/ / দর্পনে ক্যালিবান – প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী
|

দর্পনে ক্যালিবান – প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী

শেয়ার করুন

অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে
আমাদের পরে দেনা শোধবার ভার…

অতীতের গুরুভারে ইতিহাসের দায় বয়ে বেড়ানোর উত্তরকালের অনিবার্যতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার এই শব্দবন্ধ অনায়াসেই উচ্চারণ করা যেত, যদি মগজের অলিন্দে পাক না খেত অন্য কোনো ধাঁধা। ‘দাঙ্গা’ শব্দটার বুদ্ধিজীবী-মনীষায় সরলীকৃত একটা ব্যাখ্যা আছে — স্বার্থান্ধ গুটিকয়েক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল আপন আপন পার্থিব সিদ্ধির লক্ষ্যেই কিছু সমাজবিরোধীকে অর্থের বিনিময়ে কাজে লাগায়, লেলিয়ে দেয় বিভিন্ন সম্প্রদায় বা ধর্মের মানুষের জাত্যাভিমানে ঘা দিতে। বেঁধে যায় দাঙ্গা। বক্তব্যের সারবত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। কিন্তু সংশয়টা অন্যত্র। সংখ্যায় এমনতরো সমাজবিরোধীরা যেখানে মুষ্টিমেয়, সংখ্যাগরিষ্ট বিপুল জনগণকে তারা কোন মন্ত্রবলে সহজেই এমন জঙ্গীভাবনায় টগবগিয়ে ফুটিয়ে দিতে পারে! কী ভাবেই বা বিবেক-কান্ডজ্ঞানবর্জিত ভ্রাতৃঘাতী সংহারতান্ডবে মত্ত হয়ে ওঠে আপাত নিস্তরঙ্গ খেটে খাওয়ার দৈনন্দিন! তবে কি বহিরাগত খোঁচাটুকু বাদ দিয়েও যুক্তিমননহীন এই জঙ্গীপনার আগুনে ঘৃতাহুতির অন্য কোনো অন্তর্গত প্রেক্ষিত থেকেই যায় ? সবই তো আর শুরু করে না ভাড়াটে গুন্ডারা। তাহলে কোথায় উপ্ত থাকে এমন জিঘাংসার বীজ, যা নখদন্ডের বীভৎসায় দানব হয়ে ওঠে মুহূর্তেই, বা অনবরত ?
প্রশ্নগুলো কুঁড়ে খায় চেতনার রন্ধ্র। মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলপাঠ্য থেকেই ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ ভারতবর্ষের জাতীয় মাহাত্ম্য আত্মস্থ করার অন্যতম সূচক। কিন্তু ‘বিচিত্র’ শব্দটাও দ্বিমাত্রিক হয়ে উঠতেই পারে, এবং মাত্রাজ্ঞানের সমতা টলে গেলে তো দেখি, তা পরস্পর বিরোধিতায় অবতীর্ণ! ধর্ম, বহু বহু সম্প্রদায়, ভাষা, সংস্কৃতি, অঞ্চলভেদে ভিন্ন যাপন — ‘বিবিধের মাঝে… মিলন মহান’-এর দীক্ষায় উপকরণের পসরা এ দেশে পর্যাপ্ত, সন্দেহ নেই। আমরা স্নাত হই, স্লাঘা বোধ করি জাতিসত্তার এই বৈভবে, অথবা হয়তো আর্য আগমনের প্রাচীন থেকে অবিরত অনুপ্রবেশ ও মিলমিশের ঐতিহাসিক শিক্ষায়। কিন্তু সংশ্লেষিত রসায়নেও উপাদানের আপন আপন চরিত্র বা প্রকৃতি বজায় থেকেই গেলে সামান্য ভারসাম্যের অভাবই হয়ে উঠতে পারে সূত্রনির্দিষ্ট বিক্রিয়ার স্খলন। গবেষনাগারের যাবতীয় হিসেবনিকেশ গুলিয়ে দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে যাওয়া তখন মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। সমাজবিজ্ঞানও যেহেতু ‘বিশেষ ধরণের জ্ঞান’ই পদবাচ্য, তাই তেমন অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া থেকে তারও অব্যাহতি আশা করা নিরর্থক।
১৯৯২-এর অক্টোবর মাসে যখন অযোধ্যায় করসেবার হুজুগে সমস্ত দেশকে উত্তেজিত করে তোলা হচ্ছিল অতি সাম্প্রদায়িক এক উদগ্র উত্তেজনায়, এই শহর কলকাতার মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলের এক বস্তির জনৈক শ্রমিক মুসলমান (যাঁর জন্ম অযোধ্যারই অদূরে কোনো অঞ্চলে) বলেছিলেন — বাবরি মসজিদে তারা কোনোদিন নামাজ পড়েন নি। ঐ মসজিদ সংক্রান্ত বিষয়টা নিয়ে তাঁর নির্লিপ্তিও তিনি ঢেকে রাখার কোনোই চেষ্টা করেন নি। তবে বেড়ে ওঠার পরিপার্শ্বজনিত অভিজ্ঞতা বা বিশ্বাসে তাঁর অবশ্যই মনে হয়েছিল যে, যতই জীর্ণ হোক, তবু ঐ মসজিদ ভেঙে দেওয়াটা ন্যায়সঙ্গত হবে না কখনোই। প্রায় নিরক্ষর মানুষটির অর্জিত বোধে এই ভারসাম্য সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের বাধ্য করে ভাবতে, এমন যৌক্তিক মানসে ‘দাঙ্গা’ শব্দটার কোনো ঠাঁই-ই থাকতে পারে না। কিন্তু বিশ্বাস! সে তো অর্জিত অস্তিত্বের শিকড়ে। যখন সান্ধ্য অবসরে রেডিও-র সংবাদ বা প্রাতঃকালীন খবরের কাগজ মারফত তাঁর কাছে পৌঁছে যায় আক্রান্ত মসজিদের খবর, অন্তরের অন্তঃস্থলে তিনিও আক্রান্তবোধে স্বধর্মরক্ষায় খেটে খাওয়া কঠিন মুঠোয় অস্ত্র তুলে নিলে আমরা ভাবি বিকৃত গোলযোগ। কিন্তু ঐ মানুষটির হৃদয়ের অভ্যন্তরের নিভৃত আবেগের খবরটুকু রাখার প্রয়োজন বোধ করি না। ছিদ্রটুকুর সদ্ব্যবহার তো করবেই স্বার্থান্বেষীরা। আমরা ভাবি, দাঙ্গা মনুষ্যত্বের স্বল্পকালীন বিলোপ, আকস্মিক মনোবিকার। এ আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা। কারণ সংকটকালে আমরা লঘু চিন্তাজনিত অভ্যাসে মুসলমান বা হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের নিম্নবর্গীয় স্তরের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে কখনোই আগ্রহী হই না। সেক্ষেত্রে হঠকারিতার দায় কিন্তু দুতরফেই — অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিতের আবেগপ্রবণতায় এবং সমহারেই উচ্চশিক্ষিতের চটজলদি সিদ্ধান্তে দাঁড়ি টেনে দেওয়ায়। ‘তমস’ উপন্যাসে ভীষ্ম সাহানী লিখছেন — গুরুদ্বারে গান শুনে সমবেত শিখ নারীপুরুষের মনে হয়েছিল তারা যেন তিনশো বছর আগের যুগে ফিরে গেছে, যে যুগে ‘তুরুক’দের (মুসলমান) সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকেই যেন শিখ ইতিহাসের দীর্ঘ শিকলে একটি গ্রন্থি। মানসলোকে তারাও যেন পূর্বপুরুষদের সেই আত্মবলিদানের মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, ইতিহাস শুধু ঐক্যেরই নয়, শিরা-উপশিরায় ছুঁইয়ে দিয়ে যায় ঐতিহ্যেরও স্পন্দন। আত্মোৎসর্গের মহাযজ্ঞে আমরাও কি সামিল হয়ে যাই না! ১৯৮০-র ১৬ই আগস্টে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের সামান্য ফুটবল ম্যাচে, অথবা এ-পাড়ার মেয়েকে ও-পাড়ার ছেলে টিটকি্রি দিয়ে ফেললে! আর এ তো সময়ের গর্ভে লালিত ইতিহাস! আবেগে ধাক্কার প্রাবল্য নিশ্চিতই সেখানে অনুভূত ভূমিকম্পের মাত্রায়। অনুমেয়, ১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বর সকালে ট্যাংরা অঞ্চলের বস্তিতে কোনো মুসলমান যুবকের হৃদয়েও হয়তো জারিত হয়েছিল এমনই চেতনা। সে যখন হিন্দুকে মেরেছে, হিন্দুর দোকান লুঠ করেছে, তার মানসিকতায় তখন সক্রিয় থেকেছে সেই ‘প্রাক্‌পুরাণিক’ ঐতিহ্যপ্রসূত জেহাদের উত্তেজনা। অথবা হিন্দুযুবক যখন অন্যদিকে লাঠিছোরা নিয়ে প্রস্তুত, তার কাছেও তা তখন ধর্মের শত্রুর বিরুদ্ধেই প্রতিরোধের প্রস্তুতি। সংঘাত এরপর অনিবার্য, যখন বিবেক, ন্যায়নীতি ইত্যাদি ভারি ভারি শব্দগুলো উন্মত্ততার স্রোতে তলিয়ে গেছে! অমানুষিক এক উদগ্রতা তখন যেন গ্রাস করে নিয়েছে যাবতীয় চিন্তাশক্তি, যেখানে নিরীহের প্রাণনাশের হেতু একটাই — সে অন্য সম্প্রদায়, অন্য শিবিরের লোক! অসহিষ্ণুতার এই দীর্ঘপোষিত মূলোৎপাটনের দায় কার ওপর বর্তায় ? নিম্নবর্গীয় চিন্তামুক্তির সীমাবদ্ধতায়, না সুশীল সমাজের প্রগতিশীল উন্মুক্ত প্রান্তরে ? গভীরে তলিয়ে ভাবলে সময়ের দীর্ণতার ফোঁটা যে নিজেরই কপালে এঁকে দিয়ে যায় লজ্জাতিলক!
আসলে এই সংঘাত কী সততই বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক, ঠিক যেমনটি ভেবেছিল সমরেশ বসু-র ‘আদাব’ গল্পের শ্রমিকটি — ‘কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ কোত্থেকে বজ্রপাতের মতো নেমে এলো দাঙ্গা…’! দাঙ্গাকে ‘গুন্ডা-ছোটলোকদের খুনোখুনি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার মধ্যে মধ্যবিত্তের একধরণের আত্মপ্রসাদকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু কথাগুলো বলার আগে ইতিহাসটুকু অল্প ঘেঁটে দেখার অভ্যাস আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। ১৯৪৬-এর গোড়ার দিকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন — ‘একটা সিভিল ওয়ার ছাড়া হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান হবে না’। কেন এতদূর চরম জঙ্গিবাদী বা আক্রমণাত্মক মানসিকতা! হয়তো কারনটা এমনিই যে, ঐ বছরেই সাধারণ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই মুসলিম লিগের জনসমাবেশে মানুষের সংখ্যাধিক্য হিন্দু মধ্যবিত্ত মননে শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছিল। বঙ্গদেশে আধিপত্য বজায় রাখার প্রয়াসই যে এমন হিন্দুদের তরফে দাঙ্গায় প্রচ্ছন্ন মদত জাগানোর অনুঘটক — ইতিহাসই তথ্যগতভাবে তার সাক্ষী। আবার নব্বই দশকের গোড়ার কলকাতায় বস্তিবাসী বা প্রান্তিক মানুষদের বসবাস অঞ্চল পরিষ্কার করে কুচক্রী প্রোমোটারদের জমি জবরদখলই যে ধর্মের জিগির তুলে দুই সম্প্রদায়ে মারামারি বাঁধিয়ে দেওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য, এই স্বার্থান্বেষী চক্রান্ত আজ অন্তত আমাদের কাছে অনেক বেশি প্রকট। ময়দানে যুযুধান গরীব মুসলমান বা হিন্দু তো আসলে এদের ক্রীড়নক। রাজনীতির বা কায়েমি স্বার্থের রান্নাঘরের মশলা জাতীয় উপকরণ মাত্র!
আবার এমনটাও তো সমানভাবেই প্রাসঙ্গিক, ‘সাম্প্রদায়িক’ নামক বস্তুটি মোটেই কালনিরপেক্ষ নয়। শিকড়ে প্রোথিত ঐতিহ্যের আবেগে কখনো কখনো তা মানসিক ভ্রান্তির দিকেই হয়তো বা টেনে নিয়ে যায়! কারণ, প্রকৃত শিক্ষার অভাবই যুক্তিবোধের দৈন্যে ক্রমাগত ঠেলে দেয়। ময়দানের ফুটবল খেলায় দু-দলের সমর্থকদের মধ্যে মারপিট হলে যদি প্রতিপক্ষ হয় ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, তবে বিষয়টা আমাদের সাধারণ ধারণায় ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’-এর সীমালঙ্ঘনের পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রতিপক্ষ ইস্টবেঙ্গল-মহামেডান স্পোর্টিং বা মোহনবাগান-মহামেডান স্পোর্টিং হলে! আমরা কেমন যেন বোধবুদ্ধিরহিত আবেগে এর ওপর দাঙ্গার তকমা এঁটে দিই! আবার ধরা যাক, অফিসটাইমের ভিড় বাসে কোনো পকেটমার ধরা পড়ে গেলো। বেচারি তস্করের নাম যদি হয় মধুসূদন, তবে সমবেত জনতা সিদ্ধান্তে আসেন — ‘ব্যাটা পকেটমার। পুলিশে দিয়ে দিন’। অথচ দুর্ভাগ্যবশত যদি তার নাম হয় ফৈয়জ, তবে উৎসাহী মারমুখো যাত্রীরা হেঁকে ওঠেন — ‘মার মার, ব্যাটা মুসলমান’! একই পাপে দুই দন্ড, মাঝে শুভচিন্তাগুলোকে গুলিয়ে দিচ্ছে শুধুই নামের ভেদ! এই দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া, বোধ করি, বাইরের অঘটনে নয়, আমাদের অন্তর্বর্তী স্তরের ভারসাম্যের অভাবেই ফাঁক পেয়ে বেরিয়ে আসে। কায়েমি স্বার্থবাদী বা রাজনীতির দালালরা মানুষের মনের এই সুপ্ত দৈত্যটাকেই ব্যবহার করেন কৌশলে, নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থ সিদ্ধির তীব্র বাসনায়। সুতরাং খেলার পুতুল শুধু অশিক্ষিত দরিদ্ররাই নন, পুঁথিগত শিক্ষার অহঙ্কারে তৃপ্ত মধ্যবিত্তও তো যখন তখন এই চক্রান্তের জালে জড়িয়ে পড়তেই পারেন। পরিণাম সর্বদাই ভয়ঙ্কর —

পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার
ভাই আমি; আমাকে সে কনিষ্ঠের মতো জেনে তবু
হৃদয়ে কঠিন হয়ে বধ করে গেল, আমি রক্তাক্ত নদীর
কল্লোলের কাছে শুয়ে অগ্রজ প্রতিম বিমূঢ়কে বধ করে ঘুমাতেছি…

(জীবনানন্দ দাশ)

মনে পড়ে যাচ্ছে, খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত ‘কিশোর কিশোরী’ পত্রিকায় ১৯৪৮-এ প্রকাশিত তেরো বছরের বালক, আজকের প্রয়াত কথাসাহিত্যিক অমলেন্দু চক্রবর্তী-র একটি অপরিণত গল্প — ‘ইতিহাস’, যার প্রেক্ষিত সাহিত্যগুণে নয়, ৪৬’-এর দাঙ্গার প্রত্যক্ষে অবচেতন প্রতিক্রিয়ায়। সামান্যই গল্প, যার নায়ক দুই বন্ধু হামিদ আর বিজয়। ধর্মতলার পথের ধারে পাশাপাশি বসে জুতো পালিশ করে। কোনো ফেরিওয়ালার কাছ থেকে ওরা শখ করে কেনে গান্ধিজির ছবিওয়ালা দুটি ব্যাজ। কিন্তু কিছুদিন পর বিজয় নিজের ব্যাজটা হারিয়ে ফেললে বন্ধু হামিদ তাকে আর একটা ঐ একই ধরণের ব্যাজ কিনে দিতে চায়। ঘটনাচক্রে সেদিন সেই ফেরিওয়ালার কাছে ছিল শুধু জিন্নার ছবি দেওয়া ব্যাজ। গান্ধি বা জিন্না নয়, কিশোরদুটি চিনতো শুধুই রঙের আকর্ষণ। বিজয় সেই ব্যাজই ঝু্লিয়ে নেয় বুকে। এমনকী রঙের আতিশয্যে গান্ধির থেকেও জিন্না বিজয়ের কাছে অনেক বেশি সুন্দর বলেই মনে হয়। অতঃপর গতানুগতিক দৈনন্দিনে হামিদের বুকে গান্ধি আর বিজয়ের বুকে জিন্না। মাঝের বৈষম্যটুকুর খোঁজখবর ওদের সরল ভাবনায় ছিল না। কিন্তু সময় বড় নির্মম। এলো ১৬ই আগস্ট, ১৯৪৬। মহানগরীর পথঘাট এক অজ্ঞাত ভয়ের আশঙ্কার নিথর, নিস্তব্ধ। মেছুয়াবাজারের হামিদ আর বড়বাজারের বিজয় রোজকার মতো হ্যারিসন রোডে এসে নির্ভয়েই একসাথে গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন, ইট-পাটকেল-সোডাবোতল-ছুরি-লাঠি নিয়ে একগাদা মানুষের মারমুখী মিছিল। ছিটকে যায় দুজনে। হামিদ ছোটে, যেদিকে স্বজাতি মুসলমানদের জমায়েত। বিজয় উল্টোদিকে। হামিদের কন্ঠে গান্ধি, বিজয়ের গলায় জিন্না! হিংস্র নেকড়েরা দুতরফেই ঘিরে ধরে ওদের। নিমেষেই হিন্দুদের হাতে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত জিন্নার ছবি বয়ে বেড়ানো বিজয়, আর মুসলমানদের হাতে একবুক রঙিন গান্ধি নিয়ে আশ্রয়প্রার্থী হামিদ। যখন রক্তাপ্লুত দুজনেই নিজেদের নামটুকু গোঙিয়ে বলে, ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। দেখা হয়েছিল অবশ্য দুজনের আবার। পুলিশের অ্যাম্বুলেন্সে। পাশাপাশি শুয়ে জড়িয়েও ধরেছিল ওরা দুজন দুই বন্ধুকে। কিন্তু হাসপাতালে নামলো দুটি নিথর দেহ। তুচ্ছ এই গল্পটুকুর উল্লেখ আসলে ঐ বোধবুদ্ধিচেতনারহিত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে উন্মাদ আগ্রাসনের অনুষঙ্গে। কে মারছে, কাকে মারছে, কেন মারছে — তেমন হিসেবনিকেশ কিছুই অগ্রাধিকার পায় না যেখানে! শুধুই থাকে নখদন্তের উদগ্র আস্ফালন!

সুতরাং এটুকুই বলার, কোনোরকম প্রার্থনা বা সর্বাংশে পুঁথিনির্ভর শুভচিন্তা দাঙ্গাকে প্রতিরোধ করতে পারে না। মৈত্রীর বাণী বা শান্তি মিছিলের পোষাকি শ্লোগানেরও তেমন কার্যকরী হয়ে ওঠা এক্ষেত্রে নিশ্চিতই দুষ্কর। যে নির্বিবেক রাজনীতির উস্কানি মানুষের স্পর্শকাতর সাম্প্রদায়িক অন্তর্ভাগকে অনায়াসেই উত্তেজিত করে তোলে, দাঙ্গাকে তার চেতনায় অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসাবে মূর্ত করে তোলে, সেই রাজনীতির চক্রান্তকে বা ভেদবুদ্ধিকে সনাক্ত করাই দীর্ঘকালীন সমাধানের একমাত্র পথ। প্রয়োজন সেই ‘মিথ’ বা অতিকথনটাকে ভাঙা, যার অবলম্বনে দাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই প্রতিরোধের শক্তিই হতে পারে ‘বিভেদের মাঝে’ মহান মিলনের একমাত্র কান্ডারি। ইতিহাসলব্ধ দীক্ষায় বরং আজ সমবেত স্বরে গেয়ে ওঠাই হোক সময়ের আর্তি —

…বুকেতে বুকেতে সেতু অন্তরের মায়া ঘিরে বাঁধি রে
কুটিলের বাধা যত ঘৃণার নিষ্ঠুরাঘাতে ভাঙি রে
সাম্যের স্বদেশ ভূমি গড়ার শপথ দিয়ে বাঁধি রে
হেঁইয়ো হোই মারো জোর বাঁধি, সেতু বাঁধি রে…
ও মোদের দেশবাসী রে…

(সলিল চৌধুরী)
শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.