/ / সন্ধ্যাগোধূলির আভা – অমিতাভ গুপ্ত ( কবিতার সূত্রে আত্মকথন পর্ব ১ )

সন্ধ্যাগোধূলির আভা – অমিতাভ গুপ্ত ( কবিতার সূত্রে আত্মকথন পর্ব ১ )

শেয়ার করুন

সন্ধ্যাগোধূলির আভা যেন ঠিক রাতের তমসার আভা নয়। কোনো কোনো রাত্রির অন্ধকারে কিছুই যেন দেখা যায় না। সন্ধ্যাগোধূলির মুহূর্তে শুধু যে দেখা যায় তাই নয়, সে দেখা যেন হয়ে ওঠে রহস্যাতুর। ‘আপনপাঠ’–এর সহযোদ্ধাদের নির্দেশ পেয়েছি, এবার এই ছায়ায় আভায় নিজেকে দেখার চেষ্টা করতে হবে । নিজের কথা বলার এখনও পর্যন্ত যেটুকু প্রয়াস করেছি, এবার আসতে হবে তার সম্পর্কে। হয়তো প্রথম পর্বগুলির পুনরুচ্চারণের সুযোগও পাব, পরিমার্জনে পরিবর্ধনে। 

                ইভগেনি ইভতেশংকা বলেছিলেন,  “একজন কবির কবিতাই তাঁর জীবনালেখ্য।” বিশ শতকের এই রুশ প্রগতিবাদী কবির কথাটিকে ঈষৎ অবলম্বন করে আমার  মতো একজন সামান্য কবিতাপ্রয়াসী হয়তো বলতে পারে, এ জীবনে যা কিছু কবিতা রচনার চেষ্টা করেছি তাদের মাঝেই নিজের জীবনকে দেখার চেষ্টা করা ভালো। কবিতাই কবির জীবনচর্চার শ্রেয় মুকুর। বছর তিরিশেক  আগে, তাই, প্রথমজীবনের কিছু কবিতাপ্রয়াস বিচার করে নিজের কৈশোর – যৌবনের ঋতুপলমুহূর্ত খুঁজতে চেয়েছিলাম (‘প্রতিহত নির্জনে’, আলোচনাচক্র), তারপর পরিণত যৌবনে আখ্যানটি ধরা রইলো অন্য আরেক লেখায় (‘সহজ মেয়েটির সঙ্গে দেখা হল’, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মঞ্চ)। এই বর্গের আরেকটি লেখা ‘রাঙামাথায় চিরুনি’ অবশ্য মূলত আমার মার্কসবাদী–লেনিনবাদী দর্শন থেকে উৎসারিত কবিতাগুচ্ছকেই বিশেষভাবে ধৃত করেছিল।

            বর্তমান রচনার আয়োজন বার্ধক্যে রচিত, ২০১৪ সনে সাতষট্টি বছর বয়সে, একটি দীর্ঘ কবিতার প্রসঙ্গে। কবিতাটির নাম ‘শাপলা ও রাজহাঁস’, বোধহয় ১৬৪ টি  অতিদীর্ঘ–নাতিদীর্ঘ পঙ্‌ক্তির, সম্ভবত মহাপয়ারের মৃদু চলনে রচিত কবিতাটি ২০১৪ সনের উৎসব সংখ্যা ‘আরম্ভ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সঙ্গে ছিল আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সংগ্রহ থেকে পাওয়া শেকসপিয়ারের নাটকের বারোটি দৃশ্যের অয়েলপেন্টিং–এর প্রতিলিপি। ২০১৭ সনে একটি ক্ষুদ্র পুঁথির অন্তর্গত হয় কবিতাটি। বর্তমানে ‘আপনপাঠ’ কর্তৃক প্রকাশিত আমার ‘নির্বাচিত কবিতাপ্রয়াস ১৯৬৪–২০১৯’ গ্রন্থে পুনর্মুদ্রিত।

           তথ্য থেকে এবার কয়েকটি সত্যের অন্বেষণ করা যাক। কবিতাটি, আমার অন্য সব কবিতাপ্রয়াসের মতোই পশ্চিমবঙ্গের পাঠকসাধারণ দ্বারা উপেক্ষিত, অপঠিত। কিন্তু এ কোনো জরুরি সত্য নয়। আসল কথাটা হল, কবিতা রচনার বছরটি ছিল শেকসপিয়ারের জন্মের ৪৫০ বছর এবং মৃত্যুর ৪০০ বছর পূর্তির (২০১৪ এবং ২০১৬) মধ্যবর্তী এবং প্রকাশিতও হয়েছিল ২০১৬ সনে। শেকসপিয়ারকে কার্ল মার্কস গভীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন; বাংলায় শেকসপিয়ারের সমাজচেতনা সম্পর্কে বিপুলায়তন গবেষণা প্রকাশ করেছেন উৎপল দত্ত। এটুকু ভরসা ছিল যে প্রগতিশিবির অন্তত শেকসপিয়ারকে একেবারে ভুলে যাবে না। কৃতজ্ঞতাবোধহীন এ কালের নেটিবুর্জোয়া বাঙালি লেখকদের কাছে অবশ্য বিশেষ কিছু আশা করা যায় না। তাঁরা শেকসপিয়ারের দ্বারা নিবিড় অনুপ্রাণিত রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের লেখাই তো অধ্যয়ন করেন না, মনেও রাখেন না স্কটের অনুপ্রেরণায় বঙ্কিমচন্দ্র নয়, শেকসপিয়ারের অনুপ্রেরণায় বিদ্যাসাগরই বাংলা আখ্যানের সূত্রপাত করেছিলেন।

                 অর্থাৎ ‘শাপলা ও রাজহাঁস’ একেবারে নিঃসঙ্গ হয়েই রইলো। স্বীকার করা ভালো, কিছু প্রশংসাবাক্য জুটেছিল অধ্যাপকবর্গীয়দের কাছ থেকে। প্রশংসার ভাষা এইরকম, ‘ ইস্ , এ কবিতাটা যদি আপনি ইংরেজিতে লিখতেন…’। এ ভাষা আমার অচেনা নয়। সন্ধ্যাগোধূলির আভায় ভেবে শিউরে উঠি আমিও তো ইন্ডিয়ান ইংলিশেরই লেখক হতে পারতাম।

মাতৃভাষার প্রতি পশ্চিমবঙ্গবাসীর অবজ্ঞার ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা সুবিদিত। গত শতকের মধ্যভাগে মাতৃভাষা আন্দোলনে যখন মহারাষ্ট্র এবং দক্ষিণ ভারত জ্বলে উঠেছিল তখন পশ্চিমবঙ্গের দেওয়া ভোটেই হিন্দিভাষা ভারতবর্ষের প্রথম ভাষা হিসাবে নির্বাচিত হয়। এরপর তৎকালীন পূর্ববঙ্গে ও শিলচরে বাংলাভাষা আন্দোলনের সময়ও পশ্চিমবঙ্গবাসী ছিল নির্বিকার। যাক সে কথা। আমার উদ্দেশ্য ছিল ষোড়শ শতকের বাংলা ও ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডের মধ্যে একটি তুলনাত্মক আলোচনা করে এ সত্য প্রমাণ করা যে তখন বাংলায় বিন্দুমাত্র ধর্মীয় মৌলবাদ বা সাম্প্রদায়িক হানাহানি ছিল না। ইংল্যান্ডেই তখন চলছে রক্তঝরানো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। অজস্র নরহত্যায়, সন্ত্রাসে কাঁপছে সেই দেশ এবং একদল মধ্যযুগীয় অতি সাধারণ বঙ্গসন্তানের মতো, ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ দ্য ফার্স্টের কাছে, একটি আবেদনপত্র রচনা করা হল – ওই ইংল্যান্ড শেকসপিয়ারের বাসযোগ্য নয়, এখানে, এই ‘শাপলা’র মতো সরল বাংলায় তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক।

                      কল্পনা করা হয়েছে, উইলিয়াম শেকসপিয়ারের বয়স তখন আঠারো। স্ট্রাটফোর্ডে পড়াশোনা শেষ হয়েছে তাঁর, গ্রামে জনপদে ঘুরে ঘুরে মানবজীবনের সামগ্রিক পরিচয় অর্জন করেছেন, সংগ্রহ করেছেন লোকগানের অজস্র সুর, প্রচলিত উপকথা-রূপকথা, সর্বোপরি মানুষের মুখের ভাষা। লন্ডনে আসার পরে অবশ্য তিনি অন্যান্য মননশীল দীপ্তির সঙ্গে পরিচিত হলেন, যাকে বলা যেতে পারে রেনেসাঁবাহিত মননশীলতা। হলিনশেডের পুরাণ গ্রন্থ তিনি সম্ভবত  স্ট্রাটফোর্ডেই পাঠ করেছিলেন, এই পুরাণ তাঁর কয়েকটি রচনার অবলম্বন। 

                      শেকসপিয়ারের লন্ডনে আবির্ভাবের সঙ্গেই ‘শাপলা ও রাজহাঁস’ শেষ। ফ্ল্যাশিং ফরওয়ার্ড পদ্ধতিতে অবশ্য পরবর্তী রচনাগুলির অনুষঙ্গও এসেছে।

                    একটিই শুধু ছায়াভ উপসংহার। আমার কবিতাপ্রয়াসের প্রতি তিলমাত্র দৃষ্টিপাতের প্রয়োজন নেই, কিন্তু একালের বাঙালি কবিরা, লেখকেরা শেকসপিয়ারকেও কি ভুলে গিয়েছেন?

( কবিতার সূত্রে কবির আত্মকথন চলতে থাকবে পরবর্তী সংখ্যাগুলিতে )

শেয়ার করুন

Similar Posts

5 Comments

    1. রবিবার এর সকাল টা সুন্দর হয়ে গেলো ।
      খুব ভালো লাগলো, ❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *