দুষ্টু রাক্ষসের চিঠি – রেহান কৌশিক

শেয়ার করুন
কাঠগড়া ছিল না। ছিল না মাইনাস পাওয়ারের কাচে ঢাকা জজ সাহেবের চোখ। অথবা চ্যাপলিনের মতো গোঁফ-ওয়ালা উকিলদের রক্তাক্ত-করা-সওয়াল। আমাদের বিচ্ছেদ মুহূর্তে সাক্ষ্মী ছিল সরল সেগুনের বন। পাশে শীতকালের নদী। জলহীন চরে ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা নুড়ি ও পাথর। তুমি বলেছিলে, ‘শেষ।’ আমি বলেছিলাম, ‘বেশ তবে তাই হোক।’ তুমি বলেছিলে, ‘দরজা খুলে দাও, যাই…’ আমি বলেছিলাম, ‘ঘরে তো দরজা নেই। ভালোবাসার ঘরে কখনো দরজা হয় না,এটাই দস্তুর।’ চলে গেলে তুমি। চলে যাওয়ার পথ কী আশ্চর্য দ্রুততায় পিছনের দৃশ্য মুছে দিতে জানে! সেই থেকে দাঁড়িয়ে আছি। আসলে দাঁড়িয়ে কি থাকা যায়! যায় না। ধমনি-শিরায় বয়ে চলা রক্তের স্রোতে বওয়ার মতো ভেসে আছে সেই বিচ্ছেদ মুহূর্ত, বিষাদবয়ান। অনেকদিন পর জানালার পাশে একটা বিছানায় দেওয়া হলো আমাকে। হাতে সুঁচ ফোটানোর চ্যানেলটা খুলে দিয়ে গেল নাম-না-জানা নার্স। জানালা দিয়ে অনেকটা নীলচে রোদ্দুর এসে পড়েছে সাদা বিছানায় আর কী আশ্চর্যভাবে এঁকে তুলছে সমগ্র তোমাকে! আমি তো আবার সেই ফিরে যাচ্ছি টেবিল বাজিয়ে তুমুল গান-বাজনার দিনে। কীভাবে যেন বানভাসি হয়ে যাচ্ছে আমার বসত, আলগা হয়ে যাচ্ছে স্তব্ধতার শিকড়-বাকড়! কে যেন প্রাচীন তোরঙ্গ খুলে ছড়িয়ে দিচ্ছে মুগ্ধতার মায়াবি-মোহর! উড়ছে ঘরময় পুরনো চিঠিপত্রের দু-এক লাইন। অক্ষরের গায়ে সেই কবেকার ভিজে ওঠবার কথা, বৃষ্টিজল! তুমি কি এখনো এইসব গল্প থেকে ফিরিয়ে রেখেছ চোখ ? আমি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি সেই এক্সকারশন ট্যুর। সেই দিগন্তে হারানো প্রান্তর। সেই দিগন্তে হারানো প্রান্তর। প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা শিরীষ গাছ, শিরীষ গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতাদের ধুলোস্নান। আজও কি তোমার দেশে বৃষ্টি নামে? ধুয়ে যায় ধুলোবালি শব্দ আর শব্দহীনতায়? অনেকটা উঁচু থেকে তোমাকে দেখতে পাচ্ছি, জানো! অজস্র গ্রহ-নক্ষত্র জলবাতাসহীন ঝুলন্ত সমুদ্রদের আড়াল ডিঙিয়ে আমার চোখ তোমাকেই খুঁজে নেয় প্রতিদিন। বাদামী খরগোস পুষবে ব’লে কী ভয়ানক জেদে কাঠের ফালি দিয়ে ঘিরে ফেলেছ ঘাস-ঢাকা অনেকটা উঠোন আর জ্যোৎস্নার ভিতর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তোমার মুখ জুড়ে রুপোলি জলবিন্দু। জেদের সঙ্গে যৌনতার কি আঁতাত রয়েছে কোথাও! এমনই স্বেদবিন্দু দেখেছি তোমার শরীর থেকে আগুন নেভার পরে, কত কতদিন!
চিত্র : মৌমিতা ভট্টাচার্য
এখনো অ্যাশট্রে সাজিয়ে রেখেছ কেন! তোমার প্রেমিক তো আমার মতো স্মোক করে না! তবে আমার কি কিছু কিছু থেকে গেছে আজও ভ্রমবশত? যাও তিনি বসে আছেন কফির মগ নিয়ে। যাও কফি পান করো মুখোমুখি। গল্প করো জ্যান্ত টানাপোড়েনের। আচ্ছা এই যে আমি বাজিয়ে চলেছি মেঘের ম্যান্ডোলিন, শুনতে পাচ্ছো তুমি? পাচ্ছো না তো! জানি পাবে না। আমার কোনো সুরই শুনতে পাওনি কোনোদিন। ভেবেছিলাম ফিরবে একদিন, ভেবেছিলাম একদিন-না-একদিন টেনে নেবে অনন্ত-নিবিড়ে। এবারেও বসন্ত চলে গেল। অপেক্ষার মুহূর্তগুলো কী ভীষণ আগুনের দানা নিয়ে এক্কাদোক্কা খেলে— তুমি জানো! ভেবেছিলাম, যে-কটি মুহূর্ত মুখোমুখি হব, সেইসব স্পর্শকাল যেন সরল সন্ন্যাস হয়ে আবির ওড়ায় বসন্তের দিনে। কত আলোকবর্ষ দূরে আছ, একটাও এস.এম.এস সেন্ড হচ্ছে না! ফাঁকা ইনবক্স বুকে নিয়ে সাপ-লুডো খেলছি স্তব্ধতার ভিতর। আমার ঘুমন্ত হাওয়ায় খড়কুটো রাখে বিষাদের ঠোঁট। আশ্চর্য ওম মেখে জেগে থাকে সহজ সন্তাপ। এও তো আরেক পৃথিবী, হোক না স্বচ্ছ বেদনার মুখ! তবুও তো ঘর, এই গৃহস্থালি দিয়েছ আমাকে! আমার রক্তের গায়ে কবে যেন গেঁথেছিল শ্বাসের সুগন্ধ তোমার! উড়ছিল জ্যোৎস্নার ছাই অলৌকিক রাত্রির ভিতর! আজ না হয় আনন্দবাতাস হেঁটে যাক অন্যদের উঠোনে উঠোনে। ফুটুক সফেদ জুঁই অন্য কারো কাতর-করতলে। ডেকে নিক বসন্তের দিল ধ্রুপদে-ধামারে। আমাকে দিয়েছ অন্ধকার দেশ। শব্দহীন বিষাদের সন্ততি। আমি ভালো আছি। তুমি ভালো থেকো। হারমোনিয়ামে সুর তুলো চিহ্নহীন রক্তপাতের। ইতি– তোমার দুষ্টু রাক্ষস। এই নাম দিয়েছিলে তুমিই। কোনো এক মধ্যরাত্রির নির্জনে। মনে পড়ে?
শেয়ার করুন

Similar Posts

  • সম্পাদকীয় : কাশফুল সংখ্যা

    শহর জুড়ে তখন প্রস্তুতি চলছিল উৎসবের। আয়োজন শুরু হয়েছিল অবশ্য অনেক আগে থেকেই। গেল বছর প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে মোক্ষকামী জনতার দিকে ফিচেল হাসির সাথে অঞ্জলি অঞ্জলি গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিয়ে ছেলেটা যেই বলে উঠেছিল ‘আসছে বছর আবার হবে’ অথবা ঢাকির পাওনা চুকিয়ে ক্লাব সেক্রেটারি যখন বললেন ‘সামনের বছর চলে এসো ভাই দলবল নিয়ে’ তখন থেকেই আয়োজন শুরু। তারপর সময় রথের চাকা ঘুরতে ঘুরতে সারা হয় খুঁটিপুজো; মাটি লেপা হয় কাঠামোয়; বায়না দেওয়া হয় কুমোরপাড়ায়; প্রতিমার সাজ নিয়ে সান্ধ্য জটলা বসে।

  • চেনা শব্দ অচেনা শূন্য – রঞ্জন ভট্টাচার্য

    সকাল বেলায় আবার পা-টা মচকালো তবুও আমার ঘুমটা কেন ভাঙছে না একোন ছাত্রী যাকে তুমি প্রবোধ দাও সে-তো তোমার কোনো কথাই শুনছে না তোমার আকাশ ঈশ্বরময় সর্বদা প্রসাদ-টসাদ খাচ্ছো আবার ছড়াচ্ছো মাইক দিয়ে নামগান আর অত্যাচার বন্ধ পড়া পাশের বাড়ির ছোট্টোটার কেইবা তোমার ভক্তিবোধের হিসেব চায় এসব কথা বলতে নাইকো দুম করে প্রশ্ন করো কবিকে…

  • |

    এনিউমা এলিশের শেষ পৃষ্ঠা – বল্লরী সেন

    জিয়াভরলি নদী, দেবীসূক্ত॥ দ্বাদশ অধ্যায় ইতালীয় লেখক ও দার্শনিক জর্জো আগাম্বেন যখন সেই স্বর্গীয় উদ্যানের কথা লিখছেন, আমার ইজেলে পুব পাহাড়ের রোদ ফিরোজা হয়ে সৌরমণ্ডলের ফ্রেম ছিঁড়ে টুপ্ টাপ্ নামছে তেরচা হয়ে বৃষ্ণিবংশের চত্বরে, আমি শ্রুতিতে পাচ্ছি শ্রদ্ধা কামায়নীকে—ধারণ করছি রাত্রিসূক্ত। কুন্তীর হাতে কাটা মাংসের মতো সযত্ন টুকরো হয়ে হয়ে আমি বায়ু, অর্থ, শ্লেষ, রোমাঞ্চ,…

  • শাল্যদানীর লেখা

    সন্ধ্যেটা টুক করে নামছে। তোমার দেশেতো আবার সবসময় সন্ধ্যে। নন্দনকানন? তাও বুঝি আছে। তা যাই থাক আমার কাছে হেকেটি আছে, তোমার কাছে রবি নেই। কিরকম মজা! ধূলো জমা ট্রাঙ্কে হাত দি না, পাছে দাগ থেকে যায়। ওই চিহ্নেরই যত দোষ। যেমন সিঁদুরের চিহ্ন, যে চিহ্নে নাকি তোমরা বন্ধু থেকে বউ হয়ে যাও আর অন্যের জন্য…

  • মুসাফির বাঙালি – দময়ন্তী দাশগুপ্ত

    গরমের ছুটি এসেই পড়ল। আর অমনি আমবাঙালি ব্যাগপত্তর গুছিয়ে পাহাড়ে-সমুদ্রে যে যেদিকে পারে বেড়াতে বেরিয়ে পড়বে। যাঁদের নিতান্ত সে সুযোগ এ যাত্রা হল না, তাঁরা ছক কষবেন আগামী পুজোর জন্য। চারমাস আগেই টিকিট কেটে রাখতে হবে যে। এখন আর উঠাও গাঁটরি, চল মুসাফির বলার দিন নেই। এতসব হলেও, বাঙালির ভ্রমণের অভ্যেস কিন্তু খুব একটা পুরোনো…

  • গল্পকথা – আত্রেয়ী দাস

    এটা একসময়ের গল্পকথা। আমাদের চলমান জীবন থেকে সরে যাওয়া অনেক ঘটনাই আজ গল্পকথা হয়েই থেকে যাবে। তবে পক্ষে বিপক্ষের নানান তর্ক মূলত বাঙালির আড্ডায় থাকাটা এক পরম্পরা। গল্পগুলো শুধুই গল্প নয়। এই গল্পকথার হাত ধরেই সময়ের স্রোতে আধুনিকতার চাপে উবে যায় নানা জীবন-সংস্কৃতির গল্পকথা। আমরা যে মফস্বলের জীবনের ছোঁয়ায় নিজেদের বড় করে টিকিয়ে রেখেছি, সেখানে…

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *