/ / রাষ্ট্রহীন – প্রলয় নাগ

রাষ্ট্রহীন – প্রলয় নাগ

শেয়ার করুন

২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪।
গুজরাটি এক নেতা শহরে এসেছেন। টিভির খবরে তাই বার বার দেখাচ্ছে। দেখিয়ে দেখিয়ে, শুনিয়ে শুনিয়ে কান পচিয়ে ফেলবে এখন। রামনগরে হাজার হাজার জনতার সামনে দাঁড়িয়ে হিন্দিতে তিনি যা বলেছেন, তার বাংলা করলে এই দাঁড়ায় : যদি ক্ষমতায় আসে তবে আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পগুলি গুড়িয়ে দেওয়া হবে। ১.৪৩ লক্ষ ডি-ভোটার-কে সন্দেহ তালিকা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। আরও কত শত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। ধু……র….! আমার এসব একদম ভালো লাগছে না। রিমোর্টের বোতাম টিপতে থাকি। চ্যানেলের পর চ্যানেল বদলাতে থাকি, অলস দুপুর কিছুতেই কাটছে না। বোতাম টিপে টিপে অবশেষে নজরুলগীতিতে এসে স্বস্তি পেলাম : ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব/ তবু দেব না আমারে ভুলিতে।’

৩ মার্চ ২০১৫।
–শিখেছো কই? অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করে।আমি বলি: ঠেকেছি যেখানে!সমস্তটাই তো ঠেকে-ঠেকে শেখা। কেউ দেখে শেখে আর আমি ঠেকে শিখি। আরও শিখব। কিছুদিন আগে জীবনে হতাশ হয়ে এক জ্যোতিষীকে হাত দেখাতে যাই। অনেকক্ষণ হাতটি নাড়িয়ে-চাড়িয়ে, এপিঠ-ওপিঠ করে, ম্যাগনিফায়ার গ্লাসটা উপরে-নিচে তুলে বলেন:— তোর ভাগ্য বলে কিছু নেই। যে-টুকু কর্ম করবি, সে-টুকুই ফল পাবি।— তাহলে মাদুলি-টাদুলি বা ঘোড়ার নাল কিছু একটা দিন!— আপাতত কিছু নেই। কয়েকদিন পরে আয়।তড়িৎগতিতে হাতটি সরিয়ে নিয়ে পকেটে গুজে সোজা অফিস, মনে মনে ভাবলাম জ্যোতিষীও মানুষ চেনে, কার পকেটে কী আছে আগেই আন্দাজ করতে পারে। অফিসে পৌঁছে বড়বাবুকে একটু তেল দিতে শুরু করলাম, রোজ-ই দিই। তেল মারার উদ্দেশ্য মাইনেটা একটু যদি এ-বছর বাড়ে। অফিস পৌঁছতেই বড়বাবু জিজ্ঞেস করেন,— এত দেরি করলে যে?— পায়রা উড়াতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল!বড়বাবু কথাটা বিশ্বাস করেন না। কথাটা যে সত্যি বড়বাবুকে বোঝাই কী করে? আসলে পশুপাখি, জন্তু-জানোয়ার পোষা আমার ছোটোবেলার শখ। সকাল থেকে খুদ খাওয়াচ্ছিলাম। এই টালবাহানা করেই দেরি হয়ে গেল। বড়বাবু কী সেসব বুঝবেন? বড়বাবু আমায় বোঝেন না, কোনওদিন চেষ্টাও করেননি। বোঝে মিনতিদি-কে। মিনতিদি আমি একই অফিসে চাকরি করি। বড়বাবু মিনতিদির লাস্যময়ী রূপে ভুলে যান, মিনতিদি-কে কাছে এসে বসতে বলেন। আমি ঘষা কাঁচের দরজার ওপার থেকে সবকিছু দেখি। একদিন আচমকা বড়বাবুর সই নিতে বড়বাবুর ঘরে প্রবেশ করে কিছু একটা দেখে ফেলি।  থত-মত খেয়ে যাই, বড়বাবুও তাই। সই না নিয়েই ফিরে আসি। ঘণ্টা খানেক পরে বড়বাবু ডেকে পাঠান, উত্তম-মধ্যম অনেক কথা শোনান, আমাকে সব সহ্য করতে হয়। তারপর থেকে দেখি মিনতিদি বড়বাবুর পাশের ঘরেই বসেন। এক ডাকে সাড়া দেন। গাঢ় লিপস্টিক ঠোঁটে চরিয়ে মিনতিদি অফিসে আসেন। ফেরার সময় সে লিপস্টিকের গাঢ়ত্ব আর থাকে না, শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত ঘর সে গাঢ়ত্ব শুষে নেয়।  মিনতিদিকে একদিন আমি লিভ দিলাম। সেদিন রাস্তায় বাস ছিল না, ট্রাফিক, যানজট কোনও কিছুই না। মিনতিদি আমার বাইকের পেছনে বসে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে আমায়। বুকের পৃথিবী দু’টি ছুঁয়ে আছে আমাকে, যেন মাধ্যাকর্ষণ। মনে হচ্ছে, পৃথিবী ছেড়ে আমি যেন মঙ্গলযানে পাড়ি দিচ্ছি। পিঠে দুটো অক্সিজেন সিলিন্ডার।  মিনতিদি হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন মহাশূন্যে। আমিও যেতে রাজি আছি, মিনতিদি! তুমি আমায় নিয়ে চলো অন্য কোথাও, অন্য কোনও খানে। বলেছিল: চল একদিন শিলং বেড়িয়ে আসি?আমি ঈর্ষায় বলেছিলাম: কেন? বড়বাবুকে নিয়ে যাও!— বড়বাবু…! — সব জানি… এবং বুঝতেও পারি!— সব দেখা সত্যি নয়। শীলার সঙ্গে কী করেছিল জানিস না?—  জানি! শীলা তো এ সব সহ্য করেনি চর মেরেছিল। তুমি পারো না?— কেন পারব না? ….. চল আমার বাড়িতে চল। চা খাবি আজ। মিনতিদি জোরাজুরি শুরু করলেন।— শুধু চা?— তাহলে আর কী?— কিছু না…!সেদিন আর চা খেতে যাইনি। মিনতিদি অনেক জোর করেছিল, পিঠের ব্যাগটা টেনে ধরে ছিল।

২২ ডিসেম্বর ২০১৬
আমরা শিলংয়ে।উমিয়ামের কাছেই পাহাড়ি নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের বাংলোতে আমরা দু’জন উঠেছি। প্রকৃতির নির্জনতার মাঝে আমরা দু’জনই একা। মিনতিদির মুখ-চোখ থেকে সকালের রক্তিম সূর্যের মতো উপচে পড়ছে আলগা একটা খুশি । ঠাণ্ডা-কুয়াশা ঘেরা বন বাংলোর এই মোহময় পরিবেশ আমি কোনওদিন পাইনি। কখন জানি-না মিনতিদির হাতটা ধরেছি, মিনতিদিও আমার হাতটা ধরে আমার কাছে এসে বসেছে। এক চাদরের আড়ালে দু’জনে বন্দি হয়েছি। মিনতিদি গাইতে শুরু করল:‘ভালোবাসি ভালোবাসিএই সুরে কাছে দূরে বাজায় বাঁশিভালোবাসি ভালোবাসি’মিনতিদিকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে চাদরে মুড়ে নিলাম। তারপর…! তারপর যেন মনে হল,‌ পাহাড়ি নদীর স্রোতে আমাদের ডিঙা যেন দুলকি চালে নাচতে-নাচতে ভাটির দিকে এগিয়ে চলেছে। কোথাও ঘন কালো গাছের ছায়া, কোথাও অজানা বাঁক। আমরা নাগরিক কোলাহলের বাইরে। ম্লান আলোর ভেতর একসময় মিনতিদি আমার সম্মুখে চাদর জড়ানো শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। দু’হাত যেন মস্ত ডানার মতো ছড়িয়ে দিলেন নদীর এপার-ওপার। মিনতি-দির নগ্ন শরীরের সন্মুখে আমি, সভ্যতার সমস্ত কালি যেন তার গায়ে লেগে আছে, শরীরে ক্ষুধার্ত হায়নার দাঁত-নখের চিহ্ন। হাজারো নারীর আত্মচিৎকার, অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রূণের গুমোট কান্না যেন কানে এসে বাজছে। আমি নদীর জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে বালি লেপে সমস্ত কালি ধুয়ে দিলাম। চুম্বন-চুম্বনে মিটিয়ে দিলাম সমস্ত দন্ত-ক্ষত যন্ত্রণা। মিনতিদি দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার পথ আরও প্রশস্ত করে দিলেন। আমি নত মস্তকে চার হস্ত বিশিষ্ট করালবদনীর মন্দিরে প্রবেশ করলাম, যেন কাঁটাতার পেরিয়ে সীমান্তের ওপারে, সমস্ত শান্তি আজও যেন লুকিয়ে আছে, যেখানে উৎপত্তি সকল পর্বত-নদী, গাছ-মাটি-শেকড়-পল্লবের। বাউল-ভাটিয়ালির। ‘কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরও মাঝারে।’ মাঝারে উঠেছে কাটাঁতার—আমাদের আদিম পাপ, আমাদের ভুলেই। করালবদনীকে নমস্কারে নমস্কারে তৃপ্ত করি। সাত-সমুদ্র তেরো নদীতে অবগাহন করে তৃষ্ণার্ত ঠোঁট নিয়ে আমি আরোহণ করতে যাই মিনতিদির পর্বত সমান বুকের ওপর। পরাজিত শেরপার মতো বারবার হোঁচট খেয়ে গড়িয়ে পড়ি। মিনতি-দি হাত ধরে আমায় পর্বত অরোহণ করান। তারপর পর্বতের শীতল গুহার দ্বারে মিনতিদি আমার পাশে বসেন। আমাকে জড়িয়ে ধরেন: একটু ভালোবাসা দিস আর কিছু চাই না!

২৯ শে ডিসেম্বর ২০১৭।সকালবেলা।
ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরে গৌহাটি ফিরছি। সকালে কুয়াশা ভেদ করে গৌহাটিমুখী ট্রেন দুলকি চালে চলছে।  মাঝে মাঝে থামছে। কোকরাঝাড় স্টেশনে ট্রেন থামতেই, শ’য়ে শ’য়ে লোক ট্রেনে উঠে এল। বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, শিশু সকলেই। মুহূর্তেই কামরাখানি কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠল। কোলাহলে উৎকণ্ঠার প্রকাশই বেশি। সবার হাতে হাতে প্রয়োজনীয় নথি, কাগজপত্র। একের পর এক স্টেশনে ট্রেন থামছে আর ভয়-ভীতিকাতর মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। একদল মানুষ উঠছে আরেক দল নেমে যাচ্ছে। ভয়-ভীতির কারণগুলি আমার কাছে ধীরে ধীরে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। চারদিক থেকে একের পর এক মানুষের মৃত্যু সংবাদ যখন কাগজে আসছে, ভয়গুলো যেন আরো জাঁকিয়ে বসেছে মনে। কত লোক বাদ পড়বে কে জানে! কত মানুষের মৃত্যু হবে, মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি হবে, কত মানুষকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হবে!

২২ ডিসেম্বর ২০১৮।ভোর বেলা।
ক্যাম্পের ঘণ্টা পড়ল। ডিটেনশন ক্যাম্প। যেটা এখন ক্যাম্প সেটা আসলে জেলখানা। এক-দুই-তিন-চার করে পাঁচ নম্বর ঘন্টাটা পড়তেই ঘুমটা ভেঙে যায় রোজ। চোদ্দ ফুট উঁচু প্রাচীর ভেদ করে সে-শব্দ ড্রয়িং রুমে আঁচড়ে পড়ে। এ বার বন্দিরাও জাগবে…!চাকরি বাঁচাতে হাইলাকান্দি থেকে চলে আসি এ-শহরেই। চাকরি মানে বিশাল কিছু নয়, ওই প্রাইভেট একটা কোম্পানিতে চাকরি। বন্ধুর ফ্ল্যাটে থাকি, থাকি মানে পাহারা দিই। বন্ধু থাকে বেঙ্গালুরুতে। পার্মানেন্ট শিফট করেছে। আর এ-শহরে জিইয়ে রেখেছে এই স্মৃতিটুকুই। আমাকে রোজ যাতায়াতের ধকল আর সইতে হয় না আর কী!  বাবা-মাকে বড়দাদার কাঁধে ঠেলে দিয়ে আমিও বেশ দায়িত্ব-কর্তব্যহীন। আমার উত্তরের জানালার পাশে কেন্দ্রীয় কারাগারকে ডিটেশন ক্যাম্প করা হয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। শুনেছি তার সাথে গোয়ালপাড়া, কোকরাঝাড়, ধুবড়ি, তেজপুরেও এরকম ক্যাম্প আছে। ডিটেশন ক্যাম্প নামটা শুনলেই হিটলার, নাৎসি, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প– এসব মনে পড়ে। কোনওদিন ডিটেনশন ক্যাম্পে কোনও সাইনবোর্ড তো ঝুলতে দেখিনি।  আমার সেকেন্ড ফ্লোরের ব্যালকনি থেকে নিচের দিকে তাকালে ক্যাম্পের ভেতরে প্রায় সব দেখা যায়। কিছুদিন আগে কেউ একজন মরেছেও ভেতরে। কাগজে বেরিয়েছে। ষাটের বন্যায় তার সব কিছু ভেসে গিয়েছিল। নিজের পরিচয় হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে জমা দিতে পারার মতো কোনও নথি তাদের কাছে ছিল না। বৃদ্ধের ঠাঁই হয় ক্যাম্পে। তারপর মৃত্যু। বৃদ্ধের মৃত্যুর পরও পরিবারের লোকজন মৃত দেহটা নিয়ে এসেছিল: নিজেদের ভারতীয় হিসেবে প্রমাণ দিতে। চিৎকার করে বলেছিল: আমরার ঠাকুরদা স্বাধীনতা সংগ্রামী আছিলা। স্বাধীনতার লাগি লড়াই করছুইন। আমরার আর কত প্রমাণ দিতে লাগতো, কইন? মিনতি ফ্লাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সারাদিন ক্যাম্পে কী ঘটছে সব দেখে। আমি ফিরে এলে সব কিছু বলে। আমি জিজ্ঞেস করি: তোমার এ জায়গাটা কেমন লাগে?মিনতি চুপ করে থাকে। বরাক নদীর ওপারে দৃষ্টিকে যতদূরে সম্ভব নিক্ষিপ্ত করে কিছুটা উদাসীন ভাবেই জবাব দেয়: ভালোলাগবে না কেন? পাশে ক্যাম্প, কত নতুন নতুন মানুষ আসছে, যাচ্ছে।…. ভালোই লাগে…!

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।সন্ধ্যাবেলা।
টিভিতে তর্কের আসর বসেছে। এত লোক কোথায় যাবে? কোথায় রাখা হবে? শুনছি আরও ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছে। বাতিলের সংখ্যাটাও তো কম নয়। দু’একটি টিভি চ্যানেল জার্মানি হিটলারের স্মৃতি কবর থেকে তুলে এনেছে। জার্মানির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, বন্দিদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে নির্দয়ভাবে গুলি চালাচ্ছে নাৎসি বাহিনী। খুঁটির সাথে দাঁড় করিয়ে একসাথে আট-দশটা বন্দুক তাক করে আছে। একসময় দেহটি মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। আউশৎভিস হত্যা – আরও আরও অনেক কিছু। আমারও দুশ্চিন্তা হচ্ছে, ভীষণ রকম। এসবের মধ্যে কানে আসে ক্ষুদিরাম মূর্তির কাছ থেকে জমায়েত লোকের চিৎকার। প্রতিবাদ মিছিল বেরিয়েছে শহরে। মিনতি ব্যালকনিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে দূরে বরাক নদীর ওপারে তাকিয়ে আছে। আমার পরিবার সুরক্ষিত, বাবা-মা, দাদা-বৌদি, ভাইঝি—সবাই ভারতীয় নাগরিক। মিনতির পরিবারেও সকলেই সুরক্ষিত। মিনতির নাম কেন এল না?কাগজপত্র তো সব ঠিকই ছিল। ব্যালকনিতে মিনতির পাশে গিয়ে দাঁড়াই। নদীর স্রোতে সদ্য ওঠা চাঁদের কম্পিত আলো খেলা করছে। শীতল বাতাস এসে আছড়ে পড়ছে মিনতির মুখমণ্ডল ও আউলানো কেশরাশির ওপর। মিনতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। ব্যস্ত শহরের যানজটে একসময় মিছিলের শব্দ মিলিয়ে যেতে থাকে, প্রতিবাদের ধ্বনি ম্লান হয়ে যেতে থাকে। 
মিনতি তখনও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.