/ / প্রত্নজীবের ডিমের হলুদ কুসুম আভা – পার্থজিৎ চন্দ

প্রত্নজীবের ডিমের হলুদ কুসুম আভা – পার্থজিৎ চন্দ

শেয়ার করুন

Anyone today will tell you that art has nothing to do with realism. It is not about creating a replica of what’s out there in the world… It involves deliberate hyperbole, exaggeration, even distortion, in order to create pleasing effects in the brain

The Emerging Mind, V Ramahcandran

‘রিয়ালিজম’ নামে যে ধারণার কাছে আমাদের সারা জীবনের ঘোরাফেরা তার কাছাকাছিই থাকে চূড়ান্ত ‘বাস্তব’ এক জগত। এই জগত আমাদের রিয়ালিজমের জগতের থেকে বেশি বাস্তব। শিল্প আমাদের কাছে তাই এক ‘সুপার রিয়াল’-এর সন্ধান। এই সুপার রিয়ালের সঙ্গে রিয়ালের দূরতম সংযোগ হয়তো একটা আছে, শিল্পের সুপার রিয়াল জগত রিয়ালের থেকে বেশ কয়েকটি অতিরিক্ত মাত্রা ধারণ করে থাকে।

রামচন্দ্রন যাকে distortion বলে উল্লেখ করেছেন তা আসলে শিল্পের পবিত্র সন্ত্রাস। এই distortion-কে ধারণ করতে এক অতিকায় ক্যানভাসের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ক্যানভাসে ফুটে থাকা একটি চিহ্নের সঙ্গে আরেকটি চিহ্নের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অবশ্যই থাকে। একটি চিহ্ন পুষ্ট করে আরেকটি চিহ্নকে। সমস্ত শিল্পের মধ্যে চিত্রকলায় এই চিহ্নের প্রকাশ সব থেকে বেশি। ভীমবেটকার গুহাচিত্র থেকে দ্য পট্যাটো ইটারস পর্যন্ত যে হাজার হাজার বছরের বিস্তার তা বুকে ধরে আছে এই distortion-কে।

ভাস্কর চট্টোপাধ্যায় সেই সন্ত্রাস ও distortion-এর সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো এক চিত্রকর। শিল্পের নামে আমাদের চারদিকে যে অবিরাম প্রসব উৎসব তার মধ্যে বেশিরভাগ সময়ে এই ‘সন্ত্রাস’-এর চিহ্নমাত্র থাকে না। থাকে না রিয়াল-কে অতিক্রম করে সুপার-রিয়ালের খোঁজ। ফলে সে শিল্প মৃত-মাছের চোখের মতো ফ্যাকাসে ও একমাত্রিক। ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা সে প্রবণতাকে সযত্নে ভেঙে দেন, নির্মাণ করেন আরেক বাস্তবতার। ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়ের ছবির মধ্যে অসংখ্য চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে, সেগুলিকে ডিকোড করতে করতে এগিয়ে যেতে হয়।

ভাস্করের একটি ছবির সামনে বসে আছি। সারা ক্যানভাস জুড়ে নীলের সন্ত্রাস ও শেডস। সেই ‘distortion’ (যা আবার ‘lawful’)-এর পথ বেয়ে ফুটে উঠছে অদ্ভুত এক ছায়া-মূর্তি। ছায়ার মূর্তি অথবা মূর্তির ছায়া। দুটি সম্ভাবনাকে একইরকম ভাবে মেনে নিতে হবে। এমনও হতে পারে, সে কোনও এলিয়েন।

তার বিপন্ন বিস্ময়ের সামনে একটি কাচের গোলাকার জার। জারের ভেতর একটি কাঁকড়া ও ক্রমশ সাপের আদলে বদলে যাওয়া একটি হাতের অস্পষ্ট ইশারা।

ছবিটির সামনে বসে থাকতে থাকতে একের পর এক সম্ভাবনা উঠে আসতে বাধ্য। ছবিটির একটি ল্যাম্পশেড ও ডিফিউজড লাইটের খেলা লক্ষ করা যায়। এই ছায়ামূর্তি কি তাহলে সেই distortion-এর সন্ধানে ব্যাপৃত এক শিল্পী? কিমাকার… এক কিমাকার ধারণার কাছে পড়ে রয়েছে গোলকের ইশারা। কিন্তু সেই গোলকের মধ্যে এক কাঁকড়া। গোলকের থেকে তার মুক্তি নেই। এই গোলক ও কর্কট কি তাহলে জীবন ও মৃত্যুর প্রতীক? এ রহস্যের সামনে ঝুঁকে থাকা মানুষটির হাত ক্রমশ রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে সাপে; সাপ সুস্পষ্টভাবে যৌনতার ইশারা বহন করে। ভাস্করের এই ছবি সময়-জন্ম-মৃত্যু-যৌনতা পেরিয়ে পারপারহীন বিষণ্নতা ও রহস্যের এক অসামান্য প্রকাশ।

রহস্য রহস্যই, তাকে আরও আরও শব্দে ধরার প্রচেষ্টা ব্যর্থতাই ডেকে আনে, শুধু মনে পড়ে এই রহস্যকে একবার ফুটে উঠতে দেখেছিলাম বীতশোক ভট্টাচার্য’র একটি কবিতায়, ভাস্করের ছবির রহস্য ও বীতশোকের কবিতার রহস্য হয়তো এক নয়… এমনও হতে পারে দুটি হয়তো পৃথক পৃথক মেরুতে অবস্থান করছে; কিন্তু distortion-এর প্রশ্নে হয়তো তারা মিশে যাচ্ছে কোনও একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে,

অনেক স্বর্ণাভ পাখি আমাদের গৃহদ্বারে সন্ধ্যায় এসেছে;
তাদের সুতীক্ষ্ণ চঞ্চু অতর্কিত আক্রমণ পিত্তলে বাঁধানো;
দানব শৃঙ্খল খুলে দিলে যারা মূঢ় জন্তু স্বপ্নের উপরে
উঠে আসে, ছিঁড়ে খায়’ তেমনও মাংসাশী নয়, সুবর্ণের তেজে
তাদের সমস্ত পাখা পুড়ে যায়…”

অনেক স্বর্ণাভ পাখি, বীতশোক ভট্টাচার্য

এই পাখির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আত্মধ্বংসের উপাদান, কারণ তারা সুবর্ণের তেজে পুড়ে যাচ্ছে। ভাস্করের ছবির মধ্যে জেগে থাকা এই মানুষটি হয়তো সেই পাখি-মানুষ, যে আসলে আত্মধ্বংসের বারুদ বহন করছে। এ রহস্য আসলে আত্মধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করতে পারে মানুষ।

এরপর যে ছবি দুটির কাছে ফিরে গিয়ে বসি সে দুটি আত্মপ্রতিকৃতি, এক ক্ষতবিক্ষত শিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতি। প্রথম আত্মপ্রতিকৃতিটির দিকে তাকালে দেখা যাবে স্যান্ডো-গেঞ্জি পরিহিত এক প্রৌঢ়। ক্যানভাস হালকা নীল-রঙে মোড়া। প্রতিকৃতিটির মধ্যে সারল্যের উৎসব। Less-এর মধ্য দিয়ে এখানে More-কে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিকৃতিটির সব থেকে মারাত্মক অংশ তার দুটি চোখ ও ঠোঁটে গোলাপী রঙের দ্যুতি। দর্শন ও বাক-ইন্দ্রিয়ের উপর এসে পড়েছে এই অদ্ভুত রঙের আলো। অনন্ত স্তব্ধতার মধ্যে দুটি ইন্দ্রিয় যেন উণ্মুখ হয়ে রয়েছে প্রকাশের অপেক্ষায়।

দ্বিতীয় প্রতিকৃতিটির ক্যানভাস জুড়ে পোড়া-মাটি ও হালকা ব্রাউন রঙের খেলা। উল্লেখ্য, এই ছবিটিরও চোখ ও দুটি ঠোঁটে খুব হালকা সাদাটে হলুদ রঙের ছোপ। যেন কোনও প্রাগৈতিহাসিক পাখির ডিম ভেঙে বেরিয়ে আসা কুসুমের আভা… আদিম, রহস্যময়… ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিকৃতিটিতে। এই ছবিটি দেখতে দেখতে, কী এক সংযোগে মনে পড়ে যাচ্ছিল মণীন্দ্র গুপ্ত’র ‘ডিম’ কবিতাটির কথা-

ডিম পড়ে আছে বনে, কাঁটাঝোপে–
করুণতা ঘিরে আছে তাকে।
ডিমের খোলায় জেব্রা ক্রসিংয়ের দাগ
ঘোড়ার ডিমের মতো এ কি কোনো স্তন্যপায়ীদের ডিম?
পৃথিবী যেন বা এখনো অতীত যুগে আছে।
আনন্দ না, বিষাদ না,
রহস্য ডিমের মূর্তি ধরে ঘুমন্ত শিশুর মতো শুয়ে আছে
কাঁটাঝোপে ধুলোয় বিকেলে।

ডিম, মণীন্দ্র গুপ্ত

মণীন্দ্র গুপ্ত কবিতাটিতে ডিমের খোলার মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন অনন্ত রহস্য। প্রাগৈতিহাসিক আদিম প্রত্নরহস্য যেন ধেয়ে আসছে আমাদের এক পৃথিবীর দিকে। আমরা মুহূর্তকালের জন্য তার দেখা পাই, তার রহস্য ‘বুঝে’ ওঠার জন্য আমাদের ছুটে বেড়াতে হয় এক ঘূর্ণির ভিতর। এই রহস্যের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে সব শেষে আমাদের চোখ থেকে কি আমরা হারিয়ে ফেলি পরিচিত আলো, সেই ‘দেখা’র ভঙ্গি! এবং পড়ে থাকে নির্দিষ্ট দেখার ভঙ্গি পেরিয়ে মণিহারা চোখ?

ছবিটিতে বেশ কয়েকটি রোপের উপস্থিতি রয়েছে… এই রোপ হয়তো সেই ফাঁস যার থেকে আধুনিক মানুষ ও মননের পরিত্রাণ নেই।

ছবিটি থেকে চোখ সরিয়ে নেবার পর ক্যানভাস থেকে স্নায়ুর ভেতর আশ্রয় নেয় জীবনের জটিলতা ও রহস্যের দিকে তাকিয়ে হতবিহ্বল হয়ে যাওয়া দুটি চোখ। লক্ষ করার বিষয়, এই দু’চোখে কোনও মণি নেই, অর্থাৎ এই প্রতিকৃতি যাঁর সেই মানুষটির ‘দেখা’ হয়তো আর মণিসাপেক্ষ নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বলেছিলেন, “অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে”, এখানে আলোর অনুপস্থিতির কারণে অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠেনি। ফুটে উঠেছে রহস্যময় হলুদ।

ভাস্করের ছবির কাছে বসে থাকতে থাকতে দান্তে’র ইনফার্নোর ছবি ভেসে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। এই মহূর্তে ওঁনার একটি ছবির কথা মনে পড়ছে। সাদা ক্যানভাসের উপর ঘন লাইন-ড্রয়িং; ছবিটির ডান দিক থেকে শুরু হওয়া বক্রতা ধীরে ধীরে বামদিকে এসে একটি মেয়ের মুখবয়ব ধারণ করেছে। কিন্তু সারা ক্যানভাস জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে করাতের দাঁত অথবা তীব্র নখর। যেন কোনও অতিকায় আদিম পাখি নেমে এসেছে, দান্তে যেমন লিখেছেন সরলরৈখিক পথ হারিয়ে ফেলার কথা; এখানেও যেন নেমে এসেছে সেই ঘূর্ণি। ছবিটির এই রহস্যময়তার মধ্যে জেগে রয়েছে একটি অ্যঞ্জেল-মুখ। সে কি পরিত্রাণ, না কি সেও এই রহস্যের অংশ?

প্রথম ক্যান্টো’তে দান্তে’র উপলব্ধি যেন এসে মিশে গেছে এই ছবিতে –

MIDWAY upon the journey of our life
I found myself within a forest dark,
For the straightforward pathway had been lost.

আমরা বারবার দেখেছি আত্মপ্রতিকৃতি’র প্রতি ভাস্করের বিশেষ দুর্বলতা রয়েছে। ক্যনাভাসের উপর বোল্ড স্ট্রোকে আঁকা এই ছবিটি ভাস্করের আত্মপ্রতিকৃতি কি না সে বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না; কিন্তু এই ছবিটি আত্মপ্রশ্নে দীর্ণ এক পুরুষের।

এই ছবিটি দেখতে দেখতে গীতবিতান খুলে যদি সমাপতন-বশত কারও সামনে ভেসে ওঠে রবীন্দ্রনাথের সেই কয়েকটি পঙ্‌ক্তি,

সন্ধ্যা হল গো–ও মা, সন্ধ্যা হল, বুকে ধরো।
অতল কালো স্নেহের মাঝে ডুবিয়ে আমায় স্নিগ্ধ করো।।

ভাস্করের এই ছবিটি আমি দেখেছিলাম এক সন্ধ্যাবেলা ও সমাপতন-বশতই আমার কাছে ধরা দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের এই লাইনগুলি। সে কালো অতল, যে কালোর শেষ নেই এবং যে কালো সূচিত করে ‘স্নেহ’কে সেই কালোর অকল্পনীয় ব্যবহার দেখেছিলাম গানটির মধ্যে।

এবং দেখেছিলাম ভাস্করের এই ছবিটির মধ্যে, অন্ধকার ও আলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা যে প্রথাগত বাইনারি তাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন দুজনেই। শুধু ভাস্করের এই ছবিটির মধ্যে লুকিয়ে থাকা মানুষটি যেন প্রবল এক দস্যু, প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক দস্যু। অন্ধকারের মধ্য দিয়ে তার যাত্রা, কিন্তু সে অন্ধকার নয়। ‘রঘু-ডাকাতের’ মতো এক প্রাণ যেন ছুটে চলেছে জীবনের আলোর সন্ধানে।

আরেকটি প্রতিকৃতির কাছে গিয়ে বসেছিলাম একদিন। সেটি এক মহিলার।

এই ছবিটিতেও রয়েছে ভাস্করের খুব প্রিয় ও পছন্দের নীলরঙের সন্ত্রাস।

মধ্যবয়স্ক নারীর চোয়াল ও গালের হনু জেগে উঠেছে। জীবনের চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে চলার মাঝে ঝরে গেছে তথাকথিত ‘লাবণ্য’। আশ্চর্যজনক ভাবে মহিলার চোখ-দুটি বোজা। অথবা সে অন্ধ।

মহিলার মুখে বিরক্তি বা প্রসন্নতা–কিছুই নেই। যা আছে তা সম্ভবত ‘মেনে নেবার উদাসীনতা’। এই মহিলার ঠোঁটেও এসে পড়েছে সেই হলুদ রঙের আলো।

ছবিটির থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া মাত্র দেখতে পাই–অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে ফেলেছেন এক নারী… আরও অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে তাঁকে। কিন্তু সে হারিয়ে ফেলেছে, ভয়াবহ ভাবে হারিয়ে ফেলেছে সব রহস্যের উপাদান। রহস্য হারিয়ে ফেলা এক জীবনকে নিয়ে তাঁকে হেঁটে যেতে হবে বহুদূর।

ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়ের খুব বেশি ছবি দেখার সুযোগ হয়নি আমার। যতদূর জানি ভাস্করের বহু ছবি, বহু প্রতিকৃতি সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হতে চলেছে।

বহুবার ভাবতে চেষ্টা করেছি, ভাস্করের ছবির চুম্বকের মতো আকর্ষণ লুকিয়ে থাকে কোথায়।

ভাস্করের ছবির আকর্ষণ ও ঘূর্ণি ‘আট বছর আগের একদিন’-এর বিপন্নতা ও বিস্ময়। সৃষ্টির রহস্য ও আধুনিক মননের ভিতর লুকিয়ে থাকা ট্র্যাজেডি… প্রত্নজীবের ডিমের হলুদে লুকিয়ে থাকা বিষাদ ও দুর্জ্ঞেয় জগতই ভাস্করের জগৎ।

শেয়ার করুন

Similar Posts

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *