/ / একজন কমিউনিস্ট – অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ( পর্ব ৪ )

একজন কমিউনিস্ট – অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ( পর্ব ৪ )

শেয়ার করুন

একজন কমিউনিস্ট – অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ( পর্ব ১ )
একজন কমিউনিস্ট – অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ( পর্ব ২ )
একজন কমিউনিস্ট – অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ( পর্ব ৩)

চার

শুভাশিস ভাবছিল ডায়ারির কথা। মোটা ডায়ারিতে অনেকটা লেখা, অনেককিছু লেখাজোখা। আঁকাও আছে, অপটু হাতের। কাকার হাতের লেখাও বোঝা যাচ্ছে না সময়-সময়। জড়িয়ে গেছে। ফলে পড়তে কষ্ট হচ্ছে। আর যেহেতু তিন দশক পার হয়ে গেছে এই ডায়ারির বয়স, অনেকগুলি পাতা অস্পষ্ট হয়ে গেছে। জল পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে কিছু। কিছু পাতা ভাঁজ করা ছিল, কেটে গেছে ভাঁজে ভাঁজে।

শুভাশিস বলল, আশা করছি, দিন কয়েকের মধ্যে তা পড়ে ফেলতে পারব। তবু যা আছে, তোমাদের সেই সময়ের একটা রাজনৈতিক ভাষ্য হতে পারে এই ডায়ারি। আর কেবল সেই সময়েরই বা বলছি কেন, এই সময়েরই বা নয় কেন?   

তুমি কি আমাকে পড়তে বলছ?

না।

তাহলে?

তোমার একসময়ের শত্রুপক্ষ তোমার নামে কী লিখে রেখেছে, সেটা জানানো উচিত বলে মনে হল। এখন যদি বলো কেন মনে হল, তার উত্তর আমার কাছে নেই।

স্মিত হেসে ভুলাই বলল, এর উত্তর আছে আমার কাছে। শুনবে? বলে সে তাকিয়ে রইল শুভাশিসের মুখের দিকে।  

কীরকম? আগ্রহী হয়ে উঠল শুভাশিস।

ভুলাই বলল, ওই যে, সময়ের খেলা— আজ যে লোকটা অন্যকে দাবিয়ে চিৎকার করে বলছে, ‘জানিস আমি কে? দেখবি আমার ক্ষমতা কত?’, সেই লোকই দু-বছর, পাঁচ বছর, দশ বছর পর কেঁচো হয়ে যাচ্ছে— হ্যাঁ, স্রেফ একটা কেঁচো, যাকে গেঁথে ছিপ ফেলা যায়! হা হা। কত দেখলাম রে, ভাই! নিজেকে নিয়ে দেখলাম, অন্যকে দেখলাম। এই ‘আমাকে দ্যাখ’ আর ‘জানিস আমার ক্ষমতা কত’ করতে করতে আমরা, এই পলিটিশিয়ানরা কখন যে খাদের কিনারে চলে আসি, জানতেই পারি না। ক্ষমতার মোহ, নিজেকে সকলের সামনে জাহির করার নেশা মানুষের মধ্যে এমন চেপে বসে যে মানবিক গুণগুলি আমাদের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়! নইলে তৈমুর লং কেন তাঁর কবরের উপর লিখে যাবেন, আমি যখন জাগব, গোটা পৃথিবী কাঁপবে? চেঙ্গিস খান, প্রবল শীতেও বিরুদ্ধ দেশ জয় করতে গিয়ে কেন ঠান্ডায় মারা যাবেন? আলেকজান্ডার! নিজের দেশে ফেরা হল না তার। আনাতোলিয়াতেই ঘুমিয়ে থাকতে হল। এইসব ভাবি এখন। আর মনে হয়, সেই ট্যাডিশন সমানে চলছেই—ক্ষমতার মোহ, দম্ভ আর অহংকার! কত মনে পড়ে এদের কথা! কত ভাবি। ভাবি, কিন্তু শিক্ষা নিই না—কোনো কালেই নিই না। তখন মনে হত, এই লোকটা চালে ভুল করেছে,‌ রাজনীতির খেলা ধরতে পারেনি কারণ, কবিতা লিখলেই যেমন কবি হওয়া যায় না তেমনি চব্বিশ ঘণ্টা রাজনীতি করলেই নেতা হওয়া যায় না। কিন্তু এখন বুঝি, আমার সেদিনের ব্যাখ্যা ভুল ছিল। সময় তোমাকে কখন গুঁড়িয়ে দিয়ে চলে যাবে তা তুমি বুঝতেও পারবে না। বুঝবে তখন যখন হাতে পাওয়ার, জনগণের সমর্থন থাকা স্বত্ত্বেও তুমি হেরে ভূত হয়ে গেছ। সেই শরশয্যা থেকে ফিনিক্স পাখি হওয়া হবে না তোমার— হা হা।  

শুভাশিস স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। আর ভাবে, এ হল ভুলাই পালের নবজন্ম। এ এমন এক আলাদা জন্ম, যেখানে সে সমস্ত দলের সীমারেখা, ‘আমরা-ওরা’-র স্তর পেরিয়ে নিজেকে আলাদা করে নিয়েছে। সে এখন মুক্তমনা, রাজনীতি বর্জিত অথচ প্রবলভাবে এক রাজনৈতিক মানুষ হয়ে উঠেছে। সময় তাকে নিষ্পেষণ করে দিয়েছে তার চাকা চালিয়ে। না, তাই বলে ধূলি হয়নি সে। সে মিশেছে মাটিতে, আর ফিনিক্সের মতো বেরিয়ে এসেছে সেই ছাইচাপা, পচা-গলা আবর্জনার স্তূপ থেকে। এখন সে দলহীন এক রাজনৈতিক মানুষ।  

তার পর একটু থেমে, অন্যদিকে তাকিয়ে ভুলাই পাল বললে, ডায়ারিটার কথা বাড়িতে জানে?

জানি না। তবে মনে হয়, এতদিনেও কারও হাত পড়েনি।

সেটাই স্বাভাবিক।

কারণ?

এর উত্তর খুব সোজা। তোমাদের বাড়ির লোক কখনও চায়নি তোমার কাকা রাজনীতি করুক। আমি বলতে চাইছি ডাইরেক্ট পার্টি করার কথা। তোমাদের বাড়ির লোক চিরকাল কংগ্রেস করেছে, তোমার দাদুর বাবা তো গান্ধিজির সঙ্গে মিছিলে একবার পা মিলিয়েছিলেন কলকাতায় থাকতে থাকতে— সে কথাও আমরা জানি, তুমি শুনেছ। আমাদের যখন ছোটো বয়স, শুধু এই একটি কারণে আমরা তোমাদের বাড়ির দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে দেখতাম। তোমার দাদুর বাবাকে মনে হত, দেবতা। পরে যখন পার্টির সদস্যপদ নিই, ওইসব ছোটোবেলার ব্যাপার-স্যাপার মাথা থেকে আউট করে দিয়েছিলাম। কারণ কোনো বাড়ির প্রতি মুগ্ধতা থাকলে সেই বাড়ির বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না।

এছাড়া ওর নানা কাজের জন্য তোমাদের পরিবারের নানারকম ক্ষতি হচ্ছিল। রাজনীতিতে তখন আমাদের পালে বাতাস। রোজই সেই বাতাসে জোর লাগছে, ঢেউ খেলছে। বাতাসের বেগ বাড়ছে। তোমার কাকা যেমন ক্যাডার হয়ে উঠেছিল, তেমনি কেউ কিন্তু করেনি তোমাদের বাড়িতে। সেই সময় একটু নরমে-গরমে চলা দরকার ছিল, কারণ জমি বর্গা করা শুরু হয়ে গেছে।

এই কারণে তোমার কাকা বাড়ির সকলের বিরাগভাজন হচ্ছিল। ও সরে গেছে, বাড়ির লোক হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে! তাই ওই জিনিস কেউ ছুঁয়েও দেখেনি। আর সঙ্গে যেহেতু তোমার বই থাকত, সকলে ভেবেছে তোমার জিনিস। ডায়ারিটি বেঁচে গেছে। হয়তো বেঁচে গেছে তোমার কাকাও।

সন্দিগ্ধ হয়ে শুভাশিস বলে, একথা কেন বলছ?

একটু হাসল ভুলাই পাল। ঘরের চালে কতটা ঝুল জমল, তা লক্ষ করতে করতে বলল, মনে হল, বললাম। পড়ে মিলিয়ে নিও।

শুভাশিস বলল, যদি তোমার লেখা এমন কিছু থাকে, যা আমাদের উদ্দীপ্ত করতে পারে, নতুন করে ভাবনার, চিন্তার খোরাক যোগাতে পারে— আমি সে ডায়ারি কি পড়তে পারি— যদি তোমার কোনো আপত্তি না থাকে।

মাথা নাড়ল ভুলাই। বলল, না, আমার কোনো ডায়ারি নেই।

এমন কিছু যে লেখা যেতে পারে, মনেই হয়নি কখনও। লেখা থাকলে হয়তো ভালোই হত। আমার নাতনি আমার ব্যাপারে, সেই সময়ের গ্রামীণ রাজনীতির কথা শুনতে চায়। যখন যেমন মনে পড়ে বলি। ও মুগ্ধ হয়ে শোনে। আমাদের ফ্যামিলিতে একমাত্র আমিই যেমন সক্রিয় রাজনীতি করেছি অনেকটা সময়, তেমন আর কেউ করেনি। ফলে আমাকে নিয়ে লোকের কৌতূহল থাকবেই। আছেও। তবে জানো, ওকে আমি ঠিক বুঝি না। গ্রামদেশে মেয়েরা সক্রিয় রাজনীতি করে না। অন্তত আমাদের এদিকে এর চল নেই। মিছিলেও হাঁটে না তারা। আমার এই নাতনিটি এইসব না করলেও ওর মধ্যে রাজনীতি নিয়ে এক প্রবল কৌতূহল তৈরি হচ্ছে বুঝতে পারি। ও নানা বই পড়ে। আমার কাছে কিছু বই ছিল, সেগুলিতে ওর খিদে মেটে না। পুজোর সময় আমাদের যে স্টল থাকে, সেখান থেকে ও বই কেনে। গল্পর, ইতিহাসের, রাজনীতির। ভবিষ্যতে ও কী করবে, তা আমার জানা নেই। আর একটা কথা বলি, এই ডায়ারিতে যাই লেখা থাক, তোমার পড়া উচিত নয় ভাই। অনেকের ব্যক্তিগত কথাও তো লেখা থাকে। সোনামানিক যেটা লিখে গেছে, সেই লেখাগুলিকে সেইভাবেই থাকতে দাও না কেন!

এই বলে ভুলাই থামল। নিজেই নিজের পায়ে হাত বোলাতে লাগল। শুভাশিস বুঝল, ভদ্রলোক এইভাবে বসে থাকতে বা এইভাবে নিজের পায়ে হাত বুলিয়ে এক ধরনের আরাম পান। সে চুপ করে রইল।  

ভুলাই বাড়ির ভেতর দৃষ্টি দিল। সেখানে কেউ নেই। ওদিকের পুরো ঘরটা দেখা যায় না, চালার চাল নীচু। হয়ত এটা ইচ্ছে করেই করা, একটা আড়াল রাখার জন্য। আবার এটাও হতে পারে, দীর্ঘদিন মাথায় বোঝা নিয়ে থাকতে থাকতে চালটা নীচু হয়েছে বৃদ্ধর মতন। এখন তার হাতে লাঠি দরকার।

সেই দৃষ্টিপথ অনুসরণ করে শুভাশিস দেখল, উঠোনের মাটি মসৃণ নয়, উঁচুনীচু। বর্ষার জল জমলে যেমন কাদা হয়ে মাটি চলে যায় মাটির গভীরে তেমনি ঢেউ খেলানো উঠোন। সেখানে দুটি মুরগি মসৃণ ভাবে চরে বেড়ায়। আর একটু ভালো করে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, সেখানে রয়েছে হাঁসেদের সুগভীর পদচিহ্ন।

ভুলাই পাল আপনমনে বলে যেতে থাকল, কথাটা বলে ভালো করলে হে, ছোকরা; বড় শান্তি পেলাম মনে! দলে, একটা সময় এই কথা শুনেছি বটে, তবে সেটাকে আমি তেমন পাত্তা দিইনি। তার কারণ তখন আমার মতো অনেকেই এমন ছিল। নাওয়া-খাওয়া মানে পার্টি। নিঃশ্বাস মানে দল। আমাদের উৎসব মানে মে-দিবস। বন্ধু মানে শ্রমিক। আত্মীয় মানে কৃষকেরা। বাকি রইল খাওয়া আর ঘুম। সে তো হলেই হয়। বাংলাপাড়া ছিল বর্গক্ষত্রিয় মানুষের পাড়া। হাত লিড নিত ওখানে। তারপর? চাকা ঘুরল। সেই ছিয়াশি সাল থেকে আমরা ওখানে লিড নিয়ে আসছি, আজও; এতকিছুর পরও বাংলাপাড়া আমাদের দিক থেকে মুখ ফেরায়নি। এর কারণ জানো? জানো না। দ্যাখো, ওই ডায়ারিটাতে কিছু পাও কিনা। যদি না পাও, তখন আমি জানাব তার কারণ, তবে সে কথা হবে পরের সাক্ষাতে।

বলে ভুলাই পাল থামে। তখন উঠোনের দিকে সে তাকাল আবার। না, কাউকেই নড়াচড়া করতে দেখা গেল না। তাই বলে একদম ফাঁকা নেই সে-উঠোন। সেখানে বনপাখি’রা চরে। কাঁকর খায়। মাটি শোঁকে, ঘোরে-ফেরে। বোঝা যায়, এই বাড়িতে সময়-অসময়ে তাদের অবাধ গতিবিধি।

আবার শুরু করে ভুলাই। বলে, এখন এই কষ্টের মাঝে, তোমার কাকার সেই অতদিন আগের লেখাটা আমার কাছে যেন নতুন অক্সিজেন! আমার হার্টের অসুখ, মেডিকেলে আগে দেখাতুম; এখন আর যেতে পারি না—খরচও করতে পারি না। মেয়ে-জামাইরা একসময় অনেক করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটা রোগ চলতে থাকলে সকলেই কেমন যেন অভ্যস্থ হয়ে যায়। তেমনি আমাদের সকলেরই এই রোগটা গা-সওয়া হয়ে গেছে। এখন আর বাইরে গিয়ে দেখাতে পারি না। তিনমাস অন্তর কাছাকাছির এক ডাক্তারকে দেখাই। সে যা ওষুদ দেয়, খাই। টাকা থাকলে ওষুদ কিনি, নইলে নয়। তবে সাবধানে থাকি। এই যেমন ধরো, নুন কম খাওয়া, তেল-ঝাল-মশলা-ঘি কম খাওয়া। এসব অবিশ্যি আমি মেনেই থাকি প্রকৃতির নিয়মে।

 বলে হা হা করে হাসল ভুলাই পাল। শুভাশিস দেখল, দেওয়ালে একটা পুরানো ক্যালেন্ডার ঝুলছে। শ্রীকৃষ্ণের ছবি দেওয়া। ধুলোমলিন। বাকি দেওয়ালেও ধুলোর ছাপ স্পষ্ট।

ভুলাই নিজের মনে বলে চলল, কারণ তেল-ঘি আর কপালে জুটছে কোথায়? দুটি গরু আছে আমাদের। আর কিছু প্রাণী। মুরগি বড় হলে বেচি, ডিমটা খাই। তোমার জেঠিমা ওদের দেখভাল করে। দুধটা বেচা হয়। কিছু পয়সা আসে। ঘুঁটের দাম আর নেই। লোকের ঘরে ঘরে গ্যাস ঢুকে যাচ্ছে এখন। ওটা আমরাই কাজে লাগাই—জ্বালানি হয়। তবে আমি খুব আফসোস করি জমিতে না যেতে পারার জন্য। চাষি মানুষ, জমিতে না গেলে চলে?  

চুপ করে বসে থাকে শুভাশিস। দেখে কীভাবে বয়ে চলেছে সময়। উঠোনের উপর দিয়ে, মানুষের দেহ, মন, শরীরের উপর দিয়ে তার এমনই চলন মানুষকে স্থবির করে দেয়। মানুষ হয়ে ওঠে পলি পড়া নদীর মতো নরম, মোলায়েম। মনের গভীরে থাকা গোপন কথারাও তাদের ভার হারিয়ে উঠে আসে জলতলের উপরে। তখন মানুষের মনে আর কোনও আগল থাকে না।  

হয়তো তাই, ভুলাই পাল এখন একজন তেমনি মানুষ। সে এখন নরম। রাগ, ক্রোধ, হুমকি দেবার স্তর পেরিয়ে এসে সে এখন মোহনার নদী। গতি হারিয়ে স্তব্ধ সে যেন অপেক্ষা করছে সাগরে মিলবে বলে।

সে বলে চলে, আমি একজন কৃষক। জমিই আমার জীবিকা। শ্রমিকদের সামনে রেখে পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের আগে রেখে কিছু হয়নি। লেনিন কৃষকদের মনে রাখলেও শ্রমিকদের সামনে রেখে আন্দোলন করেছেন। হো-চি-মিনও তাই। এই নিয়ে আমার মনে একটা আক্ষেপ আছে। মনে হয়েছে, কেন এমন? প্রকৃতির সঙ্গে থেকে থেকে কৃষকরা কি নরম প্রকৃতির হয়ে যায়? উদাস হয়ে ওঠে? আর উলটোদিকে শ্রমিক মানে শহর, সেখানে বেঁচে থাকতে গেলে অনেক কষ্ট করতে হয়, অনেক সতর্ক থাকতে হয়। তার উপর কারখানার ভেতর পলিটিক্স তাদের মনে-মনে রাজনীতির প্রতি একটা দায়বদ্ধতা এনে দেয়। কারখানার ভেতর অনেকে দল করে। সেটাই তাদের মধ্যে এক রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়। আমার মনে হয়, এই কারণেই তাদের সামনে রেখে আমাদের মহান নেতারা লড়াই চালিয়েছিলেন সাম্যর জন্য। এছাড়া কাস্তে ধরা হাতের চেয়ে লোহা পেটানো হাতের কার্যকারিতা তাঁদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল। তবু আমাদের দেশে বিপ্লব হয় না। জানো, শুভ; আমি মনে মনে স্বপ্ন দেখি, কোনো একটা বিপ্লবে অংশ নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের দেশে তা হবার নয়। বলে ভুলাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।   

তেভাগা তো ছিল। নকশাল আন্দোলন। এগুলি কি বিপ্লব নয়?

নকশালদের কিছুটা বলা যায়। কিন্তু খুনোখুনি শুরু হতে ওরা মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আর তেভাগা একটা সময়ের, কিছু মানুষের আন্দোলনের ফসল। বিপ্লব বলতে আমি বুঝি, সারা দেশের গণজাগরণ। যেটা জারের বিরুদ্ধে হয়েছিল। ভিয়েতনামের যুদ্ধ। সারাদেশের মানুষ একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়েছিল। হ্যাঁ, এটাকে আমি বিপ্লব বলেই মনে করে থাকি। কিউবার লড়াই। সেটা এখানে কোথায়? আমাদের সময়েও কিছু ছিল না, আর এখন তো বিপ্লব সুদূরপরাহত। আমরা চিরকাল শাসিত হতেই পছন্দ করেছি— সেই প্রাচীনকাল থেকেই। শাসন ক্ষমতায় কে এল আর কে গেল, তাই নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের কোনও মাথব্যথা নেই।  

মজুমদারও কৃষকদের নিয়ে শুরু করেছিল।

হ্যাঁ। কিন্তু সেটা ধরে রাখতে পারেনি। দারোগাকে খুন করা ওদের ছিল চরম ভুল। আর সেটাই ওদের আন্দোলনকে শেষ করে দেয়। বলতে পারো, ওদের শেষের শুরু ওই দারোগাকে তির মেরে খুন করেই। তিনখানা তির খেয়ে দারোগা মারা গেল। পুলিশ এসে বদলা নিল। শেষমেশ ওরা ওই লাইনেই চলে গেল। খতম! সেই খতমের রাজনীতি গোটা আন্দোলনকেই স্তব্ধ করে দিল।

শুভাশিস চুপ করে রইল। 

ভুলাই বলে, এটা আমার মত। তোমার সঙ্গে বা অন্য কারও সঙ্গে আমার মতের মিল নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমার বিশ্লেষণ এটাই বলে। আমি একজন কৃষক— এই একটি পরিচয় আমার কাছ থেকে কেউ কাড়তে পারেনি বলে আমার মনে গর্ব ছিল খুব। কিন্তু এখন আমার শরীর বসে গেছে। আগের মতন মাঠে যেতে পারি না। ধানে কীভাবে দুধ আসছে, দেখা হয় না। মাঝে মাঝে লাঠি নিয়ে যাবার চেষ্টা যে করি না, তা নয়। তবে ওই—একদম আলের কিনার অবদি যেতে পারি না। আমার মেয়ের মাঠের ধারে বাড়ি— সে তুমি চেনো। ওখানে যেয়ে বসি। ওরা দুয়ারে চ্যাটাই পেতে দেয়, আসন পেতে রাখে। জল দেয়, বাতাস দেয়। ওদিকে তোমাদেরও জমি আছে। সেখানে ধান ফলে। বর্ষায় তাদের বাড়িতে কইমাছ উঠে আসে। উঠোনের জমা জলে খেলা করে খলসে,  গুঁতেমাছ। এত্ত এত্ত মাছ গেল বর্ষায় হল যে, মানুষে খেয়ে আর শেষ করতে পারে না। অনেকে বলে, ফসলের বিষে মাছ মরে। তাই জলজ মাছ কম। কিন্তু আমি ভাবি অন্য কথা। আগের মতো বৃষ্টি আজকাল আর হয় না। বৃষ্টি যদি জল হয়ে না জমে চারিদিকে, সে যদি না উপচায়, তবে পুকুর, খাল, বিল নদী-নালা থেকে মাছ সে টানবে কীভাবে? আগে মাঠের পর যে মাঠ গেল, তার ভিতরই থাকত ছোটো পুকুর, ডোবা, বিল। সেখান থেকে মাছ বেরিয়ে আসত জলের টানে। সেই মাছ বাসা বাঁধত মাঠে। ধানগাছের গোড়ায়। ধান বড়ো হত, তার গোড়ায় জলা জলে কচুরিপানা গজিয়ে ওঠে, মাছ তা খায়, ছানাপোনার জন্ম হয়। ওঃ, সে এক দেখবার মতো দৃশ্য বটে!

শুভাশিসের মনে হল, কথাগুলি বলছে আর চোখের সামনে যেন সেইসব দৃশ্যাবলী ভেসে উঠছে। সেই মাঠ, তার জল, সেখানের নানান জলজ প্রাণী, মেঠো শামুকের দলকে খেতে হাজির শামুকখোল। আছে বক ও মাছরাঙা। রাতে শেয়াল ঘুরে যায় কাঁকড়া ধরার আশায়। কতদিন যায় না সে সেখানে। এখন শুনে সেই নস্টালজিয়া যেন ঘিরে ধরল তাকে। মনে হল, যে-কয়দিন এখানে আছে, যাবে সে। দেখে আসবে পুরানো সেইসব দিনেদের।

ভুলাই বলে, এবার বলি তোমার জেঠিমার কথা। তারও বয়স হচ্ছে, নানা রোগ ঘিরে ধরছে তাকেও। ও নিজে আর দেখায় না; বলে আমি মেয়েমানুষ— কই মাছের জান, আমার মরণ নেই। আসলে দুজনে মিলে যে বাইরে ডাক্তার দেখাব, সে-ই পয়সা কোথা? স্থানীয় যে গ্রামীণ হাসপাতাল, সেখানে বড়ো ডাক্তার কই? তার জন্য কলকেতা যেতে হয়। হার্ট স্পেশালিস্ট, মেডিসিন স্পেশালিস্ট— সবই মজুত রয়েছে সেখানে। সেইজন্য গ্রামের মানুষ সেখেনে গিয়ে ভিড় করে। যাদের লোকবল আছে, কিছুটা হলেও ট্যাঁকের জোর আছে, তারা ওসব পারে; আমরা নিতান্তই গরিব, দেখার কেউ নেই, আমরা কি ওসব পারি? তাই ওই যা- ঠেকনা দিয়ে চলছে! পেসমেকার বসানোর কথা ছিল, তখন সেই টাকা জোগাড় করতে পারিনি— এখন নাকি শুনি ফ্রি দিচ্ছে! তা ভালো। আমি আর সেই ফ্রি-এর সামনে গিয়ে হাজিরা দিতে পারলাম কই? তোমার কাকার ওই কথাটাই আমার কাছে এই বয়সে পেসমেকার। খুব ভালো লাগল।

মেয়েটি লেবুর জল দিয়ে গেল। শুভাশিসের হাতে গ্লাসটি আলগোছে ধরিয়ে দিল। দাদুর দিকে মুখ করে বলল, আমিই করে আনলাম। দিদুন রান্না করছে।

তাহলে এবার চা করে আন আমাদের জন্য।

শুভাশিস বলল, না না জেঠু, চা-টা লাগবে না— এ-ই ঠিক আছে।

মেয়েটি অমনি ঘুরে তাকাল। বলল, কেন? তুমি কি চা খাও না?

একটু অপ্রস্তুতে পড়ে গেল শুভাশিস। বলল, না, তা নয়। আসলে ব্যস্ত করতে চাইছি না।

মেয়েটি চৌকির উপর বসে পড়ল। ভুলাই পাল বললে, খানিক পর করিস। এই জল খাচ্ছে। দশ মিনিট পর করে আন। তারপর শুভাশিসের দিকে ফিরে বললে, জানলে শুভ, ও আমার বড়ো আদরের নাতনি। ওদিকে মেয়ে আমাদের পর হয়ে গেছে, এদিকে নাতনি হয়েছে আপন। এই বেশ হল না? ও রোজ না হলেও একদিন অন্তর আসে; দু-দশ মিনিট থেকে আমাদের খবরাখবর নিয়ে যায়। ওর পড়াশুনো আছে, তাও ওরই ফাঁকে আসার সময় ঠিক করে নেয়। এই দ্যাখো না, ওর মা কি একটা রেঁদেছে, কৌটো করে নিয়ে এসেছে। আজ কী এনেছিস রে, কিঙ্কি?

মেয়েটি ইতস্তত করতে লাগল। শুভাশিসের দিকে তাকাল একবার।  

ভুলাই জোর দিয়ে বলে, বল না।

অনুচ্চ গলায় মেয়েটি বলে, ওই, বাবা পুকুরে নারকেল পাতা ফেলেছিল কাল রাতে, আজ সকালে গেঁড়ি উঠেছিল খুব। বলে সে একঝলক তাকালো শুভাশিসের দিকে।

উৎফুল্ল হয়ে উঠল ভুলাই। দুদিকে ঘাড় নেড়ে বলল, ওহো, ওহো! গেঁড়ি-চচ্চড়ি আমার খুবই প্রিয়। রসুন-পেয়াজ-আলু দিয়ে, ঝালঝাল করে বেশ বানায় আমার মেয়েটা- বাঃ। তোদের কি ওই মাঠের ধারের ডোবাটায় পাতা ফেলেছিলি?

হ্যাঁ। ওটাই। কিঙ্কির গলার স্বর তেমনি নীচু।

ভুলাই বলে যেতে থাকে, ওঃ! বরাবরই দেখে আসছি, ওই ডোবাটায় গেঁড়ি-গুগলি প্রচুর ফলে। যতই খাও শেষ আর নাই। খানিক আগেই আমাদের সেই কথা হচ্ছিল না, শুভ?

শুভাশিস মাথা নাড়ল। বিষয়টা নিয়ে সে আগ্রহ দেখাল। বলল, কোন্ ডোবাটার কথা বলছ জেঠু?  

চৌদ্দবনের ওদিকে একটি ডোবা আছে। চৌদ্দবন হল ভুঁড়োশেলের(শিয়াল) আড়ত। গাব্দাগোব্দা ভুঁড়োশেল নাচে, খেঁকশেলের পিছে— তখন আমরা বলতুম। আগে সেখানে প্রচুর শেল ছিল। দিনমানেই ঘুরে বেড়াত শেলের দল। আর মাঠের মধ্যে একলা হয়ে পড়া ছাগলের বাচ্চা বা বুড়ো, মাদী ছাগলকে টেনে নিয়ে যেত। 

[ক্রমশ]

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *