/ / হেমলতা কেরকেটা-র লেখা

হেমলতা কেরকেটা-র লেখা

শেয়ার করুন

ছবি নিয়ে পড়াশুনা করিনি। ছবির অ আ ক খ কিছুই জানা নেই। জানা নেই রং-ছায়ার মানে। আমি শুধু ছবি দেখি। দেখতে ভালো লাগে। ছবিকে নিজের মতো বয়ান করি নিজেরই মনে মনে। কালো কিংবা ধূসর, লাল কিংবা নীলের গল্প শুনেছি গানে, কবিতায়। যারা ছবি নিয়ে পড়াশুনা করেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চয়ই আমার থেকে আলাদা। ঠিক আর বেঠিকের প্রশ্নে যাচ্ছি না। আমার মতো যারা ছবি নিয়ে পড়াশুনা করেননি তাদের দৃষ্টিতে ছবি কী গল্প বলে সেটা জানতে “আপনপাঠ” পত্রিকা আগ্রহী বলে আমি সত্যিই খুব আনন্দিত।

শিল্পী: ভাস্কর প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

অনেকগুলো ছবির মাঝে আমি বেছে নিয়েছিলাম এই ছবিটিকে। ছবিটি বেছে নেওয়ার পেছনে আছে ছোটোবেলার স্মৃতি আর বড়োবেলার বাস্তব। ছবিটি দেখেই মনে পড়েছিল, “আটকাম চাটকাম দাহি চাটকাম, বাইর ফুলে বারালি, শাওয়ান-ভাদো কারালি। যাউ বেটা গঙ্গা, গঙ্গা সে যামুনা…” ছড়াটি। এই ছড়াটি ব্যবহার করা হত আঙুল গোনা খেলার সময়। ঠিক যেমনটা হয়, “ইকির মিকির চাম চিকির” এর বেলায়। কিন্তু “আটকাম চাটকাম”-এ আঙুল গোনার শেষে হাত মুঠো করে পেছনে নতুবা বগলতলায় রেখে, খেলার সাথীরা একে অপরকে জিজ্ঞেস করে কার হাতের মুঠোয় কী আছে? হাতের মুঠোয় খাবার জিনিস যেমন, দই, চিঁড়া, মিষ্ট দ্রব্য, অথবা অন্য কোনো মজাদার খাবার আছে বলেই বলা হয়। এবং সেই সমস্ত খাবার তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়ে চেটেপুঁটে খেয়ে নেয়। এই কাল্পনিক খাবারগুলির না আছে গন্ধ, না আছে বর্ণ, না আছে স্বাদ। সম্পূর্ণ কাল্পনিক হওয়া সত্ত্বেও খাওয়ার ভান করা আর পেট ভরার অভিনয় করা এই খেলাটিতেই সম্ভব।

ছোটোবেলার এই খেলাটির মতো বাস্তবে না খেয়ে পেট ভরার অভিনয় করে থাকা যায় না। জীবন নির্বাহের জন্যে জীবিকা চাই। কিন্তু জীবনের তাগিদে জীবিকা বেছে নেওয়ার ব্যাপারটা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত?

নিজের ইচ্ছেতে বেছে নেওয়া জীবিকা কিন্তু নিছক নিজের ইচ্ছা নয়। ছোটোবেলা থেকেই জীবিকা নির্বাচনের একটা জটিল প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ছোটোবেলা থেকেই শিশুদের মনে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যারিস্টার, পুলিশ, পাইলট, এর মতো কিছু নির্দিষ্ট কাজকে বেছে নেওয়ার জন্যে স্বপ্ন দেখানো হয়। এটা মোটামুটি স্কুল যাওয়ার আগে থেকেই সমাজ তার ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। কোনো শিশু যদি “তুমি বড়ো হয়ে কী হবে?”, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে তবে প্রশ্নকর্তাই তার জন্যে একটার পর একটা উপরে উল্লেখ করা জীবিকার কথা option হিসেবে বলা শুরু করে দেন। “বড়ো হয়ে কী হতে চাও” প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায়, “বড়ো হয়ে কী চাকরি করবে?” এবং ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়, চাকরি কিন্তু পেতেই হবে। বাবা-মা, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শি, সকলেই শিশুটির বেড়ে ওঠার মধ্যে যে কতবার বুঝিয়ে দেয়, চাকরিই জীবন নির্বাহের একমাত্র উপায়, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ফলে চাকরি পাওয়ার ইচ্ছার সাথে চাকরি না পাওয়ার ভয়ও শিশুটির মধ্যে বিকাশ হতে থাকে। সোজা কথায়, এ এক ধরনের ষড়যন্ত্র। চাকরির পদের সংখ্যা এবং প্রার্থীর সংখ্যার কোনো সামঞ্জস্য নেই জানা সত্ত্বেও সেই পথে একপ্রকার জোর করে ঠেলে দেওয়া হয়। প্রথাগত শিক্ষা গ্রহণ শেষ হয়ে গেলে, ‘এখন কী করছ?’, ‘কী করবে?’, ‘এ কি চাকরি পাওনি’। চাকরি না পাওয়া ছেলের বাবাকে জিজ্ঞেস করা, ‘ছেলে কী করে?’, নব দম্পতিকে আশীর্বাদ করতে এসে জিজ্ঞেস করা, ‘বর কী করে?’ (মেয়েদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে কিছু ছাড় আছে)। মেয়েরা চাকরি ছাড়া বিয়ের আসরে বসতে পারছে। তবে জায়া ও পতির মধ্যে পতির যদি চাকরি না থাকে তাহলে আরও ভালো করে বুঝিয়ে দেবে চাকরির উপকারিতাটি। এভাবেই আমরা সমাজের ষড়যন্ত্রের জাঁতাকল পিষে চলি অহরহ। এই ষড়যন্ত্র যে শুধু সামাজিক তা নয়, আর্থ-রাজনৈতিকও বটে। শিক্ষাকে আমরা সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার উপায় হিসেবে না দেখে, চাকরি পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখি, অন্যভাবে বললে, সেভাবে আমাদের দেখানো হয়। ফলে চাকরির দিকে চোখ রেখে হাঁটতে হাঁটতে শিক্ষা ব্যবস্থার কঠিন মায়াজালের চক্কর কাটতে থাকি। চেষ্টা আর অপেক্ষায় বছরের পর বছর কেটে যায় কিন্তু মাথায় চাকরি ছাড়া অন্য চিন্তা আসে না। কারণ, এতদিন চাকরি পাওয়ার চাহিদা আমাদের ব্যবহারিক জীবনের অন্যতম প্রধান চাহিদা হয়ে দাঁড়ায়।

“ষড়যন্ত্র” শব্দটি আসলে উপরের ছবিটিই মনে করিয়ে দিল। ছবিটি মনে করিয়ে দিচ্ছে আমারই ছাত্র জীবনের কথা, যেখানে আমরা প্রায় প্রত্যেকেই যেন শিক্ষা পেতে নয়, চাকরি পেতেই স্কুল কলেজে গিয়েছি। ছেলেমেয়েদের চাকরির আশায় অভিভাবকেরা তাদের জমি-জমা, বিষয় সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও শিক্ষার ব্যবস্থা করে। কারণ, চাকরি ছাড়া যুবকদের চিহ্নিত করা হয় “বেকার” হিসেবে। কম বয়সে কেউ কৃষক কিংবা বাবার উদ্যোগের ব্যবসাদার হতে পারে না। হয় চাকুরে, নয় বেকার। ব্যবসা কিংবা কৃষি যেন কোনো কাজ নয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে শিক্ষা ব্যবস্থাই যে এক বড়ো ব্যবসায় পরিণত হচ্ছিল সেদিকে কারও খেয়াল নেই। যে ছেলে কিংবা মেয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারত, তারাও অন্যের ব্যবসায় (শিক্ষা ব্যবস্থায়) টাকা ঢালতে থাকে একমাত্র চাকরির আশায়। একসময় যেখানে সাদামাটা সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে আসা শিক্ষার্থীদের জন্যে চাকরির সুযোগ ছিল, সেখানেই ধীরে ধীরে শিক্ষা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণের ব্যাপার শিক্ষার আলো জ্বালানো থেকে মানসিক ভাবে জ্বালাতন করার ব্যাপারেই বেশি কার্যকারী হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় এতদিনে ঢুকে যায় প্রশিক্ষণের ব্যাপারটিও। একসময় যেখানে চাকুরেরা তাদের কর্মের অভিজ্ঞতা… বিকাশের জন্যে প্রশিক্ষণ পেত, সেটাই পরবর্তীতে হয়ে গেল যারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তারাই চাকরি পাবে, এবং এরও পরে হয়ে দাঁড়াল একমাত্র প্রশিক্ষণ থাকলেই চাকরির জন্যে আবেদন করা যাবে (প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হও, ঝুলি ঝুলি টাকা দাও, তোমার মতো ভুরি ভুরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চাকরিপ্রার্থী অপেক্ষায় রয়েছে)। ততদিনে আমাদের রক্তে রক্তে মজ্জায় মজ্জায় চাকরির ভূত ঢুকে গেছে। তাই চাকরি পদ সংখ্যা: চাকরিপ্রার্থীর হিসাবটা দেখলেও বুঝতে চাই না।

এখন চারিদিকে সত্যিকারের “বেকার” তৈরি হয়ে গেছে। যারা রুটিনমাফিক একটার পর একটা চাকরি পরীক্ষা দেয়। এমএ, বিএড, PhD পর্যন্ত করে 8th পাশ যোগ্যতার চাকরির আবেদনপ্রার্থী হতে বাধ্য হয়। যাদের বাড়িতে গরু আছে তারা গরু চড়ায়, যাদের জমি আছে তারা জমিতে ফসল ফলায়। আর যার বাবা জমি বন্ধক দিয়ে তাকে পড়িয়েছে সে আজকাল নিজেদেরই বন্ধকি জমিতে দিন-মজুরি খাটে, আর পেটের খিদে মেটাতে খেলায় মেতে থাকার চেষ্টা করে আর ভাবে খেলার মতো যদি হাতের মুঠোতে খাবার থাকত… যদি কাল্পনিক খাবারে পেটে ভরানো যেত। উপরের ছবিটি যেন সেইসব ছেলেমেয়েদের প্রতিনিধি যারা “Mission চাকরি”-র জন্যে ছুটতে ছুটতে নিঃস্ব, ক্লান্ত।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.