/ / জুলাই-আগস্ট ২০২০ – অমিতাভ গুপ্ত ( কবিতার সূত্রে আত্মকথন পর্ব ৩ )

জুলাই-আগস্ট ২০২০ – অমিতাভ গুপ্ত ( কবিতার সূত্রে আত্মকথন পর্ব ৩ )

শেয়ার করুন

এবারের আত্ম-উন্মোচনের পর্যায়ে ইচ্ছে হয়েছে একটু বেশি স্বচ্ছন্দবাক হতে। ধারাবাহিক এ রচনাপ্রয়াসের কোনও পাঠক-পাঠিকা যদি উপস্থিত থাকেন, মার্জনা করেন যেন আমাকে।

সর্বশেষ সংখ্যায় গত শতকের নব্বইয়ের দশকের সূচনালগ্নে অর্থাৎ রাষ্ট্র অনুমোদিত হওয়ার জন্য অধীর সাম্প্রদায়িকতার মহারথযাত্রার ভূমিকা পর্বটিকে ছুঁয়ে, ওই সময়ের স্পন্দনে ইতিহাসের ও বর্তমানের আর্ত মানবসত্তাকে খুঁজে, রচিত ‘বুলন্দ্ দরওয়াজা’ প্রসঙ্গে কথা উঠেছিল।

‘বুলন্দ্ দরওয়াজা’ রচনার ও প্রকাশের পরে প্রায় তিরিশ বছর কেটে গিয়েছে। মৌলবাদী হিংস্রতা কমেনি নিশ্চয়ই, বেড়েই চলেছে, তবু তার বিরুদ্ধে কিছুকিছু প্রতিজ্ঞাকে গভীরতর এবং দৃঢ়তর হয়ে উঠতেও লক্ষ্য করেছি। ‘বুলন্দ্ দরওয়াজা’-য় আমার ভারত পর্যটন সম্পর্কে যে কথা লিখেছি সেই অনুষঙ্গে বলা যেতে পারে, তার তিরিশ বছর পরবর্তী সময়সীমায় স্বদেশকে আরও একটু বেশি দেখা গিয়েছে গালফ অব ক্যাম্বে থেকে রোটাং পাস এবং কুমায়ুন থেকে রাখিগড়ি ঘুরে। সবচেয়ে বেশি পরিচয় অবশ্য ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের, ত্রিপুরার, চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে। বলা বাহুল্য, তবু উল্লেখ না করে পারা যায় না, এইসব ঘুরে-বেড়ানোর মধ্যে দিয়েই বারবার নিজেদের এবং সমগ্র মানব ইতিহাসের, হয়তো মহাবিশ্বের ইতিহাসের ও স্বরূপের সঙ্গে, সত্য ঐতিহ্যের সঙ্গে কিছুটা পরিচয় ঘটে।

এইসব পর্যটনে, আগেই বলেছি হয়তো, আমার সবচেয়ে সুবিধে, আমি মদ্যপান করি না, তার ফলে স্পষ্টভাবে মানুষজনের সঙ্গে মিশতে পারি, কথা বলতে পারি, লব্ধ করতে পারি দৃশ্য, অনুভব করতে পারি দৃশ্যাতীতকে। মদ্যপান সম্পর্কে আমার কোনও নৈতিক বিরাগ নেই, রয়েছে মার্কসবাদী লেনিনবাদী সমালোচনা। সেই যে প্রথম যৌবনে পড়েছিলাম জন রীডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ সেখানেই জানতে পেরেছিলাম সোভিয়েত বিপ্লবের পরেই একটি নির্দেশিকা (যার প্রতিলিপি রীডের বইতে রয়েছে) জারি হয়েছিল এই মর্মে যে মদ্য প্রস্তুত কিংবা মদ্য বিক্রয় কিংবা মদ্যপান জনসাধারণের আদালতে বিচার্য ও কঠোরভাবে দণ্ডনীয়। এই নির্দেশিকাই স্ট্যালিনকে জীবনের অবশিষ্ট তিরিশ বছর কালো কফি ও কড়া চুরুট খেয়ে কাটাতে বাধ্য করেছিল। মদ-গাঁজা-চুল্লু-চরস ইত্যাদি সেবনের এবং ইত্যাদির মহিমা প্রচারের মাধ্যমে অবক্ষয়বাদ তথা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ উপকৃত হয় বটে কিন্তু পর্যটকের পক্ষে তা অপকারী।

অতএব, মোহহীন ভাবেই একদিন দিল্লির উপকণ্ঠে তুঘলকাবাদে এসেছিলাম। সকলেই জানেন মহম্মদ-বিন-তুঘলক ইন্দ্রপ্রস্থ অর্থাৎ পুরানো কিল্লা (তখনও লালকেল্লা তৈরি হয়নি) থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করার জন্য তুঘলকাবাদ নির্মাণ করেছিলেন। নির্মিত হয়েছিল, কিন্তু কখনও বাসভূমি হয়ে ওঠেনি। সদ্যনির্মিত অবস্থাতেই সেই উপনগর ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল। বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা পাথরের ঘরবাড়ির এবং পাষাণ অর্ম্যের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে, আরাবল্লীর অনেকটা উচ্চতা থেকে বর্তমান দিল্লির দিকে তাকিয়ে টের পাই strategic point হিসেবে তুঘলকাবাদ নিতান্ত মন্দ ছিল না। মহম্মদ-বিন-তুঘলক আরও একাধিক কাজ করতে চেষ্টা করেছিলেন। ধাতব মুদ্রার বদলে কাগজের (তখন যে ধরনের পার্চমেন্ট তৈরি হত, যাতে পুঁথিলেখা আঁকা হত, তারই) টাকা প্রচলনের চেষ্টা করেছিলেন। স্বর্ণ-রৌপ্য-তাম্রকে ভারতবর্ষে আটকে রাখার জন্যে। তাঁর এই চেষ্টাটিও সফল হয়নি। ফিরে এসে, অনেক অনেক দিন পরে, লিখলাম :

“এই-যে তুঘলকাবাদের মতো মৃদু মধুচন্দ্রিমার
মতন মহাকাল। রয়েছে পড়ে কালো নিগ্রোদের
মতন পাথরের খণ্ড …
লোকটা পাজি ছিল … তবু
এখনকার মতো এতটা শঠ নয়, ভয়ংকর নয়”

এখনকার রাষ্ট্রনেতারা বা অন্য কেউ যদি তুঘলককে ‘পাগলা রাজা’ বলেন তাহলে কিন্তু কথাটা একটু আত্মসমীক্ষণের পরে ভেবেচিন্তেই বলা উচিত।

কিন্তু আমার এক ফর্মার কবিতা পুঁথি ‘তুঘলকাবাদ’ -এর ভাবকল্প বোধহয় অন্যতর। ১৪টি একক দিয়ে পুঁথির পাঠসংহতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি, প্রকাশনা তথ্যের পাতায় ক্ষুদ্র গ্রন্থপরিচয়ে (প্রকাশনার নিয়মানুসারে যা ইংরেজিতে লিখতে হয়) লিখে দিয়েছি, ‘a textual integer of petical units’— সর্বমোট চোদ্দোটি unit বা একক যাদের নাম পাখি-পতঙ্গের, শাকসবজিদের নাম অনুযায়ী, যেমন, ‘নটে’, ‘বউ-কথা-কও’, ‘টুনটুনি’, ‘ফিঙে’, ‘উচ্ছিংড়ে’, ‘তুলসী’, ‘ফড়িং’, ‘মৌটুসি’ ইত্যাদি। শিরোনাম নির্বাচনে বারবার মনে পড়েছিল সেইসব হা-ক্লান্ত কাজ হারানো মানহারা বিপন্নপ্রাণ শ্রমিকদের কথা যারা ঘরে ফিরে আসার চেষ্টা করে চলেছে।

চোদ্দোটি এককই লেখা হয়েছে এ বছরের অর্থাৎ ২০২০ সালের ৮ জুলাই থেকে আগস্টের সময়সীমায়। এই সময়সীমার মধ্যে অন্যান্য যেসব ঘটনা ঘটেছে তার কিছু আভাসও হয়তো রয়েছে ‘তুঘলকাবাদ’‌‌-এ। জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড, এছাড়া হিরোশিমা দিবসের ৭৫ বছর পূর্তি পরপর দুটি এককে বিস্তৃত হয়েছে। প্রসঙ্গত, হিরোশিমা দিবসের অনুষঙ্গে রচনাটির স্বতন্ত্র শিরোনাম ‘মান্য করা’:

“জীবনাতীতের দিকে ফিরে না তাকি ক্ষিপ্র বোবা তুঘলকাবাদ
ছুটে চলেছে হিরোশিমা থেকে নাগাসাকির দিকে, কৃষ্ণাঙ্গদের দিকে,
বিধর্মীদের দিকে”

অন্যত্রও (যেমন বউ-কথা-কও) মৌলবাদী ধর্মের প্রসঙ্গ এসেছে:

“তুঘলকাবাদ শোনে উল্কার মর্মর
ধর্ম-অধর্ম ধর্ম-অধর্ম ধর্ম-অধর্ম ধর্ম”

কিন্তু পুঁথিটির প্রেস-কপি হাতে নিয়ে দু-একটি বিষয় আমাকে একটু অবাক করল। কীভাবে জানি না এই চোদ্দোটি এককের সর্বত্র ‘আমি’, ‘আমরা’, ‘তুমি’, ‘তোমরা’ বর্জিত হয়েছে।‌ উত্তম পুরুষ–মধ্যম পুরুষ যথেষ্ট ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু এই একমাসের পরিস্থিতির মধ্যে এমন কিছু ছিল যা ‘আমার’ কথা এবং ‘তোমার’ কথা ভুলিয়ে দিয়েছে।

আরেকটি বিষয়, পূর্বপঠিত বা বহুপূর্বে জ্ঞাত মহাকাশবিদ্যার কয়েকটি অনুষঙ্গ চকিতেই চলে এসেছে কবিতাপ্রয়াসে। মনে পড়ছে ১৯৬৯ সনে দশ মাসের জন্যে নিতান্ত শখ করে ভর্তি হয়েছিলাম জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্লাসে। ‘Moment In Infinity’ বইটি লিখেছি ১৯৯২ সনে এবং তারই সূত্র ধরে বোধহয় আমন্ত্রিত হয়েছিলাম এবং যোগদান করেছিলাম ২০০০ সনের বিজ্ঞান কংগ্রেসে। পরের বছর রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে একটি বক্তব্য (‘Aesthetics of Infinity’) নিবেদন করি। বক্তব্যটি ‘অসীমের নন্দন’ নামে ‘গাঙ্গেয়পত্র’ প্রকাশ করেছেন।অর্থাৎ, মহাকাশবিদ্যা আমার একটি প্রিয় আকর্ষণ যদিও এ বিদ্যায় আমি পারঙ্গম নই, নিয়মিত পাঠাভ্যাসও নেই, তবু যে এই বিষয়টির অনুষঙ্গ ঘুরে-ফিরে বারবার এসেছে তার কারণ, ‘তুঘলকাবাদ’-এর পাঠকৃতির মধ্যে হয়তো চেয়েছি ধরা থাক সৃষ্টির একটি অমোঘ সত্য। শ্রেণিসমাজ সেই সত্যকে নিষ্ঠুরভাবে কাজে লাগায় আর শ্রেণিহীন সমাজে সেই সত্যের দ্বান্দ্বিক দর্শনপ্রস্থান উন্মোচিত হয়। প্রয়োজন মতো, কবিতার প্রথাগত ব্যাকরণ অগ্রাহ্য করে, মার্কস-এর রচনাংশ উদ্ধৃত হয়েছে।

‘তুঘলকাবাদ’, এক ফর্মার পুঁথির পাণ্ডুলিপি, নিয়ে নিয়েছেন বিপুল চক্রবর্তী এবং শবর রায়। ওঁরা বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম শতবর্ষে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন তাঁরই আদর্শে রচিত এরকম কয়েকটি ছোটো ছোটো পুঁথি প্রকাশ করে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *