মহুয়া সেনগুপ্তর দশটি কবিতা

শেয়ার করুন


শত জলকণায় নামগান বাজে।
জন্ম-জন্মান্তর ঘুরে ঘুরে আসে
সীমান্ত লঙ্ঘিত পায়ে।

অতি দূরদেশে তাঁর পথিকসাজ,
মালিনীর দীন কণ্ঠহার বুকে জাগে—
লতা থেকে চ্যুত অশ্রুফুল,
মেঘ থেকে চূর্ণ জলধারা।

দুলে ওঠে অনন্ত পথ, ছুটন্ত অশ্বখুরধার,

তোমার জন্য
সখা, একটি তণ্ডুল আছে
ক্ষুধিতের শাকান্নে ধরা।


একটি আলোকিত নদীর পাশে শুয়ে আছি, একবস্ত্রে।
আমার প্রকৃতিজন্ম মাদুর করে
বিছিয়ে দিয়েছি ধুলোয়।

আকাশপথে সুরের পালকি বেয়ে
উৎসব ঘন হয়ে ওঠে।
বুকের ওপর আঁকা আছে
মৃত্তিকাতিলক।

রূপান্তরিত—
কবে, কখনও এ মাটির বুকে
নেমে আসো যদি
নয়নাভিরাম।


পায়ের কাছে শুয়ে আছে পথ।

জানি না শুনতে পাব কিনা,
শুনতে পেলে
ও পথের নীরব আহ্বান
কে পারে ঠেলতে দূরে!

ছায়া ছায়া মেঘলা দুপুরে
একদিন ডেকে নেবে
আনন্দপুরে,
দরজা ঠেলে,
ধূলিময় পথের জগৎ।

ভয় নেই–
তোমার শহরে
আমি কখনও যাব না!


জলের মর্মভাষা জানো?
জলের স্বপ্ন দেখি–
নতমুখে নেমে যাচ্ছি জলের আদরে।

জল আমায় বুকে নিয়ে খেলা করে,
নিরন্তর–
বহু বহু যুগ
আমি কারো স্বপ্নে আসি না।


পাহাড় ডাকে স্বপ্নে
একদিন ঠিক চলে যাব।
পাইন কাঠের ঢালু ছাদ ঘর।

তারপর কোনোদিন মায়াবী জ্যোৎস্নায়
নিজেকে হারাব–
ভাসিয়ে দেব আলতো
সানুদেশে,
অন্তিম ফার্নের শয্যায়!

নিরঙ্কুশ শান্ত জীবনে
ঘন কুয়াশা, মায়াঘর,

আমার অন্যজন্ম আশা!
আমার ইচ্ছামৃত্যু বর!


ক্ষুধার্ত, তুমি শুধু
আলোকবর্ষ দূরের নও,
কালের যাত্রায় একাকী অগ্রগামী মাছ।

প্রাণপণ, তোমাকে টানছি
স্পেস-টাইমের জালে বন্দি
আলোর পাত্র ভেঙে দিয়ে।

চাইছি
এই সিঙ্গুলারিটি বিন্দুর আকর্ষণে
ও সাঁতার পথ বেঁকে চুরে যাক!


তুমি শুধু বয়ে যাও
গতির আবেগে,
অধরার তৃষ্ণা তোমার।

কোন্ ঘর, কোন্ ঘাট তোমাকে
স্থিত রাখবে?

দূরের ডাক তোমায়
পথ ভুলিয়ে নিয়ে যায় বারবার
নিঃসঙ্গতার তীব্র টানে।

ভুলে যাও বিষণ্ণ নদ,
ওই জলে মধুকের ছায়া পড়েছিল
কোনোদিন।


জ্বরের ঘোরে আর্ত
যাকে তুমি শুশ্রুষা ভাবো
সে তোমার অসুখ বিকার।

অবেলার ঘুম ভেঙে
নিরাময়—
জ্বরের পারদ নেমে গেলে
বলো, উন্মাদিনী!
ও কেউ ছিল না আমার!


নীলবর্ণ আলোয় শুয়ে আছি
ধ্বংস হয়ে, অপেক্ষায়—
আকাশের কান্না ঝরে কিনা!

অবশেষে
সমাপনের সুরে
প্রতীক্ষার চাদর জুড়ে
পাপড়ি ঘন হলে
আমার শবাধারের রং
আরও পীত,
আরও একটু ছায়াতুর হল।

১০
এ যাত্রা পরিণামহীন।
অনেক বেদনায়
এ বাসনার রাশ টেনেছি
প্রণতিতে।

বিগ্রহের হাতের ঘ্রাণ
পাব না কখনও।
তাই চন্দন ঘষতে বসে
আমি লম্বা করে শ্বাস টানি,
দুই চোখ বুজে আসে
প্রণয়মঙ্গলে।

শেয়ার করুন

Similar Posts

  • অরূপরতন হালদার-এর পাঁচটি কবিতা

    অর্ধেক জীবনে হলুদ পুকুর বোঝে জলের কামান ক্লান্ত হয়দূরের মেঘ এসে তোমাকে নিয়ে যায় ব্যর্থ প্রদেশেসেখানে শীতের অর্গ্যান বাজেসব স্বরলিপি গূঢ় নয়, মেধার ছোঁয়াচে আলোয় সারারাত হিম পড়েরক্তের ছেঁড়া বনপথে গোলাপের ডাল জেগে ওঠেস্মৃতির শহর কীটদষ্ট আজ – নক্ষত্রের এলোমেলো সাজআমাকে ট্র‍্যাপিজে নিয়ে যাবে, শাদা চাঁদ নড়ে উঠে হঠাৎজুগুপ্সায় ছুটে যায় পুরোনো ছুরিকা বেয়েছুরিতে মুগ্ধ…

  • গুচ্ছ কবিতা – রাজদীপ রায়

    মারী ১ অথচ পৃথিবীতে শুরু থেকেই জীবাণু ছিলমৃত্যু-সম্ভাবনা নিয়ে গড়ে উঠেছিলপোকার জীবন এই তবু, তারই মধ্যে কোথাও কোথাওনক্ষত্রের সংকেতেমনে হয়েছিল বেঁচে থাকলে, পৃথিবীকে আরও সুন্দর দেখায়। ২ আরও একটু দূরে পড়ে আছে অজানা শরীর শীতকাল এখনও আসেনিতবুও বরফ পড়ে, হাড় জুড়ে যায় শকুন নেমেছে, ছিঁড়ে খাচ্ছেশরীরের অবশেষ পোশাকের অংশ দেখে মনে হয়চিনি, তবু আমি তাকে…

  • জয়ীতা ব্যানার্জির পাঁচটি কবিতা

    সমস্ত সূর্যাস্ত গেল প্রার্থনাবিহীন ১ তুমি সে অভাববোধ। আত্মরতি অথবা সঙ্গমকালেচোখের অবাক দৃষ্টি–সজলতার বিবিধ কারণঅধিক সচেতনতা, ততোধিক নিরুদ্বেগে ফিরে যাওয়াপোশাকের কাছে। অনুশোচনার মতো দ্বিধাগ্রস্ত এইপ্রায়ান্ধ আলোর নীচে স্বচ্ছ পর্দা টানা আনন্দ মুকুরমেয়াদোত্তীর্ণ ফুলের কাছে আমরা তবু স্মৃতিচারণশিখি। অনাবিষ্কৃতের মোহে শিখি ব্যয়, ভ্রম ও ভণিতাতোমার করুণা আজও সমান অসহনীয় মনে হয়তবু যে কোনো ক্ষতেই আমাদের প্রথাসিদ্ধ…

  • জাদু – শুভজিৎ দাস

    দুধের মলমে যত মেরামত পুষে রাখি বুকে,কুম্ভ শিথিল করি, নুন-রঙা রাগ, উৎসুকে।পাহাড়ি ফুলের পায়ে দেবতার হাত খুলে রাখি,ডানা বন্ধক রেখে মানুষ হয়েছে প্রিয় পাখিআজকে উড়াল দিক ফ্যান্টাসি ফ্যান্টাসি খেলানিয়মেরা ভেঙে গেলে উবে যাবে সব অবহেলা। অপার ইথার থেকে মানুষের মুখ ভেসে আসে,নগ্ন নৃত্যে তারা শিশুদের সরগম-এ হাসে।।

  • গুচ্ছকবিতা – সুদর্শন প্রতিহার

    (১) সূর্য ওঠা থেকে ডোবা অবধি তুমি উজ্জ্বলা হৃদমাঝারে … কালির দোয়াতের সেই হামাগুড়ি আজও পঁচিশ বছরের ছবি আঁকে । (২) যে প্রশ্ন গুলো উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আজও প্রশ্ন হয়েই বেঁচে রয়েছে সেখানেই তোমার অফিম মৃত্যু হয়েছিল । (৩) যাকিছু থেকে গিয়েছিল … অসম্পূর্ন সবই উড়িয়ে দিয়েছিলে নস্টালজিক হওয়াতে…নেশার ঘরে । (৪) যে মদিরা একটু…

  • ছদ্ম বৈপ্লবিক – অহিন্দ্রিলা মুখার্জ্জী

    চতুর্দিকে চাপ চাপ রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে মিত্রপক্ষ নাম দিয়েছে “বিপ্লবের রক্ত”! আর শত্রুপক্ষরা নানা নামে অলংকৃত করে চলেছে। বুদ্ধিজীবীরা স্ক্রিপ্ট হাতে তৈরী ক্যামেরার সামনে বসতে। প্রশ্ন করলাম তাকে “আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন, একটি দুবছরের কোমল শরীরের রক্ত বিপ্লবকে ঠিক কতখানি সাফল্য মন্ডিত করবে??” অথবা ওই রাস্তার মোড়ের চা এর দোকানের দিদিমার রক্ত কতটা এগিয়ে দেবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *