/ / ডাহুকের আড়ালে – বনমালী মাল

ডাহুকের আড়ালে – বনমালী মাল

শেয়ার করুন

                             

হরির হাঁপানি আছে। মারণ হাঁপানি। রাত্রির মাঝ প্রহর পেরিয়ে যাওয়ার পর পরই হরি ঘরের পেছন দিকে একটা ত্রিপল ঘেরা বাঁশের পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করে। প্রায় দিনই করে। পা গুণে গুণে বড়ো জোর দশ থেকে বারো পা। আবার বিছানায় এসে ওঠে। মাত্র এই কটা পায়ের চলাতেই সে হাঁপিয়ে একাকার। হাঁ করে বড়ো বড়ো শ্বাস নেয়। নাকের নরম পাতাগুলো ফুলে ফুলে যায়। চোখে কিছুক্ষণ অন্ধকার দেখে। তারপর কান না পাতলেও শব্দটা এসে বসে বসে চিটে যায় তার কানে। তারপর শুরু হয় অসহ্য অতন্দ্র সময়। ভাগশেষের রাত জুড়ে ডাহুক ডাহুক আর চাপ চাপ অন্ধকার। হরির কাছে এ এক নৈমিত্তিক ব্যাপার।

এক জীবনে হরি কম কিছু দেখেনি! রাস্তামুখা পশ্চিমা ঘরটার দুয়ারে বসে বসে এতদিন জোট দেখেছে। বাম দেখেছে। ডানও। ভরা বর্ষার গলা জলে নেতাদের নৌকার চাল দেখেছে। চড়ায় ঠেকে দুলে উঠতে দেখেছে তাদের পাছা। তারপর সবকিছু নিয়মে নিয়মে। কত রকমের মানুষের শ্বাস-দীর্ঘশ্বাস মুখস্থ করতে করতে হরি নিজে এখন হাঁপানির বয়স ছুঁয়ে ফেলল। জগৎ সংসারের নাড়ির গতি এখন তার কাছে কত মসৃণ। 

পূর্বদিকের দন জমি, আরো পূর্বে গৌরাদের কাঠা তিনেক গাঁদা ফুল তারও পরে ঘরপুকুর। সেই পুকুরের পাড়ে পাড়ে ডাহুক। বয়স বাড়তে বাড়তে মানুষ যখন কমে যায়, তখন দিন দুপুর বিকেল হরি ডাহুক দেখেই কাটায়। এক দুই তিন—অসংখ্য ডাহুক। 

মাঘ মাসের একটা রাতে হরি ডাহুকের ডাকের মাঝখানে খুব মৃদু একটা ঘ্যাঁসর ঘ্যাঁসর শব্দ শুনতে পায়। 

বউকে ডাকবে?

নাহ্, বউকে কেন ডাকতে হবে! 

ডাকা উচিতও নয়। এমনিতে হরির বউ হরির থেকেও বেশি রুগি। এত বছর একসাথে শীত কাটাতে কাটাতে যখন গোধূলি বেলায় এসেছে তখন দুজন দুজনের প্রতি যেন আরও একটু সদয় হয়ে গেছে। বিশেষ করে এই শীতের প্রতিটা সময় তাদের দুজনকেই খুব সাবধানে থাকতে হয়। কারণ হরি জানে, সব মৃত্যুই শীতল।

শব্দটা আরও একবার কানে আসে তার। কান সওয়া শব্দ হলে হরি বুঝতে পারত। কিন্তু এটা তেমন নয়। শব্দটা আসছে বাড়ির পশ্চিম দিকের পাকা রাস্তার ওই পার থেকে। এতক্ষণে পেচ্ছাব করে হেঁটে আসার চিহ্নটা হরির মন আর শরীর থেকে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। বিছানা থেকে পা বাড়ায় সে।

ঠান্ডা লাগানো বারণ, তবুও জুতো পায়ে দিল না সে। দুয়ারে বেরিয়ে পশ্চিমের জানালায় কুয়াশা ঢাকা দেওয়া পলিথিনটা সরিয়ে চোখ রাখল। শব্দটা আরও স্পষ্ট।  

হরির ঘরে হরি আর তার বউ ছাড়া কেউ নেই।

বউ জোয়ান নয়।

কাঁচা টাকা-পয়সা গয়না তেমন কিছু নেই যে চুরি যাওয়ার ভয় আছে। অতএব হরির দরজা খুলে বাইরে যেতে ভয়ের কিছু নেই। এরকম অনেকবারই হয়েছে যখন হরিকে ঘন রাত্রে রাস্তার দিকে বাইরে বেরোতে হয়েছে। আর আশ্চর্যের বিষয় প্রতিবারই হরি গয়না টাকা বউ নিয়ে একদফা ভাবে তারপর শেষটায় দরজা খুলে বাইরে যায়। 

হনুমান টুপিটা মাথায় দিয়ে একটা টর্চ হাতে হরিও অন্ধকারে মিশে গেল। যতক্ষণ না হাতের টর্চটা জ্বলে উঠল, ততক্ষণ অন্ধকারের হাতে হরি একা একটা নিষ্কণ্টক শিকার হয়েই ছিল। হাঁপানিটা একটু একটু শুরু হয়েছে অথচ সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই হরির। রাস্তাটার দুদিক না দেখেই পেরিয়ে যায় সে। সন্দিগ্ধ শব্দের কাছে গিয়ে টর্চ জ্বেলে দেখল চার জন লোক। তার পরিচিত। অন্ধকারে সবাইকে একইরকম দেখাচ্ছে যদিও। দুজন লোক পা মিলে একে অপরের মুখোমুখি তাকিয়ে আছে। তাদের দুজনের মাঝখানে একটা মোটা সরেস শিশু গাছ। তাদের হাতে ধরা আছে চেরাই করাত। বাকি দুজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক চোখ চারাচ্ছে। তারা হরিকে ঘর থেকে বেরোতে দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু আমল দেয়নি। একটা বয়স্ক লোককে বোঝানো খুব একটা বেগের হবে না মনে করে নিজেদের কাজ নিজেরা চালিয়ে যাচ্ছিল। আর তাছাড়া হরিকে তারা চেনে। শিক্ষিত লোক হলেও একটু লোভ তার আছে বৈকি। যদি খুব বেগড়বাই করে তবে সামান্য কিছু ধরিয়ে দেওয়া যাবে। 

হরি দেখে, শিশু গাছটা কাটা চলছে। সরকারি গাছ। অঞ্চলের তত্ত্বাবধানে প্রত্যেক রাস্তার ধারেই চারাগাছ লাগানো হয়েছিল, লাগানো হয়। সেই গাছ বড়ো হলে অঞ্চল অফিস লেবার দিয়ে কাটিয়ে নেয়। আবার সেই জায়গায় নতুন নতুন গাছ। 

স্থানীয় কিছু লোকজন যারা বর্তমান শাসক দলের হয়েই গলা ফাটায়, তারা নিশ্চই সাট গাঁট বেঁধেই এই চুরি করছে। হরি প্রথমে দেখে অবাক হয়, একটু মুচকি হাসে, চারদিকে তাকায়। চোখ যতখানি অন্ধকার সহ্য করতে পারে, এই বয়সে সেই চোখগুলো কুঁচকে দেখে নিচ্ছে সে। ব্যানা ঘাসগুলো যেখানে লম্বা আর ধারালো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তারই উপর চাঁড় করা আছে কতগুলো গাছের গুঁড়ি। কাল সকালের ভারী আলো আসার আগে ব্যানা ঘাসগুলো আবার কীভাবে একটু ধেপে থাকার চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে, বেশ বুঝতে পারছে হরি। কিছু সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর সে বুঝতে পারে, ঘন চাক চাক কুয়াশা তাকে জাপটে ধরছে। 

—শিশু গাছটা কতদিনের! ভালো সারছে মনে হয়…

যার দিকে মুখ করে হরি কথাটা বলল, সেই বরুণ একটু বিরক্তই হল বলে মনে হয়। তার বিরক্তির কারণটাও সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল হরি। তাই কথাগুলোর শেষের দিকটা হঠাৎ করে যেন ক্ষয়ে এল মনে হয়। আর কেউ শুনতে পেতে পারে। 

রাত যে এত বেশি শব্দ খায় না! কেবল ডাহুকের শব্দ ছাড়া! 

হরি এখন থেকে তার শব্দগ্রাম বিষয়ে যে সচেতন থাকবে, সেটা তার হাঁফ রুখে নেওয়ার চেষ্টা দেখেই বোঝা যায়। 

বরুণ প্রথমে বিরক্ত হয়েছিল, আরও বিরক্ত হয়েছিল হরির অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা নিয়ে, কিন্তু সে যথেষ্ট চতুর। তা নাহলে এতগুলো গুঁড়ি সে লাট দিতে পারত না। দিনের পর দিন এত কালো মাখার পরেও লোকের কাছ থেকে সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পারত না। বরুণ চালাক। বরুণ ধূর্ত। শুধু হরি না বুঝলেও হবে, অন্য সব্বাই বোঝে। আর তাছাড়া বরুণ এখন গ্রাম চালায়। বরুণের কথা শুনে অঞ্চল প্রধান নানা পরিকল্পনা পাশ করে। অথচ এমন একটা সময়ে বরুণকে একটু লজ্জা বা একটু ভয় পেতেই হয়, পাওয়া উচিত তো… হরির প্রশ্নের উত্তর দেওয়া উচিৎ, হরিকে এই মুহূর্তে কোনোভাবেই অবহেলা করা যায় না বুঝেই বরুণ গুঁড়িগুলো লাট দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে হরির জিজ্ঞাসাগুলোর ছোটো মৃদু উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। আর বাকি তিনজন এমনভাবে কথা বলছে এমনকি সেই কথার ফিসফিস শব্দ ছাড়া কোনো অর্থ হরির কাছ অব্দি আসছে না। 

হরির আর দাঁড়িয়ে থাকা মানায় না। এখুনি মোটা ঘাসের চাদরের উপর শিশু গাছটা শুয়ে যাবে। তারপর আরেকটা গাছ। ওই যে একটু দূরেই একটা সরেস আকাশমণি দাঁড়িয়ে আছে ভূতের মতো। তার পালা হয়তো এর পরেই। এমন কত কী দেখেছে হরি। এই বয়সে এসে আর কিছু না দেখলেও চলে। যদিও কাঁচা বয়স বা পরিণত বয়সেও হরি এসব কিছুকে তেমন আমল দেয়নি। একটা হাতকাটা আকারের সময় চোখে চোখে ঈশারা ক’রে নিজে থেকে প্রত্যেক মানুষকে থামতে বলে। আদেশ দেয় সবকিছু গুটিয়ে নেওয়ার। হরি এটা মানে। আর তাছাড়া এ আর এমন কী! তেমন কিছুই না। 

—অঞ্চলের গাছ, সরকারের জিনিস। চুরি যাচ্ছে ত মোর কী?        

রাস্তা পেরিয়ে ঘরের দিকে হাঁটে সে। নিজের হাঁপানিটা একটু একটু করে আবার টের পায়। ঘরে ঢোকে। বিছানায় ওঠে।

“শংকরার ঘরের মুরগিগুলা বাকি রাতটা আর ঘুমাতে দিবেনি…”

স্বগতকথনে হরির বউ একটু পাশ মাড়ে। 

সকালে উঠে হরি রাস্তার দিকে বেরোতেই প্রথমটা হকচকিয়ে যায়। ফাঁকা ফাঁকা লাগে তার। পূর্বের শীতের রোদ কোনো বাধা ছাড়াই অবাধ বয়ে চলে যাচ্ছে যেন। ভোর রাতে একটা টানা ঘুম হয়ে যাওয়ার জন্য ঘটনাটা তার মনে ছিল না। ব্যানাগাছগুলো একটু ধেপে আছে, তেমন ধারালো নেই তাদের গা। সদ্য কেটে নেওয়া গাছগুলোর পড়ে থাকা নাড়ি এখনও টাটকা। রাস্তায় যেতে আসতে লোকজন কেউ দাঁড়ায় বা কেউ না থেমেই গাছেদের কথা জানতে চায়। প্রথম কয়েকটা উত্তরে হরি কথা বলে। জানান দেয় যে সে জানে না। বুঝতে পারেনি, কে কখন কী করে গেছে।

—এমন এমন সময়ে বৃষ্টি হল, আলু চাষের অবস্থা একদম শেষ। এখন কি কটা বস্তা আলু তুলে লিবো নাকি বলত?

গাছ নিয়ে একজনের জিজ্ঞাসার উত্তরে হরি ‘কে জানে!’, ‘কী জানি!’ রকমের একটা ঠোঁট মুখ বাঁকায়, তারপরেই আলুর কথা জানতে চায়। 

মাথায় যেকটা চুল আছে, হাত দিয়ে সামনে থেকে পেছনের দিকে নিয়ে যায় হরি। আরো কিছু সময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পূর্বে মুখ করে শীতের রোদ সেঁকে। এবার ঘরে ঢুকবে। কয়েকটা ছেলে পড়তে আসে। তাদের পড়াবে। পড়াতে বসে সকালে দিয়ে যাওয়া পেপারের পাতায় পাতায় চোখ বোলাবে আর প্রতিদিনের মতো ওই কাগজটাকে সে গুছিয়ে রাখবে আগের পেপারগুলোর সঙ্গে। এক হাতে তুলে দেখে নেবে সেগুলোর সম্ভাব্য ওজনটাও। 

গাছগুলোর কৌতূহল নিয়ে আর কেউ ডাকলে হরি বাইরে যেত না কিন্তু এবার হরিকে ডাকতে এসেছে গ্রামেরই একজন। সন্ধ্যায় মিটিং আছে। জরুরি। হরি বুঝতে পারে, ওই গাছগুলো তাদের গ্রামের মৌজাতেই ছিল, হোক না সে গাছ অঞ্চলের—সরকারের তবুও গ্রামের তো একটা নজরদারির দায়িত্ব আছে, সুতরাং গ্রামের মিটিং যে গাছগুলোর অকস্মাৎ গায়েব হয়ে যাওয়া নিয়েই, বেশ বুঝতে পারে হরি। 

হরি যাবে। অবশ্যই যাবে মিটিংয়ে। আর মিটিংয়ে গিয়ে কী বলবে, সেটাও সে জানে। 

রাস্তা দিয়ে একটু উত্তরে হেঁটে দেশের মন্দিরের দিকে যেতে হলে বামদিকে বাঁকতে হয়। মন্দির লাগোয়া আটচালা। গ্রামের সালিশি হয়, শীতলা পুজোর ভোগ খাওয়ানো হয়। 

শীতকালের সন্ধ্যা আর হাঁপানি মিলে হরিকে একটু তাগাদা দিয়েছে। গোটা গ্রাম তখনও জোটেনি। আর জুটবে বলেও মনে হয় না। একটা লো পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। আলোটা যেখানে খুব দুর্বল, হরি সেখানে গিয়ে বসল। গ্রামের একজন, পার্টির একজন হিসেবে বরুণও এসেছে। বসেছে একগাদা হলুদ আলো মুখে নিয়ে। তার মুখোমুখি বসে আছে ভরত আর সাধন। যখন যে পার্টিই থাকুক, গ্রামের তরফ থেকে এই দুজন মানুষ সবসময় থাকে। গ্রামের কোনো ব্যাপারে এরা দুজন আগে তারপর পার্টি বা লোকাল কমিটি। কানে কানে ভরতের কাছে কথাটা এসেছে। অঞ্চল এই গাছ লাগালেও, যা দিনকাল পড়েছে, তাতে করে অঞ্চল হয়তো গ্রামকেই দোষ দিতে পারে যে, দিনে দুপুরে এতগুলো গাছ কোথায় চলে গেল! গ্রামের সায় না থাকলে এমন একটা কাজ ত আর নিমেষের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে হয়ে যায়নি! 

এরকম দোষ পাওয়ার কথা মনে মনে ভাবে ভরত। যারা এতদিন ধরে গ্রামের ভালো-মন্দ দেখে আসছে, তাদের ভাবতে হয়। সাধনকে জানানো হয়। 

আটচালার দালানটা মাটি থেকে হাতখানেক উঁচু। পাকা বাঁধানো। কেউ বাবু হয়ে বসেছে। কেউ হাঁটু দুটো মুড়ে তার মাঝে মুখটা গুঁজে। গাছেদের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে সবাই সত্যিকারের চিন্তা প্রকাশ করল। কেউ কেউ অবাক হয়ে কথার উপর কথা চাপাল। হরি চুপ করে বসে থাকবে না। সে জানে তাকে ঠিক কী কী বলতে হবে। সবার মতো সেও কাটা যাওয়া গাছগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আলোমুখ নিয়ে বরুণকে সবথেকে বেশি উত্তেজিত হতে দেখা যায়। 

—এখন অঞ্চলের কাছে কোন্ মুখে গিয়ে আমরা দাঁড়াবো?

বরুণের স্বরে বিরক্তি আর দায়িত্ব।

হরি অন্ধকার থেকে একবার বরুণের দিকে তাকায়। ভোর রাতের কথাটা তার মনে পড়ে যায় কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে ওই দৃশ্য দেখার পর একটা গাঢ় ঘুম নিয়েছে সে। এই ঘুমটাই হয়তো কাল হয়েছে তার! ঘুমটা না ধরলে হয়তো পুরো ব্যাপারটা তার কাছে এখনও পরিষ্কার থাকত! 

সত্যিই কি এই একটা ঘুমের জন্যই হরির কাছে পুরো ব্যাপারটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে!

নাকি বিবেকের কাছে ঘুমের নামে একটা অজুহাত চাইছে হরি!

না, তা কেন? হরি শিক্ষিত।

আসলে বয়সের কারণে দুটো গাঢ় ঘুমের মাঝের ঘটনাকে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে তার। আর তাছাড়া এরকম তো কতকিছু ঘটে থাকে। এসব সামান্য ব্যাপার নিয়ে এত মাথা ঘামানোর কিছু নেই।

হরি শিক্ষিত গ্র্যাজু়েয়েট। ছেলে পড়ায়। শুধু ঘরের সামনের স্কুলে পায়নি বলেই একসময় চাকরিটা নেয়নি সে। নাহলে সে আজ আরও গণ্য মান্য হত। হরিকে সন্দেহ করে না কেউ। সন্দেহ করা যায় না। তবুও হরিকে জিজ্ঞাসা করলে কিছু হয়তো পাওয়া যেতে পারে। আসলে ঘটনাটা ঘটেছে তার নাকের সামনেই। সাধন হরিকে খোঁজে। অন্ধকার থেকে হরি সাড়া দেয়। গাছ সম্পর্কে ভরতের কোনো প্রশ্নের আগেই হরি বলে—

আমিও অবাক হয়ে যাচ্ছি। এরকম দিনকাল এল শেষে! আমি কিছু শুনতেউ পাইনি গো…

নিমেষের মধ্যে সারা সভা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। গুনগুন শব্দ হয়। যে শব্দের মধ্যে নানাবিধ প্রসঙ্গ মিশে আছে।

গাছের হদিস পাওয়া আর সম্ভব নয় ভেবে অন্ধকার থেকে একটা গলা বলে ওঠে—

“যা হছে হছে, কী আর করা যাবে…”

হরি তাকে সায় দেয়। কোনো অনুশোচনা কোনো জেগে থাকার উত্তাপ তাকে স্পর্শ করছে না। অন্ধকার মুখ নুইয়ে হরি কী যেন সব ভেবে যাচ্ছে।

সভার সমাপ্তি ঘোষণার আগে যেটুকু সময় পায়, হরি প্রভাসকে জিজ্ঞাসা করে,

“ভালো ছিয়াশি ব্যানধান কার আছে বল দিখি কাকা? এই সিজিনে কব্বর ডাঙার কাছের দশ কাঠা রুইবো ভাবতিছি…”

মিটিং শেষ করে হরি ঘরের দিকে হাঁটে। সারাটা রাস্তা ডাহুকের শব্দে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার খেয়াল হল এই জীবনেই ডাহুকের সংসার মুখস্থ হয়ে গেছে তার! প্রতি ডাহুকের গলায় গলায় সাদা ছোপ যেন গোটা গায়ের অন্ধকারকে আড়াল করার জন্য! সে বুঝে গেছে, কেবল দুপুর আর রাতে মানুষ ঘুমিয়ে পড়া নির্জনতায় তারা কেন ডাকে!

গাছেদের অতীতের কাছাকাছি আসতেই তার মনে হল, হাঁপানিটা যেন বাড়ছে!

—আজকে রাতেউ ই মোকে ভুগাবে…

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.