এস আই আর – রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভোটারদের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে নির্বাচন কমিশন ! – চয়ন ভট্টাচার্য

শেয়ার করুন

নাগরিকত্ব নিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে কোণঠাসা করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ২০১৯ সাল থেকেই বিজেপির লক্ষ্য ছিল। আপনারা লক্ষ্য করবেন , সেই সময় থেকেই ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে এসে বক্তৃতা দেওয়ার সময়ে” ঘুসপেটিয়া” দের বিরুদ্ধে জোর গলায় প্রচার চালিয়ে বলতেন হিন্দুদের কোন ভয় নেই, তাঁদের আমরা সি এ এ মারফত তাঁদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেব। সাম্প্রতিক এস আই আর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় অমিত শাহের এই মিথ্যাচার ফাঁস হয়ে গেল। মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি বড়ো অংশের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার কারণে। বোঝা গেল , কালো টাকা উদ্ধার করে প্রত্যেক নাগরিকের অ্যাকাউন্টে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মত এটিও একটি জুমলা, অর্থাৎ প্রতারণা।

জনগণনা না করলে ফ্যাসিস্ট মনোভাবের সরকারের এবং তার পরিচালক শাসকদলের সবচেয়ে বড়ো সুবিধা জনগণের একটি অংশকে অবান্তর, অবাঞ্ছিত এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহী গুপ্তচর হিসাবে চিহ্নিত করা তাদের পক্ষে সহজতম কাজ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক কালে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন করার কর্মসূচি বা এস আই আর নিয়ে যে সব প্রশ্ন উঠে আসছে এবং নাগরিকদের একটি বড়ো অংশকে যেভাবে বে নাগরিক করার চেষ্টা হচ্ছে তাতে ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে ওজন কমিয়ে জাহাজ বাঁচানোর জন্য ক্রীতদাসদের সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার ভয়ঙ্কর কাহিনী মনে পড়ছে। দেশের প্রবল আর্থিক সংকট,সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য জীবন জীবিকার অনিশ্চয়তার সমাধানে কেন্দ্রীয় সরকারের সার্বিক ব্যর্থতা থেকে জনগণের নজর ঘুরিয়ে দেবার জন্য এবং আরও বেশি নিরাপত্তাহীন করে দেওয়ার জন্য বিজেপি সরকারের ইচ্ছায় অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে এই এস আই আর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যেভাবে বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করার শর্তে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে অনেক বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই আশঙ্কাকে সত্যি করে পশ্চিমবঙ্গে এস আই আরের শুনানির পরে যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম বিবেচনাধীন বা আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বাদ পড়েছে ৬৮, লক্ষ ভোটারের নাম। বাদ পড়া ভোটারদের সবাই বৈধ,এমন হাস্যকর দাবি করার কারণ নেই। কিন্তু নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও গত চারটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন , এমন নাগরিকদের সংখ্যাও খুব কম নয়।

নির্বাচন কমিশন এস আই আর প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গে শুরু হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ই এই রাজ্যের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ভোটার তালিকায় নাম রাখা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় এগারোটি নথির অন্তত একটি আবশ্যক এমন ঘোষণা করে। তার ওপর বিভ্রান্তি ছড়ায় প্রথমে ভোটার কার্ড এবং আধার কার্ড পরিচয়পত্র হিসাবে গ্রাহ্য হবে না,এমন ঘোষণায়। গরীব ও প্রান্তিক অংশের মানুষ সব নথি সংরক্ষণ করতে পারেন না, স্থায়ী ঠিকানার অভাবে অথবা দূর দুরান্তরে কাজ খুঁজতে চলে যাওয়ার কারণে। আধার কার্ড কে এস আই আর এ পরিচয়পত্র হিসাবে বৈধতা আদালত মারফত আদায় করে আনা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বাস্তবতাবোধ নিয়ে সেই প্রথম প্রশ্ন তুলে দিল। তারপর এল লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেনসি র জটিলতা , যা ম্যাপিং এর আওতায় থাকা একটি বড়ো অংশের ভোটারদের নাম বিচারাধীন করে দিল নথি যাচাইয়ের নামে। শেষ বার সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে বিচারপতিরা দায়িত্ব পেলেন নথি যাচাই করে বিচারাধীন ভোটারদের নাম তালিকায় ওঠানোর জন্য। কিন্তু ষাট লক্ষ ভোটারের নাম নথি পত্র পরীক্ষা করে বাছাই করে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ । কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকার বাইরে রেখে নির্বাচন করানোর নৈতিক অধিকার নির্বাচন কমিশনের নেই। সিপিআই এম এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করার সময় তালিকায় ভুলের পরিমাণ এত বেশি কেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে মূখ্য নির্বাচন কমিশনার স্বীকার করেছেন দায়িত্ব প্রাপ্ত অফিসারদের গাফিলতিতে ই এই ত্রুটি।। তাহলে প্রশ্ন ওঠে রাজ্য সরকারের কর্মীদের ইচ্ছাকৃত গাফিলতি কি নির্বাচন কমিশনের কাজে ব্যাঘাত ঘটাল বিশেষ কোন দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অঙ্গুলি হেলনে?

সন্দেহ জাগছে বিহারের নির্বাচনের সময় থেকেই। গত বছর ২০২৫ সালে এস আই আর হওয়ার সময় সেখানে বাংলার মত লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির পদ্ধতি অনুসরণ করে নাম বাছাই করা হয়নি। কিন্তু দেখা গেছে বিহারের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ৬৫ লক্ষ নাগরিক । কিন্তু ২০২০ সালে নির্বাচনে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এন ডি এ এবং কংগ্রেস আর জে ডি র মহাগঠবন্ধনের মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ১২ হাজার ৫০০ , যা বিতর্কিত এস আই আরের পরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ লক্ষ ৮৭ হাজার ০৭০ । অর্থাৎ ভোটে র ব্যবধান বেড়েছে ৩৬১ গুণ। প্রশ্ন উঠেছে ,তাহলে কি ক্ষমতায় আসার জন্য নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে এস আই আর প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা মাফিক ইচ্ছেমত বিরোধী ভোটারদের নাম বাদ দিয়েছে বিজেপি?

চয়ন ভট্টাচার্য

চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *