|

একজন বারীন ঘোষাল – সব্যসাচী সান্যাল

শেয়ার করুন

‘ফিফটি থাউজ্যান্ড, ম্যানেজেরিয়াল জব, কাম হাল্কা হ্যায়, কভি ভি আ জাইয়ে মিঃ ঘোষাল’ – চুলে কলপ করা, সাফারি স্যুট, ফোলিও ব্যাগের পান্ডেজী বলছিলেন। বারীনদার মুখে মুচকি হাসি – ‘আরে যো ছোড় দিয়া বো ছোড় দিয়া, আভি দোস্ত কো ঘর লে জানা হ্যায়’। ২০০৫, পঞ্চাশ হাজার টাকা, টাটানগর স্টেশনে দাঁড়িয়ে অফার  ও রিজেক্ট। আমাকে নিতে এসেছিল বারীনদা নিজে ড্রাইভ ক’রে, সেই অতি যত্নে মেনটেন করা সাদা মারুতি ৮০০। –‘তুমি আস্তে গেলে কেন?’ -‘তুই রাস্তা খুঁজে পাবি না বলে’। জুবিলি পার্ক, ডিমনা লেক দেখাতে দেখাতে বলল ‘আগে আসল তীর্থে চল, পড়ে বাড়ি’। সীসাম রোড। স্বদেশদার বাড়ি। বৌদি; কাজু ফ্রেঞ্চ টোস্ট। স্বদেশদা সিগারেট অভার করলেন। নিলাম না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল বারবার। স্বদেশ সেন চোখে সামনে। বাইরে বেরোচ্ছিলাম সিগারেট খেতে, চোখে জল। ঘন্টাখানেক। স্বদেশদা নিজে বাইরে এসে গাড়িতে তুলে দিলেন। কান্না বাধ ভাঙ্গল। বারীনদা-‘সব্য, তুই খুব ভালো ছেলে, আই এপ্রিসিয়েট ইট-লক্ষ করেছি তুই সিগারেট খেতে বাইরে বেরোচ্ছিস, সম্মান দিতে জানাটা ভালো’। অথচ বারীনদা প্রথমদিন থেকেই যেন সমবয়সী বন্ধু। কোনো সংকোচ নেই, জড়তা। একসাথে সিগারেট, মদ।

১৯৯৭ থেকে বিদেশবাস, ৯৮ থেকে কৌরব অনলাইন দেখি। দ্বিতীয় সংখ্যা; ‘রক্তময়, আজ রুয়াম জঙ্গলে চল’ ৭০-এর কবিতা, না-না উজ্জ্বলের মধ্যে – বিজনের আলোবাতাস-সেই বিজন, যে ওল্ডহোমের সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে দেয় শূন্য প্যারাম্বুলেটর। বারবার ফিরে পড়া, কৌরবের ‘জটিলতম’ কবিকে। যে’খানে যেটুকু। তারই মধ্যে লেখা পাঠানো আর্যনীল মুখোপাধ্যায়কে-নিরুত্তর। এরপর মুক্তমঞ্চ বলে এক ওয়েব পোর্টালে আলাপ রাদ আহমদ, মোশাররফ হীরা, মেসবাহ আলম অর্ঘ্য, কল্যান দাস-এর সঙ্গে। বারীন, কমল, আর্যনীল, শংকর – প্রত্যেকে ইউনিক – আমরা উইটনেস, আলোচনা, বাংলাকবিতা; প্রথার বাইরে তার ‘ঘুরিয়ে পরা পায়ের পাতা’, এদিকে ওদিকে শোনা, আর্যনীল মুখোপাধ্যায়ের কলামে ‘অতিচেতনার কথা’। এবং কৌরবে লেখা পাঠানো – এবং নিরুত্তর।

 

২০০২ আমার জীবনের প্রথম কলকাতা বইমেলা। দক্ষিণ কোরিয়ার পাট চুকিয়ে সুইডেনে যাওয়ার আগে কিছুদিন দেশে। ময়দানে কৌরবের স্টল খুঁজে বের করি – চেয়ার থেকে একজন উঠে দাঁড়ান আমাকে দেখে-ম্যাজিক। আমি বলি বারীনদা? বারীন ঘোষাল? মাথা নড়ে, মুখে হাসি, হাত ধরে স্টলে নিয়ে যান। বলি-‘অতিচেতনার কথা কিনব’, উনি বলেন-‘আগে এইটা পড়ুন’ – হাতে ধরিয়ে দেন কৌরবের ‘খালাসীটোলা’ সংখ্যা, শংকর লাহিড়ির মুখার্জি কুসুম, কমল চক্রবর্তীর স্বপ্ন। কৌরবের প্রায় সমস্ত বই একলপ্তে, সুদেষ্ণা মজুমদার ব’লে একজন সুন্দর করে প্যাক করে দেন… গোগ্রাসে গেলা শুরু হয় এবং ৯০% বই সঙ্গে  করে স্টকহোমে, নতুন করে ঘর পাততে। সুইডেনে এসেই শমিত রায়ের ‘বইপাড়া’ পোর্টালে আর্যনীল মুখোপাধ্যায়ের করা স্বপন রায়ের কবিতার আলোচনার থ্রেডে তর্কালাপ শুরু। ৯৮-২০০২, আমার চার বছরের পারসিস্টেন্ট খচড়ামোর বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন আর্যনীল, তারপর মেলো ডাউন হয়ে যান এই শুনে যে, -‘ “একটি শব্দের অর্থ, আরেকটি শব্দ”, বারীন ঘোষালের এই কথাকে আমি রিয়েলাইজ করি’ সেই রাতেই ব্যক্তিগত মেল, তারপর কৌরবে অন্তর্ভুক্তি। ২০০২ থেকে ২০০৭, টানা ৫ বছর দিনে অন্তত একঘন্টা বারীনদা, আর্যনীলদা, আমি, কখনো অভিজিৎ মিত্র, ই-মেল এ। কবিতা, আড্ডা, আলোচনা; স্বদেশ সেন থেকে কেরুয়াক, ফেরলিঙঘেটি, অ্যাশবেরি, তরুণতম শান্তনু মন্ডল, অরুন দাস। উপলব্ধি বনাম অনুভূতি, ইন্ট্রোস্পেকশান ও ইন্সপেকশান। গোটা বাংলা কবিতার জগতে আমার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কেউ বলে জানা নেই। আমার ‘A’ আর্যনীল, ‘B’ বারীন। নাহ অতিচেতনার কথা আমার কাছে তত্ত্ব নয়। আমার কবিতাভাবনার জানলাগুলো খুলে দেওয়ার জরিয়া মাত্র। সহমত বা বিরোধিতার প্রশ্নই ওঠে না কারণ আমি তার থেকে এ’টুকু নিয়েছি যে – এ’ভাবেও ভাবা যায়। এবং নিজের কবিতা ভাবনা খুব বেসিক তিন-চারটি থামের ওপর দাঁড় করিয়েছি – যা আমার নিজস্ব। অতিচেতনার কথা আমার নিজের ফিলটার গড়ে তোলার কাজ করেছি। কী নেব, কী বর্জন করব – এইসব। এইটুকুই। কিন্তু কবিতা, বারীনদার কবিতা আমি বরাবর এপ্রিসিয়েট করতে পেরেছি, রিলেট করতে পেরেছি, যাকে বলে ‘বোঝা’ তাও খানিকটা, মানে তার রস, হিউমার… বারীনদা হেসেছে – ‘তুই বুঝবি, তুই বাঙ্গাল, নীলু ব্যাটা ঘটি ওর হিউমার কম’- ঘটনাচক্রে আমাদের দুজনেরই জন্ম ত্রিপুরার আগরতলায়-সে নিয়েও ঠাট্টা-মজাক।

২০০৪-এ বারীনদা সদলবলে বোলপুর; প্রণব পাল, স্বপন রায়,  রঞ্জন মৈত্র, ধীমান চক্রবর্তী, রামকিসোর ভট্টাচার্য্য, ইন্দ্রনীল ঘোষ, রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়, শুভংকর দাশ, শর্মী পান্ডে। সকাল থেকে টৈ টৈ-সাঁঝবেলায় দারু, কবিতা, গান, ইন্দ্রর বাঁশি বাজানোর তুমুল কোশিশ। শান্তিনিকেতনে রতনপল্লীর হোটেল থেকে আমার মুলুকের বাড়ি ৮-৯ কিমি। সাইকেলে। শীতের রাত। বারীনদাই বারবার, ‘এত রাত করে আর ফিরতে হবে না সব্য, বাড়িতে ফোন করে দে, এখানেই থেকে যা – অ্যাডজাস্ট করে নেব’। বড় মানুষ ঐ ছোট ছোট আন্তরিক জেশ্চার দিয়েই চেনা যায়, তার দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা। ভালবাসতে জানতো বটে বারীন ঘোষাল। বারীঙ্কে বোহেম বলে যারা চেনেন, তাঁরা জানেন না তাঁর নিয়মানুবর্তীতার কথা, পরিশ্রমের কথা, একবার কোন কথা দিলে তা জানপ্রান দিয়ে রাখার কথা। মনে পড়ে হাতের চূড়ান্ত ব্যথা নিয়েও মুন্সী প্রেমচন্দ-এর অনুবাদ। ডেডলাইন রাখতে হবে। মধ্যবিত্তের নানা রক্ষণশীল দোষ থাকে কিন্তু তার একটা তুলসীতলাও থাকে যেখানে তাকে সন্ধ্যায় ফিরতে হয়, সে ফেরা নিজের কাছে ফেরা। বারীন ঘোষাল সমস্ত সংস্কার কাটিয়েও ওই মধ্যবিত্তের ‘তুলসীতলা’ ভোলেনি, সারাদিনের অ্যাডভেঞ্চারের পর যে স্যানিটির কাছে, যে সততার কাছে ফিরে আসতে হয়। তাই বারীন ঘোষাল জাস্ট আর একজন সেলিব্রিটি নন, এক আপাদমস্তক মানুষ।

২০০৭-এর শেষে দেশে ফিরি, এক সামন্তবাদগ্রস্ত উত্তর-প্রদেশে; কালচারাল শক, নতুন চাকরির চাপ, ক্রমাগত স্ট্রেস – লেখালিখি ছেড়ে দিই।  কোথাও একটা সংকোচ কাজ করতে থাকে, নিজেকে মূল্যহীন মনে হতে থাকে, লেখার জগতের সমস্ত বন্ধুত্ব থেকে সরে আসি। সেই সময়েও আর্যনীলদা নিয়মিত মেল। উত্তর দিই না। বারীনদা দিনের পর দিন ফোন, কখনো অন্যদের সাথে আড্ডা মারতে মারতে – ‘সব্য, ইয়ার, তোর কথা মনে পড়ছে, কে এসেছে দ্যাখ, কথা বল’। ২০০৮ এর শীতে বারীনদা নিজেই চলে আসে লখনৌ, সঙ্গে পাহাড়ু (প্রনব দে)। মা, সোমালি, কঙ্ক সবার সঙ্গে প্রাণমনখোলা আড্ডা দুই প্রিয় মানুষের, রাতে কোয়ার্টার থেকে চারকদম দূরের গেস্ট-হাউসে মদ, কবিতা, গান। আমার এক দোস্ত, পেশায় ড্রাইভার – বীরেন্দরজী-অদের নিয়ে নবাবগঞ্জে। বারীনদা, প্রনবদা ফিরে যাওয়ার একবছর পরও বীরেন্দরজী জিজ্ঞেস করতে ভুলত না – ও দাদালোগ ফির কব আয়েঙ্গে?

২০১২ থেকে প্রজেক্ট বানিয়ে লেখা শুরু করি। বারীনদা, বিক্ষিপ্তভাবে সেইসব কবিতা অনেকসময় নিতে পারেনি-বলেছে, ‘সব্য, কথা কমা’। আমি নিজের কাজ করে গেছি। পরে পুরো প্রোজেক্ট বই হলে হাতে নিয়ে পড়েছে, আর পাহাড়ুর সাথে বারবার উচ্ছ্বাস! দুই বুড়ো একসাথে ফোনে। এত ভালবাসার যোগ্য ছিলাম কি – না জানি না, আমার সন্দেহ আছে, আমি চিরখচ্চর, ইমোশনালি ইনার্ট, আলগা মানুষ, কোনকিছুর প্রতিই যার লগাও কম। তবু।

২০১৭-র বইমেলার ৩ দিনের জন্য গেছিলাম। শেষ সন্ধ্যেয় বেরিয়ে আসার আগে প্রণাম করতে হাত ধরে বলল – ‘তুই এই যে বলিস চাকরী ছেড়ে দেব, এইসব পাগলামি ছাড়’ … চোখ চিকচিক করছিল … বলল – ‘আর দেখা হ’বে কিনা কে জানে’ – একটা শঙ্কা বিঁধেই ছিল। সেই তো চলেই গেলে। বুড়ো।

 

শেয়ার করুন

Similar Posts

  • কাদম্বরী – শৌনক সরকার

    সময়টা তখন ১৮৭০ থেকে ১৮৮৪ -এর মধ্যে ,ইংরেজদের তখন রাজত্ব কলকাতায়,এক এক করে বাংলার প্রতিভারা উন্মেষিত হচ্ছেন । এই সময় বাংলার ঠাকুর পরিবারও পিছিয়ে নেই , দ্বিজেন্দ্র;নাথ , সত‍্যেন্দ্রনাথ ছাড়াও ছিলেন জ‍্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অর্থাৎ রবি ঠাকুরের প্রিয় নতুন দাদা । তাঁর জ‍্যোতি দাদা প্রসঙ্গে রবি ঠাকুর বলেছিলেন- “জ‍্যোতি দাদা যাকে আমি খুব মানতুম,বাইরে থেকে তিনি…

  • |

    সম্রাট – সৌরাংশু

    আমরা এখনও অতটা বুড়ো হইনি যে পেলেকে খেলতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের ছেলেবেলায় লালকমল-নীলকমল, গ্রিমস ভাইরা, কথামৃত, পুরাণ, গাভাসকার, বিষেন বেদি, জন ম্যাকেনরো, প্রকাশ পাড়ুকোনের সঙ্গেই চলে এসেছিলেন পেলে। ছেলেবেলা থেকেই পুরো নাম জানতাম। এডসন আরেন্তাস ড্যু নাসিমেন্টো। জানতাম, ওই কালো রঙের সুঠাম চেহারার মাঝারি উচ্চতার লোকটি আমার বাবার যৌবনে বিশ্ব মাতিয়েছেন। পেলে আমাদের ছেলেবেলায় এক…

  • |

    বালুকা, বনস্পতি – গৌতম বসু

    কবি ও সম্পাদক মহাশয় একটি বিচিত্র প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ অতর্কিতে আমার উপর নিক্ষেপ করেছেন। বিশেষ কোনো প্রসঙ্গে বিচার করে একটি গ্রহণযোগ্য মীমাংসা সূত্রে পৌঁছনো যে সম্ভব, এ-মনোবল আমার এক সময় ছিল, আজ আর নেই। অন্য কাউকে কিছু বোঝাতে যাওয়ার প্রচেষ্টার করুণ পরিণতি দেখতে পাই সর্বত্র, চলার পথে, কর্মস্থলে, গৃহে, দূরদর্শনে সম্প্রচারিত বিভিন্ন বিবাদানুষ্ঠানে। এখন মনে…

  • বারীন ঘোষাল – সম্পাদকীয়

    অমর্ত্যলোক থেকে ভেসে আসা — ৪ ডিসেম্বর, ১৯৪৪ অমর্ত্যলোকে ভেসে যাওয়া — ২৯ অক্টোবর, ২০১৭ “আর হেসে উঠলো না চম্পকদানী তার কী যেন একটা হয়েছে খুন খুন করে কেঁদেই গেল আজকে” [ বারীন ঘোষাল ] কোনো কোনো মানুষের হারিয়ে যাওয়া যেন ঠিক হারিয়ে যাওয়া নয় বরং আরো নিবিড়ভাবে টের পাওয়া। যখন এমন এক পরিস্হিতির মুখোমুখি…

  • ম্যাকবেথ একটা অসুখের নাম – সুমন চক্রবর্তী

    ২০১৩ তে মঞ্চস্থ কৌশিক সেনের স্বপ্নসন্ধানীর ‘ম্যাকবেথ’ নাটকটি আপাতভাবে রাজনৈতিক পালাবদল আর আশাভঙ্গের যন্ত্রণাকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা স্থূল দাগের নান্দনিক প্রচেষ্টা বলে মনে হলেও নাটকটি খুব সুনির্দিষ্টভাবেই বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর সংস্কৃতিমনস্ক ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করার একটি নাটুকে প্রয়াস ব্যতীত কিছু নয়। এ নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধলে কৌশিক আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেন একজন বিপুল জনসমর্থনের বলে রাতারাতি…

  • দানবেরা জেতে না কখনও – সুকুমারী ভট্টাচার্য

    প্রায় দুমাস ধরে চলছে গুজরাতের গণহত্যা। যেখান থেকে এর সূত্রপাত সেই গোধরার‌ ব্যাপারে একটা প্রশ্ন থেকে গেছে। রাতের অন্ধকারে একটা ট্রেন ছোট একটা স্টেশনে দাঁড়াতেই কয়েকজন মুসলমান (?) নির্দিষ্ট একটি কামরায় অভ্রান্তভাবে অগ্নিসংযোগ করল; তারা বন্ধ কামরাগুলি বাইরে থেকে দেখে কেমন করে জানল কোনটাতে করসেবক আছে? খবর যা বেরোচ্ছে তাতে দেখছি অন্তত পাঁচ ছ’ মাস…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *