ছেলের কাছে – শিবাজী সান্যাল

শেয়ার করুন
এই প্রথম পূর্ণিমা মুম্বাইতে ছেলের বাড়িতে এল । কিন্তু এদের জীবনধারা দেখে অস্বস্তি হতে লাগল । সব কিছু যেন অতিরিক্ত  সাজান । বিছানা পরিপাটি একদম হোটেলের  মত । রান্নাঘরের আয়োজন আরও গোলমেলে , চুল্লির  ওপর এক বিরাট ঢাকনা  ।
খাওয়া দাওয়া সাধারণ কিছুই নেই । স্বাস্থ্যকর নামে যত অখাদ্য খায় এরা । সুমন কত খেতে ভালবাসতো । আর এখন চোখের সামনে ছেলেটিকে কী সব খেতে দিচ্ছে ! দেখেও কষ্ট হয় । একদিন ওর প্রিয় খাবার  মাংসের  চপ আর বেগুন ভাজা দিয়ে লুচি করে দিয়েছিল, তা নিপা এসে ছোবল দিয়ে তুলে নিয়ে চলে গেল। এসব খাওয়া  নাকি ওর একদম বারণ। সত্যি ভীষণ  দুঃখ হয়েছিল তখন ওদের এই নিয়মের বাধন দেখে ।
নাতনী নেহা কী সব জামাকাপড় পড়ে। ব্রার ফিতে বেরিয়ে আছে। ছোট্ট  একটি প্যান্ট , সমস্ত পা দেখা যায়, ছিঃ! একদিন একটি কদাকার ঘাড় অবধি চুল ওয়ালা ছেলে এল, তাকে নিয়ে সবার সামনে ও নিজের ঘরে  ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। নিপা বলল ওর ক্লাসে পড়ে , বন্ধু।  মেয়েদের আবার এমন ছেলে বন্ধু হয় নাকি? অসভ্যতার একসা!
নিপাকে একদিনও শাড়ি পরতে দেখল না । যা না তাই পরে কাজে বেরিয়ে যায় । আর বাড়িতে সারাক্ষণ ফোনে বসে ভুরভুর করে ইংরেজি কথা বলছে ।
একদিন অমলকে ফোন করে সব জানাল।  বলল, “আমার এখানে মোটেই ভাল লাগছে না । তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও।” উত্তরে অমল বলল, “এই তো গেলে, কদিন ওখানে থাক । তুমি বরং বাবুকে বল যে তোমাকে জিনসের প্যান্ট আর একটি ঝকমারা টপ কিনে দিক ।”   “যাও, তোমার শুধু রসিকতা।”
এর মধ্যে একদিন নিপার লেডিজ ক্লাবের কী একটি অনুষ্ঠান ছিল, ও বাইরে, পূর্ণিমা সেই সুযোগে পায়েস বানিয়ে সুমনকে দিল। দীর্ঘদিন পর এমন পায়েস পেয়ে সুমন পাগলের মত খেতে লাগল। ঠিক সেই সময়েই বেলটা বাজলো। ওরা চমকে উঠে বাটি লুকিয়ে, সব সামলে, দরজা খুলে দেখল ধোপা কাপড় দিতে এসেছে। ওরা দুজনেই হাসতে লাগল।
একদিন সন্ধ্যেবেলা পূর্ণিমার শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে পড়ল। তৎক্ষণাৎ নিপা ওকে গাড়িতে করে একটি নার্সিং হোমে নিয়ে গেল।  ওরা চেক করে ভর্তি করে নিল। দুদিন পর ছেড়ে দিলে বাড়ি এসে যেন শান্তি হল।  নিপা সর্বক্ষণ ওর সেবা করতে লাগল। ঘড়ি দেখে সময়মতো  ওসুধ দেয়া, নিজে হাতে পথ্য তৈরি করা সব করতে লাগল।  অফিসে ছুটিও নিল । রাতে ওর পাশে শুতে লাগল, বলল, “যতক্ষণ  না আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হচ্ছেন , আমি আপনার কোন আবদারই শুনব না।” নেহা ওকে ফুল এনে দিল। রোজ কলেজ থেকে ফিরে ওর মন হালকা করার জন্য নানা গল্প বলতে লাগল। সুমনও অফিস থেকে ফিরে কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত।
একদিন বিকেলে নিপা নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছিল , তাই পূর্ণিমা ওকে না জাগিয়ে  নিজেই রান্নাঘরে চা করতে ঢুকল। বুঝতে পেরে নিপা ছুটে এসে ওকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঘরে শুইয়ে দিল । বলল, “কেন আপনি উঠেছেন?  আমাকে ডাকতে পারতেন। নাঃ কোনো কথা আপনি শুনতে চান না।”
নিপার এই শাসনে সত্যিই মনটা ভরে গেল। ও অমলকে ফোন করে বলল, “এদের জীবনধারা একটু অন্যরকম। কিন্তু মনগুলো খুব নরম আর সুন্দর। জানো এরা আমাকে একটি বাচ্চার মত সেবা করে চলেছে। বড় ভাগ্যে এমন ছেলে, বউ আর নাতনী পেয়েছি গো!”
শেয়ার করুন

Similar Posts

  • মা – সৈকতা দাস

    মা, এবার কি আপনার খাবার নিয়ে আসব? চমকে উঠলেন বাসন্তী দেবী। একমনে চশমার কাঁচটা মুছছিলেন তিনি। আজকাল বড্ড ঝাপসা লাগে সবকিছু। যাও, আমি যাচ্ছি। বলেই উঠে পড়লেন তিনি। আশ্রমের সবাই হয়ত অপেক্ষা করছে তার জন্য। এই মৌ মেয়েটি খুব ভালো। সবসময় তাঁর খেয়াল রাখে। না! আজ আর দেরী করা যাবেনা। কাল সকালে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক…

  • মোবাইল-চোর – রুমা চক্রবর্তী

    অন্য দিনের মতোই অমানুষিক ভিড়ে ঠাসা ট্রেনটা স্টেশনের পর স্টেশন ছুটে চলেছে নিজের মেজাজে নির্বিকারভাবে। তবে, ভিড়ের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সমস্ত অস্বস্তি, বিরক্তি, নাভিশ্বাস, হতাশ্বাস, হাসিকান্না, ধ্বস্তাধ্বস্তি, ঝগড়া, দুরাশা, নিরাশা, উদ্বেগ, তৃপ্তি-অতৃপ্তি ছাপিয়ে একটা দৃশ্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। লাস্ট লেডিস কম্পার্টমেন্টে চোর ধরা পড়েছে, গণধোলাই চলছে। *      *      *  ‘কী চুরি গেছে?’, ‘চোর কে?’, ‘ছেলে…

  • দৌড় – রমা সাহা

    দিন দু’য়েকও হয়নি, সারাটা দিন না খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছিল সুরাব। আজও বোধহয় তারই পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। দিনমজুর রহিমুদ্দি আর আমিনার একমাত্র ছেলেটা পাড়ার স্কুলেরই ক্লাস ফাইভের ছাত্র। নুন আনতে ফ্যান ফুরোয় যে ঘরে, দৌড় সেখানে বিলাসিতা। তবুও দারিদ্রের বিরুদ্ধে সুরাব ছুটে যায় সবুজ ট্র্যাক ধরে। ফুটো টিন আর দর্মার ঘরের একপাশ জুড়ে ছেলেটা যেন ট্রফি…

  • |

    ড্রোন – অরিজিৎ সেন

    আব্রাহাম জিজ্ঞেস করলেন, “প্রভু ঐ শহরে যদি পঞ্চাশ জনও নিরাপরাধ মানুষ থেকে থাকেন তাও কি আপনি পুরো শহরটাকে ধ্বংস করে ফেলবেন?” প্রভু বললেন, “পঞ্চাশজন নিরাপরাধ মানুষ থাকলে আমি সবাইকে ছেড়ে দেব।“ খানিকপরে আব্রাহাম বললেন, “অপরাধ নেবেন না যদি পঁয়তাল্লিশ থাকেন?” “তাহলেও শহর বেঁচে যাবে।“ প্রভু উত্তর দিলেন। “চল্লিশ” “তাহলেও কিছু করব না।’ “তিরিশ?….কুড়ি….দশ।” স্মিতহেসে প্রভু…

  • দাগ – পার্থ রায়

    টুবলুর অ্যাপেয়ন্টমেন্ট লেটারটা একটা মুক্তির পরোয়ানা হয়ে এল মানসীর কাছে। মনের আনাচে কানাচে আজ পালক ধোয়া ঝরণা ধারা। এক ঝাঁক পায়রা যেন ডানা মেলে বকবকম করে বলে চলেছে “মুক্তি, মুক্তি, মুক্তি”। এক মুহূর্ত দেরী করেনি মানসী। ফোনে কাজ ছেড়ে দেবার কথা জানিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে কয়েক বছর আগে ছেলেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করল। দেবোত্তম অকালে…

  • ক্রিসমাস – চিরঞ্জীত সাহা 

    কুয়াশার বিদিশা ভেদ করে , বুলেট বেগে সাইকেল ছুটিয়ে রাজ এসে থামল স্টেশন সংলগ্ন গ্যারেজে । কুকুরতাড়িত ব্যক্তির মতো প্রাণপণ দৌড়ে  টিকিট কাউন্টারে প্রবেশ করতেই শুনল , ট্রেন লেট । তিন বছর ধরে ভোর চারটের ট্রেনে হাওড়া পাড়ি দেওয়া , বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত উদ্যমী এই যুবকের কাছে পড়িমড়ি করে ভোরের ট্রেন ধরা আজ নতুন কিছু…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *