/ / ঘুণমাটি – বনমালী মাল (পর্ব ৯)

ঘুণমাটি – বনমালী মাল (পর্ব ৯)

শেয়ার করুন

২৪.

মোলায়েম কাদা নিয়ে পঞ্চু এক রাতে অনেক স্বপ্ন দেখে ফেলেছে। ফেলে আসা প্রতি রাতের মতন এই রাতে রামচক একবারের জন্যও তার চোখে ভাসেনি। কেবল মন আর হাতের কোণে কোথাও যেন কুঁরগিতে ভাসতে থাকা রাজহাঁসের নরম পালকের ছোঁয়া লেগে ছিল। আকাশের সবথেকে উজ্জ্বল একটা তারার দিকে তাকিয়ে সে যেমন এক পলক থেকে আরেক পলক এতদিন নিজের হাতে তৈরি একটা মূর্তির ছবি দেখত, তেমনি হলুদ আলোর ওপর বসে দৃষ্টির পর দৃষ্টি ফেলেছে ওই প্রায় সমাপ্ত দেবী মূর্তির দিকে।

কাঁপা কাঁপা জল হাতে লেপ দিয়েছে। মূর্তির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আনমনা হয়েছে। কিছু প্রশ্নের ভিড় সামলেছে। কিছু প্রশ্ন তার কপালে ভাঁজ রেখে অমর হয়ে আছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতন তাদের আভাস পঞ্চুকে অস্থির করে রেখেছে।

রাত মাড়িয়ে কুশল যখন সুজাতা ছেড়ে রাস্তা গায়ে মাখছে, সেই মুহূর্তেই পঞ্চু ভেবে ভেবে কূল পাচ্ছে না,
—দেবী মূর্তির পেছনে কি কোনো নারীর অধিকার থাকে!
—কুশল কাকে চোখের সামনে রেখে চোখ মুখ গড়ে!
—সব দেবী মূর্তিই কি তবে এমন হয়!

আর ভাবতে পারে না পঞ্চু। প্রতিটা জিজ্ঞাসা তার দৃষ্টির সুতো ধরে লুকিয়ে পড়ে অশ্বত্থ গাছটার অন্ধকারে। শেষ রাতে চোখ লেগে যায় পঞ্চুর। কুয়াশার মতন করে তন্দ্রা এসে ঘেরে ধরে দেবী আর পঞ্চুকে।

একটি ছায়ার সঙ্গে সঙ্গে কুশল এল সকালে। এখন সূর্যের দিকে চেষ্টা করেও কেউ তাকাতে পারছে না। কেউ কোনো দোষ আর ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছে না অদেখার কারণে। কোনো ফুরিয়ে যাওয়ার চিহ্ন কিংবা মৃত মানুষের অস্থিসার পড়ে নেই কাছেপিঠে। ঝুরা ঝুরা মাটি মাড়িয়ে এগিয়ে এল কুশল। সোনার রেণুর মতন দু’ দশটা কাদা চ্যাটচ্যাটে জুতো পড়ে চিটে গেল। ঝুরা শুকনো মাটিতে পা ঘষে ছাড়িয়ে নিয়ে কুশল পঞ্চুকে জানিয়েও দিল, সে এসে গেছে। প্রসন্ন কোমল হাসি ঠোঁটে মাখিয়ে পঞ্চু তাকায় কুশলের দিকে। একটা মিশেল দৃষ্টি তার চোখে। কাল সন্ধ্যায় কুশল তাকে যে কাজ সঁপে গিয়েছিল, তার জন্য সে কৃতজ্ঞ। কোনোভাবেই যেন কুশলের থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারছে না পঞ্চু। চাক ঘোরানোতে তার এখন ইচ্ছে নেই আর। কাল প্রায় সারারাত যে নেশা আর স্বপ্ন তাকে হাতছানি দিয়েছে, এরপর সামান্য চাক ঘুরিয়ে সে সরা হাঁড়ি তৈরি করতে চায় না। একথা শুধু মায়া দৃষ্টিতেই যেন কুশলকে বুঝিয়ে দিতে চায়। নিজে থেকেই সে কুশলের সম্মতি আদায় করে নিতে চায়।

—কাল অনেক রাত অব্দি পালিশ করেছি দাদা।

কুশল তার থেকে বয়সে অনেক ছোটো হলেও এই সম্বোধন সে প্রথম থেকেই করে আসছে। কুশল তার কথা শুনে খুশি অখুশির ধার কাছে না গিয়ে একটা নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে থাকে। যে কোনো দিকে। চকচকে মাটি কিংবা সামনের কোনো বুনো গাছের ধুলোমাখা পাতার দিকে। আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় পঞ্চুর উৎসাহ। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবার চাকের গতি বাড়িয়ে তোলে।

২৫.

দিনের এই সময়টা মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। কোনোদিন যা হবার নয়, সেই ভাবনাকে জাপটে ধরে কতক্ষণ নির্জীব শুয়ে থাকা। বাতাসের স্পর্শেও যেন ভাবনার ভিত না নড়ে। কুশল এখন শূন্যে ভাসছে। প্রতিদিন এই নির্মল সকালে সে কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও মাথা থেকে দুটো চিন্তাকে সরাতে পারে না। প্রায় প্রতি সন্ধ্যা থেকে রাত অব্দি সুজাতার ছবি নাকি রাত থেকে ভোর হয়ে সকাল পর্যন্ত স্ত্রী পুত্রের ছবি, কোন্‌টা তার কাছে বেশি প্রিয়। কোন্ পথে ফুল ঝরে। চিটালো কাদা জড়িয়ে অস্বস্তি দেয় কোন্ সম্পর্ক… বুঝে উঠতে পারে না কুশল। পালতোলা নৌকোর পাল আর দাঁড়ের যখন একসাথে প্রয়োজন হয়, বোঝা যায় না… কার জোরে নৌকো এগিয়ে চলছে।

বেলা গড়িয়ে গড়িয়ে মাঝ রাস্তায় গেলে পঞ্চু তার কেজো অস্বস্তিটাকে মাথা ঝাঁকিয়ে জানান দেয় চরাচরকে। সকালের সেই সামান্য জলখাবার পেটের কোনো অংশেই আর তার উপস্থিতি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। খিদে আর একঘেঁয়ে কাজের তোড়ে পঞ্চুর গোঁফের ওপরের চামড়া একটু কুঁচকে বুঝিয়ে দেয়, একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার। বিগড়ে যাওয়া মাথা আলতো হেলিয়ে সে সটান চলে যায় তার এই ক’দিনের পরিচিত অথচ যেন আত্মজন বিনোদ দাসের কাছে। পর্দা ঘেরা কুশল এই মুহূর্তে তার কাছে কোনো প্রভু বা মালিক হয়ে থাকতে পারে না। হয়তো ক্ষুধা আর স্বপ্নই পৃথিবীর সকল পঞ্চুকে একদিন সত্যিই প্রভুমুক্ত করবে।

প্রতিটি শৌখিন মানুষের কাছে জুতো যে মর্যাদা ধারণ করে, বিনোদ দাসেরা সেই মর্যাদা পায় না। আগাগোড়া ভালোত্ব মেশানো একটা মানুষের মতন মানুষ। গায়ে রোদ পিছলে পড়ছে। চাপা রং। নাক আর মুখ সাহস করে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বেড়ে উঠতে পারেনি। রাস্তার উচ্ছিষ্ট অংশ ক্ষয়ে যেতে যেতে বিনোদের দোকানের মুখপাত। ভরা বর্ষায় রাস্তা থেকে জলের স্রোত বিনোদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে মাঝে মাঝে দোকানের ওপর দিয়ে দাগ কেটে যায়। মণি মানিক্য খচিত অন্যান্য দোকানগুলোর পাশে এ বাজারে এই দোকানটি যেন একটি প্রাকৃতিক নিয়মের কাছে হাত পেতে থাকা করতল। যার ওপর অজস্র রেখার কাটাকুটি। নিজেদের নিয়ে একটা সঠিক শক্তিশালী ভাগ্য নির্ধারণ করতে তারা সদা প্রস্তুত যেন।

এখন চির ক্লান্ত মুখ আর অবয়ব নিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসে আছে বিনোদ। মাটির ঢিবির মতন একটা সরলরেখার চৌকাঠ। চৌকাঠের ভেতরে পাছা এলিয়ে পাগুলো বাইরে বের করে একগাল কৃত্রিম ব্যবসায়ী হাসি ছুঁড়ে দিচ্ছে আসতে যেতে লোকগুলোর দিকে। কোনো ভণিতা না করে পঞ্চু এসে বসে রাস্তা থেকে নেমে আসা উচ্ছিষ্ট কাঁকর আর পাথরের উপর। অন্যান্য দিন মৌখিক আলাপে যে পঞ্চু একটু সময় নিয়ে কখনও কখনও অনুমতি নিয়ে বসে, সে আজ হঠাৎ এসেই বসে পড়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কোনো পথিক চমকে ওঠে হয়তো… বিনোদ নাকি পঞ্চুর? কার এই ভারী দীর্ঘশ্বাস!
মাঝে মাঝে বিনোদের দিকে তাকায় পঞ্চু। একবার চোখাচোখি হয়। আঁত থেকে উঠে আসে পরের পর একলা কথন…

—আর মন টানছে না খুড়ো
—কাল শেষ রাত অব্দি জেগে দেবীর সারা গা পালিশ করেছি।
ডান হাতের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকিয়ে সে বলতে থাকে…

জলজলে স্রোত বেয়ে এক একটা নরম রাজহাঁস তার গোটা গায়ে দাগ কেটে যাচ্ছে যেন।

একটা লাল টকটকে কেন্নো এগিয়ে চলেছে ছেঁড়া গাঁদা ফুলের পাশ দিয়ে। ইচ্ছে করেই আনমনা পঞ্চু কুটো দিয়ে ভেঙে দিচ্ছে তার পথ। গুটিয়ে সোজা হয়ে আবার গুটিয়ে তিতিবিরক্ত হচ্ছে কি? বিনোদ সব দিনগুলোর মতন মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করছে ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার। একটু হাত ঝাঁটিয়ে উপরের স্তরে পড়ে থাকা সরটাকে এলোমেলো করে, ভুলে যাবে সারাদিনের বেকার অর্থহীন দোকানীর কথা। ফেটে পড়বে আগন্তুকের সাথে। তার জ্ঞানে সমাজ রাজনীতি অশ্লীলতা একটা একটা মূর্তি নিয়ে হাজির হবে। আজ পঞ্চু সেরকমই কিছু শুনতে চায়। এই অল্প কয়েকদিনের আলাপে একমাত্র এই বিনোদ খুড়ো তাকে দু-দণ্ড শান্তি দেয় কিনা বলা যায় না, তবে দু’ দণ্ড সময় দেয়। এই অবাক যোনির অজানা গভীরে রামচক নেই। তাই সবেধন বিনোদকে সে বন্ধু করে নিয়েছে।

—চক্কর আছে শালার
—কাল হঠাৎ তোকে দেবীর কাজ দিল!

শহরের ধুলো বাতাস বিনোদের মুখের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে গাছের তলায় তলায় ধাক্কা খেল।

—একদিন পুরো লুটিয়ে যাবে ও কিংবা ধাক্কা খেয়ে পথ বদলে ফেলবে।

ব্যস্ত রাজপথের ভিড় আর শব্দে পঞ্চু কিছু শোনে, কিছু কথা অশোনা থেকে যায়। শুধু বিনোদের মুখের একটা করুণ অথচ অভিভাবক সুলভ ভাব তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। সবটা বুঝতে চায় আগাগোড়া। কিন্তু নিজের অপারগতার জন্য, নিজেকে স্থাপন করতে বাধা পেতে পেতে তার জেদ আরও চেপে বসছে। একটু দূরে পড়ে থাকা একটা স্থির মরা গাছের গুঁড়ির দিকে দৃষ্টি শানিয়ে রেখেছে। এক খাদ ভেদ করা চাউনি তার চোখে।
বিনোদ এ বাজারের এক উদাসীন স্মৃতি। গাছের রস বেয়ে আরেকটা গাছ অন্ধ হয় যখন, তখনও বিনোদ শুধু হাঁ মুখ চেয়ে থাকার স্থির পাথর। শুধু কখনও কিছু কিছু বিষয়ে সে বেশ নাড়া খেয়ে ওঠে। কয়েকদিন থেকেই কুশলের সান্ধ্য যাতায়াত তাকে ভাবাচ্ছে। অনেকের মুখে শুনেছে পর্যন্ত—“রক্ষিতা আছে কুশলের। ঘরে ছেলে বউ থাকা সত্ত্বেও।”

বুকের কাছে একটা দলা পাকানো কালো ছায়া থেমে থেকে থেকে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। কুশলকে সে ভালোবাসে। শিল্পী হিসেবে কুশলের নাম আছে। রামধনুর ক্ষীণ সবুজ রঙের মতন বৃষ্টির ধোঁয়ায় সে-ও কুশলকে শ্রদ্ধা করে। কিন্তু মানুষের সবথেকে সহজ সরল রেখাটা আজ বাসের কাঁদো কাঁদো কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে।

—ঘরে বউ বাচ্চা আছে! সে খেয়ালও কি নেই!

দিনের অন্তত একটা সময় নিজেকে নিয়ে এই বিস্ময়ের রাস্তায় হাঁটে বিনোদ—যে সময়টাতে যতটুকু সম্ভব নিজেকে আড়াল করে গা সরিয়ে নেয় কুশল। আর আজ এখন পঞ্চুকে কাছে পেয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া প্রকাশ্যে আর কিছুই বেরিয়ে আসে না তার মুখ থেকে।

২৬.

কোত্থেকে একটুকরো মেঘ এসে সূর্যের ওপর চাদর বিছিয়ে দিল। মাটির রং গেল বদলে। ছায়াহীন পঞ্চু তখন মাটির দলা পাকাচ্ছে চাকের বিছানায় তাকিয়ে। আনমনা। বিষণ্ণ। দুর্বল। একটা কুকুর ডেকে উঠল কাছেই। তার ডাকে কান্না নাকি সোহাগী বায়না! বুঝে উঠতে পারে না কেউ। শব্দের অকস্মাৎ জন্মে যারা সন্তের মতো হাত তোলে, তারাই আবার শুকিয়ে যাওয়া নদীর কোলে মাথা নত করে। কুশল পর্দার আড়ালে দেবীর উত্তোলিত ডানহাতের রেখা আঁকছে স্পষ্ট করে। একটাই রেখা বাঁশের ছাল দিয়ে গভীর থেকে গভীর করে তুলছে। অন্য কোনো রেখায় লাফাতে তার উৎসাহ নয় বরং মনোযোগের অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে একটা বেওয়ারিশ ঘোড়া একতালে হেঁটে যায় গন্ধ ছড়িয়ে। কতদিনের অতীত চিটে আছে এমন শরীরটাকে একটু সাবধানে নাড়াচ্ছে ধুলোয় ঢাকা ডুমুর গাছটা। এক পশলা বৃষ্টি আবার নাচতে নাচতে কুশলের উঠোন পেরিয়ে উড়ে গেল। পঞ্চু এসব দেখছে উপরি চাউনি দিয়ে। চাক ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে পালা করে এসবই ঘটে দুপুর গড়ানো অব্দি।
বিকেল নেমে আসছে তার রং বিছিয়ে। এই সময়টাতেই কুশলকে শেষ সিদ্ধান্তটা নিতে হয়। যদিও মানুষের নৌকোয় নোঙরের কাজের মতন সিদ্ধান্ত অনিবার্য হয়ে আসে। সময় সেখানে নিজের উপর বিরক্ত। বিরামহীন ছপ ছপ শব্দে সিদ্ধান্ত শুধু এগিয়ে চলার। সময় থেকে। স্থিতি থেকে। কুশলকেও এই সময়টা কিংবা বলা যায় দিনটা পেরিয়ে যাওয়ার জন্য একটা স্থির গম্ভীর কথা এঁকে ফেলতে হবে মাথার মধ্যে। একই রেখায় দুপুর থেকে বিকেল অব্দি টান দিতে দিতে তা গভীর হয়। আরও গভীর। শেষ বিকেলের উচ্ছিষ্ট মরা আলো রেখার এত গভীরে যেতে পারে না। কালো একটা পোকার মতন রেখাটা একদৃষ্টে দেখতে দেখতে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল কুশল।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *