/ / জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল (গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী) – অনুবাদ: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য ( পর্ব ৩ )
|

জীবনের কথা বলিতে ব্যাকুল (গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের আত্মজীবনী) – অনুবাদ: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য ( পর্ব ৩ )

শেয়ার করুন

তৃতীয় পর্ব

তখন আমার ডুবন্ত মুরগীর স্মৃতির কথা মাকে বললাম। কিন্তু বয়স্ক মানুষরা যেমন ভাবেন, মাও ঠিক তেমন করেই ভাবলেন যে সে ছিল আমার ছেলেবেলার বিভ্রান্তি। তারপর গভীর অভিনিবেশে দেখতে থাকলেন পথের সবকিছু। আমি তাঁর নৈঃশব্দের তারতম্য থেকে বুঝে নিচ্ছিলাম কোন জিনিষটা দেখে তিনি কি ভাবছেন। পেরিয়ে গেলাম রেল লাইনের অন্য পারের বেশ্যাপল্লী। সেখানে জংধরা অ্যাসবেসটসের ছাদ দেওয়া ছোট ছোট রঙিন বাড়ির চাল থেকে ঝোলানো দাঁড়ে বসে থাকা পারামবিরোর[১] বৃদ্ধ টিয়াপাখিরা পর্তুগীজ ভাষায় খদ্দেরকে ডাকত। পার হয়ে গেলাম ইঞ্জিনে জল ভরার জায়গা, যার বিশালাকৃতির লোহার গম্বুজে ঘুমোতে যেত পরিযায়ী পাখি আর পথভ্রষ্ট সিগাল। শহরের ভেতরে না ঢুকে তার প্রান্ত ধরে আমরা যাচ্ছি; চোখে পড়ল বড় বড়, নিঃসঙ্গ রাস্তা আর অতীত সমৃদ্ধির সময়ের একতলা সব বাড়ি, যার জানলাগুলো পুরো দেয়াল জোরা আর যেখানে ভোর থেকে শুরু হয়ে যেত পিয়ানোয় একই সুরের ক্রমান্বয় পুনরাবৃত্তি। হঠাৎ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে মা বললেনঃ

‘ওই দেখো, ওইখানে পৃথিবীর শেষ।’

তাঁর অঙ্গুলি বরাবর এগিয়ে গেল আমার দৃষ্টি। দেখলাম রেল স্টেশনঃ একটা অমসৃণ কাঠের বাড়ি, বাংলো ধরণের টিনের ছাদ, ঝুল বারান্দা আর তার সামনে এক টুকরো শুষ্ক জমি, যেখানে বড়জোর শ’দুই লোক ধরতে পারে। এটাই সেই জায়গা, সেদিনই মা আমাকে নির্দিষ্ট করে দেখালেন, যেখানে ১৯২৮ সালে সেনাবাহিনী অসংখ্য কলা-শ্রমিককে হত্যা করেছিল, যার সঠিক সংখ্যা কখনো নির্ধারিত হয়নি। জ্ঞান হওয়া অবধি এই ঘটনার বর্ণনা দাদুর কাছে এতবার শুনেছি যে মনে হয় যেন নিজের চোখেই তা ঘটতে দেখেছিঃ একজন সৈনিক জারি হওয়া এক নোটিশ পড়ে শোনাচ্ছে, তাতে সমবেত সমস্ত ধর্মঘটী শ্রমিকদের আইনভঙ্গকারী বলে ঘোষণা করা হল আর তাদের পাঁচ মিনিট মাত্র সময় দেওয়া হল ওই জায়গা খালি করে দেওয়ার জন্য; তবুও সেই খর রৌদ্রের নিচে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল প্রায় তিন হাজার পুরুষ, নারী ও শিশু; তারপর এল গুলির নির্দেশ আর মেশিনগান উগড়ে দিল সাদা হলকা; জনতা তখন ভয়ে দিশেহারা আর সুশৃঙ্খল, বুভুক্ষু, ধারালো গুলির টুকরো তাদেরকে একটু একটু করে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিল।

সিয়েনাগা স্টেশনে ট্রেন আসার কথা সকাল ন’টায়। তারপর লঞ্চের যাত্রী ও পাহাড় থেকে আগত মানুষদের তুলে নিয়ে পনের মিনিট বাদে ট্রেন আবার চলতে শুরু করবে কলাক্ষেতের অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে। আমি আর মা স্টেশনে পৌঁছলাম আটটা বাজার পরে, কিন্তু ট্রেন সেদিন দেরিতে চলছিল। তবে আমরাই একমাত্র যাত্রী। ট্রেনের ফাঁকা কামরায় ঢোকার পরে মা সেটা বুঝতে পারলেন আর খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেনঃ

‘কি দারুণ ব্যাপার! গোটা একটা ট্রেন শুধু আমাদের জন্য!’

আমার সব সময়েই মনে হয়েছে মায়ের এই ছদ্ম আনন্দ আসলে তাঁর হতাশাকে ঢাকবার চেষ্টা মাত্র। কেননা কামরাগুলোর দিকে একবার তাকালেই বোঝা যাচ্ছে তাদের হতশ্রী অবস্থা। সেগুলো ছিল আগেকার দিনের দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরা। কিন্তু বেতের চেয়ার বা ওঠানো-নামানো যায় এমন কাচের জানলা আর নেই, বরং তার বদলে রয়েছে গরীব মানুষদের শ্রমতপ্ত ও অযত্নলালিত পেছনের ঘষায় পালিশ হওয়া কাঠের বেঞ্চ। আগের অবস্থার সঙ্গে তুলনায় শুধু এই কামরাটাই নয়, গোটা ট্রেনটাকেই তার ভূত বলে মনে হবে। আগে তিনটে শ্রেণী থাকত। তৃতীয় শ্রেণী অর্থাৎ হতদরিদ্রদের জন্য কামরাগুলো ছিল কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি বাক্সর মতো। তাতে করে কলা আর কসাইখানার জন্য গরু নিয়ে যাওয়া হত। পরবর্তীকালে সেগুলোকেই একটু পালটে কাঁচা কাঠের আড়াআড়ি বেঞ্চ বসিয়ে যাত্রীবাহী কামরায় পরিণত করা হয়েছিল। আগে দ্বিতীয় শ্রেণীতে থাকত ব্রোঞ্জের ফ্রেমে বেতের চেয়ার। আর প্রথম শ্রেণীতে থাকত কার্পেট ঢাকা বারান্দা ও লাল ভেলভেটের গদি দেওয়া হেলানো যায় এমন চেয়ার। তাতে যাতায়াত করত সরকারি অফিসার আর কলা কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মীরা। তাছাড়া কোম্পানির কোনো কর্তাব্যক্তি বা তাদের পরিবার অথবা বিশেষ কোনো অতিথি যখন ভ্রমণ করত, ট্রেনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হত একটা বিলাসবহুল কামরা। তার জানলায় থাকত রঙিন কাচ, কার্নিশে সোনালি রঙ ও বাইরের দিকে খোলা বারান্দায় ছোট ছোট চেয়ার টেবিল, চা খেতে খেতে ভ্রমণ করার জন্য। আমি এমন কোনো জীবিত ব্যক্তিকে চিনতাম না, যিনি ওই অভূতপূর্ব কামরার ভেতরটা চর্মচক্ষু দিয়ে দেখেছিলেন। আমার দাদু দু’-দুবার অঞ্চলপ্রধান হয়েছিলেন এবং টাকা পয়সা সম্বন্ধে তিনি যে খুব একটা সচেতন ছিলেন, এমনটাও নয়। তবুও দ্বিতীয় শ্রেণীতে তখনই যেতেন যখন পরিবারের কোনো মহিলা সঙ্গে থাকতেন। কেন তৃতীয় শ্রেণীতে যান, এই প্রশ্ন তাঁকে করা হলে তিনি বলতেনঃ ‘কেননা চতুর্থ শ্রেণী নেই, তাই।’ সে যাই হোক, সেই দিনগুলোয় ট্রেনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল সময়ানুবর্তিতা। গ্রামের লোকজন ঘড়ির সময় মেলাতো ট্রেনের বাঁশি শুনে।

সেদিন যে কোনো কারণেই হোক ট্রেন দেড় ঘন্টা লেট ছিল। যখন ট্রেন চলতে শুরু করল, খুব ধীরে ধীরে আর এক শোকাচ্ছন্ন ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে মা বুকে একটা ক্রশ আঁকলেন। তারপর বাস্তবে সিরে এসে বললেনঃ

‘ট্রেনটার স্প্রিংয়ে বোধহয় তেল নেই।’

সম্ভবত গোটা ট্রেনে আমরাই ছিলাম একমাত্র যাত্রী। তখনো পর্যন্ত কোনো কিছুই বিশেষভাবে আমার নজর কাড়েনি। ‘আগস্টের আলো’-র মধ্যেই সম্পূর্ণ নিমগ্ন ছিলাম। একনাগাড়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম আর মাঝে মাঝে এক ঝলক বাইরে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিলাম কোন জায়গা দিয়ে যাচ্ছি। একটা লম্বা বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন পেরিয়ে গেল বিরাট বিলের লোনা জলাভূমি। তারপর প্রচন্ড জোরে ছুটতে শুরু করল উজ্জ্বল লাল পাথুরে জমির পাশ দিয়ে। তখন কামরার আওয়াজটা যেন আর সহ্য করা যাচ্ছিল না। কিন্তু মিনিট পনের পরেই গতি কমে এল। এবারে নিঃশব্দে, হাঁপাতে হাঁপাতে চলতে লাগল ছায়াছন্ন নিবিড় কলাক্ষেতের পাশ দিয়ে। চারপাশ ক্রমশ ভারি হয়ে উঠল, সমুদ্রের বাতাস আর পাওয়া গেল না। বইয়ের পাতা থেকে চোখ না তুলেই বুঝতে পারলাম যে আমরা পৌঁছে গেছি কলাক্ষতের দুর্ভেদ্য রাজত্বে।

পালটে গেল পৃথিবী। রেল লাইনের দুপাশ দিয়ে চলে গেছে কলাক্ষেতের চওরা রাস্তা, যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তার উপর দিয়ে যাচ্ছে কাঁচকলা বোঝাই গরুর গাড়ি। মাঝে মাঝে অনাবাদী জমির উপর হঠাৎই লাল ইঁটের ছোট ছোট ঘর, চট ঝোলানো জানলা আর সিলিং ফ্যান লাগানো অফিস এবং পোস্তক্ষেতের মধ্যে নিঃসঙ্গ একটা হাসপাতাল। প্রত্যেক নদীরই আছে নিজস্ব একটি গ্রাম আর একটি লোহার সেতু। তার উপর দিয়ে তীক্ষ্ণ শব্দে বাঁশি বাজিয়ে চলে যায় ট্রেন। তখন হিমশীতল জলে স্নানরতা মেয়েরা ট্রেন দেখে চুনোমাছের মতো হুটোপাটি করে, যাতে তাদের দ্রুত সঞ্চারী স্তন দেখে যাত্রীরা আলোড়িত হয়ে ওঠে।

রিয়োফ্রিয়ো গ্রামে অনেকগুলো আরুয়াকো পরিবার পাহাড়ের আগুয়াকাতে (অ্যাভোকাডো) বোঝাই বস্তা নিয়ে ট্রেনে উঠল। এই আগুয়াকাতেই দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। ট্রেনে উঠেই বসার জায়গা খুঁজতে তারা কামরাময় লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বেড়াল। কিন্তু ট্রেন যখন ছাড়ল কামরায় রইল শুধু এক সদ্যজাত বাচ্চা সহ দুজন সাদা মহিলা ও এক যুবক পাদ্রী। বাকি পথটায় বাচ্চাটা একবারের জন্যও কান্না থামায়নি। পাদ্রীর পরনে ছিল খসখসে আলখাল্লা, তাতে নৌকোর পালের মতো চৌকো কাপড়ের রিফু। তার সঙ্গে পরেছিল অভিযাত্রীদের বুটজুতো ও টুপি। বাচ্চাটার চিৎকারের মধ্যেই সে কথা বলে গেল আর এমনভাবে বলছিল যেন সে পাদ্রীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে। সে কথা বলছিল কলা কোম্পানির ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে। যেদিন থেকে কোম্পানি চলে গেছে, ওই অঞ্চলে এটাই ছিল কথা বলার একমাত্র বিষয়। আলোচনা দুটো দলে ভাগ হয়ে যেত। একদল চাইত কোম্পানি ফিরে আসুক, আর অন্যদল তা চাইত না। কিন্তু সকলেই একটা বিষয়ে নিশ্চিত ছিল যে কোম্পানি ফিরে আসবে। পাদ্রীটি ফিরে আসার বিপক্ষে ছিল এবং নিজের পক্ষে এমন একটা ব্যক্তিগত যুক্তির অবতারণা করল যে মহিলা দুজনের কাছে তা ছিল নেহাৎই হাস্যকর বোকামিঃ

‘কোম্পানি যেখানে যায় সেখানটাই ধ্বংস করে দেয়।’

এটাই ছিল তার একমাত্র নিজস্ব যুক্তি। কিন্তু সেটাও ঠিকমতো ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারল না। আর বাচ্চাটির মা তাকে আরো দিশেহারা করে দিয়ে বলল যে ভগবানও তার সঙ্গে সহমত হবে না।

স্মৃতিবিধুরতা সব সময়েই স্মৃতির তিক্ত অংশটা মুছে দিয়ে ধরে রাখে শুধু অমৃত মুহূর্তগুলো। সময়ের এই কোপের হাত থেকে কেউই রেহাই পায় না। ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাড়ির দোরগোড়ায় বসে থাকা মানুষদের। কিসের আশায় তারা বসে আছে তা তাদের মুখ দেখলেই বোঝা যায়। লোনা জলাভূমিতে কাপড় কাচছে যে মেয়ের দল তারাও একই আশা নিয়ে চেয়ে আছে ধাবমান ট্রেনের দিকে। ব্রিফকেস হাতে কোনো অচেনা আগন্তুক দেখলেই তারা ভাবে এই বুঝি ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির লোক আবার ফিরে এসেছে অতীতের পুনঃপ্রতিষ্ঠায়। প্রতিটি কথায়, সাক্ষাতে, চিঠিতে, আজ হোক বা কাল, কথিত হয় সেই অমোঘ বাণীঃ ‘বলছে যে কোম্পানি আবার ফিরে আসবে।’ কেউ জানে না কে বলেছে এ কথা, কখন বলেছে আর কেনই বা বলেছে, কিন্তু এই কথাটায় কেউ অবিশ্বাস করে না।

মায়ের ধারণা ছিল যে তিনি এই সব দুশ্চিন্তার হাত থেকে মুক্ত। কেননা বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর আরাকাতাকার সঙ্গে তাঁর সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। যদি কেউ একজন তাঁর সামনে থাকত যার সঙ্গে জলখাবারের টেবিলে বসে গল্প করা যায়, তাহলেই ঘুরে ফিরে আসত সেই কলা-অঞ্চলের স্মৃতির অনুষঙ্গ। এমনকি নিদারুণ কষ্টের সময়েও তিনি বাড়ি বিক্রি করেননি, কোম্পানি ফিরে এলে চারগুন দামে বিক্রি করতে পারবেন, এই আশায়। শেষ পর্যন্ত বাস্তবের প্রতিকূলতার কাছে পরাজিত হলেন। কিন্তু ট্রেনে যখন ওই পাদ্রীর মুখে শুনলেন যে কোম্পানি প্রায় ফিরে আসার মুখে, একটা হতাশ ভঙ্গী করে আমার কানে কানে বললেনঃ

‘ইস! বাড়িটা বিক্রির জন্য আরেকটু অপেক্ষা করতে পারলাম না, নাহলে অনেক বেশি টাকা পেতাম।’

পাদ্রীটি যখন কথা বলছে ট্রেন চলে গেল একটা ছোট শহরের পাশ দিয়ে। সেখানে একটা প্লাজায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে অনেক লোক আর প্রখর রৌদ্রের নিচে একটা ব্যান্ড কনসার্ট বাজাচ্ছে প্রাণচঞ্চল সুরে। ওই সব শহরগুলোকে আমার সব সময় একই রকম লাগত। পাপালেলো যখন আমাকে দোন আন্তোনিয়ো দাকোন্তের[২] সেই অভিনব ওলিম্পিয়া সিনেমা হলে নিয়ে যেতেন, আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে কাউবয় সিনেমার ট্রেন স্টেশনগুলো অনেকটা আমাদের স্টেশনের মতো। অনেক পরে, যখন ফকনারের বই পড়তে শুরু করি, একইভাবে খুঁজে পাই তাঁর উপন্যাসের শহরগুলোর সঙ্গে আমাদের শহরের কী অদ্ভুত মিল। তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ এই শহরগুলো তৈরি হয়েছিল ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণায় ও তাদের সাময়িক আস্তানার ধাঁচে। আমার মনে আছে এই রকম প্রতিটা শহরের প্লাজায় থাকত একটা করে গীর্জা আর এককোট রঙ করা ছোট ছোট রূপকথার বাড়ি। মনে পড়ে কালো শ্রমিকেরা দল বেঁধে গান গাইত সন্ধ্যেবেলায়, ঝুপড়ির বাইরে বসে কলাক্ষেতের শ্রমিকরা দেখত মালগাড়ির চলে যাওয়া, সকালবেলায় ক্ষেতের সীমানায় পাওয়া যেত মাচেতাধারী শ্রমিকদের মুন্ডহীন দেহ, শনিবার রাতের মদমত্ততার ফল। মনে পড়ে রেল লাইনের অপরপারে আরাকাতাকা ও সেবিয়ায় গ্রিংগোদের[৩] ব্যক্তিগত শহরগুলোর কথা। প্রকান্ড মুরগীর খাঁচার মতো সেগুলো ঘেরা ছিল লোহার জাল দিয়ে, যাতে বিদ্যুৎ সংযোগ করা থাকত। গরমকালের ঝকঝকে সকালে সেই বেড়া কালো হয়ে থাকত পুড়ে যাওয়া সোয়ালো পাখির অগণন মৃতদেহে। মনে পড়ে তাদের দীর্ঘ তৃণাচ্ছাদিত বাগানে ময়ূর ও কোয়েলের বিচরণ, লাল রঙের ছাদ দেওয়া বাড়ি, তার জানলার তারজালি আর ছাদের উপর পামগাছ ও ধুলোমাখা গোলাপের ঝোপের মধ্যে ছোট ছোট গোল খাবার টেবিল ও ফোল্ডিং চেয়ার। মাঝে মাঝে লোহার জালের ফাঁক দিয়ে দৃশ্যমান হত ক্ষীণতটী সুন্দরীরা, পরণে মসলিনের পোশাক ও মাথায় কাপড়ের বড় টুপি, সোনালি কাঁচি দিয়ে বাগানের ফুল কাটছে।

আমার ছেলেবেলায় একটা শহর থেকে আরেকটা শহরকে আলাদা করা সহজ ছিল না। কুড়ি বছর পরে তা আরো কঠিন। কেননা স্টেশনের বোর্ডে যেখানে শহরগুলোর চমৎকার সব নাম লেখা ছিল – তুকুরিনা, গুয়ামাচিতো, নেরলান্দিয়া, গুয়াকামাইয়াল – সে সব কবে ভেঙে পড়ে গেছে। আমার স্মৃতির চেয়েও বাস্তবে তারা অনেক বেশি নিঃসঙ্গ। সকাল সাড়ে এগারোটায় ট্রেন থামল সেবিয়ায়, ইঞ্জিন পালটানো আর জল নেওয়ার জন্য। ট্রেন থেমে রইল পনের মিনিটের অন্তহীন কাল ধরে। সেখান থেকেই শুরু হল গরম। যখন ট্রেন ছাড়ল নতুন ইঞ্জিন থেকে কয়লার গুঁড়ো এসে কাচবিহীন জানলা দিয়ে ঢুকে আমাদের ছেয়ে ফেলল কালো কালো বরফকনায়। পাদ্রী আর মহিলা দুজন আমাদের অজান্তেই কোনো এক স্টেশনে নেমে গেছে। তখন আমার আরো বেশি করে মনে হতে লাগল যে ওই ভুতুরে রেলগাড়িতে যাত্রী শুধু আমি আর মা। আমার সামনে বসে, জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এর মধ্যেই মা দু-তিনবার ঝিমিয়ে নিয়েছেন। তারপর হঠাৎই পুরোপুরি জেগে উঠে আবার সেই ভয়ংকর প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করলেনঃ

‘তাহলে তোর বাবাকে কী বলব?’

মনে মনে ভাবলাম যে আমার সিদ্ধান্ত বদলের জন্য যা-হোক একটা উপায় খোঁজার চেষ্টা থেকে তিনি কখনো বিরত হবেন না। কিছুক্ষণ আগে একটা মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিলেন, আমি তা সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দিয়েছি। কিন্তু তাতে দমে যাওয়ার মানুষ যে তিনি নন, তা আমি জানতাম। তা সত্ত্বেও আবার এখন শুরু করায় একটু অবাকই হয়েছিলাম। আরেকটি নিস্ফল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আগের চেয়েও অনেক শান্ত স্বরে উত্তর দিলামঃ

‘বাবাকে বোলো, আমি জীবনে শুধু একজন লেখক হতে চাই আর সেটাই হব।’

‘তুমি যা হতে চাও, তাই নিয়ে ওর কোনো আপত্তি নেই,’ মা বললেন, ‘শুধু যে কোনো একটা বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করে নাও।’

আমার দিকে না তাকিয়েই কথা বলছেন মা। এমন ভাব করছেন যেন আমাদের এই কথাবার্তার চেয়ে জানলার বাইরের চলমান জীবনের প্রতিই তাঁর বেশি আগ্রহ।

‘জানি না কেন এত জোর করছ, যখন ভালোভাবেই জানো যে আমি আমার সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়ব না।’

সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার চোখের দিকে তাকালেন এবং কৌতূহলের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেনঃ

‘কি করে বুঝলে যে আমি জানি?’

‘কারণ তুমি আর আমি একই ধাতুতে তৈরি,’ আমি উত্তর দিলাম।

টীকাঃ

১। পারামবিরোঃ লাতিন আমেরিকার একটি দেশ সুরিনামের রাজধানী।

২। দোন আন্তোনিয়ো দাকোন্তেঃ গার্সিয়া মার্কেসের পিতামহ কর্নেল নিকোলাস রিকার্দো মার্কেসের বন্ধু দোন আন্তোনিয়ো দাকোন্তে ফামা ইটালিয়ান অভিবাসী। আরাকাতাকায় তাঁর বাড়ির সামনের অংশে ছিল ওলিম্পিয়া সিনেমা হল। গার্সিয়া মার্কেস বলেছিলেন, ওই হলের কাঠের বেঞ্চে বসেই সিনেমার প্রতি তাঁর আকর্ষণের সূচনা হয়।

৩। গ্রিংগোঃ লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে গ্রিংগো বলতে ইংরাজীভাষী মানুষ, বিশেষত উত্তর আমেরিকার মানুষদের বোঝায়।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *