/ / চতুর্দশী—শাশ্বতী সরকার

চতুর্দশী—শাশ্বতী সরকার

শেয়ার করুন


মনোবাসিনীর ঘুম

ঘুম ভেঙে যায়। তখন সকাল। ঘুমন্তের বিকারগ্রস্ততায় ছেয়ে আছে শরীর, আমার মন। পাশে মায়ের ঘুমিয়ে থাকা দেহ, নিজঝুম উষ্ণতা এসে আশ্বস্ত করে। বারান্দা থেকে পড়তে আসা ছেলেমেয়েদের কথাবার্তা সাংকেতিক, জটিল, দুর্বোধ্য। অতএব, লেপ থেকে ধীরে ধীরে ভ্রান্তিময় জেগে ওঠা শুরু হয়, সকালের। তখনই, চটি খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করি এঁটোকাঁটা। জলের বোতল, অর্ধেক তরলতা। জানি, এরকম কিছু হতে পারে না। এক আশ্চর্য ধাক্কায়, মনোবাসিনীর ঘুম ভেঙে পড়ে। মেঘ সরে যায়। অল্প কিছু রোদ আমাকে বোঝায়, আমি বাড়ি নেই, সাতমাস। মা আরও আগেই গেছেন অন্যদেশ, অন্য কোনো কাজে।

মায়ের কাঁথার তাপে চুপিসারে শুই
ও দেখি, তারা ঝরে গেলে
অন্য কোনো তারা এসে সেইস্থানে ফোটে
ভাবি—আবার ট্রেনের শব্দে একদিন ঘুম ভেঙে যাবে…

কিছুদূর খেলতে এসে আমি কি ভুলে গেছি সব? ক্রমাগত অন্ধকার। গানের মতন অন্ধকারে আমার জন্য তবে বৃষ্টি এনো। আজ, পুরনো এই অন্ধকার কার মুখের মতো মনে হয়! যার মুখ ঢাকা। চতুর্দোলার নীচে ঢিমে আঁচে এখন জ্বলে আগুন। পাতা সরে যায়। তাকে যেই হাত বাড়িয়ে ছুঁতে যাওয়া, শাদা কয়েক টুকরো হাড়।
জলের ভিতর আছে আরও জল।
অমানিশার মধ্যে—সেইসব, সেইসব—

মৃত্যু জীবনের মতো অবসন্ন নয়। তার আরও বেশি অলৌকিক ব্যস্ততা আছে। তার কোনো তিথি নেই। চটিটা গলিয়ে নিই। পাখিদের ঘুম দুলে ওঠে। জড়ানো গলায় দিনের প্রথম ফেরিওলা হাঁক দেয়, সুপুরি, বাদাম, বাসন নেবে গো! মাছটার কাঁটাগুলো পড়ে আছে, বেড়ালের পেটে যাবে। আমরা যাব খনিব্যস্ততায়, পুঁথি পড়বার দিকে, যেখানে মানুষ নেই, জোঁকসমৃদ্ধ, নায়কোচিত সব শালগাছ আছে। বিরাট স্যানিটোরিয়াম, সেইখানে দেখা হবে শবরীর সাথে।

কতকাল কেটে গেল বিরহ অধীন
কেবল জলের দিকে চেয়ে থাকি
কিছু পুণ্যফল—তোমাকে চাওয়ার
ওই দূর ফড়িংয়ের দেহ থেকে
বিচ্ছুরিত আলো, সে-ও জানে

মহর্ষির ঘর, সরযূ নদীর তীর, কালো

তুমি এসে দাঁড়াও পাথরে। তুমি এসে দাঁড়াও পাথরে। কে আসে? দরজা আলো করে দাঁড়ায়। দেখি মুখ অন্ধকারে, দেখি মুখদেশ? ভিতরে জেগে ওঠে রাসমঞ্চ। মিলন। আকস্মিক ধুলোট। শাদা বাতাসা একবার ঊর্ধ্বে উঠে ছত্রাখান হয়ে ভেঙে, লুটিয়ে পড়ে। ক্রমান্বয়ে বৃক্ষশাখে কাক ডাকে। আজ পূর্ণচন্দ্র, আচমকা।

হাওয়া কোনদিক হতে আসে, জানা যায় না। আসে দক্ষিণদিকের হাওয়া। বাঁশবনে এক হাওয়া থাকে, সন্দেহজনক। মৃদু হাওয়ায় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হাওয়া দিচ্ছে, তাই তো গরমকাল এত ভালো লাগে। সে আসবে, জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে রাখা।

চাকা ও আগুনের মতো বিরহও এক আবিষ্কার, চঞ্চলতা মানুষের।

বিরহ কি লোহার মতন? ধাতুর ভিতর এই প্রসন্ন উজ্জ্বলতা পেলে মন ভালো হয়। ঝংকার, শব্দ করবার পর যতক্ষণ না তার রেশ মিলিয়ে যায়, মনে হয় জীবনে এর চেয়ে বেশি কিছু কী চাইবার আছে। তুমি তাকে একবার ডাকো, অনেকবার, যদি সারাজীবন ধরে ডাকতে থাকো… তার একটা নাম গড়ে ওঠে।

শিল্পী: ভাস্কর প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়


তমসাঃ অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয়

জীবনের অর্ধভাগ কেটে গেল ধারবাকি ছাড়া, সুদৃশ্য কৌটো থেকে মাংসভাত বের করে খেয়ে,
সুপারি জাঁতিতে ধরে কুঁচিয়ে দেখেছি রৌদ্র ওঠে
তমসার বনে, তমসার বাপ নেই, মা ভিনজাতিতে পুনঃবিবাহ করেছে, তমসাকে দেখা যায় মাঝেমাঝে পাখি ধরে খায়

জল সর্বত্র। জল লোনা। বাড়ি, বাড়ি নয়, পাথর। সাঁকোময় পাথরের নীচে খেলা করে ছোটো ছোটো মাছ? মাছের কবোষ্ণ দেহ দেখে যেকোনো বালিকা ভুলে যায় অধীত সমগ্র বিদ্যা। বিদ্যুৎ।

জানলাম অনেক। অতি ধীরে বৃষ্টি হয়।
বৃষ্টিতে জানালার ধারে গেলে বিছানাও ভিজে আসে। বনের ময়ূরগুলি আলনার বেশে, নিতান্ত বাসন রূপে লুকিয়ে রয়েছে। রোদ উঠলে ফের বনে চলে যাবে তারা।

তাছাড়া লুকিয়ে কোথাও কোথাও বৃষ্টি হয়৷ বৃষ্টি গাত্রহরিদ্রার দিনে কাউকে না বলে কিছু, উত্তরদিকে মাথা করে শুয়ে থাকে, হাসে—মুখ টিপে।


আকাশে বাদল ভরা

আকাশ দেবতা নয়। আকাশের কোনো মূর্তি নেই।

ঊর্ধ্বে দেখলাম, আকাশের দীর্ঘ যাত্রাটা জ্বলছে। ঘাসে ঘাসে আমরা সকলেই পা ফেলেছি, ফুলের গন্ধে মেতে উঠে ভুলে গেলাম বয়সকাল। নাভি, যা কোথাও নেই। নাভি, যা হরিদ্রাভ। একাই একটি রাজনৈতিক বয়ান। মৃত্যু তাকে মুখে করে ফেলে যায় চুক্তিবদ্ধ চৌকাঠের এপারে। এবং আকাশ নীল, মায়ের মুখের মতো জলকষ্টময়।

তুমি এভাবে আর গানকে আঘাত কোরোনাকো, বোলোনাকো কথা, কথা… কথা আর কীই-বা বলো, সুর ছাড়া? আমাদের মনে থাকে সুর। আকাশে আবিষ্ট মেঘ। কোকনদ। আকাশে খেলতে নামা, আনন্দযজ্ঞে, যথেষ্ট বিপজ্জনক।


শূন্য ছাড়া কিছু নয়

কতদিন প্রেতদশা, চতুর্দশী—মনসার থানে কতদিন বাঁকুড়ার ঘোড়াখানি চুপচাপ শুয়ে থাকে দিনে, রাতে এসে কে তাকে চালায়! কখন সহসা অপ্রতিভ রেখে চলে গেলে। আমি তো বিপথগামী হতে পারি। জলের গভীরে, ঠান্ডা, শক্ত মৃতদেহের মতন পড়ে আছে পূর্বজন্মের পাথর।


ভরিবে গাগরি

শূন্যতাই আমাদের জ্ঞান। তাই আমরা ছবি আঁকি। দেখো, নদীও ছবি আঁকে। দেখেছ তো? কতরকম ছবি। গাছের ছবিও দেখলাম সমুদ্র এঁকেছে।

যে জল দেখলে কেঁপে ওঠে, তার অপ্রস্তুত গাগরি। বেলা বয়ে যায়।


এখানে আকাশ এলোমেলো

বৃষ্টি হচ্ছে। ভাবো, কত পাগল কত বাড়ির বারান্দায় শুয়ে এখন ভাবছে, প্লাস্টিকের পোড়োয় রাখা আধখাওয়া পাঁউরুটির কথা। তাদের মাথায় ঘুরছে সম্মিলিত ভোর। এখানে উৎসবপ্রবণ ভিড় অনেক উন্মাদ-আহ্লাদের পর ঘুমিয়ে পড়েছে।
এখানে কোথাও চাঁদ নেই।


চতুর্দশী

মেঝের জলে লাল রং। দেখি, ভেঙে ভেঙে টুকরো হয়ে চলে যাচ্ছে। গাঢ় লাল। কমলা লাল অন্ধকার। জল ঢালার আগে রমণীটি দেখে আর ভাবে, মেয়ের নখ হত হয়তো। হয়তো কিছুদিন পর চিবুকের গঠন পূর্ণাঙ্গ হত। জানি না, কেউ চলে যায় কীরকমভাবে। চলে যেতে দেওয়া যায় কিনা। তারপর, জল আবার পরিষ্কার। অনেকদিন পর দরজা খুলে আবার বেরোয় সে। হয়তো, বেরোনো সারাজীবনই অসম্ভব থাকে। থাকে, চাপচাপ দম আটকে আসা, একসাথে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস থেকে গেলে। একটা মুখ গড়তে চেয়েও গড়ে ওঠে না। সোনাচাঁদ, কপালে টি দেয় না, উলোঝুলো চুল লেপটে থাকে। আর ঠেকে, শোলশূন্যতা। ফরফর করে হাওয়া দিতে থাকে। হাওয়ায় মাটির কলসি উলটায়।
কলসিভাঙা জল মেঝেতে, মাটিতে থোক-থোক ইঁদুরের নাদির সাথে মিলেমিশে লুটোতেই থাকে। মানুষখাকি চাঁদ চোখভরা আক্রোশ নিয়ে জ্বলতে জ্বলতে ফুরায় একসময়। এতখানি অন্ধকারে পথ ঠাহর না হলে সে বসে পড়ে। আকাশ মুছে যায় সবটুকু। ন্যাকড়া গোঁজা ভিজে তলপেট খুব চুলকে ওঠে তার। পা’টাকেই বুকে আঁকড়ে ধরে। দেখে, হার না মানা পিঁপড়েরা দখল করেছে শাড়ির প্রান্তভাগ। এমনিতেই পিঁজে ওঠা শাড়ি থুবড়ো হয়ে বসে থাকতে গিয়ে আরও ফেঁসে যায়। একসময়ে হাতে পাওয়া সবেধন নীলমণি আঙটির পাথর চালাকি তামাশা, বেবাক ফাঁকা চালের ঘড়া, যা যা মনে লয় ভুটভাট শূন্যতা তার সবটুকুনির মতো জ্বলতে থাকে, জ্বলতেই থাকে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

2 Comments

  1. প্রতিটি কবিতাই খুব ভাল। যে জন্য কবিতা পড়া তার অনেকটাই পেলাম লেখাগুলোয়। বাস্তব আর স্বপ্নের মধ্যে যে আলোছায়াময় জগৎ আর তার বিভিন্ন পরতে লুকোনো বিস্ময় তাকে শব্দে ও নিঃশব্দে স্পর্শ করে আছে লেখাগুলো। আলাদা করে “মনোবাসিনীর ঘুম”, “শূন্য ছাড়া কিছু নয়”, “ভরিবে গাগরী” র উল্লেখ করতেই হল।
    শাশ্বতীকে অপার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.