SIR পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গ আগের মত থাকবে না – অর্ক ভাদুড়ি
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর এই রাজ্যের সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ জলবিভাজিকা। এসআইআর পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গ আর আগের মতো থাকবে না৷ থাকা সম্ভব নয়৷
কেন বলছি একথা? কারণ, ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে। যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, বা যাঁদের নাম ‘বিচারাধীন’, তাঁরা ইতিমধ্যেই ‘খানিকটা কম নাগরিক’ হয়ে গিয়েছেন৷ পাড়াপড়শির চোখে তো বটেই, নিজের কাছেও৷ ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ‘ডিলিটেড’ মানুষ বা ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের জমিবাড়ি বা গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সময় বেগ পেতে হচ্ছে। বহুক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি হচ্ছে না৷ ফলে রাষ্ট্র তার লক্ষ লক্ষ নাগরিকের নাগরিকত্বকেই সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলল।
এসআইআর সংক্রান্ত বিপন্নতার তীব্র মনস্তাত্ত্বিক সংকট নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে না৷ কিন্তু যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় নেই, বা যাঁরা এখনও অনিশ্চিত, তাঁদের বিপুল মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। যে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ জেনেশুনে, সচেতনভাবে নাগরিকের মনের উপর এই দানবিক চাপ সৃষ্টি করে, সে অপরাধী ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। এসআইআর নিঃসন্দেহে এনআরসি-র আগের ধাপ। নাগরিকের নাম তালিকা থেকে রাষ্ট্র বাদ দিয়ে দেবে৷ তারপর নাগরিক গিয়ে দাঁড়াবেন দীর্ঘ লাইনে৷ যাবতীয় নথিপত্র হাতে। তাঁকে ট্রাইবুনালে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে তিনি এদেশের নাগরিক।
এসআইআর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে বাঙালি মুসলমান, দলিত এবং নারীদের৷ সেই সঙ্গে পরিবার নেই, এমন মানুষদের৷ স্বাভাবিক। ফ্যাসিবাদী শাসন এই মানুষদের মুছে দিতে চায়৷ রাষ্ট্রীয় ‘ম্যাপিং’ প্রক্রিয়ায় এরা বেমানান।
নির্বাচন হল গণতন্ত্রের উৎসব। ‘বিপ্লবী বামপন্থী’রা যতই নির্বাচনকে ধোঁকার টাটি বলে মনে করুন না কেন, প্রাক-ফ্যাসিবাদী যুগে রাষ্ট্রের অন্তত এই ধোঁকাটুকু দেওয়ার দায় ছিল। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের যোগাযোগের সুতো হিসাবে ছিল ‘ভোটার কার্ড’। রাষ্ট্রে যে তারও হক আছে, এমন একটি ‘মধুর মিথ্যা’য় প্রতারিত হওয়ার সুযোগ ছিল নাগরিকের৷ ফ্যাসিবাদের আমলে রাষ্ট্র সেই ‘ধোঁকা’টুকু দেওয়ারও আর প্রয়োজন বোধ করছে না৷

অর্ক ভাদুড়ি
সাংবাদিক

