অরূপরতন হালদার-এর পাঁচটি কবিতা

শেয়ার করুন

অর্ধেক জীবনে

হলুদ পুকুর বোঝে জলের কামান ক্লান্ত হয়
দূরের মেঘ এসে তোমাকে নিয়ে যায় ব্যর্থ প্রদেশে
সেখানে শীতের অর্গ্যান বাজে
সব স্বরলিপি গূঢ় নয়, মেধার ছোঁয়াচে আলোয় সারারাত হিম পড়ে
রক্তের ছেঁড়া বনপথে গোলাপের ডাল জেগে ওঠে
স্মৃতির শহর কীটদষ্ট আজ – নক্ষত্রের এলোমেলো সাজ
আমাকে ট্র‍্যাপিজে নিয়ে যাবে, শাদা চাঁদ নড়ে উঠে হঠাৎ
জুগুপ্সায় ছুটে যায় পুরোনো ছুরিকা বেয়ে
ছুরিতে মুগ্ধ গাল তুমি নিয়ে গেছ পিনদ্ধ নিকটে
আরও হ্রদের সম্যকরূপ ফুটেছে বাগানে
তোমার অনেক হাড় সেই কোন মাহেন্দ্রক্ষণে বুঝেছিল
এই গতি একদিন উন্মন হবে
আজ তুষের আগুন খসে পড়ে আমার পদ্মের শরীরে
তারও ব্যথা ছিল, বুঝিনি কখনো
পিপাসা বয়েছে ধূসর জমি থেকে অর্ধেক জীবনে

অবিসংবাদী

জলের নিঝুম গলা বুঁজে এল যেন এক অনন্ত হাতসাফাই তার
অতল থেকে তুলে নিয়ে গেছে মাছদের লুকিয়ে পড়ার সব পাথর, আর একটা অসীম বৃত্ত ভেঙে পড়ছিল আমাদের টুকরো টুকরো ইতিহাসে। এমন অবিসংবাদী দিন আর নেই যে কোনো পংক্তির আগুন নিয়ে তোমাকে আরও একবার লিখে ফেলতে পারে। ছাইয়ের নতুন আলো টিনে ছাওয়া ঘরের ভেতর স্থির। মনে আসে একটা আবছা গুমখুন আর স্থবির আলাপের ধীরে মেঘের আলো হয়ে ওঠা। এখন আশ্চর্য সামাজিক কোনো কথা নিভে গিয়ে আবার দেখে তার পুনর্জন্ম আমাদের অবচেতনের মধ্যে একটা রুপোলি ঢেউয়ের শীর্ষ।

ট্র‍্যাফিক সিগন্যালগুলো একটা সাঙ্গীতিক মোহে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে যায় আর গতির মহড়া নিয়ে যে বিশৃঙ্খলা সে অনেক দূরাগত স্বপ্নে ফিরে এল। তার জামায় তুমি রক্তটিপ লাগিয়ে দিয়েছিলে একটা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, আর একটা স্তব্ধ পিয়ানো ঢেকে যাচ্ছিল মরে যাওয়া পাতায়।

দামিনী হে

এই দ্বিধা — অনুরূপ শব্দ শুনি। পাতার ভেতরে জাল মহামুদ্রা।
কাছে গেলে মুখব্যাদান, ভয়াল এক কটিদেশ আগুনে পুড়ে
যাচ্ছে। দূরে তিন পয়সার পালা, আওয়াজ আসে। এখানে
অহল্যার পিঠ, গুণিন তীর বিঁধিয়ে দিচ্ছে। নির্বীর্যের কলম
ওড়ে কাকতাড়ুয়ার পাশে।

এই যন্ত্র, সেই যন্ত্র। টিউকলে লেগে আছে ডিউকের হাসি।
ও এক শ্যামল জোয়ান, তারাদের দেশে গেছে। কাকভোর,
মথিত করো? ঘোড়াদের দানা-পানি এখন হিসেব-প্রসূত।
ওই হাঁসের পালক, অন্ধের দিব্যতা বেশ লাগে।

মনোভূমি অ্যাসিড-দ্রবণে ভাসে। সিসিফাস? বেশ। রথচক্র
গ্রাসিছে মেদিনী। পাখিটির গায়ে চাঁপার বন। স্বৈরিণী ঘরের
বাহির হল। তুলারাশি ট্যাটু করো ঘাড়ে। ওই পুণ্যিপুকুর,
ইহকাল ভেসে আছে। দামিনী হে ঘুমোও, ঘুমোও। দলমা
পাহাড়ে হাতিরা জেগেছে।

রেখাব

তুমি কি দেবেনা আমাকে ওই বিরহে ছোপানো তসর?
নির্ভার তন্তুরা আজ জানে লুকোনো ত্রাসের খবর,
বাতাসবাহিত রাত, কূল ভাঙে, আরও কূল আসে,
বিলাসখনি তোড়িটির বাঁ চোখ নেচেছে বিপুল সর্বনাশে।
মনে আসে ষাঁড়াষাঁড়ি বানে কি অপলাপ ঘটেছিল, তবু
এ তুন্দ্রাময়তা যেন বিধ্বস্ত করে আমাদের লুকোনো ঘাম।
ঐ হরিণেরা সময়কে পরাস্ত করেছিল, তাদের চোখে
উৎসব জ্বেলে দেওয়া তারারা ফিরে গেছে একে একে।
মুদ্রার অধিক আরও মুদ্রা নড়ে উঠে, বিহ্বল আভার মতো
দিনের আলো জলের কোনো রূপান্তর চেয়েছিল,
আজ সমুদ্রবিতান খুলে গেল তার গোপন হর্ষ ভেঙে।
আরও কোনো মায়ার প্রস্তাবে লীন ওই ঘোড়াদের ক্ষত,
এলাচের ক্ষেত থেকে তোমার শ্বাস আসে প্রদক্ষিণরত।
আমার ঘুমের অন্ধকারে একটি রেখাব মরে যায়,
সন্ধ্যার জোয়ারে দোয়াবরেখার আলো উষ্ণ, অবনত।

আয়াত

এই ক্লেশ, আধখানা পয়ার, তুমি দূর থেকে দেখছ জলের স্তর
মধ্যবর্তী শূন্যতায় চড়াইয়েরা ঘোরে, তাদের বুকে ছাই ছাই আলো
এক মহিম ঘোড়ার চোখ উড়ে গেল চৌরাস্তায়, আমি কলমের রোয়াব বন্ধ রাখি
কোনো পারমাণবিক বিকেলে রেইনবো মিছিলে আকাশ ভরে গেলে
তুমি ঢুকে পড়তে চেয়েছিলে সব নিয়ন সাইনের পেছনে
চেয়েছিলে বার-বি-কিউ থেকে ভেসে আসা মনস্তাপ লিখে রাখতে
মেলায় একটা সস্তা চাঁদমারি পেয়ে লক্ষ্যভেদ করেছিলে টপাটপ
ছায়ার রক্তে ততক্ষণে মণিকর্ণিকা ছুঁয়ে এসে বসেছেন বিসমিল্লা
যেভাবে অনর্থ আসে, তুন্দ্রার শব্দ, পরিখায় আলো বাড়ে কমে
ভেবেছ দেওয়ালে তেমন পুরোনো মানচিত্র ঘিরে ঘনিয়ে উঠবে কামনা
তৃতীয় প্রহরে একটা কীলক ঢুকে যায় মাটিতে
তুমি পিরানহাদের ছবি দেখছিলে…অ্যামাজন…একটা নির্জন বারান্দা জ্বলে ওঠে
কিরাতের তির ছুটে গেল তোমার দু পা লক্ষ্য করে
তারপর আর জ্ঞান নেই পৃথিবীর, অন্ধ আত্রাই বয়ে চলে অতলে

শেয়ার করুন

Similar Posts

  • অয়ন ঘোষের পাঁচটি কবিতা

    যুদ্ধ পুকুরে ডুব দিয়ে তুলে আনেশামুক-গুগলি, চুনো-পুঁটিজলের সংসার টালমাটালমাছরাঙার শ্যেন দৃষ্টিতে আগামী যুদ্ধের নিশান উড়ছে। কিস্তিমাত দুঃখকে পোষ মানিয়েআড়াই চালে মাতচৌষট্টি খোপ সাজানো আছেঈশ্বর আমি মুখোমুখি। শীত দু’হাতে তাড়াচ্ছি শীতআগুন কৌশলেঅরণি শেখাল, ভিতরের কাঁপন থামলেশীত আপনা থেকেই বসন্তকে পথ করে দেয়। নিস্তার একটা কৌণিক বিন্দু থেকেমেপে নিয়ে যাত্রাপথতির্যক আলোর সাথে সুরবুকের বাঁ’দিকে এসে সংসার পাতলঘুম…

  • নিদাঘবেলা – শিবানী

    (১) শোকের ওপর রোদ এসে পড়ে, ঝিকমিকিয়ে ওঠে অশ্রু-ঘাম… ধাঁধা লাগা চোখ তখন অলঙ্কারভ্রমে ঈর্ষিত হতে দেখি… দেখি, তপ্ত গ্রীষ্মদুপুর কীভাবে খরতাপে নীরবে পুড়িয়ে চলেছে অ-সুখ, সম্পর্ক… (২) ক্লান্ত দুপুর বেয়ে ভাঙাচোরা সংসারের টুকরো ভরা গাড়ি টেনে নিয়ে চলেছে কপাল থেকে ঘামের ফোঁটা ঝরে পড়ছে খই-এর মতো আর ওর সাথে পিচগলা পথের পিছুটান কাটিয়ে ধ্বংস…

  • যদি – সন্দীপ ভট্টাচার্য

        প্রথম ফোঁটার সিঁদুরে মেঘ ঘর পোড়া অন্তগহীনে বাদুলে ময়ূরাক্ষী নীরব ঝর্নার গান পাহাড় কি মনে রাখে? যদি রাখে তবে বুঁদের মূল্য অন্তহীন প্রেমজ সফরে জলজ সাদা ফুলের গন্ধ কবিতা কবরে নিকোটিন গন্ধে হরিবোল যদি ঠোঁটের প্রথম ঘাম মিশে যায় ফুলশয্যায় তবে সে বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক আপাত নিরীহ রাত্রে নীল বেদনা চিনচিনে ব্যাথা শিরদাঁড়া শর্তহীন…

  • ঘর – অয়ন চৌধুরী

    শরীর ছুঁয়েছে অদম্য বিষ রাত্রির কিনারে এক একটি খোলা ভেঙেছে জ্যোৎস্নার মতো যেটুকু পর্ণমোচী বিকেল লুকোনো ছিল একান্ত নিঃস্তব্ধতায় কখন যেন বছর পেরিয়ে হারিয়ে গেল জীর্ণতায়! বুকের উপর যে দুটি শালুক সান্ধ্য-কোলাজে আজ না-হয় বৃষ্টি নামুক একটা ঘর সাজুক মোমবাতিতে না কোনও শোকের সিম্ফনিতে যে ঘরের প্রথম ও শেষ একটা সমুদ্রের বুকের মতো ধরে থাকবে…

  • গুচ্ছকবিতা – সুদর্শন প্রতিহার

    (১) সূর্য ওঠা থেকে ডোবা অবধি তুমি উজ্জ্বলা হৃদমাঝারে … কালির দোয়াতের সেই হামাগুড়ি আজও পঁচিশ বছরের ছবি আঁকে । (২) যে প্রশ্ন গুলো উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আজও প্রশ্ন হয়েই বেঁচে রয়েছে সেখানেই তোমার অফিম মৃত্যু হয়েছিল । (৩) যাকিছু থেকে গিয়েছিল … অসম্পূর্ন সবই উড়িয়ে দিয়েছিলে নস্টালজিক হওয়াতে…নেশার ঘরে । (৪) যে মদিরা একটু…

  • বঙ্কিমকুমার বর্মন-এর পাঁচটি কবিতা

    আত্মীয় রক্তের হাড় তেড়ে আসে যুবতীর ঘুমেগলানো পিচের মতো রাত, এলোমেলো পায়েবিঁধে ফেলে আমাকে শস্যদানায়এত তীক্ষ্ণ খিদের নখ, এই বুঝি ছিঁড়ে ফেলে সম্ভ্রান্ত দাঁতের ফাঁকে আটকে পড়ে ভূখণ্ড পড়শিকেউ নেই যে—হৃদয় বিকোবে স্বপ্নসাজেমেঘলা মন তবু মেঘ হাঁকে জলদরেঅখণ্ড হৃদয় দুলে ওঠে আমলকীর বনে ভস্মতাপে মুখ লুকিয়ে রশ্মির ভেতর—ঢুকে পড়ে বুনে রাখা শুনশান কবিতাঘরনেচে ফেরে ঘরে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *