল তো! তুমি টিকিট দেওয়ার সময় দেখে দাওনি কেন? আর টিকিট নিয়ে কেউ এত দেখে টেখে না। ছুঁড়ে রাস্তায় ফেলে দেয়।”

“তা, আপনারা বাবু ফেলে দিতে পারেন। অনেক আছে আপনাদের। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ! কিছু ফেলতে পারি না। আবার আপনাদের মত ঠাট্টা-মশকরাও করতে পারি না।

শিবপ্রসাদ বুঝতে পারে সকালের ঠাট্টার শোধ নিচ্ছে। তারও কপাল! এই এতক্ষণ পর যাও বা একটা বাস পেল তাও সেই সকালের বাসটা! যেমন তার চালক তেমনি তার কন্ডাক্টর। সারাদিন অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি তার উপর এই উৎপাত! আর শান্ত থাকতে পারে না সে। বেশ ঝাঁঝিয়েই উত্তর দেয়, “আরে আমি ঐ ঠাট্টাটা না করলে বাসের লোকজন তোমাদের ধরে প্যাঁদানি দিত। দেখলে না সবাই কেমন রেগে ছিল! ওরকম জোরে কেউ চালায়? আর ঐ যে অমন আচমকা ব্রেক কষলে! ধরো কেউ যদি পড়ে যেত আর মাথা-টাথা ফেটে যেত, তাহলে?”

“কেউ পড়ে যায় না দাদা! আজ বিশ বছর এ লাইনে আছি। কেউ পড়ে যায়নি কোনদিন। অবশ্য লেডিস-সীটের উপর অথবা সামনে লেডিস দাঁড়ালে অনেকেই অমন পড়ে যায়।”

শিবপ্রসাদের কান-মাথা গরম হয়ে যায়। কন্ডাক্টরের ইঙ্গিতটা ও ধরতে পারে। ও কিছু বলার আগেই কণ্ডাক্টর বলে ওঠে, “চলন্ত বাসে ওঠার জন্য আপনারা যখন পড়িমড়ি করে ছোটেন এই আমরাই হাতটা বাড়িয়ে আপনাদের তুলে নিই। আর প্যাদানির কথা বলছেন! কলকাতার জনগণ এখনও এতটা মাই-কা-লাল হয়ে ওঠে নি যে ভুলভাল চালানোর জন্য বাসের কন্ডাক্টর-ড্রাইভারকে প্যাঁদানি দেবে! তাহলে কি আর আমরা এমন করে চালানোর সাহস পাই? যতক্ষণ অ্যাকসিডেন্ট না হচ্ছে ততক্ষণ নিশ্চিন্ত! ঐ গলার জোর অবধিই! ব্যাস! আর বাস-টাস যে সব জ্বালানো টালানো হয় সেখানে সাধরণ প্যাসেঞ্জার কোথায়? সে তো পার্টির ছেলেরা করে।”

সকালের আপাত চুপচাপ ছেলেটাকে এত কথা বলতে দেখে শিবপ্রসাদ একটু হকচকিয়ে যায়। কথা বলার সময় মুখ থেকে ঝাঁঝালো পানীয়ের গন্ধও পেলো। এর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শিবপ্রসাদ জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকে। ন’টাকার একটা বেশি টাকাও সে দেবে না! সে যদি ভদ্রভাবে চাইত তো শিবপ্রসাদ নিশ্চয়ই দিয়ে দিত। কিন্তু এরপর কিছুতেই দেবে না!

কন্ডাক্টর টাকাটা নিয়ে ফিরে যায়। আর কিছু বলে না। টিকিটও দেয়নি এখনও পর্যন্ত। এমন সময় আবার কি প্রচণ্ড জোরে ছুটছে বাসটা। “আরে বাবা পড়ে যাব যে! কি হল টা কি? বাড়ি ফেরার তাড়া নাকি? সে তো তোমাদের থেকে আমার কিছু কম নয়।”

শিবপ্রসাদ আবার চিৎকার করে বলে, “এভাবে চালালে আমরা কেউই বাড়ি পৌঁছতে পারব না! আস্তে আস্তে!”

কথা শেষ করতে পারে না। প্রচণ্ড এক ঝাঁকুনির জেরে পড়ে যায় সে। মাথাটায় খুব লেগেছে। বেশ যন্ত্রণা করছে! এ কি? কপাল দিয়ে যে রক্ত গড়াচ্ছে! সামনের রডটায় লেগে কপালটা কেটে গেছে। পাশে আরও একটা বাস এসে গেছে। দুজনেই সমান তালে ছুটছে। যেন আর কোন গাড়ী নেই রাস্তায়। শুধু এই দুটো বাস। দুজনেরই অসম্ভব তাড়া। কোন যাত্রী তোলা নয় দুজনের মধ্যে রেস লেগেছে, কে আগে গন্তব্যে পৌঁছবে? প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কপাল চেপে বসে আছে শিবপ্রসাদ। আবার ভীষণ জোরে এক ধাক্কা! বাসটা উল্টে যাচ্ছে সামনের এক খালে।

শিবপ্রসাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে। “আমাকে বাঁচাও! আমি ডুবছি! আমাকে বার করো বাস থেকে!”

কোনমতে ও কথা বলার চেষ্টা করছে। হঠাৎ এক ধাক্কা। “আরে হল টা কি? তখন থেকে গোঁ গোঁ করছ আবার এখন বলছ বাঁচাও, ডুবছি, বাস থেকে বার কর! বলি, কাল তো রাতে কিছু খেলেও না। অফিস থেকে ফিরে সোজা বিছানায়। কুম্ভকর্ণের মত নাক ডাকতে লাগলে আর এখন এত বেলা অব্দি শুয়ে আছ? স্বপ্ন-টপ্ন দেখেছ না কি?”

ঘুমের ঘোরটা একটু কাটলে শিবপ্রসাদ চোখ মেলে দেখে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওর বউ মৃদুলা। “আরে এ তো আমি বিছানায়! আমি কি বাড়িতে?”

এবার মৃদুলা ঝামটা দিয়ে বলে ওঠে, “বাড়িতে না তো আর কোথায়? কি হয়েছেটা কি তোমার? এত বেলা অব্দি শুয়ে আছো আর এখন জিজ্ঞেস করছ তুমি কোথায়?”

কিছুটা দম নিয়ে এবার একটু নরম গলায় মৃদুলা বলে, “অফিসে কি খুব চাপ? না, অফিসে কাজের চাপ বাড়লে তোমার মাথাটাও কেমন যেন একটু গোলমাল হয়ে যায়।”

এটা সহানুভূতি না বিদ্রুপ? শিবপ্রসাদের অফিসের কাজের চাপ যদি মৃদুলা টের পেত? মৃদুলা অবশ্য বলে সে যদি একদিন মৃদুলার মত বাড়ীর সমস্ত ঝঞ্জাট পোহাত তা’হলে টের পেত! আসলে কে যে কি টের পেতো সেটা অবশ্য পরিষ্কার নয়।

পুরোন ঘড়িটায় ঢংঢং করে ন’টার ঘণ্টা বাজল। শিবপ্রসাদের ঘুমের রেশ এতক্ষণে পুরোপুরি কেটে গেছে। তবে কি ও এতক্ষণ ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল? অথচ কালকের কথা কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে ওর। অফিস থেকে ও বাড়ি ফিরল কী করে? ওর স্পষ্ট মনে পড়ল, কাল অফিস যাওয়ার সময় ৩০বি বাসটায় উঠেছিল। বাসটা অসম্ভব জোরে ছুটছিল। বাড়ি ফেরার সময়ও ঐ একই বাসে আবার উঠেছিল ও। উঠতে বাধ্য হয়েছিল। আর বাসের কন্ডাক্টর ছেলেটার মুখটাও মনে আছে ওর। উফ্! কি অসম্ভব জোরে চলছিল বাসটা। না! মাথাটা অসম্ভব ধরে গেছে! কপালটায় হাত দিয়ে ও দেখল কপালটা একটু ফোলা ফোলা লাগছে। একবার ভাবল মৃদুলাকে বলে কালকের সব কথা। পরে ভাবল, না! থাক, যদি আবার ওর নাভার্স ব্রেকডাউন করে।

চায়ের কাপ নিয়ে মৃদুলা আবার ফিরে এসেছে। টেবিলের উপর কাপটা নামিয়ে সে শিবপ্রসাদের গতকালের পরনের জামা-কাপড় নিয়ে যায় কাঁচার জন্য। কি মনে হতে শার্ট আর প্যান্টের পকেট দুটো একবার দেখে নেয়। গত তিনিদিন ধরে শিবপ্রসাদ এই সবুজ শার্টটাই পড়ছে। বিকট ঘামের গন্ধে মৃদুলার নাকটা ঈষৎ কুঁচকে রয়েছে। সে তার স্বামীর পকেট থেকে কয়েকটা খুচরো পয়সা, একটা দশ টাকা, দুটো পঞ্চাশ টাকা, একটা লন্ড্রি বিল আর একটা বাসের টিকিট টেবিলের উপর নামিয়ে রাখে। টিকিটটা দেখেই শিবপ্রসাদ ‘ইউরেকা!’ বলে চিৎকার করে ওঠে। কাল রাতের ধাঁধাটা সমাধানের রাস্তা পেয়ে যায়।

মৃদুলাকে হতবাক করে দিয়ে পাজামার উপর একটা জামা গলিয়েই সে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে এল ৩০বি বাসের স্ট্যাণ্ডে। রাস্তায় আজ তেমন বাস চোখে পড়েনি। বাসের স্ট্যান্ডের গুমটির ঝাঁপ ফেলা। সারি সারি বাস দাঁড়ানো। একটা বেঞ্চিতে দুজন লোক বসে আছে। শিবপ্রসাদ তাদের কাছে এগিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, “দাদা, আপনারা কি বাস ইউনিয়ানের লোক? আজ কি বাস চলছে না?”

এই কথা শুনে লোক দুজন এমনভাবে শিবপ্রসাদের দিকে তাকিয়ে রইল যেন মঙ্গল গ্রহের প্রাণী দেখছে। কিছুক্ষণ পর একজন গলা খাঁকরি দিয়ে বলে উঠল, “হ্যাঁ আমরা ইউনিয়ানের লোক। দাদা কি কাগজ-টাগজ পড়েন না? আজ বাস স্ট্রাইক।”

শিবপ্রসাদ সজোরে মাথা নেড়ে জানাল সে জানে না। তারপর ওর কাছে থাকা বাসের টিকিটটা লোকটাকে দেখিয়ে বলল, “এই বাসের কণ্ডাক্টরকে কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারেন?” টিকিটটা দেখে লোকটা যেন একটু চমকে ওঠে। তারপর বলে, “সে কি! কাল বাইপাসে খালের ধারে অতবড় অ্যাক্সিডেন্ট হল। খবরের কাগজ না হয় পড়েননি কিন্তু টিভিতে তো দেখাচ্ছে। আপনি কিছুই জানেন না?”

শিবপ্রসাদ চুপ করে থাকে। লোকটা বলে যায়, “এই যে টিকিটটা এনেছেন এই বাসটাই তো কাল রাতে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। ইস! কণ্ডাক্টরের মাথাটা থেঁৎলে গেছে। বোধহয় পড়ে যাওয়ার সময় রডে-টডে লেগেছিল।”

শিবপ্রসাদ কেমন যেন হতভম্ব হয়ে যায়। কোনোমতে গলায় জোর এনে জিজ্ঞেস করে, “কখন হয়েছে?”

লোকটা জবাব দেয়, “এই রাত দশটা-টশটা হবে। কোন প্যাসেঞ্জার ছিল না। স্ট্যান্ডের দিকেই আসছিল। তারই মধ্যে কি করে যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এরকম একটা ঘটনা হল। ড্রাইভার, কন্ডাক্টর দুজনেই স্পট-ডেড।” আরও কিছু কি বলে যাচ্ছিল লোকটা? শিবপ্রসাদের কানে কিছুই ঢুকছে না। ও বাসের টিকিটটা নিয়ে শুধু চুপ করে বসে আছে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.