/ / ঘুণমাটি – বনমালী মাল (পর্ব ৬)

ঘুণমাটি – বনমালী মাল (পর্ব ৬)

শেয়ার করুন

১৫

আজ মালিনীর একলা সকাল। অভ্যাস-ভোরে ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়ে না সে। শরীর ভারী হয়ে আছে যেন। কাল দুপুরের পর থেকে মন এই আশায় ছিল যে, মানুষটা হয়ত কুঁরগির পাড় থেকেই ফিরবে। মানুষ যেমন ফেরে মানুষের টানে। কিংবা রাজহাঁস, কুঁরগির জল, মায়া ঠিকরে ঠিকরে তাকে ফেরত পাঠাবে রামচকে। ক্রমে সন্ধ্যা রাত্রি হয়, রাত্রি যখন নিদ্রা, পঞ্চু ফেরে না। নেভানো উনুন, ভাতের কাল্পনিক ধোঁয়া, হাঁড়ি আর একরাশ অন্ধকার দেখতে দেখতে মালিনী কখন যেন চোখের সঙ্গে সখ্যতা করে ফেলে। এখন বিছানা ছেড়ে বাইরে গেলে সবাই তাকে জিজ্ঞাসা করবে পঞ্চুর কথা। আনাচে কানাচে কথা ঘুরে ঘুরে সবাই জেনেছে পঞ্চুর রামচক ছাড়ার কথা। মালিনীর কাছে প্রশ্ন ক’রে ক’রে আরো গভীরে যেতে চাইবে তারা। কী জবাব দেবে সে!

বিছানায় শুয়ে থাকতেই ঘুমের ঘোর কেটে গেছে মালিনীর। ধীর পায়ে দুয়ারে নামে। সবার প্রথম সে ইচ্ছে করেই চাকের দিকে চোখ ফেলে। এই দেখা এতদিনের দেখার থেকে যে কত আলাদা, সে কেবল মালিনীই জানে। চাকের কাছে রাখা একটা সরায় মাটি-জল স্থির বসে আছে যেন কতদিন। তার পাশে জল মাটি পড়ে পড়ে তাকে আদি বাসিন্দা করেছে যেন। সেদিকে এগিয়ে যায় মালিনী। স্বচ্ছ জল। ঘোলা কেটে গেছে কবেই। পঞ্চু থাকতে চাক ঘুরত। জলে হাত পড়ত। সরার জল কত মাটি থিতিয়ে রেখেছে নীচে। চাকের সোজাসুজি একটা ছোটো জানালা দিয়ে সকালের অবুঝ আলো এসে পড়েছে। নিজেকে গুটিয়ে রাখা একটা কেঁচো আলোর আঘাতে উত্তাল ঢেউয়ের মতন বাঁক নিচ্ছে শরীরে। কী অস্বস্তি তার! মালিনী একবার চোখের পাতা ফেলে সেদিকে এগিয়ে যায়। জানালাটা ঢেকে দেয় একটা ছেঁড়া কাপড়ে। মুহূর্তেই একটা ছবির মৃত্যু হল কিংবা উড়ে গেল ক্যানভাসের আদি পিতা।

১৬


শতাব্দী প্রাচীন একটি বটগাছের মতন রামচক গর্ব আর সমীহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যার ক্ষয় আর বৃদ্ধি থেমে গেছে। কিংবা এত ধীর সে বিবর্তন, চোখে পড়ে না। শুধু তর্কে আর তর্কেই তাকে পাল্টাতে দেখা যায়।

কাল সারাদিন মেঘ-বৃষ্টি। সূর্যহীন দিন ছিল। আজ সকালে রোদের দুয়ারে মন সেঁকছে কবি। মহাকাব্যের সরঞ্জাম মেলানো। গত কয়েকদিনে রামচকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো অনেকের মতন তাকেও নাড়া দিয়েছে। সে জোর গলায় কিছু বলে না। নিজের অজান্তেই সবকিছু বুঝিয়ে দিতে পারে হয়তো হাবে ভাবে, কিংবা লেখায়। উস্কোখুস্কো চুল। দুয়ারে মাদুর ফেলে মাটির দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। রামচকের বাইরে কবি কখনো যায়নি ঠিকই, তবে সে কবি! বলাই বা নন্দবাবা মারফত অনেক কথা শোনে সে। বাকিটা কল্পনা। তার কাছে বাইরের জগতের না দেখা সত্যি অনেক বিষন্ন মনের জন্ম দেয়। পঞ্চুর এমন চলে যাওয়াতে রামচকের অনেকেই দ্বিধাদীর্ণ চোখ মেলেছে। কবি এ বিষয়ে নির্লিপ্ত। তবুও না ব’লে কয়ে এক একটা নিশ্চুপ বিকেল খুব পীড়া দিয়ে যায় তাকে। প্রতিটা নতুন সকাল তার কাছে যে সাদা পৃষ্ঠাগুলো নিয়ে হাজির হয়, সেগুলো দিনের শেষে এক অসীম অর্থবহ শূন্যতা নিয়ে চোখ বন্ধ করে।

চপলার কাছে এই সকাল নতুন কচি পাতা নিয়ে এসেছে। সে অনুভব করতে পেরেছে কবির মনের কথা। সেই থেকে একটা লজ্জা ভাব তাকে ঘিরে ধরে থাকে। বিশেষ করে যখন সে কবির সামনা-সামনি হয়। এখুনি একটা অল্প পাতার শিমুল গাছের গুঁড়ি পেরিয়ে চপলা এগিয়ে যাচ্ছে টকটকে সবুজ শিশু গাছটার দিকে। পরনে একটা শাড়ি জড়ানো আলুথালু। কবির চোখ পড়ে। কিন্তু রোদের আভা চোখ ঝলসে দিচ্ছে তার। এগিয়ে গিয়ে তাকে থামানোর সাহস নেই কবির। আবার তার মনের অবস্থাও ভালো নয়। কোন্ এক বিষন্ন অলসতা কবিকে থামিয়ে রাখে। চপলাকে ভালোভাবে দেখার জন্য সে উঠে দাঁড়ায় না। অন্য সময় হলে সে চপলার পিছু নিত কিংবা নিজেকে যতটুকু গোপনে রাখা যায়, রেখে বাঁক বদল করা অব্দি দেখে নিত।
চপলা এখন এই সকালেই হাঁটছে পঞ্চুর ঘরের দিকে। তার একটা নতুন কলসি দরকার। পুরনো কলসি কাল সন্ধ্যায় কানা হয়েছে গোধূলির পর। কোনো ব্যস্ততা নেই তার চলনে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টি পুরো রামচককে যেন বিষন্ন করে রেখেছিল। আজ সবাই উৎফুল্ল। পঞ্চুর ঘরের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতেই চপলা কেমন যেন এক ভারী মোটা থমথমে বাতাসে বাধা পায়। আগেও বহুবার চপলা এসেছে পঞ্চুর বাড়ি। মালিনী তাকে কত খাতির করে। বসে বসে গল্প শোনে। কিংবা মালিনী কাজে ব্যস্ত থাকলে পায়ে পায়ে ঘোরে চপলা। কখনো অস্বাভাবিক ভঙ্গীতে মালিনী বকবক করে। চপলার কাছে রামচকের অনেক খবর পায় মালিনী। পঞ্চু ওদের দুজনের কথা শুনে শুনে হাসে কিংবা নির্বিকার থাকে কখনো। রামচকের অন্য পুরুষদের মতন নয় সে। চপলা শুধু নয়, অন্য মেয়েদের প্রতিও তার মন টানে না। মালিনীকে সে যথার্থই খুব ভালোবাসে। পঞ্চু মালিনী দুজনেই চপলার আসাটাকে খারাপ ভাবে নেয় না, চপলার সঙ্গে যে রামচকের অনেক পুরুষের সম্পর্ক, তা তারা জানে, তবুও তাকে ভালোবাসে। স্নেহ করে।

আজ চপলা কেমন মুষড়ে গেছে উঠানে পা দিয়েই। দুয়ার নোংরা। এখনও ঝাঁট পড়েনি। মাথায় হাত রেখে মালিনী বসে আছে চাকের সামনে। চপলা যেন দাঁড়িয়ে আছে এক আধুনিক চলছবির সামনে। মুখ নীচু মালিনী। চুলগুলো বাতাসের রাগে এলোমেলো কিন্তু স্থির। তার খালি পিঠের নীচের অংশ কিছুটা ঘেঁসে আছে ময়লা মাটির দেওয়ালে।যেন এক তাকে নিস্তব্ধ জ্বর ভেতরে ভেতরে কুরে খাচ্ছে। চাক থেকে এইমাত্র একটুকরো মাটির মাংস ছেড়ে পড়ল। স্বাভাবিক হতে চাইল মালিনী।
–এসো। বসো ভাই। কখন এলে?

একসাথে এতগুলো কৃত্রিম কথা মালিনীর খাদ থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টাকে সফল করতে পারল না। ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে চপলা গিয়ে বসে একেবারে মালিনীর সামনে। গায়ে হাত রাখে। উঁকি দিয়ে দেখতে চায় কাউকে। পায় না। এতক্ষণ যে বিস্ময় চপলাকে আটকে রেখেছিল, তার ব্যর্থ সন্ধান সে করে চলেছে।
— কী হয়েছে!
এই একটা কথার ঘা তুলোর বীজের মতন ফাটিয়ে দেয় মালিনীকে। ফুঁপিয়ে ওঠে সে।
একটা কলসি কাখে বসিয়ে মালিনীর বাড়ির উঠানে নেমে আসে চপলা। তার পায়ে একটা শেকল এইমাত্র পরানো হয়েছে। অভ্যস্ত নয়, এমন ভঙ্গীতে হাঁটতে শুরু করে সে। এই ভঙ্গিতে কাখে কলসি থাকতে চায় না। হাতে নিয়ে হাঁটে। পঞ্চুর রামচক ছাড়ার কথা সে এইমাত্র মালিনীর মুখ থেকে শুনল। রামচক নিয়ে সে ভাবছে না, সে ভাবছে মালিনীর ভাবনা নিয়ে।

১৭

এই দুনিয়ায় দু’ ধরনের মানুষ আছে। একপক্ষ বিষাদের ছায়ায় শোকের তীক্ষ্ণতায় দীর্ঘসময় বাসী হাতেই সুতো নিয়ে নাড়াচাড়া করে। বোনে না। এইভাবে সুতো জড়ায়। গিঁট পড়ে দুর্বোধ্য। আরেকপক্ষ যারা ধারক এবং বাহক, যাদের শোক বা বিষাদের ছায়া কাটিয়ে উঠতে হয় খুব দ্রুত। তারা থেমে থাকলে ছায়া আর মেঘ থিতু হয়ে বসে সবার ওপর। বলাই এই সাত সকালেই সতী রোদ গায়ে ফেলে তার কাজ করতে বসেছে। হাতুড়ি ছেনির ঠকাঠক শব্দ। কাঠ এনে কুঁদে কুঁদে তাকে নরম করার অক্লান্ত প্রয়াস। চোখের সামনে সঠিক কোণে যেন তির ছোঁড়ার আগের মুহূর্ত। পাড়া বোঝে বলাইয়ের মনের গতি। কাল পঞ্চু রামচক ছাড়ার পর থেকে কারোরই মনের অবস্থা ভালো নয়। তারা অনুমান করেছে বলাই শুধু পঞ্চুর মায়া ভুলতেই, রামচকের দিগন্ত শক্ত করতেই আজ সাত সকালে মায়া খেলা নিয়ে বসেছে। শুধু বলাই জানে, সে এখন কত স্বাভাবিক। সে এখন ভরপুর শান্ত।

কাল পঞ্চু যাওয়ার পর বলাই কিছুটা মুষড়ে পড়েছিল, এটা সত্যি। সারা সন্ধ্যা সে কাটিয়েছে ঘরের বাইরে কুঁরগির পাড়ে। স্থির অভিমানী জল, গাঢ় নীলাভ। রাজহাঁসের পালকে খেলে যাচ্ছে নানা রঙ। প্রতি রঙ যেন ধরে ধরে বলাইকে মন খারাপ করিয়ে নিচ্ছে। রামচকে কাউকে তার মনের অবস্থা জানাতে চায় না বলাই। তাই এই পাড়ে এসে বিকেল কাটানো। সন্ধ্যার পা ধরে যেন হামাগুড়ি দিতে দিতে ঘরে ফেরে বলাই। সারা রামচক বিষন্ন ছিল কাল। সন্ধ্যায় আলোর রোশনাই থাকে না এখানে, কিন্তু এক মন ভালো করা বাতাস সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে রামচকের ঘরগুলিকে। বাতাসের এমন হঠাৎ মৃত্যু! কাল সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আলোর সাথে সে কোনো কথা পর্যন্ত বলেনি। নিজেকে নামিয়ে নেওয়ার একটা ঘোর তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। আলো অনুভব করতে পারছে বলাইয়ের বেদনার কোষগুলো। তাকে তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বও যেন আলোরই। আঠালো এক নিস্তব্ধতা জেঁকে বসেছিল ঘরটাকে। চলে গিয়েছিল বলাই গভীর ঘুমে।

বলাইয়ের ঘুমে কুঁরগির রাজহাঁসগুলো পাখসাট তোলে আনন্দেই। দুলে ওঠে কুঁরগির জল সহ গোটা রামচক। বাদ যাচ্ছে না ঝাউ ঘেরা ঘোড়া মাঠও। তাদের সাদা সাদা পালক ঘেরে ধরেছে গোটা রামচককে। স্বপ্নে গোটা কয়েক ছিঁড়ে যাওয়া পালক বলাইয়ের শরীরে সেঁধিয়ে যায়। এমন স্বপ্ন সে কতদিন দেখেনি। স্বপ্নের ঘোরেই তার মন দুলে ওঠে। ঝাউপাতাগুলো সুড়সুড়ি দিয়ে কাঁপিয়ে তুলছে বলাইকে। ঘুম ভাঙলে বলাই বিছানায় উঠে বসে। যেন দীর্ঘকাল সে পরমাকে ভাবেনি। এখন বাকি রাতের বাকি স্বপ্নে পরমাকে ছেনি দিয়ে কুঁদবে। পাশে শুয়ে থাকা আলোর ফেরানো মুখে প্রসন্নতার আবছায়া অনুভব করে সে। জড়িয়ে ধ’রে বাহিরে আর ভেতরে দুই নারীকে অনুভব করবে আজ রাতে। এখন ভোর হয়ে আসছে। এই ভোরে এই দুজনকে স্বপ্ন আর বাস্তবে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য আতুর হয়ে ওঠে বলাই। পঞ্চু তার কাছে মিথ্যে হয়ে যায়নি। পঞ্চু তার ভাবনায় থেকেও তার পলায়ন তাকে কোনো ঝড়ের সম্মুখীন করছে না। এই আনন্দ তাকে শিহরিত করে তোলে।
কাল রাতের এই স্বপ্নই বলাইকে ভরপুর করে তুলেছে। কাপড়ের ঝপ ঝপ শব্দে ক্রমশ জোর দিতে দিতে আলো বলাইয়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। বসে। বলাইয়ের মুখে মৃদু হাসির ক্যানভাস। এত আলো এর আগে কোনোদিন তার মুখকে এমনভাবে স্পষ্ট করে দেখায়নি। আলো ভেবেই আছে, বলাইয়ের মন বিষন্ন এক পাত্রে চুবানো থাকবে। গত কয়েকদিনে রামচকের ওপর দিয়ে একটা ঝোড়ো বাতাস বয়ে গেছে। ঝাউ এর ডাল আর রাজহাঁসের পালক এক করে মাখামাখি করে গেছে। রামচককে বলাই কতখানি ধারণ করে আছে, আলো আর পরমা এই সত্যি ভেতর থেকেই জানে।
–বলুন মহারানী!
মুখে একটা আলতো হাসি ছড়িয়ে বলাই তাকিয়ে আছে কাঠ ছেড়ে আলোর আলোমুখে। সবাইকে চমকে দিয়ে ঝাউপাতাকে একগাদা কয়লা করে, রাজহাঁসগুলোকে নোংরা শুয়োরের ঘোঁত ঘোঁত করে চোখের সামনে নিজেকে বদলে ফেলেছে বলাই। আলোর চোখ কুঁচকে গিয়ে কপালে একটা ভাঁজ। এতো বছরের সংসার জীবনে এটা প্রথম বার নয়, কিন্তু যেখানে প্রশ্ন রামচককে নিয়ে, সেখানে বলাই কীভাবে এত নির্লিপ্ত হয়ে থাকতে পারে!

–তোমার মন ভার। তাই তুমি কাজের মধ্যে মুখে আলো মেখে ছল করছো। আসলে তোমার কাজে ফাঁকি আছে। মনে একটা কালো রঙের পাথর।
–মোটেই না। আজ একটা টেবিল বানাচ্ছি। আর তুমি জানো, যে টেবিল বানাতে গেলে মনের শান্তি থাকা দরকার। আমি অশান্ত মন নিয়ে কখনো টেবিল বানাতে পারি না।
টেবিলের একটা পা আড়াআড়ি চোখের সোজা ধরে এক চোখ বন্ধ করে বাঁক লক্ষ করছে বলাই।
–টেবিলই মানুষকে ধারণ করে আসছে শত অতীত থেকে। আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে টেবিলের কাছ থেকে।
–কতটুকু জমি নিয়ে নিজেকে মেলে ধরা যায়!
–মেরুদাঁড়া না বাঁকিয়ে দিনের পর দিন একভাবে টিকে থাকা!
–মানুষকে সোজা হতে দেয়!
–নিজের ছায়াটুকুতেও তার কোনো জোর নেই!
–নিজে কোনোদিন নিয়ম ভেঙে গন্ডী ছাড়িয়ে যায় না!

আলো বুঝতে পারে, বলাই এখন কাজে মগ্ন। হাতুড়ির নরম ঘায়ে ছেনির মুখ সেঁধিয়ে যাচ্ছে একটা নতুন রূপের দিকে। এইসময় বলাইকে একবার খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে তার। ছেনির উজ্জ্বল ধার আলোকে আনমনা করে তোলে। বুকের কাছ থেকে শাড়িটা আলগা নামিয়ে বলাইকে বলে–
–কাল রাতে ওরকম জড়িয়ে ধরেছিলে কেন হঠাৎ! আমি যেন মিলিয়ে যাচ্ছিলাম!
এটা আলোর কথার কথা। আসলে সে চায়, বলাই একবার মুখ তুলে তার ভরা বুক দেখুক। কয়েকটা ভেজা স্যাঁতানো সকাল পেরিয়ে আজ মাটির খুব ইচ্ছে অনেক তাপ আর আলো নিয়ে নিজেকে সহজ করে নেওয়ার।
ছেনিটা গর্ত থেকে বের করে একটা জোরালো ফুঁ দেয় বলাই। কত লেগে থাকা কাঠ-মাংস উড়ে গেল আলোর গা ঘেঁষে। এখুনি ছেনি দিয়ে করা যে গর্তটা নিজেকে এরই মধ্যে আড়াল করতে শুরু করেছে, তাতে একটা আঙুল চালিয়ে বলাই আলোর মুখের দিকে তাকায়।
–ভোরের দিকে পরমাকে স্বপ্নে পেলাম।
বলাইয়ের চোখগুলো এক মেদুর কোমলতায় আচ্ছন্ন হয়ে এলো। অন্ধকারে হারিয়ে যেতে খুব ইচ্ছে করছে তার। চোখ পড়ে আলোর ব্লাউজের যোজক অংশে। যেখান থেকে অন্ধকারের শুরু।
বলাইয়ের স্বপ্নে আলো ছিল কিনা এই নিয়ে আলোর কোনো বিকার নেই। সে জানে, বোঝে, স্বপ্নের বলাই আর বাস্তবের বলাই দুইই মেনে নেওয়া যায়। মেনে নেওয়ার চল আছে। কেননা দুটোই সত্যি। রামচকের নিরিখে সত্যি।
রাস্তার ওপর যেন পা গুনে গুনে এগিয়ে আসছে চপলা। রাস্তার বাঁক ঘুরে চলে যাবে ঘরের দিকে। এখন সে বলাইয়ের ঘরের দিকে মুখ করেই এগিয়ে আসছে। চপলা তার চপলতা হারিয়ে মশগুল হয়ে আছে কোনো হারিয়ে যাওয়ার পথে। হাতে নতুন কাঁচা রঙের কলসি দেখে বলাই আলো দুজনেই বুঝতে পারে, সে পঞ্চুর ঘর থেকে ফিরছে। তার এমন গতি দেখে তারা অনুমান করতে পারছে সবকিছুই। আলো একটা ভারী শ্বাস ফেলে। নীচের দিকে মুখ করে আনমনা হয়েও কাজে মন দিতে চায় বলাই।

নন্দবাবা এই একদিনেই কত দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেন কুঁরগি দেখেনি কতদিন। মাথা দোলানো ঝাউগাছ ছুঁয়ে আসা সতী বাতাস তাকে অতীত ভাবায় না এখন। খোলা মাঠে সেই কবেকার হাঁটু গেঁথে যাওয়া সাদা ঘোড়াটার কথা মনে পড়ে না। ঘোড়া মাঠে বসে ঐতিহ্যের গর্বে সে আর গর্বিত হয় না এখন। রামচক তার কাছে শুধু একটা চিহ্ন হয়ে পড়ে থাকে। কোনো শামুক যেন পিঠে সোনালী একটা খোল চাপিয়ে নিজেকে ঘরবন্দী করে রাখছে। বাইরের জগতে তার আনাগোনা নিষেধ। নিজেকে গোপন বন্দী করে রাখার এমন প্রয়াস তাকে কোনোদিন করতে হয়নি।

ঘরের কোণে দিন রাত এক করে একজোড়া চোখ মরা মাছের চোখের মতন স্থির চেয়ে আছে। সেই চোখের গভীরতায় তল খুঁজতে রীতিমত বেগ পেতে হয়। এখন নন্দবাবার সঙ্গে কেউ বড় একটা কথা বলে না। সবাই বোঝে তার কষ্টের জায়গাটা। তার চোখের চাউনি নিস্তেজ হচ্ছে দিন দিন।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *