দুলাল চন্দ্র ভড় ও ধার করা আগুনের গল্প – অয়ন মুখোপাধ্যায়

শেয়ার করুন

 “বিজেপিকে হারাতে হলে বিজেপির ভাষাতেই কথা বলতে হবে”— এই তত্ত্ব বা এই ভাবনাটা আসলে ভয়ংকর ভুল। বরং বলা যায়, এই ভাবনার প্রয়োগ আসলে এক আত্মবিনাশের ম্যানুয়াল। যে রাজনীতিতে নিজের প্রতিপক্ষের প্রতীককে হাইজ্যাক করতে হয়, বা তার স্লোগানের ওপর ভরসা করতে হয়, বা তার আবেগের ওপর নির্ভর করতে হয়, সে কখনোই তার প্রতিপক্ষকে হারাতে পারে না; বরং নিজের অগোচরেই সে তার প্রতিপক্ষকে স্বীকৃতি দিয়ে ফেলে। সুতরাং তখন আর সেই লড়াইটা লড়াই থাকে না; প্রকারান্তরে সেটা হয়ে যায় প্রতিপক্ষের কাছে আস্তে আস্তে হাঁটু গেড়ে নতজানু হওয়া।

 সেই কারণে “নকল করব, কিন্তু জিতব”— এই আত্মবিশ্বাস রাজনীতির ময়দানে অত্যন্ত শিশুসুলভ। মানুষ নকল আর আসল চিনতে পারে। যে ভোটার ধর্মীয় মেরুকরণের ভাষাকে সত্যি সত্যিই অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, সে শেষ পর্যন্ত নকল সংস্করণে ভরসা রাখবে কেন? সে তো মূল দোকানেই যাবে। তাই প্রতিপক্ষের ভাষা ধার করার মানে প্রতিপক্ষের বাজারটাকেই বড় করা।

 “ধর্মকে দিয়ে ধর্মান্ধতাকে আটকাব”— এই যুক্তি শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তবে তা ফাঁপা, অন্তঃসারশূন্য। মনে রাখবেন, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের শক্তি শুধু পতাকায় থাকে না; মিছিলের জনশ্রোতের বৈধতায়, তিলকের আবেগে, আচরণের ভেতরেও থাকে। আর সেই শক্তি থাকে মানুষের অন্তরে, মানুষের অভ্যাসের ভেতর। বৃহত্তর অর্থে বলা যায়, সেটা থাকে মানুষের চোখে, কানে, দৈনন্দিনতার বিভিন্ন দৃশ্যে। আপনি যদি সেই দৃশ্যকেই স্বাভাবিক করে দেন, তা হলে আপনি প্রতিরোধ করছেন না; তাহলে বুঝবেন, আপনি প্রতিপক্ষের মানচিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়ছেন, অথবা প্রতিপক্ষের মানচিত্রকেই প্রসারিত করতে সাহায্য করছেন।

 এ কথাটা আজ স্পষ্ট করে বলার সময় এসেছে: বাংলার রাজনীতি যদি গেরুয়া নাট্যমঞ্চের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, তা হলে বাংলার পরাজয় শুধু ভোটে হবে না, তার চরিত্রগতভাবেও হবে। কারণ রাজনীতি আগে ভাষা বদলায়, তারপর মানসিকতা বদলায়, তারপর সমাজ বদলায়। একদিন দেখা যাবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টিএমসি বিজেপির বিরোধিতা করতে গিয়ে বিজেপির ছায়াপুতুলে পরিণত হয়েছে।

 জয় বাংলা, জয় বাংলা মুখে বললেই বাংলা রক্ষা পাবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বোধহয় ভুলে গেছেন, বাংলার ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্রোত একরৈখিক নয়। এখানে শাক্ত আছে, বৈষ্ণব আছে, বাউল আছে, ফকির আছে, লোকায়ত আছে, নবজাগরণের যুক্তি আছে, মানবধর্ম আছে, এমনকি ইসলামী সংস্কৃতিরও একটা নিজস্ব স্রোত আছে। এই বহুস্বরের বাংলাকে যদি চিৎকার, প্রদর্শন, তিলক, অস্ত্রনৃত্য আর ধর্মীয় উত্তেজনার একমাত্র ভাষায় নামিয়ে আনতে চায় সরকারি টিএমসি, তা হলে সেটা শুধু রুচিহীনতা নয়; সেটা ঐতিহাসিক পশ্চাদপসরণ।

 এখানেই শাসকদলের সবচেয়ে বড় ভুল। “সবাইকে একটু খুশি রাখব”— এই রাজনীতি কিছুদিন চলে, বেশিদিন টেকে না। একদিকে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার কথা, অন্যদিকে সংখ্যাগুরুর আবেগের প্রদর্শনী— এই দুই নৌকোয় চাপা যায়, তবে নদী পার হওয়া যায় না। কারণ এতে মানুষের মনে আস্থা জন্মায় না। এতে সন্দেহ জন্মায়, বিশ্বাসযোগ্যতায় টান পড়ে। এতে মাটি সরে যায়। এবং যেটা মমতা ব্যানার্জির ক্ষেত্রে হয়েছে।

 যে দল নিজের ভাষার ওপর, স্লোগানের ওপর ভরসা করতে পারে না, নিজের স্লোগান যখন মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন সে প্রতিপক্ষের স্লোগান মুখস্থ করে। তখন সেই দল নিজের মতাদর্শের প্রতি আস্থা হারায়; সে তখন নকলনবিশ হয়ে পড়ে, শর্টকাটে বিরোধীর স্লোগান-দর্শনকে হাইজ্যাক করতে চায়। যে মমতা ব্যানার্জির কথা ছিল, তাঁর স্লোগান মা, মাটি, মানুষের নামে শপথ নিয়ে দায়িত্ব নেওয়ার; মানুষের কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, শ্রম, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব— এই বাস্তব প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে নতুন পশ্চিমবঙ্গ তৈরি করার; সেই দলই আজ বিজেপির পাতা কৌশলে পা দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই রাজনৈতিক ভুল সুদূরপ্রসারী। পশ্চিমবঙ্গের এই পাল্টে যাওয়া বিপজ্জনক সংস্কৃতির তিনিও প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষক হয়ে গেলেন। অতি সম্প্রতি টিএমসির রামনবমী মিছিল থেকে নরম হিন্দুত্ব আমাদের সেই নির্দেশই দেয়।

 নিজের ভোটব্যাঙ্ক বাঁচাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই হাইজ্যাক করা সংস্কৃতির পথটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ তিনি যদি ভেবে থাকেন ধর্মীয় রাজনীতির এটা সাময়িক সমাধান, বা সাময়িক কৌশল, তা হলে তিনি ভুল ভাবছেন। তাঁর এই রাজনৈতিক কৌশল কখন যে টিএমসির রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হয়ে গেছে, জনগণের কাছে তিনি নিজেই সেটা জানেন না। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এটাই দুর্ভাগ্য যে মমতা ব্যানার্জিকে প্রতিপক্ষের ভাষা ধার করতে হচ্ছে, আর নিয়তি এটাই— ভবিষ্যতে প্রতিপক্ষের এই ভাষাই তাকে চালনা করবে।

 আমাদের আরও দুর্ভাগ্য, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই অন্তঃসারশূন্যতা। তাই আমরা দেখি, আজকের রাজনীতি যুক্তির ভাষা ছেড়ে প্রতীকের ভাষায় কথা বলছে; ফলে সমাজও ধীরে ধীরে প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে। বিশ্লেষণের জায়গায় উন্মাদনা এসেছে। ইতিহাসের জায়গায় পৌরাণিক উত্তেজনা এসেছে। যুক্তিবাদের জায়গায় কুসংস্কার। তরুণ প্রজন্মের সামনে এখন আর নাগরিকতা নয়, নাচে-গানে-পতাকায় মোড়া পরিচয়ের বাজার খুলে গেছে। সুতরাং রামনবমীর মিছিল নিছক সাংস্কৃতিক ঘটনা নয়; এটা রাজনৈতিক নির্মাণ।

 আরএসএস বা বিজেপিকে তারই তৈরি করা ময়দানে নেমে হারানো যাবে— এই বিশ্বাস আসলে অলস বিশ্বাস। যে যুক্তিবাদের শক্তি দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের ভেতর শিক্ষা, সংগঠন, প্রচার, সংস্কৃতি, পৌরাণিক কল্পনা, সামাজিক প্রভাব— সব মিলিয়ে একটা মানসিক কাঠামো বানিয়ে তুলেছিল, তা আজ বিপন্ন। প্রকৃত প্রস্তাবে, ধর্মান্ধতাকে যদি ঠেকাতে হয়, তবে সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে বাস্তব জীবনের প্রশ্নে। স্কুলে। কলেজে। চাকরিতে। মজুরিতে। জমিতে। অধিকারে। সংবিধানের ভিতরে দাঁড়িয়ে। মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে। মন্দিরের পাল্টা মন্দির বানিয়ে নয়।

 মনে রাখতে হবে, প্রতিপক্ষের মুখোশ পরে প্রতিপক্ষকে হারানো যায় না। কারণ মুখোশ কিছুক্ষণ কাজ করে, মুখ সারাজীবনের। অভিনয় কিছুক্ষণ মুগ্ধ করে, কিন্তু চরিত্র দীর্ঘকাল টিকে থাকে। রাজনীতির মাঠেও সেই একই কথা প্রযোজ্য। ধার করা আবেগ দিয়ে মিছিল বড় হয়; স্থায়ী বিশ্বাস তৈরি হয় না। আমাদের ছোটবেলায় একটা বিজ্ঞাপন খুব পরিচিত ছিল— “নকল হইতে সাবধান, দুলাল চন্দ্র ভড়ের তালমিছরি, সইটা দেখে কিনবেন।” বাজারের সেই সহজ বুদ্ধিটাই রাজনীতির ক্ষেত্রেও খাটে। আসল জিনিস যখন সামনে আছে, তখন মানুষ নকল কেন কিনবে? বিজেপির ভাষা, ভঙ্গি, প্রতীক আর আবেগের নকল সংস্করণ তুলে ধরে তাকে ঠেকানো যায় না; তাতে বরং আসলটাকেই আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়।

 শেষ কথাটা তাই শুধু রাজনীতির নয়, অস্তিত্বেরও। “আগুনের রং ধার করা যায়, কিন্তু আগুনের উত্তাপ ধার করা যায় না।” প্রতিধ্বনির কাছে নয়, ধ্বনির কাছেই তার আসল আকর্ষণ। রাজনীতিতেও তাই। আসলকে ঠেকাতে গিয়ে নকল যদি আসলেরই ছায়া হয়ে যায়, তবে শেষ পর্যন্ত মানুষ আসলটাকেই বেছে নেবে। নকলের ভাগ্যে হাততালি জুটতে পারে, বিশ্বাস জোটে না। আর যে রাজনীতিতে বিশ্বাস হারায়, সে একদিন নিজের মুখও হারিয়ে ফেলে। তখন সেটা আর শুধু ভুল থাকে না। তখন সেটা সত্যি সত্যি এমন এক পথ হয়ে দাঁড়ায়, যে পথে ফিরে আসা যায় না। পশ্চিমবঙ্গ কি সেই পথের দিকেই যাচ্ছে?

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *