/ / সেফিড পরিবর্তনশীল নক্ষত্র ও মহাবিশ্ব – গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

সেফিড পরিবর্তনশীল নক্ষত্র ও মহাবিশ্ব – গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

শেয়ার করুন

রাতের আকাশে যে সমস্ত নক্ষত্র দেখা যায়, তারা সবাই যে একইরকম ভাবে আলো দেয়, তা নয়। দিনের
পর দিন যদি খুব ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে দেখা যায় যে তাদের কারো কারো ঔজ্জ্বল্য বাড়ে কমে। তাদের মধ্যে আবার অনেক রকম প্রকারভেদ আছে। এই লেখাতে আমরা তাদের মধ্যে বিশেষ এক ধরনের নক্ষত্রের কথা শুনব। তার নাম সেফিড পরিবর্তনশীল নক্ষত্র। জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এদের এক বিশেষ ভূমিকা আছে।

সেফিড পরিবর্তনশীল নক্ষত্রের ইতিহাস বেশ পুরানো। আকাশে সেফিউস নামের এক নক্ষত্রমণ্ডলী আছে,
আমাদের দেশের প্রাচীন জ্যোতিষে তার নাম বৃষপর্ব। তার পাশেই আছে বিখ্যাত শর্মিষ্ঠা বা ক্যাসিওপিয়া নক্ষত্রমণ্ডলী। পুরাণে শর্মিষ্ঠা ও দেবযানীর গল্প বেশ পরিচিত। শর্মিষ্ঠা হচ্ছেন যযাতির দ্বিতীয় স্ত্রী ও বিখ্যাত কুরু রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা পুরুর মা। শর্মিষ্ঠা ছিলেন দৈত্যরাজ বৃষপর্বের কন্যা। এই সেফিউস নক্ষত্রমণ্ডলের দৃশ্যমান চারটি তারাকে গ্রিক আলফা, বিটা, গামা ও ডেল্টা নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ডেল্টা সেফাই নক্ষত্রটিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন জন গুডরিক নামের এক তরুণ শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

জন গুডরিকের জন্ম হল্যান্ডের গ্রনিনগেনে ১৭৬৪ সালে, তবে তাঁদের বাড়ি ছিল ইংল্যান্ডের ইয়র্কে। ছোটোবেলায় এক অসুখে গুডরিক শ্রবণশক্তি হারান। ব্রিটেনে বধিরদের জন্য প্রথম বিদ্যালয় তখন চালু হয়েছে, গুডরিককে সেখানে পড়তে পাঠান তাঁর পরিবার। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। পড়াশনাতে ভালোই করেন গুডরিক, পরে তিনি সাধারণদের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানেও ভর্তি হয়েছিলেন এবং অঙ্কে বিশেষ পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিবেশী ও বন্ধু এডওয়ার্ড পিগট ও তাঁর বাবা নাথানিয়েল ছিলেন শখের জ্যোতির্বিদ। নাথানিয়েল এক মানমন্দির তৈরি করেছিলেন। রাতের পর রাত জেগে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলেন জন। ১৭৮৪ সালে তিনি দেখলেন যে ডেল্টা সেফাই নক্ষত্রটির ঔজ্জ্বল্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট ভাবে পরিবর্তিত হয়, খুব দ্রুত বাড়ে, তারপর আস্তে আস্তে কমে। তিনি মেপে দেখেছিলেন এই পরিবর্তনের সময়কাল হল পাঁচ দিন আট ঘণ্টা সাড়ে সাঁইতিরিশ মিনিট। বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই তিনি যে মাপটা পেয়েছিলেন, তা আধুনিক মাপের থেকে মাত্র দশ মিনিট কম। অবশ্য এডওয়ার্ড তার কয়েক সপ্তাহ আগে প্রথম এই ধরনের পরিবর্তনশীল নক্ষত্র দেখেছিলেন, কিন্তু জন রয়্যাল সোসাইটিতে খুব বিস্তারিত ভাবে সময়ের সঙ্গে ঔজ্জ্বল্যের বাড়া-কমা বিষয়ে পর্যবেক্ষণের বিবরণ পাঠিয়েছিলেন। তাই তাঁকেই আমরা এই শ্রেণির নক্ষত্রদের আবিষ্কর্তা মনে করি। সিফিউস নক্ষত্রমণ্ডলে পাওয়া গিয়েছিল বলে একই ধরনের পরিবর্তনশীল তারাদের বলে সেফিড ভেরিয়েবল, বা সংক্ষেপে সেফিড। নীচের ছবিতে সেফিড শ্রেণির তারাদের ঔজ্জ্বল্য সময়ের সঙ্গে কেমনভাবে পালটায় তা দেখা যাচ্ছে। আমাদের খুব চেনা ধ্রুবতারা আসলে সেফিড, যদিও তার হ্রাসবৃদ্ধির পরিমাণ খুব কম।

পরিবর্তনশীল তারাদের উপর অনেক কাজই করেছিলেন গুডরিক, তার স্বীকৃতিস্বরূপ রয়্যাল সোসাইটি তাঁকে কপলি পদকে সম্মানিত করে। তাঁকে সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত করা হয়েছিল, কিন্তু সেই খবর তিনি পাননি।
রাতের পর রাত ঠান্ডার মধ্যে কাটানোর জন্য তাঁর নিউমোনিয়া হয়েছিল, মাত্র একুশ বছর বয়সে ১৭৮৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

কাকতালীয়ভাবে আমাদের গল্পের পরের চরিত্রটিও অসুস্থতার জন্য বধির হয়ে পড়েছিলেন। হেনরিয়েটা
সোয়ান লেভিট জন্মেছিলেন গুডরিকের এক শতাব্দী পরে ১৮৬৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাডক্লিফ কলেজের স্নাতক। হার্ভার্ড মানমন্দিরে তিনি কাজ শুরু করেন ১৮৯৩ সালে। হার্ভার্ড মানমন্দিরে একদল মহিলা একসঙ্গে কাজ করতেন, তাঁদের একত্রে বলা হত ‘হার্ভার্ড কম্পিউটারস’। কম্পিউটার মানে গণক, আমরা যে যন্ত্রকে কম্পিউটার বলে চিনি এই কাহিনি তা উদ্ভাবনের অনেক আগের ঘটনা। একজন ছাড়া অন্য গণকদের দূরবিন ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। দূরবিন দিয়ে তোলা ফটোগ্রাফগুলি তাঁরা বিশ্লেষণ করতেন। অদক্ষ শ্রমিক হিসাবে তাঁদের ঘণ্টা পিছু পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ সেন্ট দেওয়া হত। একই কাজে নিযুক্ত পুরুষরা এর দ্বিগুণ রোজগার করতেন। হেনরিয়েটা ছিলেন জ্যোতির্বিদ্যাতে স্নাতক, কিন্তু তাঁর রোজগারের পরিমাণ আলাদা ছিল না। এঁদের গবেষণা জ্যোতির্বিদ্যাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল, কিন্তু তাঁদের বিজ্ঞানী বলে স্বীকৃতি ছিল না। পরিবর্তনশীল নক্ষত্র বিষয়ে হার্ভার্ড মানমন্দিরে উইলিয়ামিনা ফ্রেমিং, অ্যানি ক্যানন, হেনরিয়েটা লেভিট সবাই কাজ করেছিলেন।

সেই সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানের সব থেকে বড়ো সমস্যা ছিল নক্ষত্রদের দূরত্ব মাপা। কাছের নক্ষত্রদের দূরত্ব মাপা সম্ভব হয়েছিল, তার জন্য ব্যবহার করা হয় লম্বন বা প্যারালাক্স পদ্ধতি। এতে ছ’মাস আগে পরে পৃথিবী থেকে কোনো তারার আকাশে কৌণিক অবস্থান মাপা হয়। সেই সময়ের মধ্যে পৃথিবী প্রায় তিরিশ কোটি কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছে, এর ফলে তারার অবস্থানে যে পার্থক্যটুকু হয় তা থেকে জ্যামিতির নিয়মে তার দূরত্ব মাপা সম্ভব। কিন্তু মোটামুটি তিনশো আলোকবর্ষ বা তার থেকে বেশি দূরের নক্ষত্রদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অচল, কারণ তাদের কোনো পরিবর্তনই আমাদের কাছে ধরা পড়ে না। হেনরিয়েটা হঠাৎই দূরত্ব মাপার এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, তার মূলে আছে সেফিড নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ।

এখানে আর একটা কথা মনে রাখা দরকার, তা হল আমরা তারার যে ঔজ্জ্বল্য দেখতে পাই তা’ তার প্রকৃত
ঔজ্জ্বল্য নয়। অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্রও যদি অনেক দূরে থাকে, তাহলে তাকে ম্লান দেখাবে। দূরত্ব জানা থাকলে তা থেকে প্রকৃত ঔজ্জ্বল্য বার করা সোজা, কিন্তু যে নক্ষত্রদের দূরত্বই জানা নেই তার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা নিরুপায়। চোখে বা দূরবিনে দুটো নক্ষত্রকে সমান উজ্জ্বল দেখে তাদের প্রকৃত ঔজ্জ্বল্যের সম্পর্ক বার করা সম্ভব নয়।

আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে কাছের দুটি ছোটো ছোটো ছায়াপথ বা গ্যালাক্সিকে দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে দেখা
যায়। আধুনিক যুগে ভূ-পর্যটক ফার্দিনান্দ ম্যাজেলানের যাত্রার সময় তাদের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, তাই তাদের বলা হয় বৃহৎ ও ক্ষুদ্র ম্যাজেলানের মেঘ। তখনও অবশ্য আমাদের ছায়াপথের বাইরে যে অন্য গ্যালাক্সি থাকতে পারে তা জানা ছিল না, কিন্তু এটা বোঝা গিয়েছিল যে সেই নক্ষত্রপুঞ্জ আমাদের থেকে অনেক দূরে আছে। লেভিট এদের সেফিডদের ফটো বিশ্লেষণ করছিলেন। তিনি সেই গ্যালাক্সি দুটির সেফিড ভেরিয়েবল তারাদের সর্বোচ্চ ঔজ্জ্বল্য ও বাড়া-কমার কালের মধ্যে একটা সম্পর্ক খুঁজে পেলেন। দেখলেন যে ঔজ্জ্বল্য যত বেশি হয়, তাদের পরিবর্তনকালও তত বেশি হয়।

প্রকৃত ঔজ্জ্বল্য না জেনেও এটা বার করা সম্ভব? লেভিটের যুক্তিকে অনুসরণ করতে গেলে একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। কলকাতা থেকে লন্ডনের দূরত্ব আমরা যখন বলি, তখন সেই দূরত্ব শিয়ালদা না শ্যামবাজার থেকে মাপা হচ্ছে তা হিসাবে ধরি না। তার কারণ কলকাতা থেকে লন্ডনের দূরত্ব এতই বেশি যে সেখানে শিয়ালদা শ্যামবাজারের দূরত্বে বিশেষ আসে যায় না। তেমনি ম্যাজেলানের মেঘ দুটির ক্ষেত্রে সবগুলি তারাই এত দূরে আছে, যে একটা মেঘের সব তারার দূরত্ব সমান বলে ধরে নিতে পারি। কাজেই তাদের প্রকৃত ঔজ্জ্বল্য না জানলেও ক্ষতি নেই, যে তারাদের সমান উজ্জ্বল দেখাবে, তাদের প্রকৃত ঔজ্জ্বল্যও সমান।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে লেভিটের এই কাজের গুরুত্ব অপরিসীম কারণ দূরের জ্যোতিষ্কদের দূরত্ব মাপার মতো কঠিন কাজকে তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহজ করে দিয়েছিল। ধরা যাক একটা ইলেকট্রিক আলো প্রতি সেকেন্ডে কত শক্তি বিকিরণ করে তা আমরা জানি। তাহলে সেই আলোটা থেকে প্রতি সেকেন্ডে কতটা শক্তি এসে আমাদের কাছে পৌঁছোচ্ছে, তা মেপে আলোটা কত দূরে আছে আমরা বলতে পারব। তেমনি কোনো তারার প্রকৃত ঔজ্জ্বল্য যদি আমরা আগে থেকে জানি, তাহলে তা আমাদের কাছে কতটা উজ্জ্বল লাগে তা মেপে সহজেই সে কত দূরে তা বার করে ফেলতে পারি। সুবিধা হল যে সেফিডের ওঁজ্ভবল্য ও পর্যায়কালের মধ্যে সম্পর্কটা অতি সহজ। নীচের ছবিটাতে সেটা দেখানো হয়েছে। উল্লম্ব অক্ষ বরাবর নক্ষত্রটি সূর্যের তুলনায় কত গুণ উজ্জ্বল এবং অনুভূমিক অক্ষ বরাবর তার পর্যায়কাল দেখানো হয়েছে। (দুটি অক্ষ বরাবরই আমরা লগারিদম মান ব্যবহার করেছি।) কাজেই শুধু ঔজ্জ্বল্য বাড়তে কমতে কত সময় লাগে তা মেপেই তার প্রকৃত ঔজ্জ্বল্য বার করে ফেলা যায়। তারপর তা থেকে দূরত্ব নির্ণয়ও খুব সহজ।

তখনও পর্যন্ত কোনো সেফিডের দূরত্ব বা প্রকৃত ঔজ্জ্বল্য মাপা সম্ভব হয়নি, বিজ্ঞানীরা এবার সেই দিকে মন দিলেন। বিজ্ঞানী এইনার হার্জস্প্রুং ছায়াপথের তেরোটি সেফিডের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তাদের দূরত্বের বিষয়ে অনুমান করেছিলেন, তার থেকে তিনি সিদ্ধান্ত করেন যে ক্ষুদ্র মাজেলানের মেঘের দূরত্ব হল মোটামুটি তিরিশ হাজার আলোকবর্ষ। লেভিটের পর্যবেক্ষণ থেকে আমাদের ব্রহ্মাণ্ড হঠাৎ করে অনেক বড়ো হয়ে গেল, তার আগে পর্যন্ত আমাদের ব্রহ্মাণ্ডকেই এর থেকে অনেক ছোটো বলে মনে করা হত। অবশ্য পরে বোঝা গেল যে হার্জস্প্রুয়ের মাপে অনেকটা ভুল ছিল, তিনি কাছের সেফিডদের দূরত্ব কম করেই ধরেছিলেন। সেই কারণে ম্যাজেলানের মেঘেদের দূরত্ব অনেক কম বেরিয়েছিল। আধুনিক হিসাবে দুটি মেঘের দূরত্ব হল একলক্ষ তেষট্টি হাজার ও দু’লক্ষ ছ’হাজার আলোকবর্ষ।

হার্লো শেগলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট উইলসন মানমন্দির থেকে গ্লোবুলার ক্রাস্টার বা ব‌র্তুলাকার
তারকাগুচ্ছ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এই নক্ষত্রগুচ্ছগুলিতে দশ হাজার থেকে দশ লক্ষ নক্ষত্র আছে। অনেকদিন আগেই জানা ছিল যে এই গুচ্ছগুলি আকাশে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই, নব্বই শতাংশকেই আকাশে ধনুরাশিতে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি অনুমান করলেন যে তার কারণ ওই বর্তুলাকার গুচ্ছগুলি ছায়াপথের কেন্দ্রের কাছে এবং মোটামুটি সমানভাবে ঘিরে আছে, আমরা আছি ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে, সেজন্য সেগুলি আমাদের আকাশে একই দিকে অবস্থান করে। অনেকগুলি তারকাগুচ্ছের মধ্যে সেফিড শ্রেণির নক্ষত্র আছে, লেভিটের গবেষণা ব্যবহার করে তিনি তাদের দূরত্ব মাপলেন। এর মাধ্যমে তৈরি হল ছায়াপথের প্রথম মডেল।

শেপলির মডেলে ছায়াপথ হল একটা চ্যাপ্টা চাকতির মতো, কিন্তু তার কেন্দ্রীয় অংশটা ফুলে উঠে গোলকাকার ধারণ করেছে। শেষ পর্যন্ত আমরা জেনেছি যে ওই গোলকের ব্যাস প্রায় ষোলো হাজার আলোকবর্ষ। আমাদের সূর্য ওই গোলকের বাইরের চাকতিতে ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় সাতাশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করে। প্রাচীন যুগে মানুষ বিশ্বাস করত পৃথিবী হল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র। কোপার্নিকাসের পরে সেই জায়গা নেয় সূর্য। যখন বোঝা গেল যে সূর্যও অন্য নক্ষত্রদের মতো একটা নক্ষত্র, তখন মনে করা হয়েছিল যে সূর্য ছায়াপথের কেন্দ্রের খুব কাছে অবস্থান করছে। শেপলির গবেষণা সেই কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকেও মানুষকে সরিয়ে দিল।

এখানে একটা কথা বলে রাখি। সেফিডের একটা বৈশিষ্ট্য উপরের ছবিটা থেকে দেখা যাচ্ছে, তারা সবাই খুব
উজ্জ্বল, সূর্যের থেকে কয়েকশো গুণ থেকে কয়েকহাজার গুণ বেশি। তাই অনেক দূর থেকেও তাদের চিহ্নিত করা
যায়। সেই কারণে দূরের বর্তুলাকার গুচ্ছ, ম্যাজেলানের মেঘ বা আরও দূরের গ্যালাক্সি থেকেও সেফিডদের চিনতে পারা যায় ও তাদের পরিবর্তনকাল মাপা যায়। ফলে তাদের দূরত্ব নির্ণয় সম্ভব হয়। অন্য গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে সেই কাজটা করলেন মার্কিন বিজ্ঞানী এডউইন হাবল। তিনি ১৯২২-২৩ সালে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে সেফিভ ভেরিয়েবলদের পরিবর্তনকাল মেপে তার দূরত্ব মেপে বার করেন আট লক্ষ আলোকবর্ষ। এই বিশাল দূরত্ব থেকেই বোঝা গেল অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের ছায়াপথের বাইরে অন্য একটা ছায়াপথ, কারণ আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে দূরের নক্ষত্রও কেন্দ্র থেকে একলক্ষ আলোকবর্ষের বেশি দূরে নয়। অল্পদিনের মধ্যেই দেখা গেল আমাদের ছায়াপথ মহাবিশ্বে আরও অনেক ছায়াপথের মধ্যে একটা। তার আগে পর্যন্ত প্রচলিত ধারণা ছিল যে যত জ্যোতিষ্ক আমরা দেখতে পাই সবাই আমাদের ছায়াপথের অঙ্গ। হাবল আরও অনেক গ্যালাক্সির দূরত্ব নির্ণয় করেছিলেন। একটা কথা বলে রাখি, সব বর্তুলাকার তারাগুচ্ছেই যে শেপলি সেফিডের সন্ধান পেয়েছিলেন তা নয়, সেখানে অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সব থেকে নিখুঁত মাপটা সেফিড থেকেই পাওয়া গিয়েছিল, এবং সেই মাপগুলোকে অন্য সমস্ত পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। তেমনি কাছের গ্যালাক্সিগুলোতে সেফিড নক্ষত্রকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল, তার থেকেই হাবল তাদের দূরত্ব নির্ণয় করেছিলেন। দূরের গ্যালাক্সিদের মধ্যে সেফিড না পেলেও তাদের দূরত্ব মাপতে তিনি যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, তার মূলে ছিল সেফিড ব্যবহার করে পাওয়া কাছের গ্যালাক্সিদের দূরত্বর মাপ।

এখানেই শেষ নয়। হাবল দেখেন যে গ্যালাক্সির আমাদের যতখানি দূরত্ব, সে ঠিক তার সমানুপাতী বেগে আরও দূরে সরে যাচ্ছে। এর থেকেই বুঝতে পারা গেল আমাদের মহাবিশ্ব আসলে প্রসারণশীল। বিগ ব্যাং বা মহা বিস্ফোরণের কথা এভাবেই বিজ্ঞানীদের মাথায় আসবে। বর্তমানে আমাদের ধারণা হল যে মহা বিস্ফোরণের ফলে
মহাবিশ্বের জন্ম, তা ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে; অসংখ্য ছায়াপথ ক্রমশই পরস্পরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে; এই চিত্র লেভিটের গবেষণা ছাড়া সম্ভব ছিল না। তাঁর গবেষণার এই সমস্ত ফল দেখার জন্য লেভিট অবশ্য জীবিত ছিলেন না। তিনি ১৯২১ সালে হার্ভার্ডে ঔজ্জ্বল্য মাপার বিভাগের প্রধান হয়েছিলেন। কিন্তু সেই বছরেই ক্যান্সারে তাঁর মৃত্যু হয়। জীবৎকালে সেইরকম কোনো স্বীকৃতি না পেলেও একটা গ্রহাণু ও চাঁদের বুকে একটা গহ্বরের নাম তাঁর নামে দেওয়া হয়েছে। জন গুডরিকের নামেও একটি গ্রহাণুর নাম আছে।

সেফিডের গল্প কিন্তু এখানেই শেষ হল না। আমরা দেখেছি কীভাবে কোপার্নিকাসের সময় থেকে শুরু করে
মানুষ সৃষ্টির কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাই যে পর্যবেক্ষণ দেখায় যে সৃষ্টিতে তার কোনো বিশেষ অবস্থান আছে বিজ্ঞানীরা তাকে সন্দেহ করেন। হাবল যে দূরত্ব নির্ণয় করেছিলেন, তা ব্যবহার করে দেখা যাচ্ছিল যে আমাদের ছায়াপথ বাকি সমস্ত গ্যালাক্সির থেকে বড়ো। উনিশশো চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে গবেষণা করে বিজ্ঞানী ওয়াল্টার বাডে দেখান যে আসলে দুই ধরনের সেফিড আছে। হাবল অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে যে সেফিডদের ব্যবহার করেছিলেন সেগুলিকে তিনি বলেন প্রথম শ্রেণির সেফিড। সেগুলির রং নীল, তারা বেশি উজ্জ্বল হয় এবং সাধারণত গ্যালাক্সির বাইরের দিকে তাদের পাওয়া যায়। ডেল্টা সেফাই নক্ষত্র এই শ্রেণিতে পড়ে। দ্বিতীয় শ্রেণির সেফিডদের পর্যায়কাল মেপেছিলেন লেভিট; তাদের রং লালের দিকে, তারা অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল এবং তাদের দেখা যায় গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছে। নীচের ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে যে দুই শ্রেণির সেফিডের জন্য ঔজ্জ্বল্য ও পর্যায়কালের সম্পর্ক আলাদা।

হাবল প্রথম শ্রেণির সেফিডের পর্যায়কাল মেপেছিলেন, কিন্তু তাদের ঔজ্জ্বল্যের জন্য লেভিটের সূত্র ব্যবহার
করেছিলেন যেটা ওই তারাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে একই পর্যায়কালের জন্য প্রথম শ্রেণির
নক্ষত্রদের ঔজ্জ্বল্য আসলে অনেক বেশি, অর্থাৎ হাবল তাদের দূরত্ব কম করে ধরেছিলেন। নতুন নিয়ম ব্যবহার করে দেখা গেল গ্যালাক্সিদের দূরত্ব আসলে হাবলের মাপের তিনগুণ, যেমন অ্যান্ড্রোমিডার দূরত্ব হল মোটামুটি পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ। এই মাপের সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্ড্রোমিডা সহ সমস্ত ছায়াপথের আকারও তিনগুণ বেড়ে গেল। এখন আমরা জানি যে আকাশগঙ্গা হল এক মাঝারি মাপের ছায়াপথ।

সেফিড নক্ষত্রদের এই বাড়াকমার কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী আর্থার
এডিংটন। প্রায় একশো বছর আগে তিনি নক্ষত্রের যে মডেল তৈরি করেছিলেন আজও আমরা সেই মডেল ব্যবহার করি, তবে তার আরও অনেক উন্নতি হয়েছে। এডিংটন বলেছিলেন যে নক্ষত্র নিজের মাধ্যাকর্ষণের টানের জন্য ছোটো হতে চায়। কিন্তু সে গ্যাস দিয়ে তৈরি এবং তার তাপমাত্রা খুব বেশি, তাই তার গ্যাসের চাপও বেশি। গ্যাসের চাপ এবং নক্ষত্র যে আলো বিকিরণ করে তার চাপ মাধ্যাকর্ষণের বিপক্ষে কাজ করে বলে নক্ষত্র আরও ছোটো হতে পারে না। সেফিডের ক্ষেত্রে কখনও মাধ্যাকর্ষণ বিপরীতমুখী চাপের থেকে বেশি শক্তিশালী হয়, তখন নক্ষত্রটা ছোটো হতে থাকে। কিন্তু ছোটো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার তাপমাত্রা বাড়ে, চাপ বাড়ে, সেই বর্ধিত চাপ আবার তাকে ফুলিয়ে বড়ো করে তোলে। এই তাপমাত্রা যখন বেশি তখন তার ঔজ্জ্বল্য বেশি হয়, তাপমাত্রা কমলে ঔজ্জ্বল্য কমে। কেন সেফিডের
ক্ষেত্রেই এ ধরনের হ্রাসবৃদ্ধি দেখা যায় সে কথা আলোচনার সুযোগ এই লেখাতে নেই। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত, আমাদের ব্রহ্মাণ্ডকে চিনতে সেফিড ভেরিয়েবল তারারা সাহায্য করেছে। আমাদের গ্যালাক্সির আকৃতি ও আয়তন, গ্যালাক্সিতে আমাদের অবস্থান, গ্যালাক্সিদের মধ্যেকার দূরত্ব, প্রসারণশীল ব্রহ্মাণ্ড—এক কথায় মহাবিশ্বকে চেনা ও জানার শুরুতে আছে এক কুড়ি বছরের বধির তরুণের অসীম কৌতূহল।

শেয়ার করুন

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *